আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
কিশোরীর কথা

সমাজকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে যারা

নিজের কর্মদক্ষতা ও সৃজনশীল চিন্তার সমন্বয়ে গড়ে তুলেছেন নিজেদের উদ্যোগগুলো। যেগুলো ভূমিকা রাখছে সামাজিক নানা পরিবর্তনের লক্ষ্যে। নতুন প্রজন্মের এমনই কয়েকজনের গল্প জানাব এবার।

মনি বেগম, গন্তব্য জাতিসংঘ
‘সত্যি কথা বলতে কি, আমি কোনোদিন ঢাকা যাওয়ার স্বপ্নই দেখিনি। সেখানে নিউইয়র্ক! জাতিসংঘে ভাষণ! সবকিছুই আজ স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হয়…’ কথাগুলো মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার মনি বেগমের। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মনি বেগম ২০১৫ সালের জাতিসংঘের ৭০তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশ থেকে একমাত্র শিশু প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। মনি বেগম মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের ঘরগাঁও গ্রামের সাধারণ ঘরের মেয়ে। দিনমজুর পিতা মরম আলী ও গৃহিণী মা হাওয়া বেগমের ৬ সন্তানের মধ্যে মনি সবার ছোট। মনি বেগমের স্বপ্ন আকাশে ওড়ার। বড় হয়ে তাই সে পাইলট হতে চায়। মনি জানায়, সেভ দ্য চিলড্রেনের আর্থিক সহযোগিতায় ঢাকা আহছানিয়া মিশন দেশব্যাপী ‘এভরিওয়ান’ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে। তাতে বাল্যবিবাহ, শিশুদের ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া প্রতিরোধ এবং মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে মনি তিন মাসের এক প্রশিক্ষণে অংশ নেয়। প্রশিক্ষণ শেষে মনি ইয়ুথ লিডার মনোনীত হয়। পরবর্তী সময়ে ঢাকায় পরীক্ষা দিয়ে মনি সারা দেশের মধ্যে সেরা ফল করে এবং নির্বাচিত হয় জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের জন্য বাংলাদেশি প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে মনি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বিশ্ব শিশু অধিকার সম্মেলনে বক্তব্য দেয়। এ ছাড়া সে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুনের সঙ্গে সাক্ষাত্ করার সুযোগ পায়। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন ছাড়াও জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি মিস মার্থা সেন্টোন পেইস, কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অনেকের সঙ্গে মতবিনিময় করার সুযোগ পায় মনি। মনি দেশে ফিরে লেখাপড়ার পাশাপাশি সমাজ সচেতনতামূলক কাজ অব্যাহত রেখেছে।

জান্নাতুল নাঈম প্রীতি
লেখালেখি তার পরিবর্তনের হাতিয়ার
আমি মূলত লেখালেখি করি। একজন লেখক হিসেবে সমাজের প্রতি যে দায়বদ্ধতা বোধ করি সেখান থেকেই মূলত লেখালেখির শুরু। গত বছর ইয়াং বাংলা এবং সিআরআইয়ের উদ্যোগে জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়। সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন বয়সের তরুণদের অংশগ্রহণে এটি একটি প্লাটফর্ম যেখানে দশটি ক্যাটাগরিতে মোট ত্রিশ জনকে পুরস্কৃত করা হয়। সেখানে সাহিত্য ও শিল্পকলায় অবদান রাখার জন্য আমি পুরস্কার পাই। সেখানেই এই আসরের অন্যতম স্পন্সর মাইক্রোসফট থেকে বাংলাদেশে নিযুক্ত মাইক্রোসফট প্রধান সোনিয়া বশির কবির ঘোষণা দেন—এই আসরের কয়েকজন তরুণ-তরুণীকে মাইক্রোসফট বাংলাদেশের ব্র্যান্ড প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত করা হবে। যাদের কাজ হবে উদ্যোক্তা হিসেবে মাইক্রোসফটকে সঙ্গে নিয়ে পথচলা। পাশাপাশি থাকবে ব্যবসার ক্ষেত্রে মাইক্রোসফটের সুযোগ-সুবিধা। এর ধারাবাহিকতায় মাইক্রোসফটের সঙ্গে যাত্রার সূচনা। একটি সৃজনশীলতার চর্চাবান সমাজ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোক্তা হিসেবে যে সমস্ত উপাদান দরকার হয় তার সবকিছুই মাইক্রোসফট থেকে আমি পাচ্ছি। পাশাপাশি পাচ্ছি স্বনির্ভর হিসেবে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে নিজ উদ্যোগে কর্মক্ষেত্র সৃষ্টির জন্য নানা ধরনের টেকনিক্যাল সাপোর্ট। আমি বিশ্বাস করি, এদেশের তরুণরা অত্যন্ত মেধাবী। আমি বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থী। এ কারণেই বর্তমানে আমার লক্ষ্য একটি অনলাইনভিত্তিক ই-শপ তৈরি করা। যেখানে হাতে আঁকা ছবি, আমার লেখা বইসহ গিফটের একটি সৃজনশীল বাজার গড়ে উঠবে। হয়তো পরবর্তীতে আরও নতুন নতুন বিষয় সংযুক্ত হবে। এতে করে তরুণদের কর্মসংস্থানের একটি নতুন মাত্রা তৈরি হবে বলে আমার বিশ্বাস।

ফারজানা খান লিখন
নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করছেন
একজন নারীই পারে অন্য আরেক নারীর মর্ম যাতনা বুঝতে। একজন নারীই পারে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে তা অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে। বারবার হোঁচট খেয়ে সমাজের মূলস্রোত থেকে পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন খুলনার দৌলতপুর উপজেলার ফারজানা খান লিখন। নিজের উদ্যোগে বিনামূল্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে প্রান্তিক নারীদের আত্মনির্ভরশীলতার সোপানের সন্ধান দিচ্ছেন তিনি। নারীর জন্য সমতা আনায়নের সংগ্রামে লড়াই করতে শেখাচ্ছেন বুক চিতিয়ে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী লিখন নারীদের নিগ্রহ হতে দেখেছেন গ্রামে। মুখ লুকিয়ে কাঁদা অসহায় নারীদের জন্য কিছু করার প্রচেষ্টা থেকেই তিনি নারীর ক্ষমতায়ন ও কাজের সুযোগ সৃষ্টির জন্য কিছু করার কথা ভাবেন। এইজন্য মূলত নিজের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন বিনামূল্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। নিজের কলেজের গেটের সামনে একটা দোকান ভাড়া নিয়ে বিনামূল্যে নারীদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেন লিখন। প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য শর্ত হিসেবে রাখেন যে, তারা অন্য কয়েকজন নারীকেও বিনামূল্যে কম্পিউটার শিক্ষা দেবেন। এভাবে আস্তে আস্তে স্থানীয় নারীরা ব্যাপকভাবে কম্পিউটার শিক্ষা পেতে থাকেন। এই শুভ উদ্যোগে শামিল হন আরও কয়েকজন। সবাই মিলে গড়ে তোলেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ডিজিটাল সেন্টার’। মূলত ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের সাথে সঙ্গতি রেখে এই সংগঠনটি কাজ করে যাচ্ছে। লিখন ও তার সংগঠন ডিজিটাল সেন্টার প্রমাণ করেছে নারীদের সবচেয়ে বড় সহায় হতে পারে একজন নারীই।

শাহরিয়ার জাহান রিপা
নারীদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে
বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার জাহান রিপা পড়াশোনার পাশাপাশি চেয়েছিলেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে। উচ্চশিক্ষার সাথে সাথে আত্মনির্ভরশীলতার সুলুক সন্ধান করতে গিয়ে তিনি কারিগরি প্রশিক্ষণ নেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে। তারপর নিজের ব্যবসা শুরু করেন। স্বনির্ভরতার পাশাপাশি তিনি বেশ কয়েকজন নারীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন। খুব একটা সচ্ছল পরিবার থেকে আসেননি রিপা। সেজন্য পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছেটা ছিল সবসময়। সেই তাগিদে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ব্লক বাটিক, স্ক্রিন প্রিন্টিং, পোশাক তৈরি, ফুড ও ফুড প্রসেসিং, ব্যাগ তৈরি ইত্যাদি কারিগরি ব্যাপারে প্রশিক্ষণ নেন। তারপর পরিবার ও নিজের হাত খরচের জমানো টাকা দিয়ে শুরু করেন ব্যবসা। পরিশ্রমী রিপার সাফল্য আসে গল্পের মতো করেই। আস্তে আস্তে গ্রাহকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেন তিনি। ধীরে ধীরে বাড়ে ব্যবসার পরিসর। ব্যবসার ব্যস্ততায় রিপা তার প্রতিষ্ঠানের জন্য কর্মী নিয়োগ করেন। তার প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাজ করছেন ৫/৬ জন নারী। তাদের নিজ হাতে শিখিয়ে পড়িয়ে নিয়েছেন রিপা। বার্থডে কেক, বিস্কুট, ক্রিমরোল, স্যান্ডউইচ, আচার ইত্যাদি তৈরি করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও দোকানে বিক্রি করেন তারা। এ ছাড়া থ্রি পিস, শাড়ি, বেডশিট, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, শাল, ব্যাগ ইত্যাদি তৈরি করেও বিক্রি করেন। তাদের পণ্য বাজারে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। পড়াশোনার পাশাপাশি এভাবে একজন তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি নিজের ও পরিবারের স্বনির্ভরতা আনয়ন করে সমাজের অন্যান্য বেকার তরুণ-তরুণীর সামনে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

সৌজন্যে : ইত্তেফাক

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close