আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
শিল্প-সংস্কৃতি

একজন নন্দিনীর গল্প

মিহির কান্তি রাউত:

খ্যাতি, সম্মান ও অভিনন্দন প্রাপ্তি এসবের যেমন ভার তেমনই তার বিড়ম্বনা। শিল্পের যে কোন শাখায় খ্যাতিমান বা কৃতীমান ব্যক্তিত্বের জন্য এ বিশেষণগুলো তার বাকী জীবনকে তাড়িয়ে বেড়ায়। অর্থমূল্যের চেয়েও সেগুলো বেশী মূল্যবান হয়ে জীবনকে এলোমেলো করে দেয়। একটা সময় জীবনে এগুলো হয়ে ওঠে প্রধান নিয়ন্ত্রক। খ্যাতির তেজটুকু বাগে রাখা খুব কঠিন হয়ে পড়ে।
ধরা যাক অভিনয় শিল্পের কথা। ভাষা , দেশ ও মহাদেশ ছাড়িয়ে এ শিল্প পৌছে যায় যে কোন প্রান্তে। বর্তমানে আঙুলের ডগা দিয়ে স্ক্রীন ঘষে ঘষে খ্যাতিমান বা পপুলার অভিনয় শিল্পীকে বেছে নেয়া যায় মূহুর্তে। এই শিল্পের খ্যাতিমানরাও তাদের জীবনকে আর দশটা মানুষের মতো করে টেনে নিতে পারে না। কেন পারে না তার গভীরে গেলে বোঝা যাবে , কেন ? তেমনি একজনের কথা বলি ।প্রকৃত নামটা নাই বা বলি। তার একটা নতুন নাম দেয়া যাক। নন্দিনী।
নন্দিনী মানে তো কন্যা। উচ্ছ্বলা, প্রাণবন্ত এক কন্যা। কন্ঠে সুর খেলা করে , শরীরে নৃত্যের কলা ফুটে ওঠে, তুলিতে তার প্রানের ছোয়া। অর্থাৎ সংগীত-নৃত্য-চিত্রকলা, তিন মাধ্যমে নন্দিনীর পদক্ষেপ। কোন মাধ্যমেই ব্যাকরণ জানা নেই ।তাতে কি ! নিজের গুণে তিন মাধ্যমে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছিল। সবচাইতে সম্ভাবনাটি উঁকি দিয়েছিল সংগীতে । আর অভিনয় তো তার সহজাত। সে যা বলে , সে যা করে, তাতেই মনে হয় অভিনয়। তাতেই মনে হয় বাস্তব। যদি বাস্তব মনে হয় তাহলে অভিনয় কোথায় ? আছে। চরিত্রের অনুকরণ জানে নন্দিনী। নানা কন্ঠের অনুকরণ জানে সে। নানা ভঙীর অনুকরণে তার জুড়ি নেই। কিছুটা প্রস্তুতির পরেই হঠাৎ নন্দিনীর ডাক আসে। নন্দিনীকে যে পরিপূর্ণ রুপ দিতে পারবে, সেই ডেকে নেয়। চরিত্র হাতে দেয়, চরিত্রকে চিত্রন করতে বলে। চরিত্র কে জীবন্ত করে তুলে ধরতে বলে। যার মননে আছে অনুকরণ ও সহজাত অভিনয় ; সেই নন্দিনী অনায়াসে প্রবেশ করে যায় একেকটি চরিত্রের ভেতরে নিজেকে হারিয়ে। নন্দিনী হয়ে ওঠে সবার নন্দিনী। তখন দর্শকের চিন্তায় থাকে -আরে, এতো তারই দেখা কোন এক নন্দিনী।
শিল্পের এ নকল খেলায় নন্দিনী নিজেকে হারাতে থাকে। তখনি হারিয়ে যায় তার অপূর্ব সুর, হারিয়ে যায় অসাধারণ নৃত্য, হারিয়ে যায় সম্ভাবনাময় চিত্রকলা। নন্দিনীর জগতে তখন শুধু চরিত্রের পর চরিত্র নির্মান। একই চরিত্রায়ন করতে করতে একঘেয়ে লাগে। ক্লান্ত লাগে। তার কী দোষ। চরিত্র নির্মাতারা তো বানিজ্য করে । অর্থ লগ্নি করে। নন্দিনী যেন হয়ে ওঠে বিনিয়োগ থেকে লাভ তুলে আনার একটা ইন্সট্রুমেন্ট মাত্র। শিল্প কোথায় হারিয়ে যায় ! বানিজ্য তখন মুখ্য হতে থাকে। তাই নন্দিনী আর ঘোর কাটাতে পারে না । একটু হাফ ছেড়ে বাঁচার জন্য নির্ভর করা যায় এমন একটি হাতে হাত রাখতে চায়। সেই হাতটি ধরেও ফেলে একটা সময়। অভিনয় নয়, বাস্তব জীবনের আরেক পর্বে আবির্ভাব ঘটে এক সুদর্শনের। নন্দিনীকে ঘোর লাগা ঝলমলে জগতের মধ্য থেকে তুলে আনার চেষ্টা করে। ফুটফুটে এক কন্যা উপহার দেয়।
ওমা। ছন্দপতন! কী যে হয় ! নন্দিনী যেন অদৃশ্য ইশারায় আবার ছুটে চলে। লক্ষ্যবিহীন। এবার ঠিক তার তাল কেটে যায়। এলোমেলো হতে থাকে সব। খ্যাতির উল্টোপিঠ দেখতে শুরু করে। লগ্নিকাররা খ্যাতিমানকে নেবে কিন্তু ক্ষয়ে যাওয়া খ্যাতিমানকে নেবে না। তখন হাতাশা , অবসাদগ্রস্ততা ঘিরে ধরে। নন্দিনীরও হলো তাই । একটা দশকের প্রেক্ষাপট পাল্টে যেতে থাকে। শক্ত করে তার হাত ধরা সেই সুদর্শন হাত ছেড়ে দিল। কন্যাকে নিয়ে একলা হয়ে পড়লো। খুব একলা। কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
আমি এতক্ষণ নন্দিনী রুপকার্থে যার কথা বলার জন্য ভনিতা করেছি সে আর কেউ নয়। একদা লাক্স সুন্দরী থেকে ছোট – বড় পর্দা কাঁপানো খ্যাতির চূড়ায় বসে থাকা সহজাত অভিনয় শিল্পী শ্রাবস্তী দত্ত তিন্নি। তিন্নি হারিয়ে গিয়ে রুপালী জগতে নেই অনেকদিন। ফলোয়াররা ভেবেছে সত্যি হারিয়ে গেছে। নির্মাতারা ভেবেছে অবসর নিয়েছে । লগ্নিকাররা ভেবেছে সে সরে গেছে । বন্ধুরা ভেবেছে সংসার করছে। মিডিয়া ভেবেছে আত্মগোপনে আছে । কাছের মানুষ ভেবেছে অভিমান করেছে । কিন্তু তিন্নি নিজেকে নতুন করে চিনেছে। জেনেছে। নতুন রুপে জানান দিচ্ছে সুদূর কানাডা থেকে। বাংলাদেশের রুপালী জগত থেকে বরফ আচ্ছাদিত শহরে তিন্নির নতুন জীবন।
এতোক্ষণ পাঠকরা ভেবেছেন —আমি কেমন করে এতোসব জানি। আমি বলার কে ? জানি কারণ, তিন্নি আমার মিনিট তিনেক হাঁটার দূরত্বে থাকে। ও আমার কন্যাসম এবং আমার পুত্রদের কাজিন। পুত্রদ্বয়ের যেমন বন্ধু আমি , তিন্নির বেলায়ও তাই । তবে আমি জানি তিন্নি আমাকে মান্য এবং শ্রদ্ধা করে। বুঝতে পারি কারন ও মাঝে মাঝে পরামর্শ নেয় আমার কাছে। ভাল মন্দ রান্না হলে পাঠিয়ে দেয়। ওর দোষ গুনের কথা এখানে উল্লেখ করলাম না। খ্যাতিমান বলে সর্বত্র অনেক বলা হয়ে গেছে নানাভাবে । আমি এখন কেবল ওর বদলে যাওয়া দেখি। ভালো লাগে। ওর শিল্পী হয়ে ওঠার আগের উচ্ছলা চন্চলা তিন্নিকে দেখি । ও এখন আর বাংলাদেশের আমার গল্পের রুপক নন্দিনী নয়, পুরোদস্তুর কানাডিয়ান শ্রাবস্তী দত্ত তিন্নি।

 

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close