আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
মতামত

দিল্লির সিংহাসনে কেজরিওয়াল ও মোদির ভবিষ্যৎ

Dr. Sarder Anis(1)ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান: দিল্লীর বিধানসভার নির্বাচনে আম আদমি পার্টির বিপুল বিজয় এবং বিজেপির ব্যাপক ভরাডুবিতে হয়েছে। সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় আসনের চেয়ে অনেক বেশী তথা ৩টি বাদে সবক’টি আসন পেয়ে বিজয়ী হয়েছে কেজরিওয়ালের দল আম আদমি পার্টি। শুধু তাই নয়, দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী পদে বিজেপির প্রার্থী সাবেক শীর্ষ নারী পুলিশ কর্মকর্তা কিরণ বেদী নিজেও হেরেছেন আম আদমির সাধারণ প্রার্থীর কাছে। দিল্লির কৃষ্ণনগর আসন বিজেপির দুর্গে কিরণ পেয়েছেন ৬৩ হাজার ৬শ ৪২ ভোট। আর আম আমদির এসকে বাঘা ৬৫ হাজার ৯শ ১৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন।

এই নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের প্রাথমিক ভোট গণনায়(প্রাপ্ত ফলাফলে) দিল্লীর ৭০ আসনের মধ্যে কেজরিওয়ালের দল ৬৭ টি আসনে, বিজেপি ৩ টি আসনে এগিয়েছিল। নির্বাচনে যথারীতি কংগ্রেসের ভরাডুবি ঘটেছে। দলটি কোনো আসনই পায়নি। (সূত্র এনডিটিভি)।এরফলে ৪৯ দিন দিল্লীর ক্ষমতায় থেকে পদত্যাগকারী মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি আবারো দিল্লীর মসনদে ফিরে আসছেন এটা ইতোমধ্যেই নিশ্চিত হয়ে গেছে। যদিও কেজরিওয়াল গত মে মাসে বেনারস আসন থেকে মোদিকে ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
২০১৩ সালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ১৫ বছর একটানা দিল্লীর মসনদ দখলে ছিল বিজেপির। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত দিল্লি নির্বাচনেও বিজয়ী হয়েছিল এই নতুন রাজনৈতিক দল আম আদমি পার্টি। কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে ২০১৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর দিল্লিতে সরকার গঠন করেছিলেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই ঘোষণাকারী কেজরিওয়ালের দল।

ওইদিন প্রায় এক লাখ লোকের উপস্থিতিতে রামলীলা ময়দানে সাদা টুপি মাথায় দিয়ে দিল্লির সর্বকনিষ্ঠ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে ভারতের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত এই নেতা। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে ৪৫ বছর বয়সী কেজরিওয়াল রাজনীতির ভিআইপি সংস্কৃতি বাদ দিতে পাবলিক মেট্রো ট্রেনে চড়ে অনুষ্ঠানস্থলে এসেছিলেন। সেখানে তিনি এক বছর আগে রাজনৈতিক দল গঠন করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়াকে অভাবনীয় উল্লেখ করে বলেছিলেন, আমি আমার দলের সংসদ সদস্যদের অহংকারী না হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা এখানে জনগণের সেবা করার জন্য এসেছি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শপথ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে কেজরিওয়াল বলেছিলেন, আসুন আমরা শপথ করি ঘুষ নেবো না এবং দেবো না। তার এই আহ্বানে উপস্থিত সমর্থকরা তুমুল হর্ষধ্বনি করেছিল। প্রসঙ্গত, এই রামলীলা মন্দিরেই ২০১১ সালে গান্ধীবাদী আন্না হাজারের সঙ্গে দুর্নীতিবিরোধী নতুন আইনের দাবিতে টানা ১৬ দিন অনশন করে নজরে আসেন কেজরিওয়াল।

কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করতে ব্যর্থ হন কেজরিওয়াল। ফলে মাত্র ৪৯দিনের মাথায় পদত্যাগ করেন এই আপ নেতা। এরপর দিল্লিতে স্থানীয় সরকার গঠনের জন্য গত শনিবার পুনরায় ভোট হয়। এবার ভোটের আগে পরে একাধিক জরিপেও এগিয়ে ছিল কেজরিওয়ালের দল।

এদিকে মঙ্গলবার ভোটের চূড়ান্ত ফলাফল আগেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। নিজের পরাজিয় স্বীকার করে নিয়েছেন দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী পদের জন্য বিজেপির প্রার্থী সাবেক শীর্ষ নারী পুলিশ কর্মকর্তা কিরণ বেদীও। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন,‘এই পরাজয় আমার। এতে প্রধানমন্ত্রী মোদির কোনো দায় নেই।’ যদিও মাত্র একদিন আগে এসব জরিপ উড়িয়ে দিয়ে নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করার আশা ব্যক্ত করেছিলেন তিনি।

তবে কিরণ যাই বলুন না কেন, আম আমাদি পার্টির এ বিজয়কে প্রধানমন্ত্রী মোদির জন্য সবচেয়ে বড় পরাজয় হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। গত বছর ভারতের লোকসভা নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর আট মাসের মাথায় এতবড় হোঁচট মোদির জন্য স্বাভাবিক বিষয় নয়। কারণ এ নির্বাচনকে ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সত্যিকারের জনপ্রিয়তা যাচাই হিসেবে দেখা হচ্ছিল। রাজধানী শহরে বিজেপির এই শোচনীয় পরাজয় মোদির জন্য একটি বড় ধাক্কা, যিনি মাত্র আট মাস আগে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। ভারতের গোটা রাজনীতিতে এর সুদূর প্রসারী প্রভাব পড়তে পারে এবং বড় ধরনের পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত বলে মনে করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ভারতের রাজনীতিতে হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা আম আদমি পার্টি দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান ও বক্তব্য নিয়ে রাতারাতি দিল্লির মানুষের মনে জায়গা করে নেয়া অন্য সব পুরানো রাজনৈতিক দলগুলোকে ভাবিয়ে তুলেছে।

মাত্র আট মাস আগে জাতীয় নির্বাচনে দেশটির চরম ডানপন্থি দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বিপুল ভোটে জয়লাভের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করে এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন বহুল আলোচিত গুজরাট হত্যাকাণ্ডের ‘নায়ক’ চাওয়ালা নরেন্দ্র মোদি।

নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় বসার আগে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ভারতবাসীকে তার কিছুই এ পর্যন্ত দেখাতে পারেননি। তার নির্বাচনী ইশতেহারের প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। কিন্তু ক্ষমতা লাভের আট মাস পার হলেও সৃষ্টি হয়নি নতুন কোনো কর্মক্ষেত্র এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধেও কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এর বদলে বিজেপি তার প্রতিপক্ষ কংগ্রেসকে ঘায়েল করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ রাজনীতিতে সমালোচনার সৃষ্টি করে।সেই সাথে ভারতের বেশ কয়েকটি এলাকায় সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের ঘটনাও মোদিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু এরই দিল্লির মসনদ দখলে নির্বাচনে ভরাডুবি মোদির বড় ধরনের ধাক্কা। কারণ দিল্লির মসনদ বিজেপি কিংবা কংগ্রেসের নয়। দিল্লির নির্বাচনে জয় লাভ করেছে নতুন দল আম আদমি পার্টি।
যতদূর জানা যায়, গত বছর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতাসীন হবার পরপরই নরেন্দ্র মোদি দিল্লি মসনদ নিয়ে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এঁটেছিলেন। যা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের একনিষ্ঠ সহযোদ্ধা কিরণ বেদিসহ বেশ কয়েকজন নেতার বিজেপিতে যোগদানের মাধ্যমেই প্রমাণ মিলে। অথচ এই কিরণ বেদিই তার টুইটার অ্যাকাউন্টে মোদির বিরুদ্ধে অনেক তথ্য-প্রমাণাদি হাজির করে বক্তব্য দিয়েছিলেন।কিন্তু এত সব কৌশল করেও শেষ রক্ষা হয়নি মোদির। আম আমাদির কাছে বড় ধরনের হার মানতেই হলো মোদীকে।
দিল্লি নির্বাচনের দৌড়ে এবারও কংগ্রেস গত নির্বাচনের ন্যায় ভরাডুবি হয়েছে। গোটা ভারতে কংগ্রেস নেতাদের দুর্নীতির দুর্ণাম মুছে দিল্লির কংগ্রেস নেতার পক্ষে ভোটের বাজারে এসে দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি। কেজরিওয়ালের ঝাড়ুর ঝড়ে তছনছ হয়ে গেছে সব পরিকল্পনা।
এদিকে সাবেক শীর্ষ নারী পুলিশ কর্মকর্তা কিরণ বেদীকে ক’দিন আগে ভাগিয়ে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী পদে প্রার্থী করাকেও বিজেপির বড় ভরাডুবির কারণ হিসেবে দেখছেন অনেকে। সেই সাথে দিল্লির মসনদ হারানোকে মোদির ভবিষ্যত রাজনীতির জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ।এর মধ্যে মোদির পলিসি ও কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন না আসলে এবং বর্তমানের কাজের গতি অব্যাহত থাকলে আগামী নির্বাচনে কংগ্রেসের ভাগ্য বিজেপিকেও যে বরণ করতে হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

অন্যদিকে দিল্লীর বিধানসভার নির্বাচনে আম আদমি পার্টির বিপুল বিজয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাওয়া অরবিন্দ কেজরিওয়ালও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। কেননা, আগের ভুলত্রুটি জন্য ক্ষমা চেয়ে দ্বিতীয়বার ঘুষ-দুর্ণীতিমুক্ত দিল্লী গড়ার প্রতিশ্রুতি কেজরিওয়াল কতটা রক্ষা করতে পারে সেটা দেখার অপেক্ষায় এখন দিল্লীর জনগণ।আর অরবিন্দ কেজরিওয়াল যদি তাঁর দেয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ঠিকই রক্ষা করতে পারেন তবে গোটা ভারতের রাজনীতিতে স্বল্প সময়ের মধ্যেই একটা বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।অন্যথা কেজরিওয়ালকেও আগামী দিনে সোনিয়া-মোদির মতোই একই পরিণতি ভোগ করতে হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

লেখক: শিক্ষা ও সমাজ বিষয়ক গবেষক। ই-মেইল: sarderanis@gmail.com

ঢাকা, ১৪ ফেব্রুয়ারি (ওমেনআই)/এসএল/

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close