আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
আন্দোলন সংগ্রামে নারী

সেবা দিয়ে যুদ্ধ করলেন কল্পনা রানী দেব

মোস্তফা হোসেইন::

কল্পনা রানী দেব। শিশু ছিলেন বয়সে। অষ্টম শ্রেণীর শিার্থীর তো তেমনই হওয়ার কথা। সেই শিশুটিই কিনা গেলেন যুদ্ধ করতে!
অবাকই হওয়ার কথা। ভৈরব গার্লস স্কুলে পড়ার সময়ও কেউ কি ভেবেছে এই মেয়ে যুদ্ধে যাবে? জয় করবে একটি দেশ? বাস্তবতা হ”েছ তিনি গেছেন এবং জয় করেছেন।
মার্চ মাসে যখন যুদ্ধ শুর“ হলো তখন তিনি চলে আসেন নবীনগরে তার পৈতৃক বাড়িতে। ভৈরব থেকে নবীনগরে গিয়েও বাঁচার পথ দেখলেন না। তাই গেলেন আগরতলা। ওখানে গিয়ে বড়ই অসহায় মনে হতে থাকে। এ কেমন কথা। শিশুকিশোর সবাই যা”েছ যুদ্ধে আর তিনি থাকবেন ঘরে বসে। তাও উদ্বাস্তু’ অব¯’ায়? কিন্তু মেয়ে বলে বাধ সাধলো সবাই। এমন একটা বা”চাকে কে নেবে যুদ্ধে? এমন সময় কল্পনা কল্পনা করলেন যোদ্ধাদের সেবিকা হওয়ার মাধ্যমে যুদ্ধে অংশ নেয়ার। পথও পেয়ে গেলেন একটা। গেলেন খালাতো বোন পদ্মা রাণীর কাছে। পদ্মা রাণী এর আগেই যোগ দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা হাসপাতালে। তিনি আবার কিছুটা নাসির্ংএর প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন। কল্পনারতো সেটাও নেই। ভাবলেন নাইবা থাকলো কোনো প্রশিক্ষণ। ওষুধ খাওয়ানো, ওষুধ এগিয়ে দেওয়ার মতো ছোটখাটো কাজগুলো তো করতে পারবেন। সেটাও মন্দ কি।
গেলেন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তৈরি হাসপাতালে। ডাক্তার নাজিমউদ্দিন দেখে অনেকটা ইতস্তত করেই জানতে চাইলেন, কী কাজ করতে পারবে এই মেয়ে?
এত কম বয়সের কাউকে কাজে লাগানো যে খুবই কঠিন। পদ্মা বললেন, পারবে।
নাজিম সাহেব শেষ পর্যন্ত রাজী হলেন। বলা চলে পদ্মার অনুরোধই কাজে লেগেছে। সেইতো তাঁর চাকরি শুরু। হয়ে গেলেন সেবিকা পদ্মার সহযোগী। কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই তিনি হলেন মুক্তিযোদ্ধাদের হাসপাতালের সেবিকা। ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় নীলিমা, বাসনা, মধুমিতা, আলোর মতো অনেকের সঙ্গে। দেখতে পান লুলু, টুলুর মতো ঢাকা থেকে আসা সিনিয়ার মেয়েদেরকেও। কিন্তু কাজ আর কি করবেন। পদ্মার সাথে সাথে ওষুধ, ইঞ্জেকসন এগিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে ওষুধ খাওয়ানোর মতো টুকটাক।
ভাবতে থাকেন, সাহস রাখতে হবে। তা নাহলে যে, আরো বড় কাজ করা যাবে না। পদ্মাও বুঝতে পারলেন তার ই”ছার কথা। একদিন বললেন, আয় অপারেশন কেমন হয় দেখবি।
বাঁশ দিয়ে তৈরি ঘর, সেই ঘরে আবার বাঁশ দিয়েই তৈরি হয়েছে বিছানা। সেই বিছানায় রোগীদের রাখা হয়। অপারেশন থিয়েটারও তেমনি বাঁশ দিয়ে তৈরি। সেই ওটিতে গিয়ে দেখেন একজনকে শোয়ানো আছে। তার অপারেশন হবে একটু পর। রোগীর গালের একদিক দিয়ে বুলেট ঢুকেছে আরেক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। রোগী ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মতিন।
মাত্র তাকিয়েছেন আর ওমনি ধপাস করে পড়ে গেছেন মাটিতে। ঐ সময় যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে আরেক রোগী যোগ হলেন।
তবে একবার বেহুশ হলে কি হবে তারপর কিন্তু আর অসুবিধা হয়নি। যেমন বীরপ্রতীক বাহার এলেন পায়ে গুলি খেয়ে। তাকে সেবা করতে গিয়ে মোটেও অসুবিধা হয়নি তার। হাসপাতালেই দেখেন শেখ আলমকে। মুক্তিযোদ্ধা হাসপাতাল বিশ্রামগঞ্জের বিখ্যাত রোগী ছিলেন সানাউল্লাহ। মারা গেছেন বলে যাকে মনে করা হয়েছিল। সেই সানাউল্লাহও একসময় কল্পনাদের অতি নিকটজন হয়ে যান।
এমনো মনে হয়েছে ডিউটি থেকে যেন না ফেরাই ভালো। ৪জন করে একেক সিফটে ডিউটি করতেন তারা। মনে হতো ২৪ঘন্টাই থাকা উচিৎ হাসপাতালে। হাসপাতাল লাগোয়া ছিল বাঁশের ঘর, যা তাদের ঘুমানোর জন্য ব্যবহার হতো। তারপরও মনে হতো এখানেই যেন শান্তি বেশি। এমনকি বিরক্তিকর কোনো পরি¯ি’’তি যদি সৃষ্টি হতো তারপরও।
কতরকম বিপত্তি যে ছিল সেখানে। একবার একজন মানসিক রোগী তাকে মারার জন্য তেড়ে আসেন। নাম ছিল মালেক। যাকে ঠ্যাডা মালিক্কা বলে ডাকা হতো। সেই ঠ্যাডা মালিক্কা তাকে মারার জন্য বাঁশ উচিয়ে ধরেছিল। ঐ সময় পাশে থাকা লোকজন তাকে রক্ষা করে।
এরও কারণ আছে। মানসিক রোগীটিকে ভালো করে তোলার দায়িত্ব পড়ে পদ্মা রহমানের ওপর। খুবই বিরক্ত করতো সেই মালেক। কিন্তু পদ্মা সেবা দিয়ে এমনভাবে রোগীটিকে সারিয়ে তোলেন যে, ভাবাই যায় না। একটা সময় এলো যে রোগী পদ্মাকে আর কোনোমতেই ছাড়তে চাইতো না। এমনকি ঘুমানোর জন্যও তাকে পীড়াপিড়ি করতো। ফলে রোগী যতক্ষণ না ঘুমাতো ততক্ষণ পদ্মাকে তার কাছাকাছি থাকতে হতো। নিজের হাত দিয়ে খাইয়ে দিতে হতো। রোগীর পেশাব পায়খানা সবই নিজ হাতে পরিস্কার করতো পদ্মা।
কল্পনার কাছে মনে হতো এতটা না করলেও বুঝি চলে। পাগলটা কিন্তু বুঝতে পারতো পদ্মাকে সরিয়ে নেয়ার জন্য কল্পনা চেষ্টা করছে। সেইজন্যই সে কল্পনাকে সহ্য করতে পারতো না। সেই কারণেই একবার সুযোগ বুঝে মালেক কল্পনার মাথায় আঘাত করার জন্য বাঁশ নিয়ে এগিয়ে আসতে থাকে।
দুইটা রাজাকার ধরে এনেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের ভিতর থেকে। ওদের দিনের বেলা কাজ করতে দেওয়া হতো। ওদের দিয়ে কাপড় ধোয়া, গোসলের পানি তোলার মতো নানা কাজ করানো হতো।
কত কাজই না করতে হতো হাসপাতালে। রোগীদের সেবা বলতে যা বোঝায় সবকিছুই করতে হয়েছে। তাদেরকে বাঁচিয়ে তোলাই শুধু নয় তাদের পক্ষে যাতে আবারো যুদ্ধের ময়দানে যাওয়া সম্ভব হয় সেটাই ছিল তাদের ল্য। যাতে পাকিস্তানি বাহিনী পরাভূত হয়। দেশ স্বাধীন হয়।
দেখতে দেখতে দেশ স্বাধীন হয়। সাদেকুর রহমানের সঙ্গে তারা দেশে ফিরেন। পরবর্তীকালে ভৈরব বাজারের হাজী আতাউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। নাম পরিবর্তন হয় আসমা আক্তার।
বড় সাধ নিয়ে যুদ্ধে গেছেন কল্পনা। আশা ছিল শান্তি আর সুখ থাকবে জীবন ভর। কিন্তু সন্তানহীন ও স্বামীহারা কল্পনার কাছে এখন সেসব শুধুই কল্পনা। সরকারি কোনো সহযোগিতা তাঁর ভাগ্যে নেই। এভাবেই কি বাকী জীবনটাও কাটাতে হবে তার?

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close