আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
আন্দোলন সংগ্রামে নারী

ইবেদুন বিবি এক সংগ্রামী নারী

দিল মনোয়ারা মনু :
বছর দশেক আগে ডিসেম্বর মাসের এক শীতের সকাল। কুয়াশার ঘন সাদা চাদর ভেদ করে সবে মাত্র সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। আমি দাঁড়িয়ে আছি পায়রাবন্দের স্বে”ছাসেবী সংগঠন নিজেরা করি’র ¯’ানীয় সেন্টার- এর সামনের রাস্তায়। আমার সামনে দিগন্ত জোড়া ফসলের মাঠ। শীতের সেই কুয়াশা”ছন্ন সকালে জমির আল ধরে মিছিল করে এগিয়ে আসছে নানা রঙের শাড়ী পড়া নানা বয়সের অসংখ্য নারী। কাছে আসতেই স্পষ্ট হল তাদের প্রত্যেকের হাতে গজারী কাঠের লাঠি। চোঁখে মুখে প্রতিজ্ঞা, প্রতিরোধের আগুন।

বুঝতে পারলাম এরা সবাই ¯ ভূমিহীন সমিতির সদস্য। এসেছেন সমিতির বেগম রোকেয়ার জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত ঐ দিনের সমাবেশে অংশগ্রহণের জন্য। তারা এসেছেন আশেপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে। শ্রদ্ধায় এবং অপার বিস্ময়ে লক্ষ করলাম এই মিছিলের নেতৃত্ব দি”েছন প্রায় ৭০ বৎসর বয়সী ছোটখাট গড়নের সাদাশাড়ী পরিহিত এক সংগ্রামী নারী যার নাম ইবেদুন বিবি। কাছে যেয়ে কাঁধে হাত দিয়ে জানতে চাইলাম আপনাদের প্রত্যেকের হাতে কাঠের লাঠি কেন? দৃপ্ত কন্ঠে উত্তর এলো, কেন শোনেননি আমাদের সমাবেশে আসতে জামায়াত নাকি বাধা দেবে। ওদের মাথা ভেংগে দিতে আমরা লাঠি নিয়ে প্র¯‘ত হয়ে এসেছি। আমি কিছুক্ষণের জন্য যেন বাকরুদ্ধ হলাম। এদের সাহস এবং দেশপ্রেম আমাকে মুগ্ধ করলো, আমরা যারা নিজেদের উ”চ শিক্ষিত এবং সচেতন নাগরিকদের অংশ হিসেবে দাবী করি তারাও কি এমনিভাবে জঙ্গীবাদী সন্ত্রাসী এই সংগঠনটির হিংসাত্মক আক্রমণ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পেরেছি। ওদের এই সচেতনতা এমন এক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকলো, যা উল্লেখ করার মত।

ঐ দিন দুপুরে স্কুল মাঠের ঐ সমাবেশের ষ্টেজে বলিষ্ঠ কন্ঠে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের ফাঁসির দাবী জানিয়ে ইবেদুন বিবি যে জ্বালাময়ী বক্তব্য রেখেছিলেন, ঢাকা থেকে আগত অতিথিবৃন্দকে তা হতবাক করেছিল। মূহর্মূহু করতালির মধ্য দিয়ে পুরো সমাবেশ তাকে সেদিন অভিনন্দিত করেছিলো।
এই সংগ্রামী, সাহসী, কল্যাণময়ী নারী গত ১২ জানুয়ারি ৮০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করলেন। তার এ মৃত্যু আমার মতো অনেককে শোকাহত করেছে। তবে আশার কথা তিনি রেখে গেছেন তার সংগঠনের অসংখ্য সচেতন সাহসী প্রতিবাদ প্রতিরোধে উজ্জ্বল নারী কর্মী। যারা তার আদর্শ এবং কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বরাবরের মতো।

আটান্ন বৎসর বয়সে ইবেদুন বিবি ভূমিহীন সংগঠনে যোগ দেন। এরপরই শুরু হয় তার সংগ্রামের রাস্তায় নিরন্তর পথ চলা। তার নিজের এবং আশপাশের এলাকায় যেকোন সংকট, অনিয়ম, বৈষম্য, নারী নির্যাতন, নারী পুরুষের সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতায়ন, তালাক, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ প্রতিরোধে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। পিতৃতান্ত্রিক এবং পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সো”চার। ফতোয়া, হিল্লাকে উপেক্ষা করে নারীকে স্বমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে এবং স্বাধীনতা বিরোধী, মৌলবাদী চক্রের বিরুদ্ধে তার লড়াই এবং সংগ্রাম ছিল সারা জীবনের। শুধু সমাজের প্রতি নন নিজের জীবনেও তিনি এই অন্যায় ও প্রতিবাদকে দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। ইবেদুন বিবির বড় ছেলে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি না নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করলে তিনি ছেলেকে বাড়ী থেকে বের করে দিয়েছিলেন এবং সেই পুত্রবধূকে মর্যাদার সাথে নিজের কাছে রেখে তার সঙ্গে সারাজীবন অহিবাহিত করেন।

এই সংগ্রামী সাহসী তৃণমূল নেত্রীকে ২০০৫ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্য বাছাইয়ে সারা দেশের ষোল নারীর সাথে অন্তর্ভূক্ত করে তাকে অনন্য এক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা হয়েছিলো।
বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি থানার শেখাহাতী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বিয়ে হয় মাত্র ১১ বছর বয়সে। নিজস্ব কোন জমিজমা না থাকায় কাঁথা সেলাই এবং ছেলের বন্ধক নেয়া জমিতে চাষের কাজ করে জীবন অতিবাহিত করেছেন এই ইবেদুন বিবি। কঠিন দারিদ্র্য এবং জীবনের কঠোর সংগ্রাম তাঁকে সমাজের প্রতি তার দায়বদ্ধতা থেকে পিছিয়ে আনতে পারেনি। ছয় ছেলে- মেয়ে এবং দশ নাতি- নাতনির বিরাট এক সংসার সামলিয়েও সমাজের নানা ধরণের জনমুখী কাজ তিনি অবিচল নিষ্ঠার সাথে করে গেছেন। প্রচলিত অর্থে প্রায় অশিক্ষিত অথচ প্রবলভাবে সচেতন, সমাজ দরদী এই মানুষটির মৃত্যুতে নিজেরা করি এবং ভূমিহীন সমিতি গভীরভাবে শোকার্ত ও বেদনাহত। তার সংগ্রামের সাথী ও সহকর্মীরা তার আদর্শ এবং অসম্পূর্ণ কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সংকল্পে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থেকে মানুষের অধিকারের পতাকা সমুন্নত রাখতে কাজ করে যাবেন এটাই আশার কথা।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close