আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সারাদেশ

‘কুইন’ নারী স্বাধীনতার এক ঝলক

Queenওমেনআই: হিন্দি সিনেমা সম্পর্কে এক ধরনের গড়পড়তা নেতিবাচক ধারণা আমাদের আছে, তার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। আবার কিছু চলচ্চিত্র নিয়ে সকল শ্রেণীর দর্শক-সমালোচকই ইতিবাচক রিভিউ দেন— ওই সিনেমাটা না দেখলে অসাধারণ কিছু একটা মিস করা হয়। তখন স্বীকার করে নিতেই হয় বলিউডে অনেক মেধাবী নির্মাতা আছেন।

তেমন একটি সিনেমা ‘কুইন’। স্পয়লার দেওয়া ঠিক হবে না তাই কাহিনী বলে দেওয়া থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করলাম। আবার আমি মুভির তেমন ভাল বিশ্লেষকও নই। কিন্তু কিছু বলার লোভ ছাড়া গেল না। এই মুভি দেখে মনে হয়েছে, উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলে একজন নারীও এই সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষের মতো অবদান রাখতে পারেন। পরিচালক এখানে অত্যন্ত সহজ কিন্তু দারুণ এক উপায়ে নারীর স্বাধীনতার চিত্র তুলে এনেছেন।

বিয়ে ভেঙে যাওয়ায় অভিমানী রাণী পাড়ি জমান প্যারিসে, যেখানে নারীরা স্বাধীন। আর ভারতে আইন, সংস্কৃতি— সবকিছুতেই সে শেকল পরা। এমনকি নারীরা ঢেঁকুর তুললেও সেটাকে ভাল চোখে দেখা হয় না। কিন্তু পুরুষের বেলায় এমনটা নেই। কোনো পার্টিতে মেয়েরা ইচ্ছা থাকলেও সবার সঙ্গে নাচতে পারবে না, কিন্তু পুরুষরা ঠিকই পারে। গাড়ি চালানোর ব্যাপারে মেয়েদের ক্ষেত্রে বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা। মেয়েরা গাড়ি চালাবে এটা অনুমোদিত না। কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে গাড়ি চালানোতে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা বেশী সফল।

মোট কথা, আমাদের সমাজে নারীকে একদমই অথর্ব হিসেবে ধরা হয়। আর নারীরাও হাজার বছরের ঐতিহ্য মেনে পুরুষের অধীন থাকতে পছন্দ করে। নিজের সমস্ত স্বাধীনতা অর্পণ করে পুরুষের কাছে নিরাপত্তা চায়। একজন পুরুষ খেয়াল না রাখলে নারী নিজেকে নিরাপত্তাহীন বলে মনে করে। জন্ম থেকেই দাসী এবং দাসী থাকতে পছন্দ করে। এই দাসত্ব ছেড়েও যে একজন নারীর পক্ষে স্বাধীন জীবনযাপন করা সম্ভব তা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ‘কুইন’।

অতি স্বাভাবিক চুম্বন নিয়েও লজ্জায় বলতে পারে না ভারতের কোনো শহুরে মেয়ে। স্বাধীন পরিবেশ পেয়ে সে এই কাজটাও করতে সাহস করে। ভারতের রাস্তায় ড্রাইভিং করার সময় যখন তার প্রিয় ছেলেটির অনেক বকা হজম করতে হয় সেখানে নিজেই অন্য সব ছেলেকে নিয়ে ড্রাইভ করতে পারে। এমনকি রাস্তাঘাট না চিনলেও অন্য কোনো পুরুষের সহায়তা ছাড়াই গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পারে। সবই মানসিকতা। সবার আগে মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। একা একা নির্জন রাস্তায় কোনো ছিনতাইকারী একটা মেয়ের সামনে এলে আমাদের সমাজের মেয়েরা সবার আগে বলবে— আমার গায়ে হাত দিও না, আমি নিজে থেকেই তোমাকে গয়নাগাঁটি খুলে দিচ্ছি। নারীর পক্ষেও যে একটা ছিনতাইকারীর সঙ্গে লড়ে নিজের দরকারি জিনিসপত্র রক্ষা করা যায় এবং তার জন্য সুপার উইম্যান হওয়ার প্রয়োজন নেই তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ‘কুইন’। হয়তো আমাদের সমাজ এমন কিছুর জন্য এখনো প্রস্তুত হয়নি। কিন্তু কাউকে না কাউকে তা করে দেখাতে হবে। এ সবকিছুকে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন পরিচালক বিকাশ বোহেল।

‘কুইন’ সিনেমাটি অসাধারণ লাগার পেছনে একদম শেষ দৃশ্যের বড়সড় ভূমিকা আছে। সেখানে দেখা যায়, প্রেমিক বিয়ে না করাতে যে রাণী নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল, সে-ই পরে প্রেমিকের বা হবু স্বামীর কাছ থেকে হাসিমুখে দূরে চলে যাচ্ছে। তাকে কত অনুনয় করছে বিয়ের জন্য, জানায় অনেক ভালবাসে— কত কী! কিন্তু রাণী তাকে ভালবাসা জানিয়ে বিদায় নিয়ে আসে। সে আসলেই ‘কুইন’। ছেলেটার প্রতি ঘৃণা নেই। প্রেমিকের কিছু কর্মকাণ্ডের কারণেই তাকে ফ্রান্স যেতে হয়েছে, এতে তার চোখ খুলে গেছে। সে আর তার পায়ে পুরুষের শেকল বেঁধে রাখতে চায় না। নারী স্বাধীনতা নিয়ে মিডিয়া বা অন্যান্য সংস্থার কায়কারবার ব্যক্তিজীবনে বেশী কিছু এনে দিতে পারে না। সবচেয়ে বড় বিষয় হল মানসিকভাবে মুক্তি পাওয়া। যেখানে আমাদের সমাজের প্রায় সব মেয়েই পুরুষের নিরাপত্তায় থাকতে চায়, সেখানে কেউ একজন এই নিয়মের বাইরে গিয়ে দুর্গম পথ সুগম করতে চাইলে অবশ্যই সেটা মাইলফলক হিসেবে গণ্য হবে।

সিনেমাটি অবশ্য এ রিভিউয়ের মতো কাঠখোট্টা নয়। হঠাৎ করে বিদেশের মাটিতে একটি মেয়ে যেভাবে জীবনযাপন করে তা আসলেই উপভোগ্য। ফ্রান্সে বেড়াতে যাওয়া এক মেয়ের সময়ে সময়ে ঘটা কাহিনী দর্শকের জন্য অনেক আনন্দের খোরাক হবে নিঃসন্দেহে। এক যৌনকর্মীর সঙ্গে সিনেমার অনেকটা সময়জুড়ে রাণীর অবস্থান আরও আগ্রহোদ্দীপক করে তোলে দর্শকদের। পাশাপাশি ওই যৌনকর্মীর জীবন বাস্তবতাও উঠে আসে।

‘কুইন’ ২০১৪ সালে মুক্তি পাওয়া বলিউডের অন্যতম সেরা সিনেমা। নারীকেন্দ্রিক এই সিনেমাটি দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছিল। এক হিসেবে ‘কুইন’ ২০১৪ সালের সবচেয়ে ব্যবসাসফল সিনেমা। ব্যবসার সাফল্য মূলত আমরা ধরে থাকি কত আয় করল তার ওপর। কিন্তু আদতে সত্যিকার সাফল্য হল কত খরচ হয়েছে এবং সে অনুপাতে কত আয় করেছে তার ওপর। এই সিনেমাটি স্বল্প বাজেটের কিন্তু সে তুলনায় আয় করে নিয়েছে অনেক। সাড়ে ১২ কোটি রুপির চলচ্চিত্রটি আয় করেছে ১২০ কোটি রুপি।

রাণী চরিত্রে অভিনয় করেছেন কঙ্গনা রনৌত। কঙ্গনার নাম শুনেছিলাম সেই স্কুলে পড়াকালে। পার্শ্ব নায়িকা হিসেবে কয়েকটি সিনেমায় অভিনয় করে থাকবেন। তাই খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে কখনই খেয়াল করিনি। পরে উইকিপিডিয়ায় ‘কুইন’ সম্পর্কে পড়তে গিয়ে জানলাম উনি সেই কঙ্গনা। অসাধারণ অভিনয় করেছেন। কঙ্গনা রনৌতের জীবন নিয়ে পড়তে গিয়েও অন্যরকমের শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়ে গেল। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘আমি খুবই সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। আমি যখন অভিনয়কে পেশা হিসেবে নিই, তখন আমার বাবা-মা আমাকে নিয়ে শঙ্কা করেছিল। পরে আমি যখন সাফল্য অর্জন করি তখন সে ভয় কেটেছিল, এমনকি এখন আমার সমগ্র অঞ্চল আমাকে নিয়ে গর্বিত।’ কঙ্গনার আরেকটি উক্তি ‘আমার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হল— আমি জানি কীভাবে শিখতে হয় এবং বিশ্বাস করি আমার ইচ্ছাশক্তিই আমাকে অনেক দূর এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।’

সময় পেলে সিনেমাটি দেখার জন্য অনুরোধ রইল। আশা করি সবার ভাল লাগবে।

তথ্য ঋণ : আইএমডিবি, উইকিপিডিয়া

লেখক : সিরাজাম মুনির শ্রাবণ
বিভাগীয় সম্পাদক, জিরো টু ইনফিনিটি
সূত্র: ওয়েব সাইট

ঢাকা, ২৪ মার্চ (ওমেনঅাই)/এসএল/

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close