আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সাহিত্য

শান্তা মারিয়ার গল্প

 

ভয়-কাট্টা
হিমালয়ের ভুবনবিখ্যাত পর্বত শীর্ষগুলো দেখা যাচ্ছে। মাকালু, কাঞ্চনজংঘা, অর্ণপূর্ণা আর অবশ্যই এভারেস্ট। প্রায় সব যাত্রীরই মনোযোগ জানালায়। সুমন তো জানালা থেকে চোখ সরাতেই পারছে না। জীবনে প্রথমবারের মতো নেপালযাত্রা। রঞ্জনা আপার জন্যই এটা সম্ভব হলো। মাত্র এক বছর হলো এই এনজিওর চাকরিটাতে ঢুকেছে সুমন। এক বছরের মধ্যেই বিদেশ ট্যুর অসম্ভব একটা ব্যাপার। সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে রঞ্জনা আপার আনুকূল্য। শুধু নেপাল ভ্রমণ নয়, চাকরিটাও হয়েছে বলতে গেলে রঞ্জনার দয়াতেই। এত নামকরা এনজিওতে মোটামুটি ভালো বেতনে চাকরি পাওয়ার মতো কি এমন যোগ্যতা ছিল সুমনের? নেহাত রঞ্জনা তার পরিচিত ছিলেন বলেই না।
পরিচয়টাও আকস্মিক। প্রেসক্লাবে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের একটা অনুষ্ঠানে সুমন গিয়েছিল তার এনজিওর পক্ষ থেকে। সে তখন ছোট্ট একটা এনজিওর নগণ্য একটা প্রকল্পে কাজ করছে। তিনমাসের কাজ। তিন মাস শেষ হলে আবার বেকার হয়ে পড়তে হবে এটা জানা ছিল। দুঃশ্চিন্তাও ছিল। চাকরি খুঁজছিল সে। কিন্তু জুটছিল না কোনটাই। তার শিক্ষাগত যোগ্যতাও খুব বেশি নয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাধারণ ব্যাচেলর ডিগ্রি। আজকাল অফিস সহকারীরও থাকে। ঢাকায় কোন খুঁটির জোরও ছিল না। ফার্মগেটের একটা মেসবাড়িতে কোনক্রমে মাথা গুঁজে থাকা। একে বাঁচা বলে না। প্রেমিকা একজন ছিল। কিন্তু সেও সুমনের হাঁড়ির হাল দেখে কাটব কাটব করছে।
হঠাৎ দৈব আশীর্বাদ হয়ে জীবনে চলে এলেন সাদেকা রহমান রঞ্জনা।
সেই অনুষ্ঠানেই সে মুগ্ধ হয়েছিল রঞ্জনা আপার রূপে। কি সুন্দর দেখতে। লম্বা, ফর্সা, একমাথা চুল। চেহারা দেখলে যে কোন পুরুষেরই মাথা ঘুরে যাওয়ার কথা। সে বয়সটা আন্দাজ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পারেনি। কত হবে? পঁয়ত্রিশ? নাকি আরও বেশি? যাক গে। বয়সে কি আসে যায়। সুমন ভিড় ঠেলে গিয়ে আলাপ করেছিল ওর সঙ্গে। সুমন নিজেও দেখতে খারাপ নয়। রং শ্যামলা, সুঠামদেহী, মাথার ঘনচুল ব্যাকব্রাশ করা। আর বয়সটাও তো পঁচিশ ছাব্বিশের বেশি নয়।
অনুষ্ঠানের পরদিনই সুমন আবার গিয়েছিল সেই এনজিওর অফিসে, রঞ্জনার কাছ থেকে পাওয়া বিজনেস কার্ডটা সম্বল করে। সেদিন কথায় কথায় আলাপ ভালোই জমেছিল। এমনকি দুজনের হোম ডিস্ট্রিক্টও মিলে গিয়েছিল। আলাপ এতদূর জমেছিল যে সেদিনই সাহস করে সুমন চাকরির আশাটাও রঞ্জনার কানে তুলে দিতে পেরেছিল। একটু দ্বিধা বা ভয়ও ছিল হয়তো। যদি রঞ্জনা মনে করে সে লোভী বা চাকরির আশায় ঘুর ঘুর করা ফালতু ছোকরা। কিন্তু রঞ্জনা তেমন কিছু ভাবেনি। বরং একেবারে আপন জনের আন্তরিকতা নিয়ে তাকে বলেছিল একটা অ্যাপ্লিকেশন আর রিজিউম জমা দিতে। গোপন কথা ফাঁস করার ভঙ্গিতে বলেছিল, চাকরি নাকি একটা খালি আছে।
কথাটা মিথ্যে নয়। একমাসের মাথায় সত্যিই সুমনের চাকরি হয়েছিল ওই অফিসেই। জুনিয়র পোস্ট যদিও। তাতে কি। প্রমোশনও হয়েছে তার ছ’মাসের মধ্যেই। আর এ সবই হয়েছে রঞ্জনার কৃপায়। সুমন বুঝেছিল, রঞ্জনা আপাকে নিজের ফেভারে রাখতে পারলে এই প্রতিষ্ঠানে তার উন্নতি কেউ ঠেকাতে পারবে না। কারণ এখানকার কান্ট্রি ডিরেক্টর থেকে শুরু করে টপ লেভেল কর্তারা সকলেই রঞ্জনার গুণমুগ্ধ ভক্ত। রঞ্জনার সঙ্গে কান্ট্রি ডিরেক্টরের সম্পর্কটা মোটেই অধীনস্ত কর্মীর মতো নয়, বরং বান্ধবীই বলা চলে। প্রায়ই দুজনে একসঙ্গে বিদেশ সফর করেন। ডেপুটি ডিরেক্টর যিনি তিনিও বলতে গেলে ওর হাতের মুঠোয়। দুজনে একসঙ্গে লাঞ্চ করেন প্রতিদিন। অন্য সহকর্মীরাও তাকে পছন্দ করেন।
শুরুর দিকে সুমন মাঝে মাঝে ভাবতো রঞ্জনার এই জনপ্রিয়তার রহস্যটা কি? শুধুই রূপ? পরে বুঝেছে, রঞ্জনা শুধু রূপসী বা বসের বান্ধবীই নয়, তার ব্যবহারটাও অত্যন্ত মোলায়েম। সে যথাসাধ্য অন্যের উপকারও করে। নইলে কি দায় পড়েছিল সুমনের চাকরিটা করে দেয়ার। সুমন একটা কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতেই তাকালো পাশে বসা রঞ্জনার দিকে।
চোখে চোখ পড়তেই দেখলো রঞ্জনা তার দিকেই তাকিয়ে আছে। মুখে পরিচিত স্মিত হাসি। সুমনও পাল্টা হাসলো। তারপর জানালা দিয়ে আবার তুষার মৌলি দৃষ্টিকে কেড়ে নিল।
নেপালের ত্রিভুবন এয়ারপোর্ট দেখা যাচ্ছে। জীবনে এই প্রথম বিমানযাত্রা। তাও আবার ত্রিভুবনের মতো একটা বেয়াড়া বিপদজনক এয়ারফিল্ডে ল্যান্ডিং। সুমনের ভিতরে ভিতরে ভয় লাগছিল। এই এয়ারপোর্টে দুর্ঘটনা তো কম ঘটেনি। বিশেষ করে সেই ভয়ংকর দুর্ঘটনাটার পর নেপাল শুনলেই বুকের ভিতর ভয় লাগে।
কিন্তু সে যে ভয় পেয়েছে একথা অন্যদের দেখানো যাবে না। ভাববে গাঁইয়া। বিশেষ করে সহযাত্রীদের তো নয়ই। এই ট্রিপে বাংলাদেশ থেকে ওরা চারজন এসেছে নেপালে একটা ওয়ার্কশপে যোগ দিতে। ওদের এনজিও থেকে সে আর রঞ্জনা। অন্য দুজন অন্য এনজিওর। ঢাকাতেই আলাপ হয়ে গেছে। চঞ্চল হাসান একটু বয়স্ক। পঞ্চাশের আশপোশে হবে। সানজিদা ইসলাম বেশ কম বয়সী। বোধহয় ছাব্বিশ সাতাশ। নামটা খ্যাতের মতো হলেও সানজিদা দেখতে চটকদার। স্টাইলিশও। জিন্সের উপর ফতুয়া পরা সানজিদার দিকে চোখ চলে যায়ই। রঞ্জনা আপার মতো সানজিদাও বেশ দীর্ঘাঙ্গী। শুধু দীর্ঘাঙ্গী নয়, দুর্দান্ত ফিগার। রঞ্জনা বরং একটু ভারির দিকে হয়ে গেছে। কিন্তু সানজিদা কারিনা কাপুরকে হার মানায়। প্লেন যখন ত্রিভুবনের উপর চক্কর কাটছে, সুমনের নার্ভাস লাগলেও চোখে মুখে সেটা বুঝতে দিচ্ছিল না। সানজিদা আর চঞ্চলসাহেব অবশ্য বসেছেন সামনের সিটে। সেখান থেকে সুমনকে দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু কাছাকাছি একজন সুন্দরী নারী আছে এই চেতনাই ওর মধ্যে একটা আলগা স্মার্টনেস জাগিয়ে তুলছিল। সুন্দরী অবশ্য রঞ্জনাও। কিন্তু রঞ্জনাকে তো এক বছর ধরে রোজই দেখছে। তার সঙ্গে গল্প হচ্ছে, সুখ দুঃখের বিনিময় হচ্ছে। রঞ্জনার সবটাই ওর জানা হয়ে গেছে। রঞ্জনার রূপ এখন আর ওর মধ্যে কোন মোহের সৃষ্টি করে না।
প্লেনটা একটু গোত্তা মারলেও, ঠিকঠাক মতোই নেমে পড়েছে। ক্যাপ্টেন ব্যাটা কাবিল আছে বলতে হবে। প্লেন যখন নামছিল সুমন ভেবেছিল রঞ্জনা হয়তো ভয় পাবে। ভয় পেলে হাত ধরার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল সে। কিন্তু রঞ্জনা মোটেই ভয় পায়নি। সে এর আগে ইউরোপ আমেরিকা ঘুরে এসেছে। এই একঘন্টার মামুলি বিমানযাত্রা তার কাছে কিছুই নয়। রঞ্জনা বরং ভাবছিল সুমনের কথা। সানজিদাকে দেখার পর থেকেই একটা অজানা আশংকা বোধ করছিল রঞ্জনা। যে কোন সুন্দরীকে দেখলেই আজকাল তার ভয় ভয় লাগে। এটা কিসের ভয় তাও বুঝতে পারে না রঞ্জনা। সে কি জানে না যে, সুমন চিরদিন ওর হাতের ঘুড়ি হয়ে আটকে থাকবে না। একদিন না একদিন সুতো কাটবেই। তবু মন মানতে চায় না।
রঞ্জনা বিবাহিত। দুই ছেলে এক মেয়ে। স্বামীও আছে। অন্যদিকে প্রেমিক সহকর্মীরাও রয়েছেন। কিন্তু তাদের কারও ওপর জোর খাটানো যায় না। বরং রঞ্জনাই ওদের হুজুর হুজুর করে। কিন্তু সুমনের কথা আলাদা। সুমন ওর হাতের পুতুল। সেটা কারও কাছে হারানো চলবে না।
ইমিগ্রেশনে কোন ঝামেলা নেই। পোর্ট এন্ট্রি। রঞ্জনা আর সুমন বেশ সহজেই বেরিয়ে এসে লাগেজ সংগ্রহের দিকে এগিয়ে গেল। পিছনে চঞ্চল আর সানজিদা। সুমন কেন যেন একটু ধীরে হাঁটছিল। বোধহয় পিছিয়ে পড়া সানজিদার জন্য। রঞ্জনা তাকাতেই সুমন অবশ্য নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে লাগেজের জায়গায় ঠিক রঞ্জনার পাশে দাঁড়িয়ে গেছে।
মাত্র সাতদিনের ওয়ার্কশপ। এদিক ওদিক মিলিয়ে টেনেটুনে নয় দিন। মাঝারি আকৃতির একটা ব্যাগ হলেই চলে। কিন্তু রঞ্জনা এনেছে বিশাল আকারের এক ট্রলি। বেজায় ভারিও। ‘ইট পাথর নিয়ে এসেছ নাকি আপা?’ রঞ্জনার ভারি ব্যাগটা নামাতে নামাতে হেসে প্রশ্ন করলো সুমন। ‘ওর ভিতরে তোর গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে এসেছি’ পাল্টা ঠাট্টা করলো রঞ্জনা। ওদের দুজনের মধ্যে এ ধরনের ঠাট্টা তামাশা প্রায়ই চলে। বিশেষ করে সুমনের আগের প্রেমিকা কেটে পড়ার পর থেকে। রঞ্জনার ট্রলিটা নামিয়ে পাশে সানজিদার দিকে তাকালো সুমন। ওর ব্যাগটা অত বড় না হলেও পুরুষের স্বাভাবিক সৌজন্য বশে সে ওটাও নামিয়ে দিল। সানজিদা খুশি হয়ে থ্যাংকস জানালো সঙ্গে হাসি। সুমনও ওয়েলকাম বলে পাল্টা হাসি ফিরিয়ে দিয়ে খেয়াল করলো মুখ গম্ভীর করে তাকিয়ে আছে রঞ্জনা। কিছুই হয়নি এমন ভাব করে সুমন ওর বিশাল ট্রলিটা ধরে পিছনে পিছনে হাঁটা শুরু করলো। তার নিজের কাপড় চোপড় খুবই সামান্য এনেছে সে। একটা ব্যাক প্যাকই যথেষ্ট। চঞ্চল হাসান ওদিকে একটা হ্যান্ড লাগেজ নিয়ে দিব্যি আছেন। দুই সুন্দরীর কারও দিকেই মনোযোগ নেই তার।
ওদের থাকবার ব্যবস্থা হলো কাঠমান্ডুর থামেল এলাকায়। থামেল হলো টুরিস্টদের আস্তানা। এখানে ফাইভ স্টার থেকে শুরু করে চিত কাত হোটেল পর্যন্ত রয়েছে। আছে বিভিন্ন দেশের খাবারের ছোট বড় রেস্টুরেন্ট। ক্যাসিনো আর বারও রয়েছে। আর ক্যাবারে নাচের ব্যবস্থাও। স্পাইডার লেডির ডান্সের ঘোষণা দেয়া একটা সাইনবোর্ড সুমনের নজর এড়ায়নি। বলিউড ডান্সারের রগরগে ছবি আর বিজ্ঞাপনও রয়েছে তার পাশেই। এর যে কোন একটা দেখতে হবে আর ক্যাসিনোতেও ঢুঁ মারতে হবে, মনে মনে তখনই স্থির করে ফেললো সুমন। একটু ফুর্তি না করতে পারলে আর বিদেশে এসে লাভ কি হলো। অন্তত বন্ধুবান্ধবের কাছে বলার মতো কিছু গল্পও তো চাই।
হোটেল মুনলাইট। বেশ বড় হোটেল। চার তারকা হবে। রিসেপশনে দুই নেপালি সুন্দরী। প্রথমদিন তেমন কিছু না হলেও পরের দিন এই দুই সুন্দরীকে ঘিরেই অঘটনটা ঘটলো। বাংলাদেশ থেকে ওরা চারজন এসেছে। আর শ্রীলংকা, ভারত, পাকিস্তান থেকেও এসেছে বেশ কয়েকজন পার্টিসিপেন্ট। নেপালীও আছে কয়েকজন। সুইডেন, নেদারল্যান্ডসের দুটি আইএনজিও হলো আয়োজক।
ওয়ার্কশপের সেশন চলছিল। ইংরেজিতে এত কচকচি একদম ভালো লাগছিল না সুমনের। সকাল থেকে লাগাতার চলছে। থামবার কোন লক্ষ্যণ নেই। ব্রেকের আগে সুযোগ বুঝে একটু কাট মেরেছিল সুমন। রিসেপশনে বসে ভাঙা হিন্দিতে গল্প জুড়েছিল দুই সুন্দরীর সঙ্গে। এতদিন ধরে হিন্দি সিরিয়াল আর সিনেমা দেখার কিছু উপকার তো আছে। নেহাতই নিরামিষ আলাপ। সুমনকে অনুপস্থিত দেখে যে সেশনের মাঝখান থেকে রঞ্জনা বেরিয়ে আসতে পারে একথা একদম মাথায় ছিল না তার। রঞ্জনা খালি একনজর তাকিয়ে দেখেছিল দুই সুন্দরীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে সুমনের সেলফি তোলার দৃশ্য। এক সুন্দরীর কাঁধে আয়েশী ভঙ্গিতে সুমনের বাঁ হাত। আরেক সুন্দরীর হাত সুমনের আরেক কাঁধে।
সঙ্গে সঙ্গে প্যানিক অ্যাটাক। হোটেলের লবিতেই সোফার উপর কাত হয়ে পড়েছিল সে। তার কাত হয়ে পড়ে যাওয়া দেখে ছুটে এল এক মহিলা কর্মী। রঞ্জনার তখন প্রায় জ্ঞানহারা অবস্থা। বুক ধরফর করছে, হৃদপিন্ড চলছে ঝড়ের গতিতে, হাত পা ঘামছে। সুমনেরও ছুটে আসতে দেরি হয়নি। হইচই শুনে ব্রেক টাইমে বেরিয়ে আসা চঞ্চল হাসান এবং সানজিদাও চলে এলেন দ্রুত পায়ে। ‘কি হলো?’ ‘হার্ট অ্যাটাক নাকি? এত ঘামছেন কেন?’ সুমন অবশ্য জানে কি হয়েছে। এটা রঞ্জনার আগেও দুয়েকবার হয়েছে। অফিসে। এরকম হলেই তিনি সুমনের নাম ধরে ডাকতে থাকেন। ওকে তখন মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে হয়। পাশে বসে থাকতে হয়। ধীরে ধীরে হাত পা ম্যাসেজ করে দিতে হয়। এদিকে রঞ্জনার এই অবস্থা দেখে এগিয়ে এলেন ইউরোপীয় আয়োজকরাও। তারা কোন ঝুঁকি নিতে নারাজ। তাদের মতে হাসপাতালে পাঠানো দরকার রঞ্জনাকে। ততোক্ষণে অবশ্য রঞ্জনার অবস্থা একটু ভালোর দিকে। সুমন যখন পাশে আছে তখন ভয়ের আর কারণ নেই। ধীরে ধীরে পালস রেট স্বাভাবিক হচ্ছে। সুমন ওদের আশ্বস্ত করে রঞ্জনাকে নিয়ে এগিয়ে গেল লিফটের দিকে। ঘরে নিয়ে শুইয়ে রাখতে হবে কিছুক্ষণ। এভাবে হোটেলের লবিতে নাটকটা চালানোর কোন মানে হয় না।
লাঞ্চের পর রঞ্জনা একদম সুস্থ। দেখে মনেই হয় না এক ঘন্টা আগেও তার প্রাণ কণ্ঠাগত হয়ে পড়েছিল।
এর পরের কয়েকটা দিন যেন স্বপ্নের মতো সুন্দর। তিনটায় ওয়ার্কশপের সেশন শেষ হওয়ার পর দলবেঁধে ঘোরাঘুরি। দরবার স্কোয়ারে বসে আড্ডা। ডিনারের পর লবিতে, কখনও কখনও কারও রুমে নৈশ আড্ডা। সেখানে সবদেশীরাই যোগ দিযেছে দুয়েকজন ছাড়া। সানজিদা শুধু রূপসী নয়, কোকিলকণ্ঠীও। বিশেষ করে লোকগীতিতে মাতিয়ে দিয়েছে সবদেশীদেরই। রঞ্জনার গানের গলাও মন্দ নয়। সেও হিন্দি আর হারানো দিনের বাংলা গানে আসর জমিয়েছে।
রঞ্জনার বিশাল ট্রলি আনার রহস্যও পরিষ্কার হয়েছে। শুধু নিজের ফ্যাশন প্যারেডের নজরকাড়া পোশাকই নয়, সুমনের জন্যও আড়ং থেকে দামি পাঞ্জাবি নিয়ে এসেছে সে। আর যথেষ্ট পরিমানে চানাচুর, নিমকি ধরনের স্ন্যাকস। ফলে রাত্রিকালীন আড্ডায় জনপ্রিয়তা পেতে দেরি হয়নি, এমনকি ইউরোপীয় আয়োজকদের মধ্যেও। ওয়ার্কশপের পাশাপাশি ওদের ঘোরাঘুরিও চলছিল পুরো দমে। থামেল থেকে দরবার স্কোয়ার তো হেঁটেই যাওয়া চলে। এছাড়াও বুদ্ধনাথ, ভক্তপুর, ললিতপুর এগুলোও দেখা হলো। শাড়ি পরা রঞ্জনাকে দেখে ‘মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য’ বলার ইচ্ছাটা দমন করাই মুশকিল হয়ে ওঠে সুমনের কাছে। আর দমন করার দরকারই কি। রাতেরে নিভৃতিতে হোটেলের বিলাসী ঘরগুলো অনায়াসে উজ্জয়নীর প্রাসাদ কক্ষ হতেও বাধা থাকে না। রঞ্জনার কোমর ছাপানো কালো চুলে হাত বুলাতে বুলাতে সুমনের মনেও আর কোন অতৃপ্তি থাকে না। ভালোই চলছিল। কিন্তু চার পাঁচদিন পর স্বয়ম্ভূ স্তূপে গিয়ে আবার প্যানিক অ্যাটাক।
কি হয়েছিল? তেমন কিছুই না। যাওয়া হয়েছিল বেশ বড় দলে। ইউরোপীয়, বাঙালি, ভারতীয়, পাকিস্তানি, শ্রীলংকান মিলিয়ে প্রায় পঁচিশ জনের গ্রুপ। রঞ্জনার সঙ্গে কথা চলছিল শ্রীলংকান জেন্ডার বিশেষজ্ঞ ছাতুর জৈমিনির । অন্যদিকে সানজিদার সঙ্গে একটু হেসে গল্প করছিল সুমন। সানজিদা সেদিন পরেছিল থামেল থেকে কেনা নেপালি কুর্তা আর ধুতি-পায়জামা। অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল মেয়েটিকে। সেদিন বরং রঞ্জনাকেই একটু কেমন যেন বয়স্ক লাগছিল। হয়তো পাহাড় ভেঙে ওঠার কারণে। মুখের কোথায় যেন বলিরেখার ভাঁজে জমে থাকা প্রসাধনী বিদ্রুপ জাগাচ্ছিল। অথচ সানজিদার তারুণদীপ্ত মুখ কি নিটোল, কি পেলব। কোথাও সাজের বাহুল্য নেই। রঞ্জনার চড়া আই শ্যাডো আর লাইনারে যেমন ক্লান্তির ইশারা তেমনি বিপরীতে সানজিদার হালকা কাজলে সবুজ সতেজতা। সানজিদা সুমনকে খুব যে পাত্তা দিয়েছে এ ক’দিন তা নয়। ওর নজর অনেক উঁচুতে। সুইডেনের হান্স বেনডিক্টের দিকেই ওর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত ছিল এ ক’দিন। আজই কেন যেন সে সুমনের সঙ্গে হেসে কথা বলছিল। স্তূপের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে সুমনকে বোঝাচ্ছিল ভূমিকম্পের আগে সে নেপাল কেমন দেখেছে আর পরে কতটা ক্ষতি সারিয়ে নিতে পেরেছে এই দরিদ্র দেশটি। রঞ্জনা যে ছাতুর জৈমিনির সঙ্গে কথা বলতে বলতেও আড়চোখে ওদের দুজনকে লক্ষ্য করছিল সেটা কি করে যেন দৃষ্টি এড়িয়ে গিয়েছিল সুমনের।
হঠাৎ সেই পরিচিত চিৎকার। ‘সুমন সুমন, শিগগিরি আয়’, আমার জানি কেমন লাগছে’। জৈমিনি আর অন্য বিদেশিরা দৌড়ে এসে ধরাধরি করে এক জায়গায় বসিয়ে দিল রঞ্জনাকে। স্বয়ম্ভূ স্তূপে তো আর দেশী বিদেশী পর্যটকের অভাব নেই। কেউ জপ যন্ত্র ঘোরাচ্ছে তো কেউ ছবি তুলছে। সাদা, কালো, বাদামি সব রকম অঙ্গধারীরাই ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে এদিকটায়। নেহাত অপরের ব্যক্তিগত ব্যাপার মনে করে নাক গলাচ্ছে না। আবার সেই একই প্রশ্ন, হার্ট অ্যাটাক? সানজিদা মনে হয় ঘটনা কিছুটা আঁচ করতে পেরেছে। পাশে দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই। কিন্তু চেহারায় কোন উৎকণ্ঠা নেই। বরং একটু বিদ্রুপের হাসিই যেন খেলা করছে ঠোঁটের কোণে। একমাত্র নির্বিকার চঞ্চল হাসান। নিজের খেয়ালে ছবি তুলছেন একটার পর একটা। এদিকে কোন মনোযোগই দিচ্ছেন না। ভাবখানা যেন তিনি এই দলের সঙ্গেই নেই। সুমন ওই সিঁড়িতে বসেই রঞ্জনার হাতে পায়ে ম্যাসেজ করছিল। আর মৃদু স্বরে বলছিল ‘কিচ্ছু হয়নি, ভয় পেও না তো’।
কাঠমান্ডুতে আর অ্যাটাক হয়নি। পোখরা আর নাগরকোটেও নয়। এর কারণ বোধহয় সুমনের অতি সতর্কতা। কে কি ভাবলো, সব চক্ষুলজ্জার মুখে ছাই দিয়ে সুমন নেপাল ট্যুরের বাকি কটা দিন রঞ্জনার পাশে পাশেই ছিল। গাড়িতে, মাইক্রোবাসে, প্লেনে, বরাবর। পোখরা যাওয়ার লম্বা পথটা সুমনের কাঁধে মাথা রেখে জিরিয়ে নিয়েছে রঞ্জনা। সুমনও ওর সবটুকু মনোযোগ ঢেলে দিয়েছে রীতিমতো এই ধ্রুবতারার দিকে। থামেলে রঞ্জনা শপিংও করেছে একেবারে প্রাণমন ঢেলে। নেপালী গয়না, ভারতীয় কাপড় চোপড়, আর শালের বোঝা বহণ করেছে সুমন, হাসিমুখেই। সেইসঙ্গে উপহারও পেয়েছে শাল, স্যুটপিস, চায়নিজ জ্যাকেট, জুতা কী নয়। নেপালে চীনা আর ভারতীয় মালের ছড়াছড়ি। সেই ছড়াছড়ির মধ্যে রঞ্জনাও যেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে টাকার শ্রাদ্ধ করেছে। রঞ্জনা হাতখোলা মেয়ে। বস, স্বামী, ছেলেমেয়ে, সুমন, অফিসের সহকর্মী, সকলের জন্যই দেদার উপহার কিনেছে সে। সুমনও আপাত হাসিমুখেই সেইসব ব্যাগ বহণ করেছে। সানজিদা ওদের দেখে মুখ টিপে হেসেছে। কিন্তু সুমন সেদিকে পাত্তা দেয়নি। বরং রঞ্জনার কানে কানে এমন সব মন্তব্য করেছে যাতে সানজিদার রূপকে খর্ব করা যায়। এর মধ্যে মোক্ষম মন্তব্য ছিল ‘ঢ্যাঙা’, ‘সাজতে জানে না’ এবং ‘খ্যাতমার্কা’। এই মন্তব্যগুলোর পর আর প্যানিক অ্যাটাকের ভয় করতে হয়নি সুমনকে। ক্যাসিনোতেও রঞ্জনাকে আর দলের অন্য কয়েকজনকে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে নিতে পেরেছিল সে। ক্যাসিনোতে যেতে রঞ্জনার কোন আপত্তি ছিল না। কিন্তু ‘স্পাইডার লেডি’ বা ‘বলিউডি ডান্সার’ কাউকেই দেখার সৌভাগ্য হয়নি তার। নেপালি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল দুদিন। ডিনারের পর্ হোটেলের বড় হলঘরে। সেখানে নেপালি শিল্পীদের সঙ্গে নাচে অংশ নিয়েছিল সানজিদা আর কয়েকজন উৎসাহী। হান্স বেনেডিক্টও। তাই সানজিদার পুরো মনোযোগ সেদিকেই কেন্দ্রীভূত ছিল স্বাভাবিকভাবেই। সুমনেরও খুব ইচ্ছা করছিল ওদের সঙ্গে নাচতে। রঞ্জনাকে একবার বলেও ছিল। কিন্তু রঞ্জনার গম্ভীর মুখ দেখে সে আর প্যানিক অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়াতে চায়নি।
নেপাল থেকে ফেরার মাসখানেক পরও রঞ্জনার আইফোনের ছবিগুলো ফেসবুক ভাসিয়েছে, অনেকের অন্তরজ্বালার কারণও হয়েছে।
পরে,সুমনের সঙ্গে রঞ্জনার স্বামীরও পরিচয় হয়েছে। অদ্ভুত একটা লোক। রঞ্জনার মুখে শুনেছে লোকটা খুব রাগী। কিন্তু তার রাগ হলো যত রাজ্যের খুঁটিনাটি জিনিস নিয়ে। রান্নাটা ঠিকমতো হলো কিনা, বাথরুম পরিষ্কার কিনা, কাপড়চোপড় আয়রন করা আছে কিনা এইসব। বেডরুমে বা ড্রইংরুমে এককণা ধুলো দেখলেই নাকি তিনি বাড়ি মাথায় করেন। কিন্তু দাম্পত্য জীবনে জমে থাকা আবর্জনার দিকে তার চোখ নেই। রঞ্জনা যদি তার সামনেই বসের সঙ্গে ঢলাঢলিও করে তিনি সেটা লক্ষ্য করবেন বলে মনে হয় না। অবশ্য রঞ্জনা অফিসের ময়লা বাড়িতে নেয় না কখনও।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অফিসে সুমনের গ্রহণ যোগ্যতা একটু একটু করে বেড়েছে। সে কাজে কর্মে কিছুটা দক্ষ হয়েছে, ধীরে ধীরে ক্ষমতাও অর্জন করেছে। সুমনের টেবিলে মাঝে মধ্যেই নারী সহকর্মীদের আনাগোনা যত বেড়েছে রঞ্জনার প্যানিক অ্যাটাকও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বৈকি।
এখন অনেকেই ব্যাপারটা বোঝে। তাই ওদের ঘাঁটাতে চায় না। রঞ্জনাকে চটিয়ে চাকরিটাকে হুমকির মুখে ফেলতে চায় না নারী সহকর্মীরাও। আর সুমনও এমন কিছু ফজলী আম নয় যে, পেড়ে খাওয়ার জন্য তাদের মুখ চুলকাবে। বরং রঞ্জনা-সুমনকে আপা দুলাভাইয়ের জায়গায় বসিয়ে তারা মাঝে মধ্যেই এটা সেটা খাবারের বায়না ধরে। রঞ্জনাও উদার হস্তে খাওয়ায় ওদের। সম্পর্কটা যতই অফিসে গ্রহণযোগ্যতা পাক সুমন জানে এই দ্বীপের বাইরে বৃহত্তর সমাজে সেটা মূল্যহীন। এই সম্পর্কের কোন ভবিষ্যত নেই। তার নিজেরই বরং আজকাল ক্লান্ত লাগে।
ফার্মগেটের সেই মেসবাড়িটা সে বহু আগেই ছেড়েছে। বাড্ডার একটা ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকে সে। দুই রুমের ফ্ল্যাট হলেও বেশ চটকদার। ভবনটা নতুন। রঞ্জনা সেটা সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছে। অফিস ছুটির পর প্রায়ই তারা একসঙ্গে এখানে আসে। কিন্তু ঘন্টা বা দুই ঘন্টার বেশি থাকতে পারে না কখনও। রঞ্জনা চলে যাওয়ার পর শূন্যতাটা আরও বেশি করে চেপে বসে ওর মাথায়। চাকরির তিন চার বছর হয়ে গেছে। টাকাও জমেছে কিছু। বয়সও বাড়ছে ওর। এখন গৃহের স্থায়ী সুখ শান্তির জন্য তৃষ্ণাটা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে প্রায়ই। সামাজিকভাবে পরিচয় দেয়ার মতো একজন মোটামুটি স্ত্রী, ছেলেপিলে, যাদের নিয়ে ছুটিতে দেশের বাড়িতে যাওয়া যায়। বৃদ্ধ বাবা মা যাদের নিয়ে সগর্বে পাড়া প্রতিবেশীর বাড়িতে যাবেন। শহর থেকে আসা নাতি নাতনিদের দেখাবেন।
রঞ্জনা তাকে যতই ভালোবাসুক সে কখনও তার স্ত্রী হতে পারবে না। কথাটা রঞ্জনাও বলেছে। সে কখনও তার স্বামীকে ডিভোর্স করবে না। তার জীবনের স্থিতাবস্থা একটুও টালমাটাল হয় এমন কোন কিছু তাকে দিয়ে হবার নয়। তারমানে কি? দিনের পর দিন এই ক্লান্তিকর প্রেম চালিয়ে যাওয়া, মাঝে মধ্যে বিদেশ ভ্রমণে গিয়ে হানিমুন, হানিমুন খেলা।
কিন্তু সে যদি অন্য কাউকে বিয়ে তো দূরের কথা একটু প্রেম-ট্রেমও করে রঞ্জনা হয়তো তাকে খুন করে ফেলবে অথবা নিজেই মারা যাবে। প্যানিক অ্যাটাক নয়, সত্যি সত্যি হার্ট অ্যাটাক হবে। আর নয়তো এমন কেলেংকারি করবে যে ঢাকা শহর থেকে পাত্তারি গুটাতে হবে। এই অফিস থেকে অন্য অফিসে চাকরির চেষ্টা করা যায় অবশ্য। কিন্তু এনজিও সেক্টরে ঢাকায় মোটামুটি সবাই সবাইকে চেনে। এক অফিসে কেলেংকারি করে অন্য অফিসে যাওয়াটা বেশ কঠিন। হয়তো প্রোফেশনটাই বদলাতে হবে।
কানাডায় ইমিগ্রেশনের জন্য খুব গোপনে চেষ্টা করছিল সুমন। রঞ্জনার হাতের লাটাই হাতেই থাকবে। সে শুধু মাঝখান দিয়ে ভোঁকাট্টা হয়ে যাবে। এই সুতো বাঁধা জীবন কোন জীবনই নয়। এর থেকে মুক্তি পেতেই হবে। আর বিদেশে চলে যাওয়াটাই মুক্তির সবচেয়ে ভদ্রজনোচিত উপায়। কিন্তু ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটলো যে ও কোনকিছু করারই অবকাশ পেল না।
অফিসে লাঞ্চের পর নিজের চেয়ারে বসেছে দশমিনিটও হয়নি। এর মধ্যেই ম্যাসিভ অ্যাটাক। রঞ্জনা তখন সুইডেনে।
সহকর্মীরা হাসপাতালে দ্রুতই নিয়ে যায়। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্সেই নিষ্প্রাণ হয়ে গিয়েছিল সে। একটা কথাও উচ্চারণ করার সময় হয়নি তার। সুমনের মৃত্যুর পর ছয় মাস কেটেছে। আর কোন প্যানিক অ্যাটাক হয়নি রঞ্জনার। হয়তো আর কোনদিন হবেও না।

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

Close
Back to top button
Close
Close