আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সারাদেশস্পট লাইট

জাপানি নারীদের ‘শত্রু’র সঙ্গে বসবাস

japanoiওমেনঅাই:৭০ বছর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে অধিকৃত টোকিওর অনেক মানুষই যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করতেন। কিন্তু ঠিক সেইসময়েও হাজার হাজার জাপানি তরুণীর মধ্যে জনা দশেক নারী বৈরিতা ভুলে মার্কিন সেনাদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। অথচ, যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নিজেদের অধিকার আদায়ে বড়সড় সংগ্রামই করতে হয় তাদেরকে। শত্রু হিসেবে পরিচিত মার্কিন সেনাদেরকে বিয়ে করে শ্বশুড়বাড়িতে যাওয়ার পর সেইসব জাপানি নারীদের কী অভিজ্ঞতা হয়েছিল তারই বর্ণনা দেয়া হয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে।
এমনই এক জাপানি নারী হিরোকো টোলবার্ট। ১৯৫১ সালে ২১ বছর বয়সী এই নারী প্রথমবারের মত তার শ্বশুড় শাশুড়ীর সঙ্গে দেখা করতে যুক্তরাষ্ট্রে যান। তখন মনে মনে শ্বশুর-শাশুড়ীর মন জয় করার পরম ইচ্ছা ছিল তার। নিউইয়র্কে ট্রেন যাত্রার জন্য প্রিয় কিমোনো জামাটিই পরেন তিনি। কারণ তিনি শুনেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সব মানুষই পোশাক পরিধানে রুচিশীল এবং সুন্দর সব বাসায় থাকে।
কিন্তু নববধূকে দেখে মোহিত হওয়ার থেকে বরং অখুশীই হন তার স্বামীর পরিবার।
হিরোকো বলেন: “আমার শাশুড়ি আমাকে পরিবর্তিত রূপে দেখতে চাইতেন। তারা আমাকে পশ্চিমা কাপড়ে দেখতে চাইতেন। এমনকি আমার স্বামীও। অগত্যা আমি আমার স্বদেশী সব কাপড় তুলে রাখলাম। কিমোনোটা বহু বছর তুলে রেখেছিলাম।”

হিরোকো জাপানের ঐতিহ্যবাহী কাপড় পরতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত
যুক্তরাষ্ট্রের জীবন যে তার কল্পনার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তা পোশাকের ঘটনাতেই বুঝে যান তিনি।
হিরোকো বলেন: “আমি যে মুরগির খামারের অংশ হয়ে গেছি সেটা বুঝে গেছিলাম। আমার চারপাশ শুধু মুরগির খাঁচা আর সার মনে হচ্ছিল। কেউই বাসায় জুতা খুলতো না। কিন্তু জাপানে বাসায় আমরা কখনো জুতা পরতাম না। সবকিছুই অনেক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছিল। এই ধরনের পরিস্থিতিতে থেকে আমি বিধ্বস্ত হয়ে যাচ্ছিলাম।”
হিরোকো জানান তার নামটা পর্যন্ত পাল্টে ফেলা হয়েছিল। তিনি বলেন, “তারা আমার নতুন নামও রাখে- সুসি।”
যুদ্ধকালীন জাপানের অনেক নববধূর মতই হিরোকোও মোটামুটি ধনী পরিবার থেকে এসেছিলেন। কিন্তু টোকিওতে নিজের ভবিষ্যত তৈরি করতে পারেননি।
তিনি বলেন: “বোমা বিস্ফোরণে সবকিছুই টুকরা টুকরা হয়ে গিয়েছিল। রাস্তা, দোকান কিছুই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সবকিছুই দুঃস্বপ্নের মত ছিল। আমরা মাথার উপরে একটু ছাদ ও খাবার পাওয়ার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলাম।”
স্বামী আর শ্বশুড়বাড়ির প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমি বিল সম্বন্ধে বেশি কিছু জানতাম না। তার পরিবার বা অতীত ইতিহাস কোন কিছুতেই ওয়াকিবহাল ছিলাম না আমি। কিন্তু যখনই সে আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিল, আমি সুযোগ নিলাম। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে আমি বসবাস করতে পারছিলাম না। কিন্তু আমার বাঁচার দরকার ছিল।”
হিরোকো জানান মার্কিন সৈন্যকে বিয়ে করার ব্যাপারটি তার পরিবার মেনে নিতে পারেনি। তিনি বলেন: “মার্কিন কাউকে বিয়ে করছি শুনে আমার মা ও ভাই বিচলিত হয়ে পড়েন। জাপান ছাড়ার সময় একমাত্র মা-ই আমাকে ছাড়তে আসে। আমি ভেবেছিলাম, এটাই শেষ। আমি হয়তো আর কখনো জাপানকে দেখতে পাবো না।’
উল্লেখ্য, জাপান যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক শত্রু হওয়ায় হিরোকোর শ্বশুরবাড়ী থেকেও তাকে এখানকার মানুষ হয়ত তাকে অন্যভাবে দেখতে পারে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়া হয়।
১৯৪১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পার্ল হারবারে জাপানের আক্রমণে একদিনে অন্তত ২৪শ’ মার্কিন নিহত হয়। আর এর ফলে অন্তত ১ লাখ ১০ হাজার জাপানি-আমেরিকানকে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলের এক শিবিরে স্থানান্তরিত করা হয়।
এটাই যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জোরপূর্বক স্থানান্তরের ঘটনা। আর তাই ঐ সময়ে জাপানি সম্প্রদায়ের যে কেউ নিজ দেশের পক্ষে পুনরায় হামলার জন্য গুপ্তচরবৃত্তি করতে পারে বলে আমেরিকার জনগণকে প্রণোদিত করা হয়।

মার্কিন সৈন্য জাপানী-আমেরিকানদের বেসামরিক অব্যাহতির আদেশপত্র দেয়ালে লাগাচ্ছেন
শিবিরটি ১৯৪৫ সালে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ঐ দশকের পুরো সময়জুড়ে শিবিরের মানুষের মনে আবেগ ছিল দগদগে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়ান-আমেরিকান স্টাডিজের প্রফেসর পল স্পিকার্ড বলেন: “এই যুদ্ধে উভয় পক্ষের মধ্যেই অবিশ্বাস্য ঘৃণা ও ভীত সন্ত্রস্ততা ছিল। সেসময় যুক্তরাষ্ট্র বর্ণবাদের জন্য প্রশংসিত জায়গা ছিল। আর আন্তঃজাতি সম্পর্কের বিরুদ্ধে অনেক কুসংস্কার প্রচলিত ছিল।”
সৌভাগ্যবশত, হিরোকো তার শ্বশুরালয়ের আশপাশের মানুষ অর্থ্যাৎ এলমিরার গ্রামীণ খামারের আশে পাশে বসবাসরত সম্প্রদায়ের কাছ থেকে ভালো আচরণই পান।
তিনি বলেন: ‘বাচ্চা জন্ম দেওয়ার সময় আমি যে সহায়তা পাবো না এবং কঠিন বিপদের সম্মুখীন হব, সেটা আমার স্বামীর এক চাচী আমাকে বলেন। কিন্তু তিনি আমাকে ভুল বলেছিলেন। কারণ যে ডাক্তার আমার প্রসব করান, তিনি জানান, আমার সেবা করতে পেরে তিনি খুবই গর্বিত। তার স্ত্রীর সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়। তারা ক্রিসমাস ট্রি দেখাতে আমাকে তাদের বাসায় নিয়ে যায়।’
যুদ্ধকালীন বিয়ে হওয়া অন্যান্য জাপানি নববধূরাও মার্কিন শ্বশুড়বাড়িতে নিজেদের খাপ খাওয়াতে গিয়ে বিপাকে পড়ে।
১৯৫২ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরিত হওয়া আতসুকো ক্রাফট বলেন: “আমি এখনও মনে করতে পারি, লুইসিয়ানাতে এক বাসে ওঠার সময় সেখানে কালো এবং সাদা মানুষের বসার জন্য দু’টি ভাগ দেখেছিলাম। কোথায় বসতে হবে তা আমার জানা ছিল না। অতঃপর আমি মাঝখানের সারিতে বসেছিলাম।”
হিরোকোর মত আতসুকোও উচ্চ শিক্ষিত ছিল। কিন্তু বিধ্বস্ত টোকিওতে বসবাসের থেকে আমেরিকান কাউকে বিয়ে করে উন্নততর জীবনযাপনের কথা ভেবেই তিনি বিয়েটি করেন।
তিনি বলেন: ‘ভাষা বিনিময় প্রোগ্রামে অংশ নেওয়ার সময় ‘মহানুভব’ স্বামীর সাথে দেখা হয় তার। আর বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার সময়ই আমেরিকাতে পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য রাজি হন তিনি।’

১৯৫২ সালে আতসুকো (বা থেকে দ্বিতীয়) আরনোল্ড (ডান থেকে দ্বিতীয়) বিয়ে করেন এবং আমেরিকা চলে আসেন
কিন্তু মাইক্রোবায়োলজিতে স্নাতক সম্পন্নপূর্বক হাসপাতালে চাকরি করা সত্ত্বেও এখনও তিনি বৈষম্যের শিকার হন বলে জানান।
তিনি বলেন: ‘আমি যখনই থাকার জন্য কোন বাসা বা অ্যাপার্টমেন্ট খুঁজতে যায় তখনই তারা বলেন, এটি ভাড়া হয়ে গেছে। তারা ভাবে, আমাকে দেখলে কেউই হয়তো বাসা বাড়া নেবে না। তখন তাদের ব্যবসায় ক্ষতি হবে। এ ধরণের আচরণ খুবই পীড়াদায়ক।’
অধ্যাপক স্পিকার্ডের মতে, জাপানি বধূরা প্রায়ই জাপানী-আমেরিকানদের কাছে প্রত্যাখিত হন।
তিনি বলেন: ‘সম্প্রদায়ের লোকেদের ধারণা, এরা চারিত্রিকভাবে বাজে। কিন্তু আদতে এরকম কোন কিছুই নয়। বেশিরভাগ নারীই (টোকিওতে) ক্যাশ নিবন্ধন, মোজা বুনন অথবা মার্কিন মালিকানার অন্তর্গত বিভিন্ন সংগঠনে চাকরি করতেন।’
স্পিকার্ডের মতে, ১৯৫০’র দশকে গড়ে ৩০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার নারী আমেরিকা পাড়ি দেন।

প্রথমদিকে, মার্কিন সেনাবাহিনী থেকে সৈন্যদেরকে স্থানীয় নারীদের সাথে মেলা-মেশা করতে বারণ করা হয়। তাছাড়া তাদেরকে বিয়ে করার অনুরোধ থেকে অবরুদ্ধ করা হয়।

হিরোকো মার্কিন সৈন্য স্যামুয়েল বিল টোলবার্টকে বিয়ে করেন এবং ১৯৫১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরিত হন
১৯৪৫ সালের যুদ্ধ বধূ আইনে, আমেরিকান চাকুরিজীবীদের ভিনদেশী স্ত্রীকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু ১৯৫২ সালে অভিবাসন আইন হওয়ার পর, প্রচুর সংখ্যক এশীয় আমেরিকায় যাওয়ার সুযোগ পায়।
যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরিত হওয়ার পর, মার্কিন সেনাবাহিনীভিত্তিক স্কুলগুলোতে জাপানী নববধূরা মার্কিন সংস্কৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তারা মার্কিন পদ্ধতিতে কেক বানানো থেকে শুরু করে তাদের অভ্যস্ত ফ্লাট জুতা পরিহার করে হিল জুতা পরা আরম্ভ করে।
কিন্তু অনেকেই সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত ছিল।
স্পিকার্ড বলেন: সাধারণত কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের বিয়ে করা জাপানী নারীরাই সহজে বসতি স্থাপন করতে সক্ষম হন।

জাপানী নববধূরা ব্রাইড স্কুলে আমেরিকার জীবন-ব্যবস্থা শিখতে যান
কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারগুলো জানে হারানোর বেদনা। নববধূরা কৃষ্ণাঙ্গ নারী সমাজে সাদরে গৃহীত হন। কিন্তু ওহিয়ো এবং ফ্লোরিডার মত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শ্বেতাঙ্গ সম্প্রদায়গুলোতে বিচ্ছিন্নতা প্রায়ই চরম পর্যায়ে চলে যেত।
তবে বর্তমানে দিন বদলেছে
আতসুকোর বয়স এখন ৮৫। তিনি জানান, লুইসিয়ানা এবং ওয়াশিংটন ডিসির পাশ্ববর্তী মেরিল্যান্ডের জীবনযাপনের মধ্যে একটা বড় ধরনের পার্থক্য লক্ষ্য করেছেন তিনি। এখানে তিনি তার স্বামীসহ দুই সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন।
তিনি জানান, দিন বদলে গেছে। এখন আর কোনরূপ বিদ্বেষ পরিলক্ষিত হয় না।
তিনি বলেন: ‘যুক্তরাষ্ট্র এখন আরও বেশি পার্থিব ও পরিশীলিত। আমি জাপানী-আমেরিকান, আর এতেই আমি খুশি।

হিরোকোও স্বীকার করেন দিন বদলে গেছে। কিন্তু ৮৪ বছর বয়সী এই নারী ১৯৮৯ সালে স্যামুয়েলকে পরিত্যাগ করেন এবং আবারো বিয়ে করেন। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র যতটা পরিবর্তিত হয়েছে তিনিও ততটাই পরিবর্তিত হয়েছেন।
তিনি বলেন: “সন্তানদের সাথে সহানুভূতিশীল হওয়ার শিক্ষা পেয়েছি আমি। জাপানিরা সুশৃঙ্খল এবং স্কুলে যাওয়াটা তাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মনে করি সফলতা মানে অধ্যয়ন, অধ্যয়ন আর অধ্যয়ন। আমি অর্থ সঞ্চয় করেছিলাম এবং এখন একজন সফল দোকানের মালিক।
আমি আমার জীবনের সঠিক পথটা বেছে নিয়েছি- আমি একজন খাঁটি আমেরিকান।
কিন্তু সেখানে সুসির কোন ভূমিকা নেই। শুধুমাত্র, হিরোকো।”

সূত্র: বিবিসি নিউজ

ঢাকা, ২০ অাগস্ট (ওমেনআই)//এসএল//

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close