আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সারাদেশস্লাইড

প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফর এবং

মাহমুদ হাসান : সাংবিধানিক হিসেব-নিকেশ অনুযায়ী আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ। সাধারণত দেশে নির্বাচনের রাজনীতি শুরু হলে তার সাথে হাত ধরে আসে ভারত প্রসঙ্গ। প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি তখন রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী বক্তৃতার খোরাক হয়ে ওঠে। তাকে নিয়ে কথামালা সাজান হয়। ভোটারের মন কাড়তে যে যেমন খুশি ভারত বিরোধিতার ঢোল বাজায়। তারা ভুলে যায়, একাত্তরে আমরা গণহত্যার শিকার হলে ভারত আমাদের রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছিল, তার দৃঢ় হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। তখন যদি সে আক্রান্ত পড়শিকে রক্ষা না করে পাশ ফিরে শুয়ে থাকত, জানি না ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয় আসত কিনা।

অপ্রিয় হলেও সত্যি, ভোটের আগে ভারত বিরোধিতা এদেশে দৃশ্যমান একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। অবশ্য সচেতন জনগণ অস্বস্তিকর এই বাস্তবতাটা বোঝে। তবে এটা যে বিরোধীদের অন্তরের নয়, মুখের কথা তা আমজনতা ভালো করেই জানে। কেন জানি এবার নির্বাচনের আগেভাগেই ভারত প্রসঙ্গ শুরু হয়ে গেছে। এটা কি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন ভারত সফরকে উপলক্ষ করে, নাকি ঘরে উঠেপড়া বিএনপিকে রাজনীতির ময়দানে নামিয়ে আনতে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক একটি কৌশল? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত শুক্রবার যুব মহিলা লীগের সম্মেলনে তার দলের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির সমালোচনা করতে গিয়ে ১৬ বছর আগে ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয় ও বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বে চারদলীয় জোটের বিজয়ের জন্য ভারতের গুপ্তচর সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইংÑ ‘র’-কে দায়ী করেন।
প্রচারণা আছে যে, সে-সময়কার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রির জন্য আমেরিকান কোম্পানির প্রস্তাব নাকচ করে দেন। তখন তৎকালীন বিরোধী নেত্রী বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাকে ক্ষমতায় ফিরতে সাহায্য করার বিনিময়ে গ্যাস বিক্রি করবেন বলে ভারত ও আমেরিকাকে মুচলেকা দেন। আর সেজন্য ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা ‘র’ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিলে শেখ হাসিনাকে নির্বাচনে হারানোর চক্রান্ত করে।
অবশ্য আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের সংসদ নির্বাচনে তার দলের হারের জন্য প্রথম থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে আসছিলেন। কিন্তু কখনই ভারতের কথা উচ্চারণ করেননি। তাকে ভোটে হারানোর জন্য অনেকবার বিল ক্লিনটন প্রশাসনকে অভিযোগ করলেও এই প্রথম ‘র’-কে দায়ী করলেন।
শেখ হাসিনা এমন এক সময় র-এর প্রসঙ্গ নিয়ে এলেন যখন বিএনপি শেখ হাসিনাকে ‘ভারতের দালাল’ হিসেবে তাদের পুরনো প্রচারণা শুরু করেছে। বিএনপি দাবি করেছে যে, প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন দিল্লি সফরে কী কী দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হতে চলেছে, তা প্রকাশ করতে হবে। রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা বলছেন, বিএনপির মুখ বন্ধ করতেই গ্যাস বিক্রির মুচলেকার সেই পুরনো কথা তুলেছেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী ওই সমাবেশে বলেন, সে-সময় ‘র’-এর এবং মার্কিন দূতাবাসের লোকেরা বনানীর হাওয়া ভবনে বসে থাকত। আর এখন ভারতের বিরুদ্ধে তারা কত কথা বলছে। তিনি বলেন, যারা কোনও দিন ভারতের কাছ থেকে কিছুই আদায় করার চেষ্টা করেনি তারাই আবার ভারত-বিরোধী কথা বলছে। খালেদা জিয়া গঙ্গার পানি আদায়ের জন্য ফারাক্কা পর্যন্ত লংমার্চ করেছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হয়ে ভারত গিয়ে গঙ্গার পানির কথা বলতে ভুলে যান তিনি। তাহলে দালালিটা করে কে?
এদিকে সাংবাদিকরা ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার কাছে ‘র’ সম্পর্কিত প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রসঙ্গে মন্তব্য চাইলে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। এ এছাড়াও সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিলি­ সফরের সময় বাংলাদেশ-ভারত সামরিক চুক্তি হবার সম্ভাবনা আছে কিনা সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। মিডিয়ার কাছ থেকেই যা জানছেন।
আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, আগামী ৭ থেকে ১০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নয়াদিলি­ সফরে যাচ্ছেন। ৮ এপ্রিল দিলি­তে শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরের ওপর ভারতের ইংরেজি দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য হিন্দু, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও হিন্দুস্তান টাইমস প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এসব প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বৃদ্ধি পেতে চলেছে। শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একাধিক সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে।
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র উদ্ধৃতি করে পত্রিকার প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, সহযোগিতার এ ক্ষেত্র বিস্তৃত করতে ভারত ৫০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব করবে। সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে যৌথ সহযোগিতায় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরি করা হবে। বাংলাদেশের জন্য সামরিক নৌযান নির্মাণেও ভারত সাহায্য করবে। এ ছাড়া দুই দেশের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ আরও নিবিড় এবং যৌথ মহড়ার পরিধি আরও বাড়ানো হবে।
তবে বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বলছেন, ভারতীয় নেতৃত্বকে বাংলাদেশ বারবার এই বার্তা পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় স্বার্থে তার সহযোগিতার ক্ষেত্র বিস্তার করবে। তবে এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে তুলনীয় হতে চায় না। এছাড়া অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাংলাদেশ এমন কোনো ধারণার সৃষ্টি করতে চায় না যে আমরা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর নির্ভরশীল হতে যাচ্ছি। বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ককে একমাত্রিক মনে করলে তা ভুল করা হবে।
এদিকে ভারত সফরের আগ দিয়ে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বিভিন্ন মহলে কৌত‚হলের সৃষ্টি করেছে। হাওয়া ভবনে ‘র’-এর লোকজন বসে থাকতেন প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সোমবার সংবাদ সম্মেলন করে তিনি বলেন, ‘পাবলিক পারসেপশন অন্য রকম আছে। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনেই নাকি তারা বসে থাকেন। যদি তা-ই হয়, এ ব্যাপারে তার ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত।’ বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন, বিএনপি যদি মুচলেকা দিয়ে থাকে নিশ্চয়ই কোনো কাগজে সই করেছিল। আপনি প্রধানমন্ত্রী, সে কাগজটি দেখান। আর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় র-কে জড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের পেছনে অন্য কারণ দেখছেন। তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা চীন থেকে সাবমেরিন কিনেছেন। ভারত জানতে চেয়েছে, এই সাবমেরিন আপনি কার বিরুদ্ধে ব্যবহার করবেন? ্উলে­খ্য, গত রোববার চট্টগ্রামে চীন থেকে কেনা দুটি সাবমেরিনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা কারও সঙ্গে কখনো কোনো যুদ্ধে লিপ্ত হতে চাই না। কিন্তু কেউ যদি আক্রমণ করে, তাহলে যেন তার সমুচিত জবাব দিতে পারি, সে প্রস্তুতি আমাদের থাকবে। সেদিকে লক্ষ রেখেই আমরা যা যা করণীয় তা করে যাচ্ছি।’
ভারতীয় পত্রিকাগুলো বাংলাদেশের চীনা ডুবোজাহাজ কেনা প্রসঙ্গে লিখেছে যে, গত নভেম্বরে চীন থেকে বাংলাদেশের দুটি সাবমেরিন কেনার ঘটনা ভারতের অনেককে চমকে দিয়েছে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে উদ্ধৃত করে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশকে ২৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়ার পর ঢাকার ওপর বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে দিলি­র। ভারত মহাসাগরে কৌশলগত সামরিক উপস্থিতির জন্য চীনের স্ট্রিং অব পার্লসে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছে বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close