আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সারাদেশ

পরকীয়ার টানেই ২ মেয়েকে হত্যা করল বাবা!

ওমেনঅাই:বাবা-মায়ের কোলে সন্তানরা সবচেয়ে বেশি নিরাপদ, এ কথা নতুন নয়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসছে এ কথা। কবে, কোন প্রেক্ষিতে এ বাক্যের শুরু তা সঠিকভাবে বলা কঠিন। বিশ্বের নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষের কাছে বাক্যটি বেশ প্রচলিত।

বিবর্তনের এ পৃথিবীতে চিরঞ্জীব থাকছে না সব কিছু। হয়তোবা সে ধারাবাহিকতার প্রভাব পড়েছে বাবা-মায়ের আদর-স্নেহের। নিরাপদ বলে বাবা-মায়ের চিরচেনা এ কোলও সন্তানদের জন্য কখনও হয়ে উঠে ভয়ঙ্কর।

এটি ব্যতিক্রম। তারপরও ঘটছে না তা নয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবিশ্বাস্য এরকম ঘটনা ঘটিয়েছেন মো. মনির হোসেন। নিজের দুই মেয়েকে নদীতে ফেলে হত্যা করলেন। প্রচার হলো বিদেশ যেতে টাকার জন্যে দুই মেয়েকে বিক্রি করে দিয়েছেন মো. মনির হোসেন।

ঘটনার কদিনের মধ্যে তাকে আটক করা হলে জানা গেল আসল ঘটনা। বিদেশ যেতে টাকার জন্যে মেয়েদের বিক্রি করেননি তিনি। মেরে ফেলতে নদীতে ফেলে দিয়েছেন মেয়েদের। সেটা পরকীয়ার টানে।

১১ দিন রিমান্ড শেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করে নৃশংসভাবে দুই শিশুকে হত্যার কাহিনী বলেন তিনি। যদিও গ্রেপ্তারের সময় তিনি পুলিশের কাছে দাবি করেছিলেন বিদেশ যাওয়ার জন্য তার দুই সন্তানকে বিক্রি করে দিয়েছে।

পাষণ্ড বাবা মনিরের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার পর থেকেই পুলিশ ও দুই কন্যাশিশুর লাশ খুঁজতে থাকে। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচার হলে বিষয়টি ভৈরব থানা পুলিশের নজরে আসে।

অবশেষে ১৪ ফেব্রুয়ারি সকালে ভৈরব থানার ওসি আশুগঞ্জ থানায় ফোন করে জানান, ১৭ জানুয়ারি মেঘনা নদী থেকে তারা এক শিশুর লাশ উদ্ধার করেছে। খবর পেয়ে আশুগঞ্জ থানা পুলিশ ভৈরব থানায় যোগাযোগ করে। মৃতশিশুর পরনে থাকা জামা-কাপড় ও ছবি সংগ্রহ করে নিয়ে আসে তারা। পরে রত্না বেগম ছবি ও জামা-কাপড় দেখে তার মেয়ে মারিয়া আক্তারের লাশ সনাক্ত করেন। এ ঘটনায় ওই বাবার ফাঁসির দাবি করেছে এলাকাবাসী।

মামলার বাদী, পুলিশ ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলার আশুগঞ্জ উপজেলার শরীফপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিস মিয়ার ছেলে মো. মনির হোসেন। রত্নার সঙ্গে প্রায় ৮ বছর আগে বিয়ে হয় তার। বিবাহিত জীবনে তাদের সংসারে ১ ছেলে ও ২ কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। তিন সন্তান নিয়ে ভালোই চলছিল তাদের সংসার। তবে এ কথা গোপন করে ৮ মাস ধরে একই এলাকার অষ্টম শ্রেণিতে পড়ূয়া এক কিশোরীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন।

প্রেমের শেষ পরিণতি হিসাবে গত ২ মাস আগে দুজনই বিয়ে করার সিদ্বান্ত নেয়। প্রেমিকার কাছে নিজেকে অবিবাহিত প্রমাণ করতে এবং তার পথের কাঁটা সরিয়ে ফেলতে বিবাহিত জীবনের ৮ বছরের সব স্মৃতি মুছে ফেলার উদ্যোগ নেয় মনির। সে অনুযায়ী স্ত্রী ও ৩ সন্তানকে জীবন থেকে পর্যায়ক্রমে সরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

পরিকল্পনা অনুয়ায়ী ১৪ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৬টায় ২ শিশুকন্যা মারিয়া (৬) ও সামিয়াকে (৪) ভৈরব ব্রিজে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে নিয়ে যায় মনির। ভৈরবের একটি খাবারের হোটেলে ২ শিশু কন্যাকে নিয়ে দুপুরের খাওয়া শেষ করে বিকেলে তাদের নিয়ে আসে আশুগঞ্জ-ভৈরব মেঘনা নদীর উপর নির্মিত সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুর মাঝখানে। ব্রিজের উপর থেকে তার দুই সন্তান মারিয়া ও সামিয়াকে ফেলে দেয়ার সুযোগ খুঁজতে থাকে মনির। পরে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ব্রিজের উপর মানুষের আনাগোনা কমতে থাকলে একপর্যায়ে সুযোগ বুঝে প্রথমে মারিয়াকে ও পরে সামিয়াকে ব্রিজের উপর থেকে ফেলে দেয় পাষণ্ড বাবা মনির। পরবর্তী টার্গেট ছিল স্ত্রী ও শিশুছেলেকে সুযোগ বুঝে হত্যা করার।

এ ঘটনার পর থেকে রত্না ও তার পরিবারের লোকজন মনির ও তার দুই সন্তানকে বিভিন্ন যায়গায় খুঁজতে থাকে। এভাবে ঘটনার পাঁচদিন পেরিয়ে গেলেও মনির ও তার দুই সন্তানের কোনো খোঁজ-খবর না পেয়ে অস্থির হয়ে হয়ে পড়েন তার স্ত্রী রত্না। পরে নবীনগর উপজেলার বীরগাঁওয়ে মনির হোসেনকে এলাকাবাসী দেখতে পেয়ে তাকে আটক করে। এ সময় মনিরের সঙ্গে তার দুই সন্তান ছিল না। সন্তান কোথায় আছে জানতে চাওয়া হলে তিনি এলোমেলো কথা বলতে থাকেন। এরপর বারবার তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি এক পর্যায়ে বলেন, ‘তার বন্ধু লালপুর বাজারের স্বর্ণ ব্যবসায়ী রতন ভৈরবে তাকে নেশাজাতীয় কিছু খাইয়ে অচেতন করে দুই সন্তানকে নিয়ে পালিয়ে গেছে। এরপর ১৩ দিন তার কাছে দুই সন্তান সম্পর্কে জানার জন্য চেষ্টা করে পরিবার ও এলাকাবাসী।

২৭ জানুয়ারি বুধবার বিকেলে তাকে পুলিশের হেফাজতে নিয়ে আসা হয়। সেখানে মনির পুলিশের কাছে দাবি করেন বিদেশ যাওয়ার জন্য সে তার সন্তানকে তিন লাখ টাকার বিনিময়ে একই এলাকার পাশের বাড়ির রতনের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। এই ঘটনায় মনিরের স্ত্রী রত্না বেগম ২৭ জানুয়ারি মনিরকে প্রধান আসামি করে আশুগঞ্জ থানায় একটি অপহরণের মামলা করেন। মামলার পর পুলিশ মনিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ সময় মনির পুলিশকে বিভিন্ন রকমের কথা বলতে থাকে। তবে পুলিশ সে কথায় বিশ্বাস না করে ২৮ জানুয়ারি প্রথম দফায় ৬ দিনের রিমান্ডে আনে। এ সময় তিনি পুলিশকে বিভিন্ন রকমের সাজানো কথা বলতে থাকেন। পুলিশ তার কথামতো বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালালেও নিহত দুই শিশুর লাশ খুঁজে পাচ্ছিল না। পরে এক পর্যায়ে সে তার বড় মেয়ে মারিয়াকে ব্রিজ থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করার কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করে এবং তার ছোট মেয়ে সামিয়াকে তার বাড়ির পাশের বায়েক এলাকার একটি মাঠে ছেড়ে দিয়ে আসে বলে জানান।

পুলিশ তার কথামত বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালালেও দুই শিশুর লাশ উদ্ধার করতে পারেনি। পরে প্রথম ৬ দিনের রিমান্ড শেষ হলে ৩ ফেব্রুয়ারি মনিরকে আবারো ৫ দিনের রিমান্ডে আনে আশুগঞ্জ থানা পুলিশ। ১১ দিনের রিমান্ডের শেষ পর্যায়ে মনির পরিকল্পিতভাবে তার দুই কন্যাশিশুকে সুকৌশলে ব্রিজ থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করার কথা স্বীকার করে এবং ১০ ফেব্রুয়ারি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। তবে পুলিশ দুই শিশুর লাশ খুঁজে পাচ্ছিল না। ওই শিশুদের লাশ পাওয়ার জন্য আশুগঞ্জ থানা পুলিশ মেঘনা নদীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায়।

এদিকে, ১৭ জানুয়ারি মেঘনা নদী ভৈরব মোহনায় একটি শিশু লাশ ভেসে উঠলে ভৈরব থানা পুলিশ নদী থেকে সেই লাশ উদ্ধার করে অজ্ঞাত লাশ হিসাবে দাফন করে। আশুগঞ্জ এলাকার দুই শিশুর নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে ভৈরব থানা পুলিশের তা নজরে আসে। ১৪ ফেব্রুয়ারি সকালে ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. বদরুল আলম তালুকদার আশুগঞ্জ থানায় ফোন দিয়ে মেঘনা নদীতে একটি বাচ্চা মেয়ের অজ্ঞাত লাশ পাওয়ার কথা জানান।

খবর পেয়ে আশুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সেলিম উদ্দিন ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. নজরুল ইসলাম লাশের নমুনা ও সুরতহাল রিপোর্ট দেখতে যান। সেখান থেকে তারা লাশের ছবি এবং কাপড় নিয়ে আসেন। পরে তারা মামলার বাদী ও নিহত বাচ্চার মা রত্না বেগমকে খবর দেয়। খবর পেয়ে থানায় ছুটে আসেন সে এবং আলামতগুলো দেখে তার বড় মেয়ে মারিয়া (৬) এর লাশ সনাক্ত করে। এ সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

মামলার বাদী ও নিহত দুই সন্তানের মা রত্না বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ‘পুলিশ আমাকে যে কাপড়ের ছবি দেখিয়েছে সেই কাপড় পড়ে আমার বড় মেয়ে মারিয়া সেদিন তার বাবার সঙ্গে ঘুরতে বেড়িয়েছিল। আমি আমার দুই বাচ্চার হত্যাকারী মনিরের ফাঁসি চাই।’

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম জানান, ভৈরব থানা থেকে একটি ফোন পেয়ে আমরা ছুটে যাই সেখানে। প্রাথমিকভাবে লাশের ও কাপড়ের কিছু আমরা সংগ্রহ করি। সেই ছবি আমরা বাচ্চার মাকে দেখালে তিনি আমাদের এটি তার বড় কন্যাশিশু মারিয়ার লাশ বলে নিশ্চিত করেন। তবে ডিএনএ টেস্ট করার পরই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে এটি কার লাশ।’

এ ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) শাহরিয়ার আল মামুন জানান, শিশু দুটি নিখোঁজ হবার পর ২৭ জানুয়ারি মনিরের স্ত্রী রত্না বেগম বাদী হয়ে আশুগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেন। দুই দফায় ১১ দিনের রিমান্ডে আনার পর শেষ দিনের মাথায় নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন মনির হোসেন। পাশাপাশি বড় মেয়ে মারিয়ার লাশ প্রাথমিকভাবে সনাক্ত করেছে তার মা রত্না বেগম। পুলিশ এখন ছোট মেয়ে সামিয়ার লাশ খুঁজছে।

ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ১৬ (ওমেনঅাইটুয়েন্টিফোর ডটকম)//এসএল//

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close