আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
মতামত

জাহানারা ইমাম স্মৃতি জাদুঘর এবং কিছু কথা

02_Shahbagh+protest_140213বাহরাম খান : তাকে সাধারণত ‘মা’ বলেই ডাকা হয় । যিনি দেশের সকল সন্তানকে নিজ সন্তান হিসেবে ধারণ করার শক্তি দেখান তাকে মা বলতে কারো কৃপণতা থাকে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় সন্তানকে যুদ্ধে পাঠিয়েছেন। পুরো পরিবার যুক্ত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ ও যোদ্ধাদের সহযোগিতায়। হারিয়েছেন সন্তান, রক্ষা পায়নি স্বামী। তারপরও দেশকে, দেশের স্বার্থকেই স্থান দিয়েছেন সবার উপরে। তিনিই তো প্রকৃত মা।

শহীদ জননী জাহানারা ইমামের পরিচয় জানাতে ভূমিকার প্রয়োজন হয় না। তারপরও কিছু না বলে তার পরিচয় দিতে যেন নিজেকেই নিঃস্ব মনে হয়। এমন মা পৃথিবীতে কয়জন আছেন? সেই প্রশ্নও মনের মধ্যে উঁকি দেয়।

মাতৃত্বের স্বাভাবিকধারায় পৃথিবীর সব মা সমান। কিন্তু নিজের কর্ম দিয়ে যারা মাতৃত্বের সঙ্গে আরও বিশেষ কিছু যোগ্যতা অর্জন করেন তখন তিনি অসামান্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত হন। গল্প-উপন্যাসে অনেক মাকে মহিমান্বিত করে তোলা হয়। তা লেখকের হাতের যশ। কিন্তু কর্মে যে মা আমাদের পথ দেখিয়েছেন, তিনি তো অতুলনীয়।

থাকি আজিমপুরে। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম স্মৃতি জাদুঘরের অবস্থান আমার আবাসস্থলের দুই কিলোমিটারের মধ্যেই। ‘একাত্তরের দিনগুলি’ পড়ার পর উদ্দেশ্য ছিল ওই জাদুঘরে যাব। তার পরও অনেক দেরীতে সে ইচ্ছা পূরণ।

বইয়ে পড়া বিবরণের সঙ্গে বাস্তবের জিনিসপত্র দেখলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। তবে নাগরিক উন্নয়নের তোড়ে বইয়ে পড়া জাহানারা ইমামের বাড়িটি আর পাওয়া যায়নি। ডেভেলপার কোম্পানির মাধ্যমে দ্বিতল ভবনটি ভেঙে সেখানে ছয়তলা ভবন হয়েছে। স্মৃতি জাদুঘরটি বন্দী হয়েছে একটি মাত্র ফ্ল্যাটে। ঠিকমতো সব জিনিসপত্রের জায়গা হয়নি। অনেক কিছু রাখা হয়েছে বারান্দায়, অফিস রুমেও।

পরিপাটি আয়োজনে ব্যবহার্য জিনিসগুলি সাজিয়ে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ বলে কথা, ঐতিহ্য সচেতন অন্য কোনো দেশ হলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত এমন একটি বাড়িকে হয়ত সংরক্ষণ করা হতো।

শুধুই কি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির বাড়ি ছিল এটি? না। এই বাড়ি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাতি জ্বালিয়ে রাখার জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে। স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা যেমন কঠিন, তেমনি স্বাধীনতার ইতিহাস দেখার চেয়ে তা নতুনপ্রজন্মের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া ও তাদের আগ্রহী করে তোলা আরও কঠিন।

জানহানারা ইমাম দু’টি কাজই করেছেন। জীবনবাজী রেখে, সংসারবাজী রেখে তা তিনি করেছেন। এ কারণেই স্বাধীনতার ২১ বছর পর গণ-আদালত স্থাপন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পথ দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। এ কারণেই স্বাধীনতার ৪৫ বছরের মাথায় যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও রায় কার্যকর হয় তখন শাহবাগ চত্বরে জ্বলজ্বল করে ওঠে একটি ছবি, সেটি জাহানারা ইমামের।

জাদুঘরে রক্ষিত জাহানারা ইমাম ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যবহার্য জিনিষপত্র দেখছিলাম। ১৯৭১ সালে যে পরিবার মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ওয়াশিং মেশিনের মতো যন্ত্রপাতি ব্যবহার করত, তারা কীভাবে মুক্তিযুদ্ধ ধারণ করেছেন— তা বুঝতে হলে জাহানারা ইমামের দেশপ্রেম ও শিক্ষাকে বুঝতে হবে।

দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকার শুধু জাহানারা ইমাম একাই করেননি। তার পরিবারও করেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের এপ্রিল মাস। বড় ছেলে শাফি ইমাম রুমী আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেন। বাবা-মা চাইলেন রুমী আমেরিকায় যাক। রুমী তখন তাদের বললেন, ‘তোমরা চাইলে শেষ পর্যন্ত আমি আমেরিকায় যাব, হয়ত পড়াশোনা করে বড় ইঞ্জিনিয়ারও হব। কিন্তু এমন মুহূর্তে দেশের জন্য কাজ করতে না পারলে নিজের বিবেকের কাছে কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারব না।’

জাহানারা ইমামের শ্রদ্ধা-জাগানিয়া ব্যক্তিত্বের জন্য পারিবারিক বন্ধনটা এমনই ছিল যে, কেউই আলোচনা না করে সিদ্ধান্ত নিতেন না। শেষ পর্যন্ত রুমীর যুক্তিকেই মেনে নিলেন তার বাবা-মা। জাহানারা ইমাম বললেন, “তোকে যুদ্ধের জন্য ‘কোরবানী’ করলাম।”

ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ঢাকায় বড় কয়েকটি অপারেশন পরিচালনা করেন রুমীরা। ২৯ আগস্ট দুর্দান্ত সাহসী গেরিলাযোদ্ধা শাফি ইমাম রুমীকে তাদের এলিফ্যান্ট রোডের বাসা থেকে পাকিস্তানী বাহিনী তুলে নেওয়ার পর তার আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। তখন থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জাহানারা ইমামের বড় আফসোস ছিল— “কেন ওকে ‘কোরবানীর’র কথাটা বলেছিলাম? মা হয়ে এই কথাটা না বললে হয়ত আজও রুমী বেঁচে থাকত।”

পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী রুমীর সঙ্গে তার বাবা এবং ছোটভাইকেও তুলে নিয়ে গিয়েছিল। অনেক নির্যাতনের পর তারা মুক্তি পেয়েছিলেন। চরম ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রুমীর বাবা নির্যাতন, লজ্জা আর অপমানের ভার সইতে না পেরে ১৩ ডিসেম্বর মারা যান।

সন্তান ও স্বামীকে হারিয়েও দেশকে, দেশের মানুষকে ভালবেসে নিজের সংগ্রামের পথ থেকে সরে যাননি। মরণব্যাধি ক্যান্সারও তাকে নিজের পণ থেকে আলাদা করতে পারেনি। শরীরে ক্যান্সার নিয়েই তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সময়ের পরিক্রমায় এখন তার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হচ্ছে।

দেশপ্রেমের পণ থেকে মৃত্যুই আলাদা করেছে তাঁকে। কিন্তু তাঁর স্বপ্নের স্পিরিট থেকে কেউ তাঁকে দূরে সরাতে পারেনি। স্বপ্ন তিনি বুনে গেছেন। স্বর্গ থেকে হাসছেন জাহানারা ইমাম আর বলছেন, আমার স্বপ্ন সত্যি হচ্ছে। সৎ স্বপ্ন কখনো থেমে থাকে না, বাস্তবায়ন হয়, হয়ই, হবেই ।

লেখক : সাংবাদিক
সূত্র: ওয়েব সাইট

ঢাকা, ২৪ অক্টােবর(বাংলানিউজ সিক্সটিন ডটকম)//এলএইচ//

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close