আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
মতামত

শিক্ষা পণ্য নয় অধিকার

apa finalফরিদা ইয়াসমিন: কয়েক দিন ধরে দেশ ছিল উত্তাল। স্থবির হয়ে ছিল রাজপথ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থেকে মানুষের ত্রাহি অবস্থা। শুধু ঢাকা নয়, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট মহানগরগুলোর একই অবস্থা। যানজটে রাজপথ অচল হয়ে থাকা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবারের যে কারণটি তা একেবারেই নতুন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমেছে। তারা কোনো ভাঙচুর চালায়নি। শান্তিপূর্ণই বলা যায় আন্দোলন। বিভিন্ন রাস্তা অবরোধ করে তাদের টিউশন ফি’র ওপর আরোপ করা সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানায়। তবে তারা একদিনেই রাস্তায় নেমে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করেনি। বেশ কিছু দিন ধরেই তারা ক্যাম্পাসভিত্তিক প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিল। কিন্তু কে শোনে কার কথা! অবশেষে তারা রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছে।

আমরা জানি শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা সুনিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর সেই লক্ষ্যেই সরকার ভর্তুকি দিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনা করছে। স্বাধীনতার পর দেশে চারটি এবং দুটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকায় প্রকৌশল ও ময়মনসিংহে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। পরবর্তীতে ক্রমবর্ধমান চাপ সামলাতে সরকারিভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় যেমন চালু করা হয়, তেমনি পাশাপাশি গড়ে উঠেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার সুযোগের স্বল্পতার কারণেই বেসরকারি খাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গড়ে উঠেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই পরিচালিত হচ্ছে।

এবার চলতি অর্থবছরের বাজেটে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের টিউশন ফি’র ওপর সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়। এরপর থেকেই শিক্ষার্থীরা ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে গত আট বছর ধরেই ভ্যাট ব্যবস্থা চালু রয়েছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের যুক্তি হচ্ছে, এসব প্রতিষ্ঠানে যারা পড়ালেখা করে তারা ধনীর সন্তান। তাই তাদের টিউশন ফি’র ওপর ভ্যাট দিতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। আসলে কী তাই? আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেককে জানি যারা কষ্ট করে শুধু সন্তানের উন্নতর ভবিষ্যতের আশায় পড়াশোনার খরচ জোগাচ্ছেন। মুষ্টিমেয় কিছু লোকের কথা বাদ দিলে বেশির ভাগই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থান পায় না বলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। অনেক অভিভাবক জমিজমা বিক্রি করে সন্তানকে পড়াচ্ছেন। অর্থমন্ত্রী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সুযোগ করে দিয়ে দেখতে পারেন কতজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। রাষ্ট্রের নাগরিকদের শিক্ষার সুযোগ দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্বের কারণেই কী রাষ্ট্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বরাদ্দ দিচ্ছে না? তাহলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রছাত্রীদের ওপর এই বৈষম্য কেন? বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দাবি যৌক্তিক, শিক্ষা কোনো পণ্য নয় অধিকার, সেখানে পণ্যের ওপর যে ভ্যাট চলে তা শিক্ষা খাতে চলে না। পৃথিবীর কোথাও শিক্ষা খাতে ভ্যাট আছে বলে আমার জানা নেই। বরং রাষ্ট্র নানাভাবে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সহায়তা করে থাকে। কানাডায় পণ্যের ওপর ভ্যাট অত্যন্ত বেশি, যা ১৩ শতাংশ। অথচ শিক্ষা ক্ষেত্রে ভ্যাট তো দূরের কথা সরকার শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে ঋণ দিয়ে সহায়তা করে। আমেরিকাতেও একই অবস্থা। আমাদের মতো গরিব দেশে দক্ষ মানব সম্পদই হচ্ছে মূল সম্পদ। তাই দক্ষ ও শিক্ষিত মানব সম্পদ গড়ে তোলার জন্য সরকারকে নানাভাবে এগিয়ে আসা উচিত।

ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতেও এক সময় ধনীর সন্তানরাই পড়াশোনা করত। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে ইন্টারনেটের এই যুগে অভিভাবকদের সামনে পুরো দুনিয়া খুলে গেছে। খুব সাধারণ নিম্ন-মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত অভিভাবকরাও চান তার সন্তান বহির্বিশ্বের দুয়ারে পা রাখুক, ভালো শিক্ষায় শিক্ষিত হোক এবং বিশ্বের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করুক। তাই তাদের সর্বস্ব দিয়ে, অনেকে জমিজমা বিক্রি করেও সন্তানের পেছনে খরচ করেন। অর্থমন্ত্রী উচ্চবিত্তের কথা বলছেন। তিনি নিশ্চয় অবগত আছেন উচ্চবিত্তের সন্তানরা স্কুল থেকেই বিদেশে পড়াশোনা করছে। এ ছাড়া ঢাকায় কিছু বিদেশি স্কুল আছে যার মাসিক টিউশন ফি এক লাখ টাকার উপরে, তারা সেসব প্রতিষ্ঠানে পড়ছে। শিক্ষার ব্যয় কমাতে পারলে অনেক নিম্ন-মধ্যবিত্ত অভিভাবকও সন্তানদের ভালো শিক্ষার সুযোগ করে দিতে পারতেন।

শিক্ষা ক্ষেত্রে ভ্যাট আরোপ নৈতিকতাবিরুদ্ধ। -এই উপলব্ধি থেকে সরকার ১৪ সেপ্টেম্বর ভ্যাট প্রত্যাহার করেছে। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা স্বস্তি পাচ্ছেন। আমি শুধু বলব, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি না করে সরকারের উচিত এটিকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়। সে জন্য সরকারকে অনুরোধ করব, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলো থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার করার জন্য। প্রসঙ্গত বলতে হয় যে, ব্যাঙের ছাতার মতো বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠছে। কোথাও কোথাও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নেই, উচ্চমাত্রার টিউশন ফি। সরকারের উচিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বজায় রাখার বিষয় পর্যালোচনা করা, গ্রেডিং করা, টিউশন ফি নির্ধারণের একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা এবং শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়টি মনিটরিং করা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির টালমাটাল চাপ সামাল দিতেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এগিয়ে এসেছে। তাই সরকারের উচিত তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্যাট আরোপে সরকার হয়তো ১০০ বা ১৫০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে পারত। কিন্তু শিক্ষার সুযোগ প্রসারিত করে সরকারের রিটার্ন হয়তো আরও বহু বহু গুণ বৃদ্ধি পাবে।

লেখক : সাংবাদিক

সূত্র: দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন

ঢাকা, ১৫ সেপ্টেম্বর (ওমেনঅাই)// এসএল//

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close