আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
মতামত

আমাদের মা-বাবা এবং বৃদ্ধাশ্রম

শারমিন সুলতানা রীনা

মা-বাবা আমাদের কাছে বিধাতার দেওয়া একটি স্বর্গীয় দান। মমতার নাম মা-বাবা ভালবাসার নাম মা-বাবা। ১০ মাস ১০ দিন গর্ভে ধারণ করে মা আমাদের পৃথিবীর মুখ দেখান। কষ্ট করে আমাদের বড় করেন। বাবার ঘামে গড়া আমাদের এই বেড়ে ওঠা জীবন। এক সময় তাদের ছাড়া আমরা অচল। মা-বাবা-সন্তান-ভালবাসা নামক এক সুতাে দিয়ে গাঁথা মালা। আমরা যখন বড় হই, তখন মা-বাবা ছোট হয়ে যান। অবশেষে শিশুদের মতো আমাদের কাছে আশ্রয় খোঁজেন। সন্তান তখন তাদের মা-বাবা। মা-বাবা যখন সন্তানের কাছে স্নেহ-মমতা খোঁজেন, তখন তারা এর পরিবর্তে করে অবহেলা-অনাদর। মা-বাবাকে তারা দূরে রাখতে চায়, তথা আশ্রয় না দিয়ে রেখে আসে বৃদ্ধাশ্রমে। এতে সন্তানের বুক এতটুকু কেঁপে ওঠে না। একাধিক সন্তান থাকা সত্ত্বেও মা-বাবার ঠাঁই হয় বৃদ্ধাশ্রমে। কিন্তু কেন? এই কেনোর উত্তর আসলেই জটিল। সংসারে মেয়ের চেয়ে ছেলের গুরুত্ব অনেক। তার খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরা, স্বাধীনতা সব কিছুতেই অগ্রাধিকার দেন মা বাবা। অনেক সময় ছেলের দোস ত্রু টি তাদের চোখে পড়েনা,আর পড়লেও খুব একটা পাত্তা দেননা ছেলে বলে। এক সময় পরম আদরের এই ছেলে যখন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বাইরের একটি মেয়েকে ঘরে তুলে আনে। তখন অনেক মা আছেন ছেলের সঙ্গে থাকা বউমাকে খুব একটা সহ্য করতে পারেন না। কখন সেই আদরের ছেলে মায়ের কাছে আস্তে আস্তে পর হয়ে যায়। উপরের স্তর থেকে নিম্নস্তর পর্যন্ত ছেলে বিয়ে দিয়ে অধিকাংশ মা যখন শাশুড়ি হন, তখন তার এক রূপ । আবার মেয়ে বিয়ে দিয়ে অন্য রূপ ধারণ করেন। একজন মমতাময়ী মা তখন দুই রূপে আবির্ভূত হন। অধিকাংশ শাশুড়ি মা কখনই ছেলের বউকে নিজের মেয়ের মতো ভালবাসতে পারেন না,পারেন না স্বাভাবিক ভাবে ছেলের পাশে মেনে নিতে। তিনি ভাবেন, বউয়ের জন্য ছেলে পর হচ্ছে। ফলে তৈরি হয় মা, ছেলে ও বউ এই তিনজনের মধ্যে দূরত্ব। অথচ এই সম্পর্ক ফুলের মতো বিকশিত করতে পারে তাদের এই মানসিকতার পরিবর্তনে। সেখানে থাকে অন্য রকম এক সুখের প্রবাহ। এর প্রভাব পরিবার, সমাজ এমনকি রাষ্ট্রেও সুন্দর একটা প্রভাব ফেলতে পারে,পারে অপরাধ প্রবণতা কমাতে।
আবার এর উল্টোটাও যে সমাজে ঘটছেনা তাও কিন্তু নয়। অনেক মেয়ে আছে যারা শশুর বাড়ির মানুষদের প্রথম থেকেই আপন ভাবতে পারেনা। পারেনা বাবা মায়ের স্হানটা শশুর -শাশুড়িকে দিতে। শাশুড়ি ভালো হওয়া সত্ত্বেও অনেক বউ তাকে পছন্দ করেন না। একসঙ্গে থাকতে চান না ভেঙে যায় পারিবারিক ও মানবিক বন্ধন। ওই বউ যখন শাশুড়ি হন তখন তার জন্যও অপেক্ষা করে করুণ পরিণতি।
বউয়ের কাজের দোষ ধরতে অনেক শাশুড়ি পেছনে লেগে থাকেন, ছেলের কানে কুমন্ত্রণা দেন। খাবারের বেলায়ও এক চক্ষুবিশিষ্ট। ফলে অনেক সংসার ভেঙে যায়। আবার অনেক বউ নিরবে সহ্য করে আর চতুরতায় অপেক্ষা করে কবে শাশুড়ি বৃদ্ধ হবেন আর এর শোধ নেবেন।
ছেলেমেয়ের যখন আলাদা সংসার হয়, মা-ও তখন যেন এক চোখ বিশিষ্ট হয়ে যান। পরম আদর যত্মে মেয়ের বাড়িতে অনেক কিছু পাঠান। অথচ আদরের ছেলে কখন যে তার পর হয়ে যায়, তা টেরও পান না। এই শাশুড়ি যখন বৃদ্ধ হন, তখন বউয়ের প্রতিশোধের পালা আসে। তাকে বউয়ের হাতের পুতুল হয়ে থাকতে হয় এবং বউয়ের ওপর কথা বলার ক্ষমতা হারান। বউ তখন তাকে দূরে রাখতে চান অথবা পাঠিয়ে দেন বৃদ্ধাশ্রমে। আমরা কেবল ছেলে ও বউয়ের দোষ ধরি।
অনেকের মেয়েও থাকে। মেয়ে কেমন করে পারে মা-বাবার এই পরিণতি সহ্য করতে? মেয়ে যেমন পরের ছেলের সংসার করে, তেমনি ছেলেও পরের মেয়েকে নিয়ে সংসার করে। মেয়ের স্বামী যেমন, ছেলের বউও তেমন। অথচ ছেলের চেয়ে মেয়ের পেছনে সংসারে অর্থ ও শ্রম বেশি খরচ হয়। মেয়েরও দায়িত্ব আছে বৃদ্ধ মা-বাবার দায়িত্ব নেওয়ার। যার কেউ নেই, কিছু নেই তার জন্য অবশ্যই বৃদ্ধাশ্রম একটি নিরাপদ জায়গা।
মেয়েরা সমঅধিকার সবক্ষেত্রে চাইলে মা-বাবার দায়িত্ব নেওয়ার বেলায় সমঅধিকার তেমন একটা চায়না। এখানে মেয়ের স্বামীরও একটি ভূমিকা থাকা দরকার। ছেলেদের বেলায় এ দায়িত্ব বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা মা ও শাশুড়ি হিসেবে আমাদের মানসিকতা যদি পরিবর্তন না করি, তাহলে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে যাবে। পশ্চিমা দেশগুলোয় মা-বাবা স্বেচ্ছায় চলে যাচ্ছেন। কারণ বৃদ্ধাশ্রমের একটি ভালো দিকও রয়েছে। যখন কেউ বৃদ্ধ হয়ে যান, সংসারে তখন তিনি হয়ে পড়েন নিঃসঙ্গ। এ সময় তিনি একাকিত্বের যন্ত্রণা বয়ে বেড়ান। বৃদ্ধাশ্রমে তার একাকিত্ব দূর হয়। এখানে তিনি অন্যদের সঙ্গ পান। যা পরিবার থেকে পান না।
আমরা যারা বাংলার কালচারে মানুষ, তারা এটি চাই না। ছেলেমেয়ের বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট, বাড়ি-গাড়ি, চাকর-বাকর থেকেও মা-বাবার সেখানে ঠাঁই হয় না। আমাদের মানসিকতার কেন এমন অবমূল্যায়ন ও নিচে নেমে যাবে? আমরা চাই না, বংশধরের ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হয়ে কোনো মা-বাবার স্থান হোক দূরে বা বৃদ্ধাশ্রমে। বাবা- মারও এই বিষয়টা গভীর ভাবে ভাবা উচিৎ তারা যেন ছেলের বউকে পর মনে না করে বরং তার ভালো লাগা-মন্দ লাগাকে গুরুত্ব দিয়ে বুকে টেনে নেন নিজ সন্তানের মতো এতে বউ-শশুর-শাশুড়ির দূরত্ব যাবে কমে এবং বউয়ের কাছে তারা হবেন নিজ বাবা-মায়ের মতো। তাই বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা না বাড়িয়ে আমরা বরং আমাদের বিবেক বোধটি জাগ্রত করে মানবিক গুণাবলি বাড়িয়ে তুলি। এটি আমাদের শিকড় হয়ে গাছ রক্ষা করতে সহায়তা করবে এবং পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় ও অটুট রাখবে।

সা/৭/১০/১৯.৫৮

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close