আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
মতামত

ধর্ষকের উল্লাসে প্রকম্পিত দেশ

শান্তা মারিয়া

ধর্ষকের হিংস্র উল্লাসে কাঁপছে বাংলাদেশ। একের পর এক ধর্ষণের খবর। দলবদ্ধ ধর্ষণের খবর। খাগড়াছড়িতে এক চাকমা নারীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করেছে ৯ জন বাঙালি নরপিশাচ সেটেলার। ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার রাতে। মেয়েটিকে ধর্ষণ করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, ওই দরিদ্র পরিবারের যথাসর্বস্বও তারা লুট করে নিয়ে যায়।

শুক্রবার রাতে ঘটেছে আরেকটি ঘটনা। সিলেটের এমসি কলেজে স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক নববধূ। ক্যাম্পাস থেকে তাকে ছাত্রাবাসের ভেতরে ধরে নিয়ে যায় ছাত্র নামধারী কতিপয় নরপিশাচ। তার স্বামীকেও নির্যাতন করে তারা।

এ ঘটনায় জড়িত ৭ জনের নাম গণমাধ্যমে এসেছে। তারা হলো সাইফুর রহমান, মাহবুবুর রহমান রনি, মাহফুজুর রহমান মাসুম, অর্জুন, রাজন আহমদ, রবিউল ও তারেক আহমদ।

আরেকটি ঘটনা ঘটেছে যশোরে। সেখানেও দুই নারী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

পার্বত্য জেলাগুলোতে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ওপর বাঙালি সেটেলারদের নিপীড়ন-নির্যাতনের অভিযোগ আজকে নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে ধর্ষণ ও নির্যাতন চলছে পাহাড়ি মানুষের ওপর। যাদের ভূমি, তাদেরই সেই ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে এরা নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী কখনো প্রতিকার পায়নি। পাহাড়ি নারী ধর্ষণের কোনো সুষ্ঠু বিচারও হয়নি। কোনো ধর্ষকেরই কঠোর শাস্তি হয়নি।

আর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ছাত্র নামধারী গুণ্ডাদের এই তাণ্ডবও নতুন নয়। বস্তুত এ দেশের সর্বত্র নারীর নিরাপত্তা হুমকির মুখে।

ধর্ষণের ঘটনাগুলোকে যদি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হতো, অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হতো, তাহলে এ অবস্থা কিন্তু হতো না।

বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের কোনো মানসম্মান অবশিষ্ট থাকবে না, যদি এভাবে একের পর এক ধর্ষণের বীভৎস ঘটনা ঘটতে থাকে। লকডাউনের ভেতরেও কিন্তু দেশে ধর্ষণের ঘটনা থেমে ছিল না। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, আইন ও সালিশ কেন্দ্র তাদের নিয়মিত প্রতিবেদনে জানাচ্ছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত গত ৬ মাসে ৬০১ নারী ও শিশু বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একক ধর্ষণের শিকার ৪৬২ জন এবং দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ১৩৪ জন। রেপ ভিকটিমদের মধ্যে ৪০ জনের বয়স ৬ বছরের মধ্যে এবং ১০৩ জনের বয়স ১২ বছরের মধ্যে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৭ জনকে। ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে ৭ জন। ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে ১২৬ জনের ওপর।

এখন তো অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, ধর্ষকের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। অমানুষরা বিকৃতির চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। নারীর প্রতি ন্যূনতম সম্মান ও মর্যাদা এ দেশের সিংহভাগ পুরুষের নেই। এ কথার প্রমাণস্বরূপ আমি যে কোনো নিউজ পোর্টালের নারী অধিকার বা এ ধরনের লেখার নিচে প্রকাশিত মন্তব্যগুলো পড়তে আহ্বান জানাই। কুৎসিত ভাষায় সেখানে নারীর উদ্দেশে গালাগাল বর্ষিত হয়। যারা এসব কুৎসিত মন্তব্য করে তারা নিঃসন্দেহে ধর্ষণকামী। এরা পোটেনশিয়াল ধর্ষক। সময় ও সুযোগ পেলে এরা যে কোনো নারীকে ধর্ষণ করবে। রাস্তাঘাটে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি যারা করে, যারা ভিড়ের বাসে সুযোগ পেলে নারীকে অশালীনভাবে ধাক্কা দেয়, যারা পথচলতি বা রিকশাযাত্রী নারীর উদ্দেশে নোংরা মন্তব্য ছুড়ে দেয়, তারা সবাই পোটেনশিয়াল ধর্ষক।

কিন্তু কেন এত ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে? কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না এই জঘন্য অপরাধ? এই অপরাধ বন্ধ করতে একদিকে দরকার আইনের কঠোর প্রয়োগ, অন্যদিকে দরকার উপযুক্ত শিক্ষা।

দু-চারজন ধর্ষককে ফাঁসিতে ঝোলানো দরকার সবার আগে। দৃষ্টান্তমূলক কয়েকটি শাস্তির ঘটনা ঘটলেই অন্য সম্ভাব্য অপরাধীরা ভয় পাবে। আবারও বলছি, দ্রুত বিচারের আওতায় ধর্ষণের বিচার হওয়া দরকার।

আর সবচেয়ে বেশি দরকার গণমাধ্যমে এবং সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্ষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা। শিশু ও নারীর বিরুদ্ধে সব ধরনের সহিংসতা রোধে সমাজে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। নারীকে যৌনসামগ্রী ভাবার অসুস্থ মানসিকতা দূর করতে হবে সমাজ থেকে।

ধর্ষণ ও নারীর প্রতি যৌন হয়রানিকে অনেক পুরুষই বড় কোনো অপরাধ বলে মনে করে না। ভাবখানা হলো, ইচ্ছা করলেই একটি মেয়েকে ধর্ষণ করা যায়। এতে আর এমন কী ক্ষতি হয়!

এদের কাছে ধর্ষণ একটি বিকৃত বিনোদন মাত্র। এটি যে গুরুতর অপরাধ এবং এর শাস্তি যে কঠোর, সে কথাটি প্রচার করতে হবে সমাজের সর্বস্তরে। মামলার দীর্ঘসূত্রতা, ধর্ষিতার মেডিকেল পরীক্ষায় হয়রানি, প্রভাবশালীদের হুমকি, ধর্ষককে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়- এসব কারণে অপরাধীদের ধারণা হয়, ধর্ষণ করে পার পাওয়া যাবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতিই এর জন্য দায়ী।

সরকারকে জিরো টলারেন্স মনোভাব নিয়ে প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি সেবামূলক সংস্থাকে ধর্ষণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে।

এ দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। অর্ধেক জনগোষ্ঠী যদি সদা সর্বদা ধর্ষিত হওয়ার আতঙ্ক নিয়ে বেঁচে থাকে, তাহলে কীভাবে তারা উন্নয়নের অংশীদার হবে? একেবারে শৈশব থেকে পুরুষকে ধর্ষণবিরোধী করে গড়ে ওঠার শিক্ষা দিতে হবে। এই সমাজে কোনো নারী নিরাপদ নয়, কোথাও নিরাপদ নয়। পাহাড়ে, সমতলে, ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে, সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে, হাসপাতালে, ঘরে, পথে- সর্বত্র ধর্ষকের উল্লাসধ্বনি। এই ধর্ষকের অভয়ারণ্য আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি হতে পারে না। দেশকে ধর্ষণমুক্ত করা এখন এক নম্বর জাতীয় কর্তব্য।

লেখক : সাংবাদিক ও শিক্ষক

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close