আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
স্পট লাইটস্লাইড

নারী উদ্যোক্তাদের পদচারণা বাড়ছে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে

খাদিজা খানম তাহমিনা

ছোট বেলা থেকেই রঙ এবং ছবি আকার প্রতি আলাদা ঝোঁক কাজ করতো রাজশাহীর মেয়ে শারমিন আকতারের। স্কুল ও কলেজের গন্ডি পেরিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রাফিক ডিজাইন নিয়ে চারুকলা বিভাগে ভর্তি হলেন। পড়াশোনা শেষে ঢাকায় আসলেন ক্যারিয়ারের সন্ধানে কিন্তু ছোট বেলা থেকে স্বপ্ন ছিল ডিজাইনার হওয়ার। সামাজিকতার কারণে সময়ের তারতম্যের ফলে বাস্তবতার সাথে হার মেনে নিতে হলো। ইচ্ছে ছিল নানান পরিকল্পনা, নিজেকে পরিচিত করানো সেরা হিসেবে শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্ব দরবারে। কিন্তু পড়াশোনা শেষ হতেই উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে পরাজয় মেনে নিতে হয়েছে বাস্তবতার সাথে। গ্রাফিক ডিজাইনের উপর বাস্তব জ্ঞান থাকার কারণে গোটা কয়েক ট্রেনিং ( যেমন: ফটোগ্রাফি, ওয়েব ডিজাইন, এস, ই, ও, আর ওয়েব ডেভলপিং) সম্পন্ন করে শুরু করলাম আউট সোর্সিং। বেশ ভাল জমেছিল কিন্তু বর্হিবিশ্বের সাথে সময়ের তারতম্যের কারণে বেশী দূর এগোতে পারেননি। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলেন অনলাইন ব্যবসার যেখানে পরিবারের সমর্থন, উৎসাহ ও প্রেরণা ছিল। তিনি বলেন, “গ্রাফিক ডিজাইন ও ওয়েব ডিজাইনের কাজ সম্পর্কে ভাল ধারনা ছিল বলে শুরুতে চমৎকার একটি অনলাইন পেইজ শুরু করলাম। শুরুতে ধারণা করলাম ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা বাহিরে যায় কম তাই মেয়েদের ব্যবহারের সকল ধরনের পণ্য সামগ্রী নিয়ে শুরু আমার নতুন পথচলা। আলহামদুলিল্লাহ আর থেমে থাকতে হয়নি। ২০১৮ সাল হতে গুটি গুটি পায়ে আমি এই ব্যবসাটি নিয়ে এগিয়েছি। পজির স্বল্পতার কারণে স্বল্প পরিসরে আমি শুরু করেছি কিন্তু ক্রেতা বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য খুব অল্প সময়েই পরিচিতি পেয়েছি। আমি মূলত কাজ করি বিভিন্ন ধরনের হিজাব, বোরকা, খিমার, ড্রেস নিয়ে। প্রাথমিকভাবে পরিচিত হতে একটু সময় লেগেছে তবে এটা সত্য আমি অতি দ্রুত ক্রেতাদের কাছে পৌঁছতে পেরেছি। তবে মেয়ে হিসেবে কিছু প্রতিবন্ধকতা ছিল যেটি আমার পরিবারের সহযোগিতায় উত্তীর্ণ হয়েছি।
ব্যবসাটা অনলাইন ভিত্তিক হওয়ায় উপস্থাপনা একটি বড় বিষয়। কারণ ক্রেতাদের সামনে পণ্যকে সঠিক এবং মান সম্মত ভাবে তুলে ধরা একটি বড় বিষয়। উপস্থাপনা ভাল হলে এবং পণ্য ক্রেতাদের সামনে সঠিক ভাবে তুলে ধরতে পারলে ভাল বিক্রি হয়।
আবার ভাল ফটোগ্রাফি হলেও অনেক ভাল বিক্রি হয় যেটি একাডেমিক পড়াশোনার কারণে আমার ছিল। আলহামদুলিল্লাহ বর্তমানে দুটি পেইজ আমার।
ওনার অফ ” Colors Fair ”
“Colors Fair Dress”।

নারী উদ্যোক্তা। বিষয়টা কিন্তু পজিটিভ। নারীরা ঘরে বসে বসে মাথার উকুন বাছেন না। অযথা সময় নষ্ট না করে, নিজের মেধা ও মননকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব বাজারে নিজেকে তুলে ধরছেন, পুরুষের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নে সামিল হচ্ছেন, স্বাবলম্বিতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। নারীদের প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো। এই মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের তুলনামূলক বেশি উপস্থিতি লক্ষণীয়। সামাজিক, পারিবারিক দায়বদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতা বিশেষ বাধা হয়ে দাঁড়ায় না বলে অনলাইন উদ্যোগে নারীদের এখানে পদচারণা। এতে দিনকে দিন নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। নিজেকে তুলে ধরতে পারছেন বিশ্ব বাজারে। নিজের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সামাজিক, ব্যক্তিগত সামষ্টিক সমস্যা সমাধানে পারদর্শিতা দেখাচ্ছেন নারী উদ্যোক্তারা। উইমেন আই 24 ডট কমের পক্ষ থেকে কথা বলেছিলাম কিছু ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের সাথে-

লিপি দেব। ঢাকার গুলশান ১ বাড্ডা লিংক রোডে থাকেন।
গত বছর ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে এমবিএ কমপ্লিট করার পর ভেবেছিলেন চাকরিতে জয়েন করবেন কিন্তু করোনার কারণে তা সম্ভব হয়নি। চাকরি না পাওয়ার হতাশা কাটিয়ে উঠতে ই-কমার্স বিজনেস নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করলেন এবং উদ্যোক্তা হওয়ার পরিকল্পনা শুরু করেন। তিনি বলেন,
“প্রথমে কি নিয়ে শুরু করবো তা নিয়ে অনেক চিন্তায় ছিলাম এবং স্বল্প পুঁজি নিয়ে কিভাবে এগিয়ে যেতে হবে সেই চিন্তা থেকে অনলাইনে একটি পেইজ খুলি ক্ষীরের সন্দেশ নামে, এবং সন্দেশ আর নারিকেল নাড়ু নিয়ে কাজ শুরু করি। মিষ্টি জাতীয় পন্য নিয়ে কাজ করাটা অনেক বড় চ্যালেজিং বিষয়।
যেখানে বিভিন্ন ক্রেতার স্বাদ,রুচি,পছন্দ বিভিন্ন, তাদের চাহিদা মূল্যায়ন কিভাবে করবো সেটা নিয়ে আমাকে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং পন্য ঠিকভাবে ক্লায়েন্টের কাছে পৌছানো এবং কুরিয়ার নিয়ে ও আমাকে ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। বর্তমানে এগুলো কিছুটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি।
মূলত সন্দেশ আমার শাশুড়ী বানিয়ে থাকেন, উনার কাছ থেকেই আমি শিখেছি। এখনো সন্দেশ, নাড়ু বানানোর সময় উনিই তত্বাবধানে থাকেন তাই পারিবারিক সার্পোট পুরোটাই আছে। এই ক্ষেত্রে কোন সমস্যা পোহাতে হয়নি। মজার ব্যাপার হচ্ছে যখন অনেক বেশি অর্ডার পাই তখন আমার শাশুড়ী, শ্বশুর,আমি এবং আমার স্বামী সবাই মিলে অর্ডার কমপ্লিট করি। তাহলে বুঝতেই পারছেন পারিবারিক সার্পোট কতটুকু!

নারী উদ্যোক্তা ‘আহিরী বুটিক’ এর স্বত্বাধিকারী আতিয়া চৌধুরী বলেন, উদ্যোক্তা হওয়ার শুরুটা ২ বছর আগে। জব ছেড়ে দেই অসুস্থতার কারনে। তারপর আর জবে আগ্রহ পাই না। কারন জবে অনেক মানুষিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়। ব্যবসাটা নিজের স্বাধীনতা, নিজের মত কিছু সৃষ্টি করা সম্ভব। মেয়েদের সব কাজেই কমবেশি প্রতিবন্ধকতা আছে, থাকবে এটাই স্বাভাবিক, আমাদের পুরুষশাসিত সমাজে। তবে আল্লাহ রহমতে তেমন প্রতিবন্ধকতা আসেনি এখনও।তবে আশেপাশের মানুষগুলোর কাছ থেকে কিছু কথা শুনেছি, শুনতে হয়ই, আমি এসবে পাত্তা দেইনা। নারীর কাজে বাধা আসবেই, এসব বাধা পেরিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।পারিবারিক সাপোর্ট ১০০% আলহামদুলিল্লাহ।

‘LS collection’ এর স্বত্বাধিকারী ফারজানা সুলতানা লিমা তিন বছর আগে থেকে ঘরে বসে অনলাইন বিজনেস শুরু করেন। ভালো চলছিল ব্যবসা কিন্তু হাজবেন্ড পছন্দ করতেন না বলে আস্তে আস্তে সংসারের জন্য ব্যবসা বন্ধ করে দেন। তিনি বলেন, এমন কিছু একটা করতে চেয়েছি যেনো আমি কিছুটা আনন্দে থাকতে পারি। তারপর শুরু করি নারীদেরকে নিয়ে একটা সংগঠন। এটা নিয়ে আমি আস্তে আস্তে এগুতে চাচ্ছি। এখানে যে নারীরা বিজনেসের সাথে জড়িত, তাদের নিয়ে বিভিন্ন অনলাইন প্রশিক্ষণ এবং মেলার আয়োজন করছি, যেনো তাদের উপকার হয়। তারপরও বাধা আছে কিন্তু এসব বাধা ভেঙে সামনে সবার দোয়ায় ভালো কিছু করতে চাই। নিজের বিজনেসটাকেও দাঁড় করছি মনোবল শক্ত করে। পরিবার থেকে সাপোর্ট পাইনা, কিন্তু ভালো কিছু করতে পারলে অবশ্যই সাপোর্ট পাবো।

নুসরাত জাহান, বাবার বাড়ী নড়াইলে কিন্তু বিবাহ সুত্রে এখন ঢাকায় অবস্হান করছেন।
বাবা মা সরকারি চাকরিজীবী সেই সুবাদে নিজের পায়ে দাঁড়াবেন এমনটা চিন্তা করেই স্টুডেন্ট লাইফ থেকেই পার্ট টাইম চাকুরী এবং গ্রাজুয়েশন শেষ করে ফুল টাইম চাকুরী করেছেন দেশের বিভিন্ন প্লাটফর্ম এ। কিন্তু নিজের একটা আইডেন্টিটি গড়ার সুপ্ত ইচ্ছা ছিলো। বিয়ের আগে চাকরি’র পাশাপাশি দেশীয় শাড়ী নিয়ে অনলাইন বিজনেস যাত্রা শুরু করলেও পর্যাপ্ত সময় ও সাপোর্টের অভাবে বন্ধ করে দেন এবং চাকরি কন্টিনিউ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে বিয়ে, সন্তানের জন্ম- এসব দিক বিবেচনা করে চাকরি ছেড়ে দেন। তিনি বলেন,
সংসারের কাজ, বাচ্চা দেখাশুনা করার পরও নিজেকে নিয়ে ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল নিজের কিছু একটা করা উচিত।
করোনাকালীন সিচুয়েশনে হুট করেই একদিন পরিচিত এক আপুর হোমমেইড খাবারের বিজনেস পেইজে অনলাইন ক্লাসের এ্যাড দেখে নিজেরও ইচ্ছা হয় শিখি এবং নিজে কিছু করি। এতে আমার বাচ্চার সাথে সাথে কাস্টমারদের বাচ্চাদেরও স্বাস্থ্যকর মজার মজার খাবার দিতে পারবো। শুরু হয় পথচলা। ‘সুইট ট্রিট’ আমার স্বপ্নের নাম। আমি এগিয়ে যেতে তাই

আফসানা হক। ঢাকা বনশ্রীবাসি। পেশায় একজন ডেন্টাল সার্জন।। পাশাপাশি তিনি একজন নারী উদ্যোক্তা। ‘পল্লীগাঁথা’ র স্বত্বাধিকারী আফসানা হক জানান, দেশি শাড়ির প্রতি ভালোবাসা অনেক আগে থেকে। পেশায় ডাক্তার এবং বাসায় ছোট বেবী। লকডাউনের আগে বান্ধুবির সাথে বিজনেসের বিষয়টি শেয়ার করেন। সেও আগ্রহ দেখালো। তারপর গুগলে বিভিন্ন শাড়ি সম্পর্কে টুকটাক পড়ালেখা করেন। যারা এসব নিয়ে কাজ করে তাদের ফলো করেন, আর ইচ্ছেটাও ডানা মেলতে থাকলো। তিনি বলেন, তারপর হাজবেন্ডকে জানালাম আমার স্বপ্নের কথা। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম সেও চায়, আমি আমার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাই। সত্যি বলতে তার অনুপ্রেরনাতেই আমার পথচলা শুরু। সে প্রতি মুহূর্তে আমাকে সাহস জোগায়।
প্রতিবন্ধকতা বলতে পরিবার থেকে কোন সমস্যা হয়নি আলহামদুল্লাহ। কিন্তু করোনাকালীন এই সময়ে প্রোডাক্ট সোর্সিং থেকে শুরু করে প্যাকেজিং এবং ডেলিভারী সব কিছুই ছিলো কিছুটা চ্যালেঞ্জিং।
খুব অল্প সময়ে অনেক মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, যা ছিল কল্পনার বাইরে। এখন শুধু স্বপ্ন, একদিন দেশি পন্যের জয় জয়াকার হবে এবং আমার মতো নারী উদ্যোক্তারা জয় করবে বিশ্ব।

জিনিয়া আজাদ, থাকেন বসুন্ধরায়। ‘Attire House’ এবং ‘House Of Delicacies By Zinia Azad’ এর স্বত্বাধিকারী। শুরুটা করেছিলেন একান্তই শখের বশে। বন্ধুরা মিলে বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজ গুলোতে প্রায়ই হানা দিতেন, আর পছন্দের ডিজাইনগুলো চুরি করে নিজেরা বাসায় এসে সেই ডিজাইন প্রাকটিস করতেন। একসময় নিজেদের উপর আস্থা এবং সাহস বেড়ে গেলো। সিদ্ধান্ত নিলেন নিজেদের কাপড় এখন থেকে নিজেরাই তৈরি করবেন। শুরু হলো পথচলা। তারপর বেসিক নলেজের জন্য কিছু কোর্স করলেন এবং পুরোদমে নেমে পড়লেন ব্যবসায়।
রান্নাবান্নার প্রতি আগে থেকেই ঝোঁক ছিলো, প্রায়ই নতুন নতুন কিছু রান্না করতে ভালো লাগতো। একটা সময় বাচ্চার টিফিন তৈরি করতে করতে ঝুঁকে পড়লেন কেক তৈরির নেশায়। বাচ্চা কেক পছন্দ করে, তাই নানা ডিজাইনের কেক আর মিষ্টি তৈরি করতে করতে সবার উৎসাহে শুরু করলেন অর্ডার নেওয়া। ‘House Of Delicacies By Zinia Azad’ সেই ফলশ্রুতিতেই করা। কেক তৈরিতে বসুন্ধরায় এখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন জিনিয়া আজা। ছেলের স্কুলে, স্বামীর অফিসে, নিজ এলাকায় কোথায় নেই তাঁর প্রশংসা। তিনি বলেন, নারীার আজ নিজেদের মেধাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায় বৈচিত্র্য আনছে, এটা সত্যি দারুণ ব্যাপার । এখন আর নারীরা সংসারের কাজ, বাচ্চা জন্ম দেয়া, লালন- পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, নারীদের সাফল্যের গন্ডীটা আজ বিশাল আকার ধারণ করেছে। থেমে নেই নারীর শীর্ষেে উঠার পথচলা। এগিয়ে যাবে নারী, সকল বাধা অতিক্রম করে বিশ্ব দরবারে নিজেদের দাঁড় করাবে।

পাপিয়া আক্তার ঝুমু। জন্ম, লেখাপড়া, বিয়ে সবই কিশোরগঞ্জে। কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ থেকে বাংলা বিষয় নিয়ে অনার্স, মাষ্টার্স কমপ্লিট করেছেন। পড়াশোনা কালীন সময়ে ভাবতেন চাকরি করবেন, সেটাও হবে প্রাইমারি স্কুলের চাকরি। চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু বেটে বলে মিলেনি। তিনি বলেন, ২০১১ সালে বিয়ে হয় আমার। ২০১৪ সালে প্রাইমারি স্কুলের চাকরিতে জয়েন করি। ২০১৮ সালে স্কুলের প্রজেক্ট শেষ হয়।
আর তখনই আমি চাকরি ছাড়া অন্য কিছু করার কথা ভাবি। যেন সংসার, বাচ্চা সামলিয়ে কাজ করতে কোনো বেগ পেতে না হয়। বিসমিল্লাহ বলে শুরু করে দিলাম মাত্র ১০০০০ টাকা পুঁজি নিয়ে। ছোটবেলা থেকেই আমার মাকে দেখে এসেছি এটা ওটা অনেক কিছু নিয়ে কাজ করতেন। মা সবসময়ই বাচ্চা, সংসার সামলিয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে অনেক কাজ করেছেন। আমরাও আম্মাকে অনেক সাহায্য করেছি। আসলে বলতে গেলে মায়ের কাছ থেকেই উদ্যোক্তা হবার গুণটা পেয়েছি।
২০১৮ সালে আম্মা,আব্বা,ভাই, বোন এবং স্বামীর সাপোর্টেই শুরু করি আমার উদ্যোক্তা জীবন। পরিবারের সম্পূর্ণ সাপোর্টে ঘরোয়া ভাবেই ব্যবসা শুরু করি অল্প পুঁজিতে। নিজে গিয়ে দেখে দেখে ড্রেস সংগ্রহ করেছি।আলহামদুলিল্লাহ সেলও হয়ে যেতো। তারপর ফেসবুক একটি পেইজ খুলি **অপ্সরা বুটিক ** নামে।পেইজ,ফেসবুক এর মাধ্যমে আমার ব্যবসার প্রসার ঘটতে থাকে অল্প অল্প করে।
আর এখন কিশোরগঞ্জের মোটামুটি অনেকেই আমার কাস্টমার হয়েছে। যা এখনও চলমান।
ব্যবসা করতে গেলে ধৈর্য্য, শ্রম, আত্মবিশ্বাস, সততা, দক্ষতা সব কিছু থাকতে হবে।শখের ব্যবসায়ী হলে তা নিয়ে বেশি দূর যাওয়া যায়না।
আমাকে ব্যবসা করতে গিয়ে ছোট ছোট সমস্যা ফেইস করতে হতো। যেমন, আমি অল্প লাভেই ড্রেস সেল করতাম, তো ব্যবসার প্রথম দিকে বাকিতেও দিতে হতো। তো তারা টাকা পেইড করতো অনেক লেট করে। একজন উদ্যোক্তাকে আসলেই অনেক কিছু হ্যান্ডেল করে চলতে হয়। এমনই টুকটাক সমস্যায় পড়তে হয়েছে। আরো সমস্যায় হয়তো পড়তে হতো যদি আম্মার উদ্যোক্তা জীবন থেকে কিছু না শিখতাম। আসলে শিখাটা শুধু খাতা কলমেই সীমাবদ্ধ নয়, বাস্তবতা থেকেও শিক্ষা নিতে হয়।
আমি কাজ করছি দেশীয় বিভিন্ন ধরনের থ্রি পিস যেমন- বাটিক সবধরনের থ্রি পিস, জয়পুরী, ফেরদৌস লোন, ডিজিটাল লোন, তাতঁ,পাকিস্তানি থ্রি পিসও আছে। বাটিক বিছানার চাদর এবং ছেলেদের পাঞ্জাবি হাতের কাজের। কালার,সাইজ,ডিজাইন কাস্টমাইজড করে থাকি।
সব মিলিয়ে আলহামদুলিল্লাহ আমার উদ্যোক্তা জীবন চলছে গুটিগুটি পায়ে ‘অপ্সরা বুটিক’র হাত ধরে।

শাম্মী খানম সুমি। ‘চন্দ্রপ্রভা বুটিক হাউজ’ র স্বত্বাধিকারী।
ঢাকা শহরে এসেছেন ২০১৮ শুরুতে, মাস্টার্স করবেন আর ভালো কোন চাকরির আশায়। মাস্টার্স শেষ হলো কিন্তু ভালো চাকরি হলো না, ভালো চাকরি মানে ভালো বেতনের চাকরি । এই যান্ত্রিক শহরে থাকা, খাওয়া আর পড়াশোনার খরচ-সব মিলিয়ে বাসা থেকে প্রতি মাসে আসা টাকার পরিমান খুবই সামান্য মনে হতো! অনেক জায়গায় চাকরিও করেছেন তবে বেতনটা ঠিক মনের মতো হচ্ছে না দেখে, আরও ভালো বেতনের চাকরির পিছনে ছুটতে লাগলেন। বেশ ছোট খাটো অনেক চাকরি করেছেন ২০১৮ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত। তিনি বলেন,
একটা সময় মনে হলো আমি চাকরির পিছনে আর ছুটবো না, এবার চাকরির পাশাপাশি অন্য কিছু করতে হবে। যেহেতু আমি রাঙ্গামাটির মেয়ে, আমার কাছে তাঁতের কাপড় আছে, আছে দেশীয় ঐতিহ্য তুলে ধরার বিরাট সুযোগ।
যেই ভাবনা সেই কাজ, ফেসবুকে পেইজ খুলে ফেললাম, তারপর শুরু হলো পথ চলা।
শুরুটা সহজ ছিলো না। মোটামুটি একটা বাজেট দরকার ছিল, কিন্তু এতো টাকা আমার কাছে ছিলো না। তাই চিন্তা করলাম শুধু কাপড়ের ছবি তুলে তুলে পেইজে পোস্ট দিবো।
দোকান গিয়ে ছবি তুলে নিয়ে আসতাম বিভিন্ন শাড়ি, থ্রি পিছ, পিনন হাদি। মানে রাঙ্গামাটির তাঁতের যতো কাপড় আছে সব কাপড়ের ছবি পোস্ট করতে লাগলাম। এক সপ্তাহের মধ্যে আমার অর্ডার এলো। আমি দারুণ খুশি, তারপর আস্তে আস্তে দুজনের থেকে চারজন, এভাবে কাস্টমার বাড়তে লাগলো।
শুণ্য পুঁজি দিয়ে আমি ব্যবসা শুরু করি, পাশাপাশি চাকরিও করেছিলাম একটা স্কুলে।
হটাৎ কোভিড-১৯ এলো। করোনার দাপুটে স্কুল, কলেজ সব কিছু গেলো বন্ধ হয়ে,,
স্বাভাবিক কারণে ঢাকা ছেড়ে রাঙ্গামাটি চলে যেতে হলো। দীর্ঘদিন ধরে ঘর বন্ধী থেকে আরও হতাশায় নিমজ্জিত হতে লাগলাম। চিন্তা করতে লাগলাম আরও কি কি ভাবে আমার ব্যবসাটা বাড়ানো যায়। আমার স্কুলের বেশ কয়েকজন অভিভাবক ছিলেন যাদের নিজেদের দোকান আর কারখানা দুটোই আছে। তাদের সাথে যোগাযোগ করে আমি কিছু কাপড়ের অর্ডার করি এবং এই করোনা কালীন সময়ে আমি ঘরে বসে ৩০,০০০ টাকা ইনকাম করি অনলাইনে।
পারিবারিক সাপোর্ট বলতে গেলে সবাই অনেক উৎসাহ দিয়েছে। আমি মনে করি আমার যাত্রা শুরু মাত্র, আরও অনেক দূর যেতে হবে।
আমি এখন কাঠের গয়না, তাঁতের কাপড়, আর বিভিন্ন ওয়ান পিস, টপস এবং বাঁশের রকমারি ফার্নিচার নিয়ে কাজ করছি।

মিরপুরে অবস্থিত ‘আহিরী বুটিক’ এর স্বত্বাধিকারী আতিয়া চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্রধান বাধা হলো আমাদের সংস্কৃতি। আমরা নারীকে একটি নির্দিষ্ট ভূমিকায় দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম। কিন্তু সময় পাল্টেছে, বাস্তবতা এখন ভিন্ন।

বনশ্রীর কসমেটিকস এবং পোশাকভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘সারাহ ফ্যাশন’ -এর কর্ণধার তাহমিনা সুমি বলেন,
এখন পারিবারিক দায়িত্ববোধের সঙ্গে সঙ্গে একজন নারী তাঁর সত্তাকে এই সমাজে সফলভাবে পরিচিত করে তুলতে সক্ষম। সেই ২০/৩০ বছর আগের বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং বর্তমান অর্থনীতির হিসাব এখন ভিন্ন। এখন নারীরা বাংলাদেশের অর্থনীততে পুরুষের সাথে পাল্লা দিয়ে অবদান রাখছে।
তাহমিনা সুমি’র এই সফল উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে রয়েছে তার নিজের পরিশ্রম এবং এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়। নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হয়েছে তাঁকে তবে কখনোই দমে যাননি তিনি। নিজের মেধা, মননশীলতা, কর্মনিষ্ঠা এবং একাগ্র প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।

‘সালমা’স হাউজহোল্ড এন্ড গার্ডেনিং প্রোডাক্ট’ এর স্বত্বাধিকারী উম্মে সালমা সোমা সব বাদ দিয়ে ভালো লাগার কাজটিতেই মনোযোগী হয়েছেন, নিজস্ব আগ্রহ ও অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে। একটু একটু করে গড়ে তুলেছেন ক্রেতাবলয়, অর্জন করেছেন আস্থা। তিনি মনে করেন, অনলাইনভিত্তিক ব্যবসাকে এখনো অনেকেই সংসার সামলে অবসরে করা শখের কাজ ভাবে। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন, যেকোনো পেশাজীবীর চেয়ে একজন উদ্যোক্তাকে তাঁর ব্যবসায় ভাবনা, শ্রম এবং সময় কোনো অংশেই কম দিতে হয় না।

‘এসআর এলিগেন্স’ এর কর্ণধার সেলিনা আক্তার বলেন, অনলাইন ব্যবসার সুবিধাজনক দিক হলো ক্রেতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ যা ব্যবহার করে তাঁদের আস্থার জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব।

উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করতে গিয়ে “সুইট ট্রিট’ এর কর্ণধার নুসরাত জাহান সহায়ক হিসেবে পাশে পেয়েছেন উইমেন এন্ড ই-কমার্স ফোরাম (উই) কে। । এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তাদের দিকে সম্মান, সহযোগিতার হাত যেমন বাড়িয়ে দিয়েছে। এই প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ‘এলএস কালেকশন’ এর সফল কর্ণধার ফারজানা সুলতানা লিমাসহ আরও অনেক সফল নারী উদ্যোক্তা।

সরকার নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণ প্রদানের নীতিমালা প্রণয়ন করলেও এ সুবিধা পাচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। নানা শর্তের বেড়াজালে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে ভোগান্তিতে পড়ছেন তারা। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোতে নারী উদ্যোক্তা ডেক্স থাকলেও কোনো সহযোগিতা দিচ্ছে না। ফলে ব্যবসা বাণিজ্যে পিছিয়ে যাচ্ছেন নারীরা। একটি মাধ্যম থেকে জানা তথ্যানুযায়ী, অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনাকারী নারী উদ্যোক্তাদের সহজে ট্রেড লাইসেন্স দেবে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)।

ব্যবসা করতে এসে হোঁচট খেয়েছেন অনেক নারী। তাঁরা জানেন আরও হোঁচট খেতে হবে। ওই সব কিছুকে ডিঙ্গিয়ে নারী এগিয়ে যাবে। সফল হওয়ার চেষ্টা করবেন আমাদের নারী উদ্যোক্তারা। সামনে তাদের সুদিন আসবে সেই প্রত্যাশা আমাদের সকলের।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close