আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সারাদেশ

প্রথম টার্গেট ‘সার্জেন্ট জহুরুল হক হল’

ওমেনআই ডেস্ক : বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। একাত্তরে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার প্রধান লক্ষ্যস্থলও ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

২৫ মার্চের কালরাতে তারা এখানে যে বর্বরতা চালায় তেমনটি বিশ্বের আর কোথাও ঘটেনি। গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট কোনো কিছুই বাদ যায়নি।

আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত বিদেশি সাংবাদিক এবং মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু সাইমন ড্রিংও তার পাকিস্তানী বাহিনীর লোমহর্ষক নির্যাতন ও গণহত্যার বর্ণনায় ‘সার্জেন্ট জহুরুল হক হল’র কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছিল পাকিস্তানি আর্মিদের প্রথম টার্গেট। তিনি উল্লেখ করেন-

‘আমরা প্রথমে গেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)। এটাই ছিল আর্মিদের প্রথম টার্গেট। আশপাশের মানুষের সঙ্গে কথা বলি। জানলাম ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে কিভাবে কামান চালানো হয়েছে। আমরা দেখলাম দুই দিন পরও পুড়িয়ে দেওয়া কক্ষগুলোতে ছাত্রদের মৃতদেহ একটু একটু করে পুড়ছিল। অনেক মৃতদেহ বাইরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল, অবশ্য হলের পার্শ্ববর্তী পুকুরেই বেশিরভাগ মৃতদেহ ভেসে ছিল। চারুকলার একজন ছাত্রের মৃতদেহ পড়ে ছিল তার ইজেলের পাশেই হাত-পা ছড়িয়ে। সাতজন শিক্ষক নিহত হয়েছেন। বাইরের ঘরে লুকিয়ে থাকা ১২ সদস্যের এক পরিবারের সবাইকেই হত্যা করা হয়েছে। সৈনিকরা অনেক মৃতদেহ সরিয়ে ফেলেছে।’

‘ইকবাল হলে এখনও ৩০টি মৃতদেহ পড়ে রয়েছে। এ হলের করিডোরে যে-পরিমাণ রক্ত জমাট বেঁধে আছে তা নিশ্চিতভাবে এই ৩০ জনের চেয়ে অনেক বেশি মৃতদেহের রক্ত। অন্য একটি হলে মৃতদেহগুলো দ্রুত গণকবর খুঁড়ে পুঁতে রেখে তার উপর ট্যাংক চালিয়ে মাটি সমান করে দেওয়া হয়েছে। আশপাশে বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশের রেললাইনের ২০০ গজ জুড়ে গড়ে ওঠা কুঁড়েঘরগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। টহলদার সেনাবাহিনী এখানকার একটা বাজার ধ্বংস করেছে এবং এর ঘুমন্ত দোকানদারদেরও হত্যা করেছে। দুই দিন পর যখন রাস্তায় বেরিয়ে এসব দেখার সুযোগ ঘটল, তখনো অনেক মানুষের মৃতদেহ ছড়িয়ে আছে, তাদের পরনের কাপড় গলার কাছে উঠে এসেছে।’

একাত্তরের ২৫ মার্চ কালরাতে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’র পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের (তৎকালীন ইকবাল হল) মৃত্যুপুরীর চিত্র বর্ণনা করেন প্রত্যক্ষদর্শী জিন্নাত আলী। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদের ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম দুর্গ ইকবাল হল’ শিরোনামের সংবাদেও তার মর্মস্পর্শী উদ্ধৃতি প্রকাশিত হয়েছিল। জিন্নাত আলীসহ ওই সময়ের নির্মম হত্যাযজ্ঞের প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী-

‘অন্ধকারের বুক চিরে ছুটছে বুলেট। কামান দাগছে, এলোপাতাড়ি ছুড়ছে গ্রেনেড। বোমাগুলো ফস করে জানালা দিয়ে ঢুকে ঘরের ভেতরে পড়তেই ছড়িয়ে পড়ছে আগুন। স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রের বীভৎস গর্জনে প্রকম্পিত গোটা এলাকা। অক্টোপাসের মতো হানাদাররা ঘিরে ফেলেছে চারিদিক। এসেম্বলি হল ও পাঠাগারে আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে। পাশের রেল সড়কের বস্তিও জ্বলছে। ওদিক থেকে ভেসে আসছে মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর মানুষের আর্তনাদ। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি। মৃত-অর্ধমৃতদের ঠাঁই হয় একসঙ্গে, একই কবরে। মৃত্যু উপত্যকায় চিল, শকুন আর কুকুরের রাজত্ব।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হলের ‘স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন পরিষদ’কে কেন্দ্র করেই মূলত অসহযোগ আন্দোলন গড়ে ওঠে। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের সময় থেকে ওই ছাত্রাবাসটি ছিল স্বাধিকার তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের সদর দপ্তর বিশেষ। তাই পাকবাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের অন্যতম লক্ষ্য ছিল এ হল।

অধ্যাপক ড. ক ম মুনিমের মতে, কালরাতে ওই হলের ২০০ ছাত্রকে পাকবাহিনী হত্যা করে। জহুরুল হক হল আক্রমণের প্রথম পর্যায়েই ব্রিটিশ কাউন্সিলে পাহারারত ইপিআর গার্ডদের হত্যা করা হয়। এরপর হলের কর্মচারী সিরাজুল হক, আলী হোসেন, সোহরাব আলী গাজী ও আব্দুল মজিদকে হত্যা করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, ‘২৫ মার্চ রাতে হলের বেশির ভাগ ছাত্র যখন ঘুমিয়ে ছিল ঠিক তখনই পাকিস্তানি সৈন্যরা অপারেশন শুরু করে। প্রথমে গুলির শব্দ অতঃপর বোমা, ট্যাংকের শব্দে ছাত্রদের ঘুম ভেঙে যায়। প্রথম দিকে অনেকে ভেবেছিলেন হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ও সূর্যসেন হলের ছেলেরা অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তারা বুঝতে পারেন পাকবাহিনী হল আক্রমণ করেছে। ভয়ে অনেকে ছাদে, কেউ বাথরুমে আবার কেউ হল ছেড়ে পালাতে গিয়ে ধরা পড়েন।’

তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, “হলের কক্ষ শুধু নয়, হলের টয়লেটগুলোকেও কসাই খানায় পরিণত করে ঘাতকের দল। অনেক ছাত্রকে হলের ছাদ থেকে গুলি করে পুকুরে ফেলে দেয়। ছাত্রদের খুঁজে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হিংস্র সৈন্যরা পৈশাচিক আনন্দে চিৎকার করে বলে, ‘ওস্তাদ, চিড়িয়া মিল গিয়া’। গুলিবিদ্ধ আহত ছাত্রদের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। ছাত্রদের শারীরিক নির্যাতনের সময় জল্লাদদের উল্লাস, ‘বাতাও জয় বাংলা, বানচোত, শেখ মুজিব কাঁহা গিয়ে?’ অভিযান চলে সকাল পর্যন্ত। সৈন্যরা চলে যাওয়ার পর অনেক উর্দুভাষী (বিহারি) হলে লুটপাট চালায়।”

প্রত্যক্ষদর্শী মোয়াজ্জেম মিয়া তখন মাস্টার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। হলের ২৩৫ নম্বর কক্ষের আবাসিক ছাত্র ছিলেন তিনি। ওই রাতে গ্যারেজের ছাদে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। অশ্রুসিক্ত চোখে কালরাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘হলের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে রেল সড়কের বস্তিতে হানাদার বাহিনী যখন আগুন দেয়, তখন বস্তিবাসী আশ্রয়ের আশায় প্রাচীর ডিঙিয়ে ছুটছিল হলের দিকে। কিন্তু হানাদাররা তাদের বাঁচতে দেয়নি। পাক হানাদারদের বুলেটবিদ্ধ হয়ে হলেই মারা যায় অনেকেই। ২৬ মার্চ ভোরে ইকবাল হলের যেখানেই দৃষ্টি পড়েছে, সেখানেই দেখা গেছে লাশ আর লাশ। এ দেশের সোনার ছেলেদের গুলিবিদ্ধ লাশ।’

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ঢাকার মার্কিন কনসাল আর্চার কে ব্লুাড ‘দি ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ’ (ইউপিএল ঢাকা ২০০০) গ্রন্থে লিখেছেন, সাতসমুদ্র তের নদীর ওপার থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী বালুচিস্তানের কসাই জেনারেল টিক্কা খানের অধিনায়কত্বে মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলির নিয়ন্ত্রণে, মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজার অধীনে ৫৭নং ব্রিগেডের ১৮নং পাঞ্জাব, ৩২নং পাঞ্জাব, ২২নং বালুচ, ১৩নং ফ্রন্টিয়ার ফোর্স, ৩১নং ফিল্ড রেজিমেন্ট, ১৩নং বিমান বিধ্বংসী রেজিমেন্ট এবং তিনটি কমান্ডো কোম্পানি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ঢাকায় ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে যে অভিযান পরিচালনা করে তার মধ্যে ১৮ ও ৩২ পাঞ্জাব এবং ২২ বালুচ লে. কর্নেল তাজের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে ‘এথনিক ক্লিনিজং’-এর উদ্দেশ্যে যখন রক্তগঙ্গা, ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা ও ব্যাপক অগ্নি সংযোজনের মাধ্যমে প্রজ্বলিত নরকে পরিণত করেছিল তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল উপাচার্যবিহীন।

তৎকালীন উপাচার্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ১৯৭১ সালের ১ জানুয়ারি তিন বছরের জন্য জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৮ ফেব্রুয়ারি তিনি সপরিবারে জেনেভা যান। জেনেভার একটি পত্রিকায় ঢাকায় দু’জন ছাত্রের মৃত্যু সংবাদ দেখে বিচলিত হয়ে ২৫ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান সরকারের শিক্ষা সচিবকে পাকিস্তান দূতাবাসের মাধ্যমে প্রেরিত এক পত্রে লেখেন, তোমরা নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর গুলি চালনার পর আমার ভাইস চ্যান্সেলর থাকার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। তাই আমি পদত্যাগ করলাম। (স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রবাসী বাঙালি, আবদুল মতিন, রেডিক্যাল এশিয়া পাবলিকেশন, লন্ডন, এপ্রিল, ১৯৮৯)।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close