আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
মতামতস্লাইড

নারীর পোশাক কি পুরুষতন্ত্রের প্রেসক্রিপশন?

শান্তা মারিয়া

বিদেশে থাকি বলে দেশের শপিংমলে একটু কমই যাওয়া হয়্। এবছর জানুয়ারিতে গাউছিয়ায় গিয়ে আমার দিশেহারা অবস্থা। মেয়েদের তৈরিপোশাক বিক্রির দোকানগুলোতে লেখা রয়েছে ‘এখানে খিমার পাওয়া যায়’। খিমারটা কি বস্তু সেটা লেখা পড়ে প্রথমে বুঝতে পারছিলাম না। পরে তাকিয়ে দেখি সব দোকানেই এক ধরনের ঢিলেঢালা ম্যাক্সি টাইপের পোশাক ঝুলছে। বুঝলাম সেটা্ই খিমার। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিভিন্ন আলোকচিত্রে ও চলচ্চিত্রে নারীদের এ ধরনের পোশাক পরতে দেখেছি। দোকানি বিরক্ত স্বরে বুঝিয়ে দিলেন এটাই লেটেস্ট ফ্যাশন। আর যেহেতু আমি খিমার পরা অবস্থায় নেই, তাহলে নিশ্চিতভাবে আমি খুবই বেপর্দা টাইপ মহিলা। ফ্যাশন অনেক রকমের হয় তাই নিয়ে কিছু বলার নেই। কিন্তু ফ্যাশন যখন হয়ে দাঁড়ায় ধর্মীয় ছাপ মারা এবং কোন বিশেষ পোশাক পরলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের খুব বাহবা পাওয়া যায় তখন দুটো কথা না বলে পারা যায় না।
মধ্যপ্রাচ্যের পোশাককে অনেকে ধর্মীয় পোশাক বলে মনে করেন বা ধর্মীয় পোশাকের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম, স্বল্পসংখ্যক খ্রিস্টান এবং আরও স্বল্প সংখ্যক অগ্নি উপাসক বাস করেন। তারা সকলেই একই ধরনের পোশাক পরেন। এমনকি প্রাক ইসলামিক যুগেও কিন্তু খিমার বা আলখাল্লা বা জোব্বা ধরনের পোশাক পরনের রীতি ছিল। পোশাক যতটা ধর্মীয় তার চেয়ে অনেকবেশি ভৌগোলিক কারণে পরা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের পোশাক পরলেই যে তিনি খুব ধার্মিক এ কথা বোঝার কোন অবকাশ নেই। কারণ সেখানে যারা অপরাধ করে, অধর্মের কাজ করে তারাও ওই একই পোশাক পরেই সেটা করে। কিন্তু যেসব বাংলাদেশী পুরুষ মধ্যপ্রাচ্যে চাকরি করেন বা একসময় করেছেন তাদের কাছে মনে হয়েছে খিমার এবং আবায়া (সৌদি বোরখা) পরলে তার স্ত্রী, কন্যারা এবং তিনি নিজেও খুব ধার্মিক হিসেবে সমাজে পরিচিতি পাবেন। আর সমাজে ধার্মিক হিসেবে পরিচিতি পেলে তার মান মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে।
এখানেই হলো নারীর পোশাককে কেন্দ্র করে পুরুষতান্ত্রিক ও ধর্মান্ধ সমাজের রাজনীতি। নারীর পোশাক তখন আর নারীর চয়েজ থাকে না। নারীর ফ্যাশনও তখন আর নারীর চয়েজ থাকে না। সেটা হয়ে দাঁড়ায় নারীর উপর পুরুষের নিয়ন্ত্রণের প্রকাশ। ধরুন একজন নারী খিমার, আবায়া পরছেন। তিনি বলবেন, কই আমাকে তো আমার স্বামী বা পুত্র বা পিতা জোর করেননি, আমি নিজের পছন্দে এই পোশাক পরেছি। কিন্তু সত্যিই কি তাই? হয়তো তার পিতা, পুত্র, স্বামী কেউ সরাসরি তাকে এই পোশাক পরতে বাধ্য করেননি, বা না পরলে মারবেন এমন কথাও বলেননি। কিন্তু এ পোশাক পরার পর পিতা বা শ্বশুর তার প্রশংসা করেছেন, স্বামী আড়ালে ও প্রকাশ্যে বলেছে, ‘আমার স্ত্রী খুবই পর্দানশীন, আমার স্ত্রী খুবই ধার্মিক, আমার স্ত্রী আমার সব কথা শোনে, সে একালের খারাপ মেয়েদের মতো নয়।’ পাড়া প্রতিবেশী ও শ্বশুরবাড়িতে তার নাম ডাক বেড়েছে ধার্মিক হিসেবে। এটা কিন্তু সমাজের পরোক্ষ চাপ। আর তাকে দেখে আরেকজনও এই পোশাক বেছে নিয়েছে অনুরূপ সম্মানিত হওয়ার আশায়।


এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, মেয়েরা যদি খিমার পরেই তো তোমার সমস্যা কি? নাহয় সে শ্বশুরবাড়িতে খিমার পরে বাড়তি মান-সম্মান অর্জন করেই নিল। তাতে তোমার কি?
কোন সমস্যা্ নেই। সমস্যা এটাই যে, খিমার পরে একজন যখন ভালো মেয়ের সার্টিফিকেট পেয়ে যায়, তখন খিমার না পরে আরেকজন অটোমেটিকালি ‘খারাপ মেয়ে’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায়। আর এই তথাকথিত ‘ভালো মেয়ে’রা হয়ে ওঠে পুরুষতন্ত্রের মজবুত স্তম্ভ। এদের নমুনা হিসেবে প্রদর্শন করেই পুরুষতন্ত্র খারাপ মেয়েদের(পড়ুন প্রতিবাদী নারীদের) সাইজ করে। এদের দেখিয়েই পুরুষতন্ত্র বলে, নারীর পোষাকের কারণে ধর্ষণ হয়। পোশাকের কারণে নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়। পোশাকের কারণে ধর্ষণ হয় যারা বলে তাদের জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা হয় হিজাব পরিহিতা তনু কেন ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হলো। কেন তাহলে মাদ্রাসার ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়। কেন মসজিদের ভিতরে ইমাম দ্বারা শিশু ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়। ধর্ষণ শুধু যে মসজিদ, মাদ্রাসায় হয় তা নয়, স্কুল, কলেজেও হয়। এবং কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই বাংলাদেশের নারীরা উন্মুক্ত দেহে চলাচল করে না। দুই বছরের শিশুও এদেশে ধর্ষণের শিকার হয়। সেটাও কি পোশাকের দোষে? যাক সেসব অন্য প্রসঙ্গ। বলছিলাম নারীর পোশাকের কথা।
নারী, পুরুষ সকলের পোশাকই সকলের চয়েজ হওয়ার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেটা হয়নি। বরং পোশাক দিয়ে একজন মানুষকে ‘ভালো’ ও ‘খারাপ’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা ক্রমশ বেড়েছে। কিছুদিন আগে এক গণমাধ্যমে খিমার ও আবায়া পরা এবং নাকমুখ আবৃত এক নারীকে তার শিশু পুত্রর সঙ্গে ক্রিকেট খেলতে দেখা গেছে। সেই ছবি দেখে মৌলবাদী পুরুষরা খুব উৎসাহিত হয়েছেন।


আবার অনেক প্রগতিশীল প্রশ্ন করেছেন এই নারী মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতিকে ধারণকরা পোশাক পরে কি প্রমাণ করতে চাইছেন। আমার প্রশ্ন অন্যত্র।নারীটির যে পরিচয় পাওয়া গেছে তাতে জানা যাচ্ছে তিনি স্কুল কলেজে ভালো ক্রীড়াবিদ ছিলেন। জাতীয় পর্যায়ের ক্রীড়াতেও অংশ নিয়েছেন। ভালো কথা। কিন্তু এমন একজন কৃতী ক্রীড়াবিদ নারী হয়ে তিনি বিবাহিত জীবনে প্রবেশের পর স্রেফ গৃহবধূ হয়ে গেলেন কেন? নিতেন পক্ষে স্কুলের গেম টিচার হিসেবেও যদি কাজ করতেন তাও তো বুঝতে পারতাম দেশের নারীরা কর্মক্ষেত্রে কিছুটা হলেও অবদান রাখছেন। কিন্তু তিনি তার ক্যারিয়ার পুরাই বিসর্জন দিয়েছেন বলে বোঝা যাচ্ছে। এখন এই খিমার ও আবায়া পরা নারী যদি মৌলবাদী পুরুষদের মতে আইডিয়াল হন তাহলে আমরা কোন সিদ্ধান্তে পৌছাই? এদেশের নারীরা তার মানে অর্ধেক জনগোষ্ঠির উচিত আপাদমস্তক বস্ত্রাবৃত হয়ে কেবল মাত্র নিজের সন্তানকে প্রতিপালন করা এবং স্বামীর খেদমত করা। এদেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠি যদি এখন কর্মক্ষেত্র থেকে পদত্যাগ করে নিজের নিজের শিশু সন্তানের সঙ্গে আবায়া পরে ক্রিকেট খেলা শুরু করে তাহলে দেশের অর্থনীতির চৌদ্দটা বাজতে আর দেরি হবে না। আর ওই রকম পোশাক পরে এই হিউমিডিটির দেশে ক্ষেতে খামারে, কলে কারখানায় কাজ করাটাই বা কতদূর বাস্তব সম্মত? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে হবে এমন নয়। বরং মনে হচ্ছে দেশটা ধীরে ধীরে আবার বেগম রোকেয়ার অবরোধবাসিনীর যুগে ফিরে যাচ্ছে।


নারীর পোশাক যতক্ষণ চয়েজ বা ফ্যাশন ততোক্ষণ আমার কিছু বলার নেই। কিন্তু যখন সেটা ‘ভালো নারী’ ও ‘খারাপ নারী’র সূচক হয়ে দাঁড়ায় পুরুষতন্ত্রের প্রেসক্রিপশন মতে তখন আমি অবশ্যই প্রতিবাদ করবো। কারণ নারীর পোশাক নারীর চয়েজ হতে হবে। সেখানে সমাজের ও পরিবারের এবং সর্বোপরি পুরুষতন্ত্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপ চলবে না। কিছুতেই না।

 

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close