আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
উন্নয়নে নারীসারাদেশ

লন্ডনে ওয়াসফিয়া নাজরীনের মতবিনিময়

IMG_5294।। নিলুফা হাসান, যুক্তরাজ্য ।।
ওয়াসফিয়া নাজরীনই হ”েছন বাংলাদেশের একমাত্র পর্বতারোহী যিনি পৃথিবীর সাতটি মহাদেশের সাতটি সর্বো”চ পর্বত শৃঙ্গে (সেভেন সামিটস) আরোহনের মিশন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের চল্লিশ বছরে অর্জিত নারীদের অগ্রগতি ও সাফল্যকে সারা বিশ্বে তুলে ধরার জন্যই ওয়াসফিয়া এই অভিযান শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে তিনি বিশ্বের সর্বো”চ পর্বতশৃঙ্গ হিমালয় পর্বতমালার এভারেস্টসহ পাঁচটি মহাদেশের পর্বতের শীর্ষ চূড়ায় উঠে লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত এবং দু‘লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়েছেন।

যুক্তরাজ্য সফররত ওয়াসফিয়া নাজরীনের সম্মানে লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রাঞ্জল ভাষায় পর্বতারোহনের লোমহর্ষক কাহিনী থেকে শরু করে মধুর স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে বাংলাদেশের নারীর ক্ষমতায়নে দৃঢ় প্রত্যয়ী ওয়াসফিয়া জানান যে, এই লক্ষ্য অর্জিত করার জন্যই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন সেভেন সামিটস ফাউন্ডেশন। তিনি জানান যে, এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অবহেলিত কিশোরী ও মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড়ানো ও তাদেরকে খেলাধুলায় উৎসাহিত করার জন্য বিভিন্ন কাজ করেছেন। মানবাধিকার কর্মী হিসেবেও তিনি তার ভূমিকা পালন করছেন।
পূর্ব লন্ডনের ব্রীকলেনে সেলিবারিটি শেফ টমি মিয়ার আয়োজনে প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি আমিরুল ইসলাম চৌধুরীর সভাপতিত্বে এই অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন প্রেস ক্লা্েবর সাধারন সম্পাদক এমদাদুল হক চৌধুরী। মতবিনিময়কালে ওয়াসফিয়া তাঁর শৈশবে বেড়ে উঠা, প্রেরণা ও অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন।

১৯১১ সালের ২ অক্টোবর আফ্রিকা মহাদেশের সর্বো”চ পর্বত শৃঙ্গ কিলিমানজারো বিজয়ের পর একে একে ওয়াসফিয়া ২০১১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ আমেরিকার সাউথ একোনকাগুয়া, ২০১২ সালের ২৬ মে এশিয়া মহাদেশের হিমালয় পর্বতমালার এভারেস্ট, ২০১৩ সালের ৪ জানুয়ারী এন্টারটিকা মহাদেশের মাউন্ট ভিনসন এবং ২০১৩ সালের ২৮ মার্চ ইউরোপ মহাদেশের মাউন্ট এলব্র্রাস পর্বত শৃঙ্গে আরোহন করেন। বর্তমানে তিনি উত্তর আমেরিকা মহাদেশের ম্যাককেনলী এবং ওসিনিয়া মহাদেশের পানক্যাক জায়ায় আরোহনের প্র¯‘তি গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশের পর্বতারোহীদের মধ্যে ওয়াসফিয়াই হ”েছন একমাত্র পর্বতারোহী যিনি সেভেন সামিটস বিজয়ী হতে যা”েছন।
উল্লেখ্য, ওয়াসফিয়ার পূর্বে বাংলাদেশের আরও তিন পর্বতারোহী- মুসা ইব্রাহীম (২৩ মে ২০১০), এম এ মুহিত (২৯ মে ২০১১) এবং নিশাত মজুমদার (১৯শে মে ২০১২) এভারেস্টের চূড়ায় আরোহন করেন। ওয়াসফিয়ার পর বাংলাদেশের পঞ্চম পর্বতারোহী মোহাম্মদ খালেদ হোসেন (২১ মে ২০১৩) এভারেস্টে আরোহন করেন। কিš‘ এভারেস্ট থেকে অবতরণের সময় তিনি দূর্ভাগ্যজনক ভাবে নিহত হন। উইকিপেডিয়ার সূত্র অনুযায়ী এভারেস্ট চূড়ায় আরোহন করতে গিয়ে এপর্যন্ত দুই শতাধিক পর্বতারোহী নিহত হয়েছেন। ওয়াসফিয়াও জানান যে, তিনি তার অভিযানকালে ১৩টি মৃতদেহ দেখতে পেয়েছেন।

বিদেশে পড়াশুনা করলেও তাঁর শৈশব কেটেছে চট্টগ্রামে, সেখানকার পাহাড় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাঁকে প্রকৃতির কাছাকাছি যেতে আকৃষ্ট করেছে। ছোটবেলায় মা-বাবার বি”েছদও তাঁর মনে দাগ কেটেছে এবং তখন থেকেই ওয়াসফিয়ার মনে নিজের পায়ে দাঁড়ানো, সমাজের বঞ্চিতদের জন্য কিছু করার আগ্রহ বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া মেয়েদের জন্য কাজ করার ই”েছ জেগেছে। বর্তমানে তিনি ব্র্যাকের শুভে”ছা দূত হয়ে মেয়েদের উন্নয়নের জন্য বিভিন্নভাবে কাজ করছেন।
ঊণত্রিশ বছর বয়সী ওয়াসফিয়া মুক্তিযুদ্ধ স্বচক্ষে না দেখলেও তিনি বলেন, এই ধরনের দুঃসাহসিক কাজে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধই তাঁর প্রেরণা, শক্তি এবং সাহস যুগিয়েছে। বাংলাদেশের চল্লিশ বছর পূর্তিতে তাঁর ভিশন ছিল যে, প্রতিটা মহাদেশের সর্বো”চ শৃঙ্গে উঠবেন, বাংলাদেশের মেয়ে হিসেবে বাংলাদেশের নারীদের অগ্রগতির কথা, অর্জনের কথা ও উন্নতির কথা বলবেন, বাংলাদেশ যে পিছিয়ে নেই তা বিশ্ববাসীকে জানাবেন। ২০১১ সালের বিজয় দিবস ১৬ই ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশের প্রথম অভিযাত্রী হিসেবে দক্ষিণ আমেরিকার সর্বো”চ পর্বতশৃঙ্গ একোণকাগুয়ায় আরোহন করেন।
২০১২ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে ২৬ শে মার্চ ওয়াসফিয়া এভারেস্ট শৃঙ্গের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন এবং দু‘ মাস যাত্রার পর ২৬শে মে তিনি বিশ্বের সর্বো”চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্টে উঠেন।

অভিযাত্রার কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে ওয়াসফিয়া বলেন, এক একটি পর্বতের চূড়ায় উঠতে এক থেকে দু‘মাস সময় লেগে যায়। তিনি বলেন, অনেক কষ্ট, ক্লান্তি, ঝড় ঝাপটা পেরিয়ে ডেথ জোন অতিক্রম করে যখন পর্বতের চূড়ায় পৌঁছে বাংলাদেশের পতাকা মেলে ধরি তখন আনন্দে বুক ভরে যায়, সকল ক্লান্তি মুছে যায়। তাঁর সবচেয়ে মধুর অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা রাতের বেলায় পর্বতে আরোহন করতেন এবং দিনের বেলায় ঘুমাতেন। তিনি বলেন, যখন এভারেস্টে পৌঁছলাম, তখন দেখি যে অনেক নীচে সূর্যোদয় হ”েছ। এটাই ছিল সবচেয়ে আনন্দের ঘটনা। তিনি বলেন, প্রকৃতির ঐ সৌন্দর্যে অভিভূূত হয়ে পরি, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায়না। এন্টারটিকার মাউন্ট ভিনসন অভিযাত্রাকে তিনি তাঁর সবচেয়ে কঠিন অভিযান বলে উল্লেখ করেছেন। সেখানে অনেক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছিলেন তিনি।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন যে, যারা পর্বত চূড়ায় উঠে নিজ দেশের পতাকা উড়ান, তারা সবাই নামার সময় ঐ পতাকা নিয়ে আসেন। তিনি জানান যে, এভারেস্টে তিনি বাংলাদেশের যে পতাকাটি উড়িয়েছিলেন, ঐটি তিনি নারী মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবিকে দিয়েছেন। এছাড়া এভারেস্ট বিজয়ের পর বাংলাদেশের নারীমুক্তির জন্য যারা কাজ করছেন তাদের জন্য ওয়াসফিয়া তার পা দুটিকে উৎসর্গ করেছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে ওয়াসফিয়া বলেন, বাংলাদেশ থেকে ফান্ড পাওয়া দুষ্কর এবং অন্যদিকে তিনি সরকারী পৃষ্ঠপোষকতাও নিতে চান না। আগামী ১৬ই ফেব্রুয়ারী ইস্ট লন্ডনের রিচমিক সেন্টারে ওয়াসফিয়া নাজরীনের ‘সেভেন সামিটস‘ ফাউন্ডেশনের জন্য এক ফান্ড রাইজিং অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ওয়াসফিয়া তাঁর সেভেন সামিটস সফল করার জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন। আমরা তাঁর সাফল্য কামনা করছি।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close