আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
মতামতস্লাইড

সেই কালরাত এখন গণহত্যা দিবস

নুসফাক মাহমুদ : আমাদের স্বাধীনতার বয়স ৪৬ বছর। আমাদের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা চালিয়েছিল ৪৬ বছর আগে। একাত্তরের একাত্তরের সেই নৃশংসতা স্মরণে অবশেষে কালরাত ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আর এজন্য বাংলাদেশকে ৪৬ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। চার দশকের বেশি সময় ধরে অনেক শহীদ পরিবার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালনকারী সংগঠন ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছিল। গত শতকে বিশ্বের ভয়াবহ গণহত্যাগুলোর অন্যতম ছিল বাংলাদেশের গণহত্যা। গণহত্যা দিবস ঘোষণার ফলে আগামী প্রজš§কে ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় দখলদার পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যার মত মর্মান্তিক ইতিহাসের সাথে পরিচিতি হওয়ার সুযোগ ঘটল। স্বাধীনতার জন্য পূর্ব পুরুষেরা হানাদার কীভাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিল, গণহত্যা দিবস পালনের মাধ্যমে নতুন প্রজš§কে সেই মর্মান্তিক ইতিহাস জানার এ সুযোগ করে দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর জাতীয় সংসদ স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
জাতীয় সংসদের বদন্যতায় জাতি এ বছর প্রথমবারের মতো ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস পালন করবে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতভাবে ২৫ মার্চের গণহত্যাকে স্মরণ করে দিনটিকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। একইসাথে আন্তর্জাতিকভাবেও এ দিবসের স্বীকৃতি আদায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারকে আহŸান জানানো হয়। গত ১১ মার্চ প্রস্তাবটি গ্রহণের সময় সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, শুধু ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ নয়, যুদ্ধ চলাকালে ও যুদ্ধের পরও গণহত্যা হয়েছিল। বাংলাদেশের এমন কোন গ্রাম নেই যেখানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মমতা ও গণহত্যার চিহ্ন নেই। তিনি বলেন, সেই গণহত্যার জন্য পাকিস্তানি বাহিনীর পাশাপাশি আলবদর, আলশামস রাজাকাররা সমান দায়ী। পশ্চিম পাকিস্তান সেনাবাহিনী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তিকামী নিরস্ত্র বাঙালির স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা দমন ও জাতিগত শুদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে “অপারেশন সার্চ লাইট” নামে লাগাতার গণহত্যা শুরু করেছিল ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ রাতে। তাদের আকস্মিক গণহত্যা শুরুর পরিপ্রেক্ষিতে বীর বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা করে। সে সময় হানাদার বাহিনীর ওই গণহত্যার খবর ও সচিত্র প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হয়।
গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত জাতীয় জীবনের এক নতুন ঐতিহাসিক অধ্যায় এবং মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদের আত্মার প্রতি জাতীয় দায়বদ্ধতা পূরণ। উলে­খ্য, ১৯৯৩ সালের ২৫ মার্চ শহীদজননী জাহানারা ইমাম গণহত্যা দিবস ঘোষণার দাবি জানিয়েছিলেন। তখন থেকেই একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি প্রতিবছর এই দাবি জানিয়ে আসছিল। দেরিতে হলেও গণহত্যা দিবস জাতীয়ভাবে পালনের সিদ্ধান্ত ৩০ লাখ শহীদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের পাশাপাশি বাংলাদেশের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন সহজ হবে।
মনে পড়ে, ৪৬ বছর আগে, ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে বাংলার বুকে নেমে আসে মৃত্যুর ঘনতমসা। রাতের নিñিদ্র অন্ধকারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পাশব শক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঢাকার নিরীহ নিরস্ত্র জনসাধারণের ওপর। মেশিনগান, মর্টার ও ট্যাংক নিয়ে অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে হানাদাররা নির্মমভাবে হত্যা করে ৫০ হাজারের বেশি ঘুমন্ত নাগরিককে। ঢাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে শুরু করে হত্যাযজ্ঞ। রাতে পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সেনাবাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রাবাস, শিক্ষক কোয়ার্টার, রাজারবাগ পুলিশলাইন, পিলখানা ইপিআর (বর্তমান বিজিবি) ব্যারাকসহ ঢাকার আবাসিক এলাকা এবং বস্তিবাসীর ওপর বর্বর আক্রমণ চালিয়ে সূচনা করে ৯ মাসব্যাপী ইতিহাসের নজিরবিহীন গণহত্যা, নারী ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ। শস্য-শ্যামল বাংলাদেশকে অগ্নিবলয়ে নিক্ষেপের মাধ্যমে শুরু হয় মানবতার বহ্ন্যুৎসব।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ অভিযান শুরুর জন্য রাত সাড়ে ১১টায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসে। ফার্মগেটের মুখে হানাদারবাহিনী প্রথম প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়। এখানে তারা লাউডস্পিকারে গোটা ঢাকায় কারফিউ জারির ঘোষণা দেয়। ছাত্র-জনতা সেনাবাহিনীকে বাধা দিলে তারা মেশিনগানের সাহায্যে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পাখির মতো গুলি করে হত্যা করে। ডিনামাইট দিয়ে ব্যারিকেড উড়িয়ে দিয়ে শহরে প্রবেশ করে। রাস্তায় রাস্তায় শুরু হয় খণ্ড যুদ্ধ। চারদিকে গুলি আর গোলার বিস্ফোরণ। মানুষের আর্তচিৎকার।
পাকিস্তানি সেনারা নিরস্ত্র বাঙালির বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ শুরু করলে সেই ভয়াল রাতে ঠিক ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তান শাসনের ম্যান্ডেড লাভকারী পূর্ব পাকিস্তানের নেতা ও বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কের নিজ বাসভবন থেকে ঘোষণা করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। মগবাজার ওয়্যারলেস স্টেশনের মাধ্যমে সেই ঘোষণা পাঠানো হয় চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছে। মগবাজার থেকে ঘোষণাটি চট্টগ্রামে প্রথমে রিসিভ করেন সলিমপুর ওয়্যারলেস কেন্দ্রের কর্মীরা। তারা সেটি নন্দনকানন টিঅ্যান্ডটি অফিসে পাঠালে সেখান থেকে জহুর আহমদ চৌধুরীর বাসভবনে পৌঁছানো হয়। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি ছিল নিম্নরূপÑ “পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আমাদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। ছাত্র-জনতা-পুলিশ-ইপিআর শত্র“র বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রাম শুরু হয়েছে। আমি ঘোষণা করছি, আজ থেকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। সর্বস্তরের নাগরিককে আমি আহŸান জানাচ্ছি, আপনারা যে যেখানে যে অবস্থাতেই থাকুন, যার যা আছে তাই নিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। সম্মিলিতভাবে শত্র“র মোকাবিলা করুন। আপনারা শেষ শত্র“টি দেশ থেকে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যান। আল­াহ আমাদের সহায়। জয় বাংলা।”
রাত ১২টার পর বঙ্গবন্ধুর স্বকণ্ঠে এ ঘোষণা বেতারে একবার শোনা যায়। পিলখানা ইপিআর (বিজিবি) ব্যারাক থেকেও বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার লিখিত বাণী ওয়্যারলেসের মাধ্যমে সারা দেশে বার্তা আকারে পাঠানো হয়। এ ওয়্যারলেস বার্তা চট্টগ্রাম ইপিআর সদর দফতরে পৌঁছায়। চট্টগ্রাম উপক‚লে নোঙর করা একটি বিদেশি জাহাজও এ বার্তা গ্রহণ করে। চট্টগ্রামে অবস্থানকারী আওয়ামী লীগের শ্রম সম্পাদক জহুর আহমদ চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার বাণী সাইক্লোস্টাইল করে রাতেই শহরবাসীর মধ্যে বিলির ব্যবস্থা করেন।
রাত ১টার দিকে সেনাবাহিনীর একটি দল ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের অদূরে শুক্রাবাদে ব্যারিকেডের মুখোমুখি হয়। এখানে প্রতিরোধ ব্যূহ ভেঙে হানাদাররা রাত দেড়টার দিকে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে আসে। সেনারা বাসভবনে এলোপাতাড়ি গুলি নিক্ষেপ শেষে ভেতরে প্রবেশ করে। বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে শেরেবাংলা নগরস্থ বাহিনীর দফতরে নিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে তাকে সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হয়। আটক রাখা হয় আদমজী কলেজের একটি কক্ষে।
মধ্যরাতেই সেনাবাহিনী পিলখানা, রাজারবাগ, নীলক্ষেতে ইকবাল হল, ঢাকা হল, জগন্নাথ হলসহ ছাত্রাবাসগুলো আক্রমণ করে। সেনারা পিলখানা ও নীলক্ষেতে প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়। রাত ২টার সময় হানাদারবাহিনী ট্যাংক, বাজুকা, মর্টারের মাধ্যমে নীলক্ষেতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা দখল করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক কৃতী অধ্যাপকসহ বিপুলসংখ্যক ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীকে হত্যা করে। প্রচণ্ড লড়াইয়ের পর পিলখানা ব্যারাকের পতন হয়। রাজারবাগ পুলিশ লাইন হামলাকারীদের কব্জায় আসে রাত ২টায়। সেনাবাহিনীর মেশিনগানের গুলিতে, ট্যাংক-মর্টারের গোলায়, আগুনের লেলিহান শিখা একদিকে নগরীর রাত হয়ে ওঠে বিভীষিকাময়, অপরদিকে এ রাতের ওপর উপ্ত হয় নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের। পরের দিন নবসূর্যোদয়ের মধ্য দিয়ে সূচিত হয় নতুন প্রতিজ্ঞার ইতিহাস, শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর হানাদারবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে সূচিত হয় বাঙালির বিজয়। বিশ্ব মানচিত্রে আবিভর্‚ত হয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close