আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
আন্তর্জাতিক

ভারতীয় কিশোরীদের নারকীয় ‘বন্দী’ জীবন

ওমেন আই :
তের বছরের লক্ষীকে যখন ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির এক বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হল তখনও সে ভয়ে কাঁপছিল। ভীত সন্ত্রস্ত এই কিশোরীটি নিখোঁজ হয়েছিল চার বছর আগে।পাচারকারীরা তাকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এআসামের এক গ্রাম থেকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে এসছিল। তারা তাকে দিল্লির এক বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজে লাগিয়ে দেয়। শুরু হয় তার নারকীয় জীবন।

সেখানে সে রান্না, ঘর-বাড়ি পরিষ্কার এবং বাচ্চাদের খেয়াল রাখা থেকে শুরু করে সংসারের সব কাজই করত। শুধু কাজ আর কাজ। কোনরকম অবসর মিলত না। এরওপর কাজে কোনো রকম ভুল হলে শুরু হত মার। কাজের ফাকে লক্ষীর এক দণ্ড জিরোবার ফুসরৎ নেয়ার জো ছিল না। ওকে বসা দেখলেই গৃহকর্ত্রী বকাবকি শুরু করত। পুলিশের কাছে সে জানায়,‘ আমাকে কখনোই বাড়ির বাইরে যেতে দেয়া হত না। আমি যে দিল্লিতে রয়েছি এটাও জানতাম না। ওরা আমাকে বলত, এটা নাকি মাদ্রাজ।’

এই বাসায় কাজ নেয়ার আগে ধর্ষণের শিকার হয় লক্ষী, যারা তাকে অপহরণ করেছিল তাদের হাতেই। ওই ব্যক্তিরা হুমকি দিয়েছিল, যদি লক্ষ্মী এ কথা কাউকে জানায়, তাহলে গ্রামে ফিরে তারা সবাইকে এ কথা বলে দেবে। তখন লক্ষ্মীর আর মানসম্মান বলে কিছু থাকবে না। এরপর তাকে বাসাবাড়ির কাজে লাগিয়ে দেয় তারা। তবে এ কাজের জন্য কোনো পারিশ্রমিক পেত না সে। দালালরা তার বেতন তুলে নিত।

পোশাক আর মিষ্টি দেখিয়ে প্রতারণা

লক্ষ্মীকে ফিরে পাওয়ার কথা শুনে তার চাচা কিছুটা ভারমুক্ত হয়েছেন। আসামের এক চা বাগানে কর্মরত ওই চাচা জানায়, খুব ছোটবেলায় লক্ষীর বাবা-মা মারা যান।দাদীর যত্নেই বেড়ে ওঠে সে। কিন্তু লক্ষ্মীর নিখোঁজ হওয়ার শোকে অসুস্থ হয়ে পড়েন তার বুড়ি দাদি। কিন্তু ভাইঝিকে খুঁজে বের করার মতো যথেষ্ট পয়সা ছিল না তার।

তার চাচা বিবিসি প্রতিনিধি শিল্পা খান্নাকে বলেন,‘ আমাদের গ্রামের বাবা-মায়েরা চা বাগানে কাজে চলে যাওয়ার পর দালালরা আসে। তারা আমাদের বাচ্চাদের নতুন পোশাক আর মিষ্টির লোভ দেখায়। অবুঝ শিশুরা কিছু না বুঝেই তাদের ফাঁদে পা দেয় এবং হারিয়ে যায়।’.
ভারতে লক্ষ্মী বা তার পরিবার একজন নয়-অসংখ্য। দেশটিতে প্রতি আট মিনিট অন্তর একজন শিশু হারিয়ে যায় এবং এদের অর্ধেককেই আর ফিরে পাওয়া যায় না।

এসব অপহৃত শিশুদেরকে অনেক সময় জোর করে পতিতাবৃত্তির মত জঘন্য পেশায় ঠেলে দেয়া হয়।তবে ইদানীং অপহৃত শিশুদের বাসাবাড়িতে কাজে লাগানোর প্রবণতা বেড়েছে।কারণ এসব কিশোরীরা চার দেয়ালের মাঝে বন্দি থাকায় একাজে দালালদের পুলিশের হাতে ধরা পড়ার ঝুকি কম। ভারত সরকারের ভাষ্যমতে, পাঁচ লাখ শিশু গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে।

মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চাহিদা

দিল্লির উত্তর অংশে ‘বাচপান বাঁচাও আন্দোলন’ নামে একটি পুর্বাসন সংস্থায় নিখোঁজ শিশুদের খোঁজ নিতে আসেন অনেক পরিবার। তারা সবাই আসামের চা বাগানের শ্রমিক।তারা এসেছে আসামের সামের রংপুরা এলাকা থেকে। এ এলাকায় শিশুদের হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা বেশি হয়ে থাকে। তারা জানায়, গত তিন থেকে চার বছরে ১৬টি মেয়ে হারিয়ে গেছে।
বাচপান বাঁচাও আন্দোলনের প্রধান কৈলাস সত্যাত্রি বলেন, ‘গৃহকর্মে শিশুশ্রম বাড়ার জন্য মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চাহিদার একটি ভূমিকা আছে। তারা সস্তায় শ্রম খোঁজে। আর এই সুযোগ নিয়ে পাচারকারীরা ভারতের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে নানা কৌশলে শিশুদের নিয়ে আসে এবং বড় বড় শহরগুলোতে পাচার করে।’

নারকীয় জীবন

চলতি মাসে সুমিলা মুণ্ডে নামের এক ১৮ বছরের কিশোরীকে উদ্ধার করা হয়েছে। তার সাহায্যে চিহ্ণিত বেশ কয়েকজন পাচারকারীকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। উদ্ধার পাওয়ার পরও তার ভয় কাটে না। গৃহকর্ত্রীর অত্যাচারের কথা মনে হলে এখনও সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। সে বলে,‘ আমি যে কষ্ট আর যন্ত্রণা সহ্য আর কারো জীবনে এমন অবস্থা হউক আমি তা চাইনা। ওই নরক থেকে আমি বেরিয়ে এসেছি এটা ভাবলেই অবাক লাগে। আমার লেখাপড়ার খুব শখ ছিল। আমি আবার স্কুলে যাব।’

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি শিশু শ্রমিক রয়েছে ভারতে। যদিও আইনগতভাবে দেশটিতে শিশু শ্রম নিষিদ্ধ। তবে এই আইনের কার্যকারিতা খুব একটা নেই। ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের শ্রম শিশুশ্রম আইনে নিষিদ্ধ। আবার দেশটিতে ১৮ বছরের কম বয়সীদের শিশু হিসেবে ধরা হয়।

অসহায় সরকার

শিশুদের অধিকার রক্ষায় সরকারের ব্যর্থতার কথা এখন সর্বজনবিদিত। বিভিন্ন সরকারি সংস্থাগুলোও তাদের অসহায়ত্বের কথা স্বীকার করে নিয়েছে। এ ব্যাপারে শিশু অধিকার রক্ষায় জাতীয় কমিশনের প্রধান কুশাল সিং বলেন, ‘এটি খুবই দুঃখজনক। শিশুশ্রম-সংক্রান্ত আইন ও নীতিগুলো একেবারে সেকেলে।’ আইনগুলোর প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হলে অপহূত বা পাচার হওয়া শিশুদের সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি প্রচলিত আইনের অসঙ্গতি তুলে ধরে বলেন,‘ আইনে বলা হয়েছে ১৪ বছরের নিচে যাদের বয়স তারা বিপজ্জনক পেশায় নিযুক্ত করা যাবে না। তাহলে যেসব পেশা বিপজ্জনক নয়, সেখানে কি একটা দু বছরের শিশু কাজ করতে পারবে? কাজেই এটি একটি পশ্চাৎমুখী আইন এবং এর সংশোধন হওেয়া প্রয়োজন। কিন্তু এই সংশোধনীর প্রস্তাবটি এখন পার্লামেন্টে পাস হওয়ার জন্য ঝুলে আছে।আর এটা যে আরো দীর্ঘদিন ধরে ঝুলেই থাকবে এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।’

এখন এ আইনটি সংশোধিত হলে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে লড়াই করাটা সামাজিক সংগঠনগুলোর জন্য কিছুটা সহজ হবে। কিন্তু এতে দরিদ্র পরিবারগুলোর আতঙ্ক যে কাটবে না এটি প্রায় নিশ্চিত। তখনও তারা তাদের কিশোরী কন্যাটির হঠাৎ করে হারিয়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটাবেন।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close