আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
অপরাধস্লাইড

জঙ্গিদের মরণকামড়

ওমেনআই ডেস্ক : হঠাৎ করেই মরণকামড় দিতে মাঠে নেমেছে জঙ্গিরা। লক্ষ্য নিজেদের শক্তির নতুন করে জানান দেওয়া। এ ছাড়া একের পর এক জঙ্গি সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনার প্রতিশোধও নিতে চায় তারা। এরই অংশ হিসেবে জঙ্গিরা নিজ ডেরা থেকে বেরিয়ে আসছে। হামলা করছে টার্গেট পয়েন্টে। সর্বশেষ গত শনিবার সিলেটে আতিয়া মহল ঘিরে প্যারা-কমান্ডোদের অভিযানের মধ্যেই বাইরে বোমা হামলা চালানো হয়। ঘটনায় দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ ৬ জন নিহত হন। র‌্যাবের গোয়েন্দাপ্রধান আবুল কালাম আজাদসহ অন্তত ৪৩ জন আহত হন। শনিবার রাতের ওই ঘটনা ভাবাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের। এরই অংশ হিসেবে সারা দেশে পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গত বছর জুলাই মাসে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁ ও শোলাকিয়ায় ঈদের দিন হামলার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টানা অভিযানে নব্য ধারার জেএমবির জঙ্গিরা কোনো হামলা চালাতে পারেনি। ৬ মার্চ নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান ও তার সহযোগীদের ছিনিয়ে নিতে তাদের বহনকারী প্রিজন ভ্যানে হামলা হয়। কিন্তু ব্যর্থ হয়। এর পরের দিন কুমিল্লায় একটি বাসে তল্লাশিকালে পুলিশের দিকে বোমা ছুড়ে ধরা পড়ে ‘নব্য জেএমবির’ দুই জঙ্গি। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের একটি বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে অস্ত্র ও বোমা উদ্ধার করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। ১৫ মার্চ সীতাকুণ্ডের আমিরাবাদের এক বাড়ি থেকে বিস্ফোরকসহ এক জঙ্গি দম্পতিকে আটক করে পুলিশ। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৬ মার্চ একই এলাকার একটি বাড়িতে ১৯ ঘণ্টা অভিযান চালানো হয়। ওই অভিযানে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ও গুলিতে এক নারীসহ চার জঙ্গি নিহত হন। ১৭ মার্চ দুপুরে আশকোনায় র‌্যাবের প্রস্তাবিত সদর দপ্তরে আত্মঘাতী হামলায় এক জঙ্গি নিহত হয়। ২৩ মার্চ সিলেটের দক্ষিণ সুরমার শিববাড়িতে ‘আতিয়া মহল’ নামে একটি পাঁচতলা বাড়িতে জঙ্গি আস্তানার খবর পায় পুলিশ। এরপর ওই বাড়ি ঘিরে ফেলে পুলিশ। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় সোয়াট সদস্যরা। পরবর্তীকালে সেনাবাহিনীর প্যারা-কমান্ডো দল পরদিন ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’ শুরু করে। উদ্ধার করেন ওই ভবনে আটকেপড়াদের। ২৪ মার্চ রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গোলচত্বরসংলগ্ন পুলিশ বক্সের সামনে ‘আত্মঘাতী’ বিস্ফোরণে এক জঙ্গি নিহত হয়। গতকাল পর্যন্ত তার পরিচয় পাওয়া যায়নি। আর শনিবার ২৫ মার্চ সিলেটে আতিয়া মহলে সেনাবাহিনীর প্যারা-কমান্ডোদের অভিযানের মধ্যেই বাইরে পুলিশ চেকপোস্টের কাছে জঙ্গিদের বোমা হামলায় দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ ৬ জন নিহত হন।

এসব ঘটনাপ্রবাহ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। হঠাৎ কেন জঙ্গিরা মারমুখী হয়ে উঠেছে তার পেছনের কারণ খোঁজার চেষ্টা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গিরা যেসব বোমা ব্যবহার করছে, তা আকারে অতীতে উদ্ধার করা বোমার চেয়ে কয়েকগুণ বড়। বোমার ভেতরে স্পিন্টার হিসেবে যে লোহার বল ব্যবহার করা হচ্ছে, তাও অতীতে ব্যবহার করা স্পিন্টারের চেয়ে কয়েক গুণ বড়। সর্বশেষ বিমানন্দর গোলচত্বরের পুলিশ বক্সের সামনে বোমা বিস্ফোরণে এক জঙ্গি নিহত হওয়ার পর অক্ষত অবস্থায় আরেকটি বোমা উদ্ধার করা হয়। যে বোমাটি ওজনে ১৩ কেজির মতো। তাতে স্পিন্টার হিসেবে ব্যবহৃত লোহার বলগুলোও আকারে অনেক বড়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন করে শক্তির জানান দিতে এবং বড় জঙ্গি হামলা চালাতেই নব্য জেএমবির সদস্যরা বড় আকারের বোমা তৈরি করছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের জঙ্গি আস্তানায় তৈরি এ ধরনের বোমার ৩টি চালান ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। যার অন্তত ৩টি আশকোনার দুই ঘটনায় বিস্ফোরিত হয়েছে। বাকিগুলো এখনো জঙ্গিদের কাছেই রয়ে গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে গত ৬ মার্চ থেকে শনিবার সিলেটে জঙ্গি হামলায় দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ ৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনা বিশ্লেষণ করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগের প্রধান ডিআইজি মনিরুল ইসলাম বলেছেন, জঙ্গিদের সাম্প্রতিক তৎপরতা দেখে আমরা মনে করি যখন জঙ্গিরা খুব বেপরোয়া হয়ে যায়, যখন তাদের সামনে আর ওইভাবে এগোনোর আর কোনো পথ থাকে না তখন এ ধরনের হামলা করে বা হামলার চেষ্টা চালায়। তা ছাড়া জঙ্গিদের জায়গাগুলোও সংকুচিত হয়ে আসছে। এ বিষয়ও তারা বুঝতে পারছে। এমন একটা পরিস্থিতিতে জঙ্গিরা মরণকামড় দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে আমরা অগ্রিম গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারব বলে মনি করি। আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে।

জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টানা অভিযানে তামিম চৌধুরী, নুরুল ইসলাম মারজান, আবদুর রহমান ওরফে সারোয়ার জাহান, সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জাহিদুল ইসলামসহ অন্তত ৩৫ জঙ্গি মারা যায়। ধরা পড়ে বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাও। এতে নব্য ধারার জেএমবির ৭০ শতাংশ শক্তি ক্ষয় হয়ে গেছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা দাবি করে আসছেন। গত ৯ মাসে তাদের টানা অভিযানের মধ্যেই নব্য ধারার জেএমবি সদস্যরা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তবে এবার তারা পূর্বের জঙ্গি হামলার কৌশল বদলে ভয়ঙ্কর মিশন নিয়ে জঙ্গি হামলায় ফেরার চেষ্টা করছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা মনে করছেন। এখনো দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১৫-২০টি জঙ্গি আস্তানা রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া অন্তত ৪০ জন নতুন জঙ্গি পরিবারের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে হিজরতের মাধ্যমে জঙ্গি আস্তানায় ওঠার চেষ্টায় রয়েছে বলে তথ্য পাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারা একের পর এক আত্মঘাতী হামলা চালানোরও ছক করে এগোচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে শনিবার রাতে পুলিশ সদর দপ্তর যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার, সব রেঞ্জ ডিআইজিসহ সংশ্লিষ্ট অন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছে। মুসা, সাগর, হাত কাটা মাহফুজ ওরফে সোহেল মাহফুজসহ আরও অন্তত ৫ থেকে ৬ জন গুরুত্বপূর্ণ নেতা এখনো অধরা। তাদের ধরতে অভিযান আরও জোরদার করতে পুলিশ সদর দপ্তর নির্দেশ দিয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বিবিসিকে বলেন, বাংলাদেশে এই ধরনের হামলার চেষ্টা করা হবে সেটা আগে থেকেই কিছুটা ধারণা করা যাচ্ছিল। অনেকটা প্রেডিকটেড ছিল যে এ ধরনের ডেসপারেট অ্যাকশন হবে বাংলাদেশে। এটাকে আমরা রি-অর্গানাইজ পিরিয়ড হিসেবে ধরব যখন কোনো হামলা হয়নি, নতুনভাবে সংগঠিত করা এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারিতে যারা প্রশিক্ষণ নিচ্ছে তাদের সামনে নিয়ে আসা। এই সময়টা তারা চুপ থাকে এবং নতুন কৌশল সাজায়।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে যেহেতু জঙ্গিদের সাময়িক বাধার সৃষ্টি হয়েছে, তাই বিভ্রান্ত করতে এবং মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লক্ষ্যবস্ত করা হচ্ছে। বেশকিছু ক্ষতি হওয়ার পর তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close