আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
আপন ভুবন

দাদার বাড়িতে কোরবানি ঈদ

শান্তা মারিয়া
আমার শৈশব ও কিশোরবেলার শিরোনাম হতে পারে ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’। সত্যিই নির্মল, সুস্থ, সুখী শৈশব ছিল আমার। বিশেষকরে চকবাজারের বাড়িতে ঈদ মানেই আনন্দধারা। রোজার ঈদ ও কোরবানির ঈদ আমরা সাধারণত চকবাজারের বাড়িতেই কাটাতাম। বিশেষ করে যতদিন চাচারা জীবিত ছিলেন।
আমার শৈশবে দেখেছি বাবা কোরবানি দিতেন চাচাদের সঙ্গে। আলুবাজারের বাড়িতে গরু জবাইয়ের খাটুনি ও ঝামেলা করা বাবার বিশেষ করে মায়ের ধাতে পোষাতো না। বাবা কখনও গরুর হাটে যেতেন না।
মূলত আমি চাকরিতে ঢোকার পর নিজেদের বাড়িতে আলাদা কোরবানি শুরু করি। তাই বলা যায় জীবনের দীর্ঘ সময় চকের বাড়িতেই আমাদের কোরবানি ঈদ কেটেছে। লালচাচা একটি বা দুটি গরু এবং ছাগলও কোরবানি দিতেন। সাধারণত মেজচাচা ও আমরা একসঙ্গে কোরবানি দিতাম। অন্য চাচারা যার যার বাড়িতে কোরবানি দিতেন। চকের বাড়িতে আরও কেউ কোরবানি দিতেন কিনা আমার মনে নেই। সাধারণত চকের বাড়িতে তিন থেকে চারটি গরু কোরবানি হতো।
ঈদের দিন সকাল হলেই আমরা সেজেগুজে আলুবাজার থেকে বেগমবাজারে চলে যেতাম। বাবা চাচারা নিচের তলায় গরু কোরবানির জায়গায় ব্যস্ত। বাড়ির পিছনের কসাইপট্টি থেকে আমাদের পরিচিত কসাইরা হাজির। আমার চাচাতো ভাইদের মধ্যে যারা একটু বড় তারাও বাবা চাচাদের সঙ্গেই কাজে দারুণ ব্যস্ত। আর দোতলায়( পরে তিনতলায়) মেজচাচী, লালচাচী, মা এবং অন্যান্য আত্মীয়রা মাংসের অন্যান্য প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। আমার মা একধারে বসে ভাবীদের সঙ্গ দিতেন। ওসব মাংস ঘাঁটাঘাটি মায়ের একদম পছন্দ ছিল না। শেলীবু, মিলিবু, মুন্নুবু, পারভীনবু, রোকসানাবুও রান্না ও অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত। কারণ ঈদের দিন সকাল থেকেই চকবাজারে আত্মীয়রা একের পর এক আসছেন। আমাদের মানে ছোটদের ব্যস্ততা রাজ্যের দুষ্টুমী আর হৈহুল্লোড়ে। চকের মেলায় যাচ্ছি সালামির টাকা নিয়ে। বাড়ির সঙ্গেই রাস্তার উপরে মেলা। তাই মেলায় একবার নয়, বহুবার ছুটে ছুটে যাওয়া হচ্ছে। মেলায় আমার সঙ্গে অবশ্য রহমতভাই অথবা আমার বড়ভাই(উদয়) থাকছেন। যাতে হারিয়ে না যাই। মন্টুমামা, সন্তুমামা(এরা মেজচাচীর সহোদর এবং বাবার খালাতোভাই) তাদের পরিবার নিয়ে চলে এসেছেন ঈদ উদযাপনে। মন্টুমামার মেয়ে ডালিয়া আমার সমবয়সী। ডালিয়া খুব ফর্সা আর হাসিখুশি মেয়ে। ডালিয়া-ভ্যালিয়া মিলে সারা বাড়িতে ছুটোছুটি চলছে। সন্তুমামার মেয়ে শান্তা আমাদের চেয়ে অনেক ছোট। আমি যে সময়ের কথা বলছি তখনও সন্তুমামা বিয়ে করেননি। তিনি অসম্ভব ভালো এবং শিশুদের সঙ্গে মিশে যাওয়া একজন মানুষ। তিনিও মেতে আছেন আমাদের সঙ্গে(আসলে, তিনি লক্ষ্য রাখছেন যেন আমরা পড়ে-টরে না যাই)। আছে দুষ্টুর শিরোমণি আমার চাচাতো ভাই আবদুল্লাহ। নিত্যনতুন খেলনার খবর জানাতে আর দুষ্টুমীর কায়দা কানুন বের করতে তার জুড়ি নেই। চকের মেলা থেকে অবশ্য অবশ্যই কেনা হয়েছে ঢোল, ডুগডুগি, কটকট শব্দ করা টিনের মাছ-ডুগডুগি, দড়িটানা ড্যাং ড্যাং গাড়ি, লাঠি লাগানো টিনের প্রজাপতি যেটা চালালে কটকট শব্দ হয়। মোটকথা কানের গোড়ায় যত রকম শব্দ করা সম্ভব তা আমরা করে যাচ্ছি এবং বড়দের মাথা খারাপ করার পক্ষে তা যথেষ্ট।
একবার ঈদে এই শব্দদূষণ এতটাই মাত্রা ছাড়িয়ে যায় যে, সন্তুমামা একটি বুদ্ধি করেন। তিনি কি একটা কায়দা করে ডুগডুগি গাড়ির ড্যাং ড্যাং শব্দ করার কাঠিগুলো খুলে ফেলেন। অন্যান্য খেলনা থেকেও কিভাবে যেন উচ্চ শব্দ বের হওয়া বন্ধ করে দেন।
চকের মেলা থেকে কেনা খেলনার মধ্যে আরও ছিল বাঁশি, কাগজের সাপ, ঘাড়ে স্প্রিং বসানো বুড়োবুড়ি, মাটির পুতুল, মাটির ও টিনের হাড়ি পাতিলের সেট ইত্যাদি। ঢাকায় যে কোন নতুন খেলনা আসরেই সেটি প্রথম পাওয়া যেত চকের মেলায়। নব্বই দশকে দেখেছি ফ্রেন্ডশিপ মার্কেট থেকে আসা অসংখ্য চীনা খেলনা।
চকের মেলায় নাগরদোলার আয়োজন ছিল। জেলখানার প্রাচীরের পাশেই বসানো হতো এই নাগরদোলা। জেলখানার সামনে থেকে শুরু হয়ে মেলা ছড়িয়ে পড়তো চক সার্কুলার রোড, উর্দু রোড, বেগম বাজারের গলি, মৌলভি বাজার পর্যন্ত। পুরানো ঢাকার প্রত্যেক মহল্লাতেই ছোট ছোট খেলনার দোকানও বসতো ঈদে।

কোরবানির ঈদে গরু জবাইয়ের পর তিনভাগ করে ফেলা হতো নিচতলাতেই। তিনভাগের এক ভাগ গরীব দুঃখীদের মধ্যে বেটে দেয়া হতো।

বাকি দু’ভাগ মাংস উপরে আন্দর মহলে নিয়ে আসা হতো। মাংস ভাগাভাগির বিষয়ে সবচেয়ে এক্সপার্ট মেজচাচা। তার নিজস্ব ওজন মেশিন রয়েছে। একচুলও যেন এদিক ওদিক না হয়। আত্মীয়দের বাড়ি বাড়ি মাংস নিয়ে যেতেন রহমতভাই ও মনোয়ারভাই।
অন্যদিকে বাড়ির দোতলার ড্রইংরুমে বসেছে টিন এজার আর একটু বড় ভাইবোনের আড্ডা। আশির দশকে যখন পারভীনবু ও রোকসানা বু’র বিয়ে হয়ে গেল তখন সেই আড্ডায় যোগ দিলেন দুই দুলাভাই। নিজাম খান ও বদরুল করিম আমাদের দুই প্রিয় দুলাভাই যেমন আমাদের স্নেহ করতেন তেমনি মজার মজার কথায় হাসাতেনও।
বেগম বাজার, আলুবাজারে প্রত্যেক বাড়িতেই গরু ছাগল কোরবানি হতো। একেক বাড়ির গরু ছাগলের একেক রকম বৈশিষ্ট্য।আমাদের পাড়ার ইউসুফ হাজীদের বাড়িতে সবসময়ই মিরকাদিমের দুটি গরু আনা হতো। ইব্রাহিম হাজীরা পাহাড়ের মতো উঁচু দুটি লাল রঙের অস্ট্রেলিয়ান ষাঁড় বাড়ির ফটকে বেঁধে রাখতো। তুলার গোডাউনের মালিক ছিল বোম্বাইয়ের মানুষ। তাদের বলা হতো বোম্বাইয়া। তারা সব সময় তিনটি হরিয়ানা ষাঁড় আনতো। বিশাল শিংওয়ালা সাদা রঙের সেই ষাঁড়গুলোকে দেখলেই ভয় করতো।
একজন চেয়ারম্যান(তার নামটা ভুলে গেছি সম্ভবত হোসেন) সাতটি ছাগল কোরবানি দিতেন। চার স্ত্রীর নামে চারটি। একটি নিজের নামে, অন্য দুটি বাবা মায়ের নামে।
কোরবানির মাংস বাড়িতে নিয়ে আসার পর বাবা তার নিজস্ব বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে বিলাতেন। এই কাজে বাবাকে আমি সাহায্য করতাম খুব ছোটবেলা থেকে। আগেই বলেছি মা কাঁচা মাংস ও রক্তের গন্ধ সহ্য করতে পারতেন না। আমাদের বাপ বেটি মিলেই এসব কাজ সারতে হতো। বাবা গরুর মাংস খুব একটা পছন্দ করতেন না। তাছাড়া তার বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন সনাতন ধর্মাবলম্বী। তাই বেশিরভাগ বছর আলাদা একটি ছাগলও কোরবানি দিতেন।
ঈদের পরের দিনটি বেশি মজা হতো। কারণ এদিন মাংস টাংসর ঝামেলা নেই। ইচ্ছা মতো বেড়ানো চলবে। বড় চাচা থাকেন বাংলা বাজারের নর্থব্রুক হল রোডে। সদরঘাটের খুব কাছে এই বাড়ি। দোতলা বাড়িটি লাল ইটের। ঈদের পরদিন তার বাড়িতে গেলে দেখতাম স্পেশাল মেন্যু। সেখানে অবশ্য অবশ্যই থাকবে হাড়ি কাবাব এবং ল্যাম্ব লেগ রোস্ট। আরও থাকবে দহি বড়া। আমার বড় চাচী মুর্শিদাবাদের বনেদী বাড়ির মেয়ে। নবাব পরিবারের আত্মীয়। ফলে তার রান্নায় নবাবী ঐতিহ্য থাকবেই।
সেজচাচার লালমাটিয়ার বাড়িতেও যাওয়া হতো বৈকি। এই বাড়িটি হলো ধানমন্ডি সাতাশ নম্বর আর লালমাটির সংযোগস্থলে, এখনকার জেনেটিক প্লাজার পিছনে। বাড়িটির নাম সপ্তর্ষি।
তখনকার লালমাটিয়া খুবই নিরিবিলি। আলাদা আলাদা প্লটে একেকটা বড় বড় বাড়ি। একতলা, দোতলা বা সর্বোচ্চ তিনতলা একেকটা বাড়ি। চাচার বাড়িতে খাবার দাবারের এলাহি আয়োজন। টেবিলে সেমাই ও পোলাও মাংস, রোস্ট রেজালা রয়েছে। যে মেহমানই আসুক তাকে বসিয়ে দেয়া হচ্ছে খাবারের টেবিলে। বিভিন্ন বাড়ি ঘুরে সেজচাচার বাড়িতে যাওয়া হতো। তখন পেট থাকতো ভর্তি। খাবারের একটুও ইচ্ছা থাকতো না। কিন্তু হলে কি হবে, ‘খাবো না’ এ কথাটি বলার সাহস কার আছে সেজচাচার মুখের ওপর? আমি সেজচাচাকে খুব ভয় পেতাম। যদিও তিনি আমাকে ও ভাইয়াকে খুবই স্নেহ করতেন। খাবার টেবিলে বসে একটু হলেও খাবার মুখে দিতেই হতো। বড়চাচা ও সেজচাচার বাড়িতে আরেকটি জিনিস থাকতো। ড্রইং রুমে সেন্টার টেবিলের উপর একটি পিতলের খোরমাদানিতে বেশ কিছু খোরমা। সেজচাচাদের সেন্টার টেবিলের টপ হচ্ছে মোরাদাবাদের কাজ করা পিতলের তৈরি। দেয়ালে একটি বড় পেইন্টিং ও নানা রকমের ছবি।
আমাদের নিজেদের বাড়ির বৈঠকখানাতেও ঈদের কয়েকদিন বাবা একটি আতরদানে কয়েক রকম আতর এবং খোরমাদানিতে খোরমা সাজিয়ে রাখতেন।
চাচার বাসা থেকে ফেরার পথে ফুপুর বাড়িতেও ঢুঁ মারা হতো। ধানমন্ডি সাতাশ নম্বরে আমার বড়ফুপুর বাড়ি। এখনকার রাপা প্লাজার পাশে সিমা ব্লজম নামে যে বিশাল ভবনটি সেটি আমার বড়ফুপার। তখন সেখানে তিনতলা একটি বাড়ি ছিল। বড়ফুপার নাম সিরাজুল হক। আর ফুপুর নাম মাহযূযা হক। দুজনের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে বাড়ির নাম সিমা। সেজচাচার বাড়ি যেমন সর্বদা সরগরম, ফুপুর বাড়ি কিন্তু তেমন নয়। যদিও তার বাড়িতেও মেহমান প্রচুর। কিন্তু কেন যেন এই বাড়িটি আমার কাছে একটু শান্ত ও নিরিবিলি বলে মনে হতো। ফুপাকে দেখতাম ঈদের দিনও তার নিজস্ব বিশাল লাইব্রেরি ঘরে বইয়ে ডুবে আছেন।
ছোটবেলার ঈদের স্মৃতি বলে শেষ হবে না। এখন যখন বিদেশের মাটিতে নিরামিষ ঈদ করি, ঈদের দিনও অফিসে যাই, বাড়িতে নিজের হাতে রান্না করতে করতে চোখের জলে নাকের জলে ভাসতে হয়(পেয়াজ কাটতে গিয়ে), তখন মনের ভিতর ভেসে ওঠে ছোটবেলার সেইসব জৌলুসময় ঈদের কথা।

সামি/৩০/৭/২০.৫১

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close