আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
অর্থনীতিস্লাইড

অনলাইনে জমজমাট কেনাকাটা

রেজাউল করিম খোকন : সময়ের পালাবদলে সব কিছুতেই পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগছে। বদলে যাচ্ছে আমাদের জীবনযাপন। আধুনিক সময়ের প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে নিত্যনতুন অনুসঙ্গী সম্পৃক্ত হচ্ছে। যার প্রভাবে জীবনযাপন আরো ছন্দময়, গতিশীল এবং সহজ সাবলীল হয়ে উঠছে। সাবরিনা খানের কথাই ধরা যাক। কাজ করেন একটা প্রাইভেট ব্যাংকে। কাজের চাপ খুব বেশি। প্রতিদিন সকালে অফিসের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়ে বিকেলে বাসায় ফিরতে ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যায়। অফিসেই কেটে যায় দিনের পুরোটা সময়। এরপর যাওয়া এবং আসার সময় যানজটে আরো কয়েক ঘন্টা। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে নিজের পরিবারের দৈনন্দিন কাজকর্ম করেন, স্বামী ও ছেলে মেয়েকে সময় দেন। অফিস আর সাংসারিক ব্যস্ততায় সংসারের প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে পারেন না তিনি। সাবরিনা অনেক দিন ধরেই ভাবছিলেন, ঘরে বসে কীভাবে কেনাকাটা করবেন তিনি। কিছু কোনোভাবেই উপায় খুঁজে বের করতে পারছিলেন না। অফিস থেকে ঘরে ফেরার পর কিছুটা সময় ইন্টারনেটে ঘোরাঘুরি করা সাবরিনার অনেকদিনের শখ বা অভ্যাস। কয়েক বছর আগে একদিন অনলাইনে ই-শপিংয়ের খোঁজ পান তিনি। প্রথম দিকে শুধু অনলাইনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পোর্টালগুলোতে ঘোরাঘুরি করতেন। কোন জিনিসের দাম কত, মান কেমন, বিক্রেতা কোন এলাকার- এসব দেখতেন তিনি। কয়েক মাস আগে একদিন সাহস করে একটি মাইক্রোওয়েভ ওভেন কেনার জন্য বিক্রেতার মোবাইলে কল দেন। দামে বনে যাওয়ায় পরদিন অফিস থেকে ফেরার পথে ঐ বিক্রেতার নির্ধারিত ঠিকানায় গিয়ে ওভেনটি কিনে আনেন। এভাবেই সাবরিনা অনলাইনের মাধ্যমে কেনাকাটায় অভ্যস্ত হন। এরপর তিনি অনলাইনে নিজের জন্য জামা এবং ঘরের কয়েকটি প্রয়োজনীয় জিনিস কিনেছেন। সাবরিনার মতো এখন আরো অনেকেই অনলাইনে কেনাকাটায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। অনলাইনে কেনাকাটা তাদের জীবনকে সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করেছে। এমনিতে কোনো কিছু কেনাকাটা করতে হলে পুরো বাজার চষে ফেলতে হতো। এদোকান সেদোকান ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হতে হতো। এতে অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট হতো। আজ আমাদের এখানে অনলাইন বেচাকেনার প্রসার ঘটছে ক্রমশ। অনলাইন কেনাকাটার সুবিধাগুলো উপলব্ধি করতেই অনেকেই আরো দ্বিগুণ উৎসাহে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। তারা বেশ আগ্রহী হয়ে উঠছেন। নগরজীবনের ব্যস্ততায় যখন নাভিশ্বাস অবস্থা সবার, নিজের জন্য একান্ত কিছু সময় বের করতে গিয়ে গলদঘর্ম হচ্ছেন যারা, তাদের ব্যস্ত জীবনযাপনে অনেকটাই স্বস্তি এনে দিয়েছে এই অনলাইন বাণিজ্য। একটি মোবাইল ফোনই সহজ করে দিচ্ছে ক্রেতা-বিক্রেতার জীবনাচরণ। এভাবেই মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ক্রেতা বিক্রেতার এই চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু অনলাইনে কেনাবেচার প্ল্যাটফর্ম। ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমেও কেনাকাটা চলে এখন। জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি থেকে শুরু করে ঘরের নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী হাঁড়িপাতিল, মাছ-মাংস, মুরগী, শাক-সবজি পর্যন্ত বিক্রি হয় এসব ওয়েবপোর্টালে। আজকাল ডিম, দুধ, মাখন, রুটি, হাতে বানানো পিঠা, নাস্তা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে অনলাইনে।
সা¤প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ বিক্রয় ডট কম, সেলবাজার, ও এল এক্স, এখনি ডট কম, আমাদের দেশ আমার গ্রাম, ই-শপ প্রভৃতি অনলাইন পোর্টাল বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমেও তাদের পণ্য বিক্রি করছে। দেশে গত কয়েক বছরে সব মিলিয়ে দুই হাজারের মতো অনলাইনে বেচাকেনার প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে প্রায় ৮৫টির মতো অনলাইন হাট সক্রিয়। এর বাইরে ৭টি ক্ল্যাসিফায়েড অনলাইন বিজ্ঞাপনের প্ল্যাটফর্ম এবং অফলাইনে বেচাকেনা করা অন্তত ৫টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের
ওয়েবপোর্টাল রয়েছে। যেখান থেকে অনলাইনে বেচাকেনা হয়। আর এসব প্ল্যাটফর্মের ৭৩ শতাংশ বিক্রি হয়ে থাকে ফেসবুক পেজ থেকে। সন্ধ্যা থেকে কেনাকাটা বাড়তে থাকে। সাধারণত ২০ থেকে ৩৫ বছরের নারী পুরুষ অনলাইনে কেনাকাটা করে থাকেন। অনলাইনে কেনাকাটার ৭০ শতাংশই সম্পন্ন হয় ক্যাশ অন ডেলিভারি সিস্টেমে। এর বাইরে ১০ শতাংশ ক্রেডিট কার্ড ও ২০ শতাংশ হয়ে থাকে বিকাশের মাধ্যমে।
সেলবাজার নামে একটি প্রতিষ্ঠান ২০১১ সালে প্রথম অনলাইনে বেচাকেনা শুরু করে। এরপরেই অনলাইনে বেচাকেনার প্রসার ঘটতে থাকে। বর্তমানে এমন ২০ থেকে ২৫টি ওয়েবপোর্টাল রয়েছে। এ পোর্টালগুলো ব্যবসায়িকভাবে বেশ সফল হতে শুরু করেছে। বিপুল সংখ্যক মানুষ এখন এসব পোর্টাল দেখছে, এমন বিবেচনায় এখানে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন দেয়ার প্রবনতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনলাইনে বেচাকেনা হয় দুই ভাবে। সেলবাজার, বিক্রয় ডট কমের মতো ওয়েবপোর্টালে বিক্রেতা তার পুরানো পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দেন। আগ্রহী ক্রেতা সেই বিজ্ঞাপন দেখে ওই বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে দুজনের আপসের ভিত্তিতে পণ্যটি বেচাকেনা হয়। এজন্য অবশ্য নগদ অর্থ পরিশোধ করতে হয়। এসব ওয়েবসাইটে এখন নতুন পণ্যের বিক্রির বিজ্ঞাপনও দেওয়া শুরু হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান তার নিজস্ব পণ্যের বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। আবার বেশ কিছু ওয়েবপোর্টাল রয়েছে যারা নিজেরাই পণ্য বিক্রি করে ও সরবরাহ করে। ক্রেতা শুধু পণ্য পছন্দ করে অনলাইনে ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড, মাস্টার কার্ড, ভিসা কার্ডের মাধ্যমে কেনাকাটা বিল পরিশোধ করেন। বাংলাদেশে অনলাইনে বেচাকেনার বড় ওয়েবপোর্টাল হলো বিক্রয় ডট কম। ২০১২ সালের জুন মাসে যাত্রা শুরু করে এখাতের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে তা। জানা গেছে শুরুতে প্রতিমাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার ক্রেতা পণ্য কিনতে এই ওয়েবপোর্টালে ঢুকতেন। এখন প্রতিমাসে গড়ে ২০ লাখ আগ্রহী ক্রেতা নিয়মিতভাবে এই ওয়েবপোর্টালে যান। পোর্টালটিতেই বর্তমানে তিন লাখের বেশি পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার বিজ্ঞাপন পায় বিক্রয় ডট কম। বিজ্ঞাপন দিতে কোনো পয়সা লাগেনা। শুধু পণ্যের ছবি, দাম, বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ নম্বর ও ঠিকানা দিতে হয়।
বাস্তবতা হলো, অনলাইনে বেচাকেনা মানুষের জীবনযাপনের মানোন্নয়ন করেছে। আগে পুরনো জিনিসপত্র ফেলে দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলনা, নয়তো কাউকে উপহার হিসেবে বিনাপয়সায় দিয়ে দিতে হতো। এখন পুরনো জিনিস বিক্রি করে সেই টাকা নতুন জিনিস কেনার কাজে লাগানো হচ্ছে। নগরজীবনের তুমুল ব্যস্ততায় অনেকেই ঈদের কেনাকাটা করতে শপিংমলে, মার্কেটে, বিপণী বিতানে যেতে পারেন না। রাজধানী ঢাকার অসহনীয় যানজটের কারণেও অনেকে বাইরে বেড়িয়ে গলদঘর্ম হন। এছাড়া ঈদবাজারে অতিরিক্ত ভিড়ে চিড়ে চ্যাপ্টা অবস্থায় অনেকে পড়েন বিড়ম্বনায়। তাদের জন্য দারুণ সুখবর এনে দিয়েছে অনলাইন বাজার। জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি, কম্পিউটার, মোবাইল থেকে শুরু করে জামা কাপড়, জুয়েলারি, শাড়ি, ঘর গোছানোর সামগ্রী, বই, গানের সিডি, অ্যালবাম- সবই কিনতে পাওয়া যাচ্ছে অনলাইনে। এমনকি মাছ, মাংস, কাঁচাবাজারও মিলবে অনলাইন অর্ডারে। দোকান বা শপিংমলে গিয়ে যেভাবে পরখ করে পছন্দের পণ্যটি কেনা হয়, ঠিক সেভাবে সংশ্লিষ্ট অনলাইন শপে ঢুকে ছবি এবং দাম দেখে পছন্দ করে অনলাইনেই কেনার অর্ডার দেওয়া যায়। ডেলিভারির সময় হাতে অর্ডার দেয়া জিনিস পেয়ে যাচাই করে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। জানা যায় দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে অনলাইন কেনাকাটা। যার মধ্যে ২ শতাংশ বা দুই লাখ গ্রাহক নিয়মিত অনলাইনে কেনাবেচা করেন। প্রবাসী ক্রেতাদের জন্যও রয়েছে অনলাইন পণ্য কেনার ব্যবস্থা। এছাড়া রেলওয়ে টিকেট, হোটেল বুকিং এবং অভ্যন্তরীণ বিমানের টিকিট কেনার
সুবিধাও দিচ্ছে কয়েকটি সাইট। অনলাইন ক্রেতা বিক্রেতাদের মঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এবার ঈদে অনলাইনে সাড়ে তিনশ কোটি টাকার মতো কেনাবেচা হবে। পণ্য বিক্রিতে দিন দিন তাদের নির্ভরশীলতা বাড়ছে ই-কমার্স সাইটগুলোতে। ঈদ বাজারে অনলাইনে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় মেয়ে ও শিশুদের পণ্য। ঈদের সময় মোট বিক্রির ৮৫ ভাগই হয় পোশাক। ১৫ রোজার পর থেকেই অনলাইনে কেনাকাটা সাধারণ সময়ের চেয়ে ৪০-৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। গত বছরের ঈদে প্রায় ১১ কোটি টাকার মতো লেনদেন হয়েছিল অনলাইনে। আজকের তরুণ প্রজন্ম তুলনামূলকভাবে বেশি পরিমানে অনলাইনে কেনাকাটায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। এভাবে বর্তমান নাগরিক জীবনযাপনে যেমন নতুন ধারার সুচনা হয়েছে তেমনিভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।
যানজটের ভোগান্তি এড়িয়ে ঘরে বসেই ঈদের বাজার সারতে কে না চায়? তাই জমজমাট হয়ে উঠেছে অনলাইন বাজার। ঈদ উপলক্ষে নতুন নতুন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় সব ই-কমার্স সাইট। পণ্য ছাড়াও দিচ্ছে উপহার। প্রচলিত কেনাকাটার পাশাপাশি ঈদ উপলক্ষে জমে উঠেছে দেশের অনলাইন বাজার। কর্মব্যস্ত চাকুরে, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীরাও পছন্দের পণ্য ক্রয়ে ঢুঁ মারছেন অনলাইন মার্কেটপ্লেসে। ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে নানা অফার আর রকমারি পণ্যের পসরা নিয়ে হাজির হয়েছে অনলাইন শপগুলো। অনলাইনে বেচাকেনার সাইটের মাধ্যমে ছবি দেখে অর্ডার দিলে একদিনেই বাসায় পৌছে যাচ্ছে পণ্য। শাড়ি, সালোয়ার কামিজ, শর্টপ্যান্ট, ফতুয়া, পাঞ্জাবিসহ সব ধরনের পণ্য কেনাকাটার ধুম পড়ে গেছে অনলাইনে। বিলাসবহুল কোনো শপিংমল কিংবা দামি কোনো ব্রান্ডের পণ্যটি খুব সহজেই কিনতে পাওয়া যাচ্ছে অনলাইনের মাধ্যমে। অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু ব্রান্ডের পণ্য বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে ক্রেতাদের সরবরাহ করা হচ্ছে। অনলাইনে অর্ডার করলে পণ্য পৌছে যাচ্ছে ক্রেতার দোরগোড়ায়। অর্থ পরিশোধে পাওয়া যাচ্ছে ব্যাংক সহায়তাও। অনেকেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পরিশোধ করে দিচ্ছেন প্রয়োজনীয় অর্থ। ক্যাশ অন ডেলিভারিতে গ্রাহক পণ্য হাতে পাওয়ার পর টাকা পরিশোধের সুযোগ পাচ্ছেন। এ কারণে অনলাইন বাজার কেনাকাটা করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন ক্রেতারা। অনলাইনে কেনাকাটা করার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, আপনি যা কিছুই চান, বাড়িতে বসে তা পেতে পারেন এবং পণ্যমান বিষয়ে ছাড় না দিয়েই। অনলাইনে কেনাকাটা করার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি আগামী দিনগুলোতে এর ব্যাপক সম্ভাবনাকে জোরালোভাবে ফুটিয়ে তুলছে।
লেখক : ব্যাংকার

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close