আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সারাদেশস্লাইড

শেখ মুজিবুর রহমান এক মহান নেতা

খাদিজা খানম তাহমিনা

‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা
গৌরি মেঘনা বহমান
ততকাল রবে কীর্তি তোমার
শেখ মুজিবুর রহমান’
১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জে টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। বাবা শেখ লুৎফর রহমান, মা সাহেরা খাতুন। তখন কি তারা ভেবেছিলেন তাদের ঘর আলো করা এই শিশুটিই পাকিস্তানের দাসত্বের নিগূঢ় থেকে বাঙালি জাতিকে মুক্ত করে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করবেন? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক মহান নেতা, তার তুলনা তিনি নিজেই। যিনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থেকেও বলেছিলেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।’
খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন বাঙালির এই অবিসংবাদিত নেতা। তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকেও সরকারি বাসভবনে থাকতেন না। থাকতেন আটপৌরে ৩২ নম্বরের বাড়িটিতেই।
বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা :
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত। পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ছাত্র জনতা, পুলিশ, ইপিআরসহ হাজার হাজার মানুষকে হত্যা শুরু করে তারা। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহর রাত ১২.২০ মিনিট, গ্রেফতার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন পয়েন্টে টেলিফোন, টেলিগ্রাম, ইপিআরের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সেই স্বাধীনতার ঘোষণাটি আনুষ্ঠানিক স¤প্রচার করে।
ইংরেজিতে প্রচারিত ঘোষণাটির বাংলা অনুবাদ :
“সম্ভবত এটাই আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনসাধারণকে আহŸান জানাচ্ছি, তোমরা যে যেখানেই আছ এবং তোমাদের হাতে যাই আছে, তা নিয়েই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দখলদার সৈন্যবাহিনীকে প্রতিরোধ করতে হবে। যতক্ষণ না পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ ব্যক্তি বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত হবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না চ‚ড়ান্ত বিজয় অর্জিত হবে, তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।”
এবং এর সঙ্গে তিনি বাংলায় লিখিত ঘোষণাটিও পাঠানÑ
‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিত পিলখানায় ইপিআর ঘাঁটি ও রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে এবং শহরের লোকদের হত্যা করছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলছে। আমি বিশ্বের জাতিসমূহের কাছে সাহায্যের জন্য আবেদন করছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সঙ্গে মাতৃভূমি মুক্ত করার জন্য শত্রæদের সাথে যুদ্ধ করছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে আপনাদের কাছে আমার আবেদন ও আদেশ Ñ দেশকে স্বাধীন করার জন্য শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। আপনার পাশে এসে যুদ্ধ করার জন্য পুলিশ, ইপিআর বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও আনসারদের সাহায্য চান। কোন আপস নেই, জয় আমাদের হবেই। আমাদের পবিত্র মাতৃভূমি থেকে শেষ শত্রæকে বিতারিত করুন। সকল আওয়ামী লীগ নেতা, কর্মী এবং অন্যান্য ও দেশ প্রেমিক ও স্বাধীনতা প্রিয় লোকদের এ সংবাদ পৌঁছে দিন। আল্লাহ আপনাদের মঙ্গল করুন।’
জয় বাংলা।
শেখ মুজিবুর রহমান
২৬ মার্চ ১৯৭১।
টুঙ্গিপাড়ায় শেখ পরিবারের জন্ম নেয়া খোকা নামের শিশুটি কালের আবর্তে হয়ে উঠেছিলেন নির্যাতিত-নিপীড়িত বাঙালির মুক্তির দিশারী। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ এবং জনগণের প্রতি মমত্ববোধের কারণে পরিণত বয়সে তিনি হয়ে উঠেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। বিশ্ব ইতিহাসে ঠাঁই পেয়েছেন স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার হিসেবে।
শেখ মুজিবুর রহমান কিশোর বয়সেই জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। অষ্টম শ্রেণীতে ছাত্র থাকাকালীন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ থাকা তৎকালীন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। এ আন্দোলনে যোগ দেয়ার কারণে সেই ছাত্রাবস্থায় কারাবরণ করেন তিনি। মাধ্যমিকের পর উচ্চশিক্ষার জন্য চলে যান কলকাতায়। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ ভর্তি হোন। এ সময়ই তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শেরেবাংলা এ.কে. ফজলুল হকসহ রাজনৈতিক নেতাদের সান্বিধ্য লাভ করেন। কিছুদিনের মধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গনে ছাত্র-যুবনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর বাঙালিদের উপর পাকিস্তানের শোষণ নির্যাতন মেনে নেননি তিনি। তাই সংগ্রাম করে বাঙালিকে স্বাধীনতার মুক্তি মন্ত্রে দীক্ষিত করেন শেখ মুজিব। তার নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাকামী বাঙালির নয় মাস মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত হয়েছে মহান স্বাধীনতা। ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মদান এবং অসংখ্য মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জন হয় এই স্বাধীনতা। বিশ্ব মানচিত্রে স্থান পায় সার্বভৌম বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম ও দূরদর্শিতায় বিশ্ব মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে সার্বভৌম বাংলাদেশ।
বাংলা ও বাঙালির সঙ্গে বঙ্গবন্ধু হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ একটি নাম। বাঙালির হৃদয় স্পন্দনে চিরজাগ্রত থাকবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ নেই, তবুও তার নামের দেদীপ্যমান আলোক শিখার প্রখরতা বাড়ছে। সেই প্রখরতা নিয়েই বাঙালি জাতি আজ বাংলাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। বিশ্বের কোটি কোটি বাঙালির হৃদয়ের মণিকোঠায় অমলিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ আর মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার কারণে বাঙালি ‘জাতির জনক’ উপাধিতে ভূষিত হন বঙ্গবন্ধু। জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য বিংশ শতাব্দীতে যারা মহানায়ক হিসেবে স্বীকৃতি পান, তাদের মধ্যে অন্যতম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের জন্য বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ হলো একটি অন্যতম মাইলফলক। এই ভাষণের মাধ্যমে জাতির জনক স্বাধীনতার জন্য সমগ্র বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দিয়েছিলেন, যা ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। তার সেই ভাষণ আজও বাঙালিদের প্রাণে নতুন উদ্দীপনার সঞ্চার করে- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ স্বাধীনতা অর্জনের জন্য মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা, মুক্তিযুদ্ধের কৌশলগত দিক, রণকৌশলসহ সকল দিকনির্দেশনা জাতির জনক মুক্তিযুদ্ধ শুরুর ১৮ দিন আগেই বাঙালি জাতিকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। তারই ফলশ্রæতিতে ১৯৭১ সালের ২৫-২৬ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে বিডিআরের বেতার যন্ত্রের মাধ্যমে স্বাধীনতা ঘোঘণা দিয়েছিলেন।
২৬ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর দেয়া স্বাধীনতা ঘোষণা শুনেছেন পাকিস্তানী সেনা অফিসারসহ অনেকেই। ২৭ মার্চ ১৯৭১ তারিখে লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় শিরোনামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও তখন অর্থাৎ ২৭ মার্চ বিশ্বের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রধান শিরোনামে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছিল। ফিনান্সিয়াল টাইম পত্রিকায় ২৭ মার্চের হেড লাইন ছিল ‘সিভিল ওয়্যার আফটার ইস্ট পাকিস্তান ডিক্লিয়ার ইনডিপেন্ডেন্স।’

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close