আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সারাদেশ

স্কুল পড়ুয়াদের সচেতন করছেন গণধর্ষণের শিকার সুজেট

ওমেন আই :
ভারতে কলকাতার পার্ক স্ট্রিটে গণধর্ষণের শিকার হওয়া সুজেট জর্ডন এখন স্কুলের পড়ুয়াদের শেখাচ্ছেন কী করে তারা যৌন নিপীড়ন থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারবে।

গুজরাটে ভালসাদের অতুল বিদ্যালয় নামের একটি স্কুলে প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে বড় ছেলে মেয়েদের কাছে নিজের লড়াইয়ের বর্ণনা দিয়ে এসেছেন মিজ. জর্ডন।
স্কুল কর্তৃপক্ষ ও সুজেট জর্ডন বলছেন, ধর্ষণসহ মহিলা ও শিশুদের ওপরে যে ধরণের অত্যাচার হয়, সেইসব লুকিয়ে না রেখে, তাদের সঙ্গে খোলা মনে আলোচনা করলেই তারা আরো বেশি নিরাপদ থাকবে।
স্কুলের অভিভাবকরাও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।

“সারা পৃথিবীতেই নারী ও শিশুদের ওপরে যৌন নিপীড়নের ঘটনা বেড়ে চলেছে। স্কুলটির প্রধান ভেবেছেন আমি যেভাবে হার না মেনে লড়াই করে গেছি আমার ওপরে অত্যাচারের পরেও, সেটা ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা জানতে পারলে তারাও লড়াই করতে উৎসাহ পাবে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন সুজেট জর্ডন।

গুজরাটের ভালসাদে অবস্থিত ওই স্কুলটির প্রিন্সিপাল একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসার – কর্ণেল শেখর।
“আমরা চেয়েছিলাম সুজেট জর্ডনের মতো সাংঘাতিক সাহসের অধিকারী কেউ আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে বোঝান যে কীভাবে ভারতের মতো একটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মহিলাদের কী যন্ত্রনা সহ্য করতে হয় আর কীভাবে স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয় লড়াই করতে হয়,” বলছিলেন কর্ণেল শেখর।

ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক আর অভিভাবকদের সঙ্গে সারাদিনই আলোচনা চালিয়েছেন মিজ. জর্ডন। সঙ্গে ছিল তাঁর নিজের দুই মেয়েও।
কী জানতে চাইল ছোট বাচ্চারা?

জবাবে মিজ জর্ডন বলছিলেন, “ওরা আমার কাছে জানতে চেয়েছিল আমি কী করে প্রায় একা লড়াই করলাম, সেই শক্তি কীভাবে পেলাম বা যখন মন্ত্রী বা নেতারা আমার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তখন আমার মানসিক অবস্থা কী হয়েছিল .. এই সব।“

ওই স্কুলেই নবম আর চতুর্থ শ্রেণীর দুই ছাত্রীর মা মিমি ম্যাথুও অংশ নিয়েছিলেন সুজেট জর্ডনের সঙ্গে আলাপচারিতায়।

মিসেস ম্যাথু বলছিলেন, “সেদিনের আলোচনার পরে আমাদের চোখ খুলে গেছে। চুপ করে মেনে নেওয়ায় কোনও লাভ নেই – ছোট থেকেই লড়াইয়ের মানসিকতা তৈরি করতে হবে – এটা পরিস্কার। “

তিনি বলছিলেন সুরক্ষার ঘেরাটোপের মধ্যে থাকতে অভ্যস্ত মেয়েরা। কিন্তু মিজ. জর্ডনের ঘটনাটা খুব কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি করে দিয়েছে তার দুই মেয়েকেই। এরকম ঘটনা যে হতে পারে, এটাই তাদের বিশ্বাস হচ্ছিল না। কিন্তু তারপরে বুঝেছে। আর মিজ. জর্ডনের সাহসের কথা সবসময়ে বলছে দুজনেই।

“সেদিনের আলোচনার পরে আমাদের চোখ খুলে গেছে। চুপ করে মেনে নেওয়ায় কোনও লাভ নেই – ছোট থেকেই লড়াইয়ের মানসিকতা তৈরি করতে হবে – এটা পরিস্কার।”

প্রায় সব অভিভাবক বা স্কুলই যেখানে ‘ধর্ষণ’ বা ‘যৌন নিপীড়ন’ – এইসব কথাগুলো ছোটদের সামনে আলোচনা করতে লজ্জা পান, তখন এই স্কুলটিতে প্রাথমিক স্তরের ছেলে মেয়েদের নিপীড়ন, ‘ভাল ছোঁয়া’, ‘খারাপ ছোঁয়া’ র মতো বিষয় শেখানো হচ্ছে বা নবম শ্রেণীর দুটি মেয়েকে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে তাঁর গণধর্ষণের ঘটনা নিয়ে একটা তথ্যচিত্র তৈরি করতে- এটা খুবই আশ্চর্য করেছে মিজ. জর্ডনকে।

“আজ আমি যখন আপনার সঙ্গে কথা বলছি, তখন প্রথম শ্রেণীর বাচ্চাদের আমরা শেখাচ্ছি ‘ভাল ছোঁয়া’, ‘খারাপ ছোঁয়া’ কীভাবে চিনে নিতে হবে,” বলছিলেন স্কুলটির প্রধান।

আর সুজেট জর্ডানের কথায়, স্কুলে বিতর্ক শেখানো হয়, ভাষণ দেওয়া শেখানো হয়, কিন্তু যে পরিবেশে শিশুদের থাকতে হবে বা বাচ্চা ছেলে বা বাচ্চা মেয়েরা কীধরনের নিপীড়নের শিকার হতে পারে, সে বিষয়ে কোনও ধারনাই দেওয়া হয় না।

“শুনতে খারাপ লাগলেও বাচ্চাদের সঙ্গে এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতেই হবে। বলতে হবে চারদিকে কী হচ্ছে। ওদের এভাবেই আমরা সুরক্ষিত রাখতে পারব, বিষয়গুলো এড়িয়ে গিয়ে নয়,” বলছিলেন সুজেট জর্ডন।

স্কুলটির আরেক অভিভাবক – পেশায় শিক্ষক রভি নায়ার অবশ্য বলছিলেন একাদশ শ্রেণীতে পাঠরত তাঁর ছেলের সঙ্গে সমাজে নিয়মিতভাবে চলতে থাকা এ ধরণের ঘটনাগুলো নিয়ে তিনি খোলাখুলিই আলোচনা করেন আগে থেকেই।

“ছেলে নিয়মিত সংবাদপত্র পড়ে আর টিভি-তে খবর দেখে। স্বাভাবিকভাবেই ধর্ষণ, যৌন হেনস্থার ঘটনাগুলো সে দেখে। ২০১২ সালে দিল্লি গণধর্ষণ হোক বা অন্য কোনও ঘটনা, সব কিছু নিয়েই আলোচনা হয় আমাদের মধ্যে। সমাজে কী ঘটছে সেটা তো লুকিয়ে রেখে লাভ নেই। না জানলে লড়াই করবে কী করে!” বলছিলেন পেশায় শিক্ষক রভি নায়ার।

অতুল বিদ্যালয় থেকে ঘুরে আসার পরে মিজ. জর্ডন চাইছেন অন্যান্য স্কুলের বাচ্চাদের কাছে নিজের লড়াইয়ের কাহিনী শোনাতে, যাতে তারা নিজেরাই নিপীড়ন থেকে বাঁচতে পারে।

২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে কলকাতার পার্কস্ট্রীটের একটি নাইট ক্লাব থেকে বেরিয়ে আসার পরে চলন্ত গাড়িতে মিস জর্ডনকে ধর্ষণ ক’রে ভোরের দিকে ফেলে দেওয়া হয় গাড়ি থেকে।

প্রথমে পুলিশ তাঁর অভিযোগ নিতেই অস্বীকার করেছিল। আর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন গোটা ঘটনাটা সাজানো। আরেক মন্ত্রী মিজ. জর্ডনের চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন।

পরে অবশ্য তদন্ত করে ধর্ষণ প্রমাণিত হয় আর অভিযুক্তদের মধ্যে একজন বাদে বাকী সবাইকে গ্রেপ্তারও করা হয়। কিন্তু সেই মামলা এখনও শেষ হয় নি। অপরাধীদের সাজাও হয় নি।

ঘটনার দেড় বছর বাদে উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার কামদুনিতে ঘটে যাওয়া একটি গণধর্ষণ ও খুনের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে পর্দার আড়াল থেকে প্রকাশ্যে আসেন মিজ. জর্ডন।

বিবিসিকে তিনি বলেছিলেন, “পার্ক স্ট্রিট ধর্ষণের শিকার – এই পরিচয়ে আর বাঁচতে চাই না। আমার নাম সুজেট জর্ডন। যারা ধর্ষণ করেছে – লজ্জা তাদের পাওয়ার কথা, আমি কেন লজ্জায় মুখ লুকিয়ে থাকব।“

ভারতে সেই প্রথম কোনও ধর্ষণের শিকার নারী নিজের পরিচয় প্রকাশ করলেন।

বিবিসি বাংলা, কলকাতা

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close