আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
জাতীয়

​​​​​​​করোনাকালে ১৬% নারী চাকরিচ্যুত, ছাঁটাই ২০%

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সমীক্ষা প্রকাশ

​​​​​​ওমেনআই ডেস্ক : মহামারি করোনাকালে বিভিন্ন কারখানায় কর্মরত শ্রমজীবী নারীদের ১৬ শতাংশ চাকরিচ্যুত হয়েছেন। আর এই সময়ে সাময়িকভাবে ছাঁটাই হয়েছেন ২০ শতাংশ নারী।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে এমন চিত্র। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে দেশের শ্রমজীবী নারীদের আর্থ সামাজিক অবস্থান সম্পর্কিত একটি সমীক্ষা পরিচালনা করেছে সংগঠনটি।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১ টায় সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে অনলাইনে সংবাদ সম্মেলনে এ সমীক্ষা প্রকাশ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম।

দেশের শ্রমজীবী নারীদের আর্থ সামাজিক অবস্থান সম্পর্কিত সমীক্ষার তথ্য উপস্থাপন করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পাঠাগার উপ-পরিষদের রিসার্চ ও ট্রেনিং অফিসার ও সদস্য আফরুজা আরমান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পাঠাগার উপ-পরিষদ সম্পাদক রীনা আহমেদ।

সমীক্ষায় বলা হয়, করোনাকালে ১৬ শতাংশ নারী চাকরিচ্যুত হয়েছেন। সাময়িকভাবে ছাটাঁই হয়েছেন ২০ শতাংশ নারী। গৃহকর্মী হিসেবে যারা কাজ করতেন তাদেরকে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য বাসাবাড়িতে আপাতত কাজে নিচ্ছে না। বেতন বন্ধ বা আংশিক বেতন থাকায় ৫২ শতাংশ নারী আর্থিক সংকটে আছেন। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবীরা সর্বোচ্চ করোনা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন, ঘরে খাবার না থাকায় নিম্নমানের জীবন যাপন করছেন ৩০ শতাংশ ও পরিবারের ভরণপোষণ করতে পারছেন না ২৮ শতাংশ নারী।

সমীক্ষায় আরও বলা হয়, খুব অল্প সংখ্যক নারী চাকরির বেতন দ্বারা ৩ শতাংশ সংসারের খরচ মেটাচ্ছেন। এমতাবস্থায় সন্তানের লেখাপড়ার খরচ বহন করা কষ্টকর হচ্ছে এবং শিশু শ্রম ও বাল্য বিবাহের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে নারীর প্রতি সহিংসতা।

সংগঠনটির দেওয়া তথ্য মতে, সর্বোচ্চ ৩৯ শতাংশ নারী বিভিন্ন পোশাক শিল্প, জুতা ও ব্যাগ তৈরিসহ বিভিন্ন কারখানায় কাজ করেন। করোনার কারণে সৃষ্ট সমস্যায় দীর্ঘ সময় ধরে কারখানার শ্রমিক নারী, গৃহকর্মী, দিনমজুর, নির্মাণ শ্রমিক, হোটেলের রান্না বা মসলা বাটার কাজ করেন প্রভৃতি-এমন খেটে খাওয়া শ্রমজীবী নারীরা এখন গৃহবন্দী। বেশির ভাগেরই কাজ নেই, বেতন বন্ধ। সাধারণ ছুটিতে কারখানা বন্ধ আছে বলে ১৮ শতাংশ নারী শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারছেন না। আশিংক বেতন পাচ্ছেন ১৬ শতাংশ এবং বেতন বন্ধ ৩০ শতাংশ নারীর।

সমীক্ষার তথ্য মতে, করোনাকালে স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরির সাথে সাথে আর্থিক, সামাজিক, পারিবারিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বড় ধরণের অভিঘাত তৈরি করেছে, যা নারীদের ওপর ভিন্ন ধরণের প্রভাব তৈরি করেছে। দেশের শ্রমশক্তিতে ৩০ শতাংশ নারীরা যুক্ত, যাদের অধিকাংশই ইনফরমাল সেক্টরে কাজ করেন। তাদের অনেকেই করোনাকালীন সময়ে কাজ হারিয়েছেন।

করোনা সংক্রমণে আক্রান্তের হিসেবে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা কম হলেও এর কারণে সৃষ্ট সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিঘাতসমূহ নারীদের পারিপার্শিক অবস্থাকে আরও প্রান্তিক করে তুলেছে যা পরবর্তীতে নারীর অগ্রগতিকে আরও বাধাগ্রস্ত করবে বলে সংগঠন মনে করে।

এ অবস্থায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সুপারিশগুলো হলো—

  • সরকারের সেফটি নেট কর্মসূচির পরিধি বাড়াতে হবে।
  • করোনারর কারণে যে সকল শ্রমজীবী নারী কর্মহীন হয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে তাদের সেফটি নেটের আওতায় আনতে হবে।
  • শ্রমজীবী নারীদের কর্মে ফিরে আসার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে সরকারকে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিতে হবে।
  • শ্রমজীবী পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে পরিবারের কন্যা শিশুদের লেখাপড়া অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
  • শিক্ষার ক্ষেত্রে ছাত্রীদের এই ঝড়ে পড়া রোধে বিভিন্ন প্রণোদনা দিয়ে, বৃত্তি দিয়ে বা উৎসাহব্যঞ্জক কিছু করে কীভাবে তাদের শিক্ষার মধ্যে যেন ধরে রাখা যায় তা ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • বর্তমানে উদ্ভূত আর্থিক সংকটের কারণে বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা প্রতিরোধে সরকারকে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • শ্রমজীবী নারীরা অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে যুক্ত থাকার কারণে সরকারের প্রণোদনা কর্মসূচির আওতাভুক্ত নন। এই শ্রমজীবী নারীদের জন্য জরুরিভিত্তিতে সহায়ক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • সরকারি ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে শ্রমজীবী নারীর প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার ও জনপ্রতিনিধিদের বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে ও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • নির্যাতনের শিকার নারীদের রাষ্ট্রকর্তৃক আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। এই সময়ে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
  • আদালতে নারী নির্যাতন বিষয়ক মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।
  • নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সাহায্যকারী সংস্থা ও হটলাইনগুলো সম্পর্কে তথ্য যেন সবাই জানতে পারে এবং তা থেকে কী সহায়তা, কীভাবে পেতে পারে তা টিভি স্ক্রল ও ব্রেকিং নিউজ হিসেবে গণমাধ্যমে প্রচার করতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ নারীরা যেন এই তথ্যগুলি পায় সে জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • সংকটকালীন সময়ে সরকারের যে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো আছে সেখানে নারীর আশ্রয়ের যথাযথ ব্যবস্থা করতে হবে।
  • যেহেতু পরিবহন সীমিত, নারী সহিংসতার শিকার হলেও কোথাও যেতে পারছে না। সেক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে শেল্টারহোম বা আশ্রয়কেন্দ্রগুলো বাড়াতে হবে এবং তাদেরকে এ বিষয়ে জানাতে হবে।
  • নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ ও নির্মূলে সরকারের সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলিতে বাজেট বৃদ্ধি করতে হবে।
  • পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিকদের চাকরি সুরক্ষিত রাখার জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • করোনাকালীন নারীর স্বাস্থ্যসেবা সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে।

সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম সভাপতির বক্তব্যে বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী যেকোনো দুর্যোগে নারীরা আক্রান্ত হয় বেশি। অথচ নারীদের সুরক্ষায় যে জেন্ডার বিভাজন ডাটা থাকা দরকার সেটি কখনোই গুরুত্ব পায় না। এই পরিস্থিতিতে সমীক্ষাটি কেবল ইনফরমাল সেক্টরের নারীদের দেওয়া তথ্যের আলোকে করা হয়েছে।’

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাত্র ৩১ শতাংশ নারী মনে করেন সহিংসতার ঘটনায় তাদের বিচার প্রাপ্তির সুযোগ আছে। এটি করোনা পরিস্থিতি আরও সীমিত করে দিয়েছে। অন্যদিকে সামাজিক পরিস্থিতির কারণে অনেকে মামলা করতে চায় না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু, সহ সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. মাসুদা রেহানা বেগম, সংগঠন সম্পাদক উম্মে সালমা বেগম, প্রকাশনা সম্পাদক সারাবান তহুরা, আন্তর্জাতিক সম্পাদক রেখা সাহা; প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পাঠাগার উপ-পরিষদ সদস্য হুমায়রা খাতুন, সাংবাদিক এবং সংগঠনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সমীক্ষার জন্য সংগঠনের ২৬ টি জেলা শাখার সংগঠকদের মাধ্যমে তথ্য সংগৃহীত হয়েছে। প্রতিটি জেলা হতে পাঁচজন করে মোট ১৩০ জন শ্রমজীবী নারী এ সমীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। সমীক্ষায় দেখা গেছে অংশগ্রহণকারী শ্রমজীবী নারীরা বেশিরভাগই বিভিন্ন কারখানার শ্রমিক ও স্বল্প আয়ের মানুষ।

মা/১০/৯/২৩.০০

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close