আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
ফেসবুক থেকে

উন্নয়নের গায়ে কত যে বিষফোঁড়া

বেগম জাহান আরা : বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এখন বিদেশের নজর কেড়েছে। ব্যাখ্যা করার দরকার নেই, সচেতন মানুষ মাত্রেই কথাটা জানেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা শক্তিশালী রাজনীতিক হিসেবেও খ্যাতি পেয়েছেন। আমরা সবাই জানি, ঘন বসতির এই দেশে উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নেয়া কত কঠিন। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার যানজট নিয়ে সবার মনেই বিরক্তি এবং কষ্ট। কিন্তু রাস্তার পরিমাণ বাড়ানো বা রাস্তার লেয়ার তৈরি করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। মেট্রো রেলের কাজ শুরু হয়েছে। অনেক ফ্লাইওভার নির্মিত হয়েছে। কিন্তু তবু মানুষ আর গাড়িতে উপচে ওঠা এই নগরে যানজটের নিরসন হয় না। চলাচলের সুযোগ যতটা বাড়ে, চাহিদা সেটা খেয়ে ফেলে।

জীবিকার জন্য মানুষ ঢাকামুখী হয়। ফুটপাথে বসে যায় সামান্য বাণিজ্যের জন্য। নগরের কোনাকাঞ্চিতে ঘর বাঁধে তাদের পরিবার পরিজন। গড়ে ওঠে বস্তি। সেখানে মানবেতর জীবন যাপন করে বহু মানুষ। এলাকার কোনো না কোনো প্রভাবশালী মানুষ তাদের পতিত জায়গায় ওদের বাসের সুযোগ করে দেয়। অবৈধ গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহের ব্যবস্থাও করে দেয়। রীতিমতো ভাড়া আদায় করে ঐ সব ছিন্নমূল দরিদ্র মানুষদের কাছ থেকে। একে আমি উন্নয়নের গায়ে বিষফোঁড়া বলছি। কিছুতেই এই ফোঁড়ার ঘা সারানো যায় না। কারণ এই বস্তির ফোঁড়া ধীরে ধীরে হয়ে যায় বহুমুখী বাঘি ফোঁড়া। চারদিকে যে ফোঁড়ার মুখ। সব দিক দিয়েই পুঁজ পড়ে।
ওদের জন্য পয়ঃনিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা থাকে না। প্রাকৃতিক কাজ সেরে নেয়ার জন্য আশপাশের জমিতেই যায়। শিশুদের লেখাপড়ার বালাই থাকে না। ঘিঞ্জির মধ্যে গিয়ে অপরাধী লুকিয়েও থাকে। অনেকে ভিক্ষে করে। অবৈধ কাজকর্মও চলে সেখানে। এই ড্রাগ ব্যবসা, নারী ব্যবসা, এই সব তো ডাল ভাত হয়ে যায়। আসলে দারিদ্র্য, অশিক্ষা আর কুশিক্ষা মানুষকে অমানুষ করে দেয়। প্রদত্ত মানবিক গুণাবলি বিকশিতই হতে পারে না। কেমন এক বেপরোয়া উচ্ছৃঙ্খলার মধ্যে জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে যায়।
অসাবধানতার জন্য ঘন ঘন আগুন লাগে বস্তিতে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় বিপুল। নিঃস্ব মানুষগুলো একেবারে নাঙ্গা হয়ে যায়। নানা রোগে শোকে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকে বয়সী মানুষেরা। রোগের ডিপো হয় অস্বাস্থ্যকর পুরো এলাকাটা। মাঝে মাঝে বাঘি ফোঁড়াটা কেটে ফেলা, মানে বস্তি উচ্ছেদের কথাও বলেন নগরপাল। কিন্তু সম্ভব হয় না। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করলে ওরা যাবে কোথায়? উন্নয়নের গায়ের ঘাটা তাই আর ভালো হয় না। পুঁজ পড়তেই থাকে। ফুটপাথের অবৈধ বাণিজ্য উচ্ছেদ অভিযানের রূপ তো দেখলাম। নিম্ন আয়ের মানুষের রুজি রোজগারের প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায় পাহাড়ের মতো। মানবতা দাঁত বের করে তেড়ে আসে। জীবনের তাগিদে উচ্ছেদের পরে আবার এসে ভিড় জমায় ক্ষিপ্ত দরিদ্র অসহায় মানুষগুলো। কিছু মানুষ সহানুভূতি নিয়ে পাশে এসে কথা বলে। পত্রিকায় লেখে। সত্যিই তো, পুনর্বাসন ছাড়া ওরা কোথায় বসবে বাণিজ্যের পশরা নিয়ে? নগরে তো নানা ধরনের মানুষ থাকে। মধ্য আয়ের লোকজন ফুটপাথের জিনিসপত্র কেনে দেদার। বোঝা যায়, ঐ সব ছোট দোকানের চাহিদা আছে মানুষের কাছে। তাদের অধিকাংশই হাঁটার পথ পরিষ্কার হোক, এটা চান। আবার ওদের কষ্টে তাদের প্রাণও কাঁদে। কিন্তু জানেন না সমাধান কোথায়? এও এক বিষফোঁড়া। না যায় সওয়া, না যায় ফেলা।
বেইজিংয়ে থাকার সময় দেখেছি মর্নিং মার্কেট সরাতে। সরকার পরিকল্পনা করে ওদের জন্য মর্নিং মার্কেটের কাছাকাছি একটা জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণ করে প্রত্যেককে নির্দিষ্ট মাপের দোকান বরাদ্দ করেছে। তাতে ওদের বাণিজ্য চলেছে এবং রাস্তার দুই পাশ মুক্তও হয়েছে। হঠাৎ একদিন উচ্ছেদের মতো নিষ্ঠুর কাজ সেখানে হয় না। কিংবা পরিকল্পনাহীনভাবে পুনর্বাসনের কোনোই ব্যবস্থা না করে দরিদ্র মানুষ এবং তার সামান্য পশরা রাস্তায় ছুড়ে ফেলে না। আমরাও চাই ফুটপাথ পরিষ্কার হোক। তবে ওদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেই উচ্ছেদ অভিযান সফল করা হোক। এখন তো না ঘরকা না ঘাটকা অবস্থা। কিন্তু এভাবে তো চলবে না। করতেই হবে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা এবং সেই মোতাবেক শুরু করতে হবে কাজ। মাঝে মাঝে ঝটিকা উৎখাত করে চমক দেয়ার কাজ এটা নয়। দেশের প্রশংসিত উন্নয়নের গায়ে আরো ফোঁড়া আছে। শিক্ষা খাতের কথাই বলা যাক। দেশে শিক্ষিতের হার বাড়ছে বলা হয়। আমি বলি, ডিগ্রির ছাড়পত্রের হার বাড়ছে। শিক্ষিতের হার নয়। প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে বলতে গেলে নিয়মিতই। জালিয়াতরা ধরা পড়ে না। এই সেদিন এক কোচিং সেন্টারের কিছু মানুষকে ধরা হয়েছে। আমাদের জিজ্ঞাস্য হলো, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় কেমন করে? এবং কেন হয়? যারা এই অপকর্ম করে, তাদের ধরা যায় না কেন? ওরা কি ম্যাজিক জানে? বুঝতেই পারি না, কিভাবে প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনা মেনে নেয়া যায়? পাসের হার বেড়ে যাচ্ছে এটা দেখানোর জন্য? এই বেপরোয়া ফোঁড়াটার চিকিৎসা কী? আমাদের দেশে ব্যর্থতার দায় কাঁধে নিয়ে পদত্যাগের দৃষ্টান্ত নেই। তাই বার বার ঘটনাটা ঘটলেও সংশ্লিষ্ট দফতর দায়ও নেয় না। কারণ দায় না নিলে কিছুই হয় না। সবাই পার পেয়ে যায়। সবাই সয়ে নেয় বিষফোঁড়ার দুরন্ত ব্যথা।
শিক্ষা খাতের এই বীভৎস ঘা-টা কিন্তু বস্তির মতো কোনো এক জায়গায় দানা বেঁধে থাকে না। কিংবা ফুটপাথের গায়ে অবৈধ বাণিজ্যের মতো না। শিক্ষা খাতের এই ঘা-টা গ্যাংগ্রিনের মতো সমস্ত শরীরে তথা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। পরে অচল করে দেয় শরীর তথা সমাজদেহ। তারপর মৃত্যু। শিক্ষা খাত এখন রীতিমতো বাণিজ্য হয়ে গেছে। যাদের টাকা আছে তাদের ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে যাবে, কোচিং সেন্টারে যাবে বিশেষ কোচিংয়ের জন্য, ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র কিনবে, জিপিএ ৫ পাবে, গোল্ডেন জিপিএ পাবে। তর তর করে ওপরের পর্বে লেখাপড়া করবে এবং বিদেশে যাবে। একজন গ্র্যাজুয়েট ছেলেমেয়ের কাছ থেকে ভালো ইংরেজি বা বাংলা কথা শোনা যায় না বলে কত কর্পোরেট হাউসের চাকরিদাতারা বিলাপ করেন। লজ্জার ধিক্কারে মরে যাই আমরা বয়সী সচেতন মানুষেরা। এসব তো পত্র পত্রিকারই খবর। হ্যাঁ, ব্যতিক্রম তো অবশ্যই আছে।
পত্র পত্রিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হলের ঘর দখল নিয়ে মারামারি গোলাগুলি খুনোখুনির প্রতিবেদন তো আমরা সকলেই পড়ি। কোনো রাখঢাক নেই প্রতিবেদনে। এই জবর দখলের সংস্কৃতি এখন মেয়েদের হলেও চালু হয়েছে। লেখাপড়া করতে এসে যদি এই সব ধান্ধাবাজি মারামারি করে প্রজš§ এবং সেটা অন্যায়ভাবে, তাহলে ভাবতেই হয় যে, এই প্রজš§ দেশের উন্নয়নকে কি এগিয়ে দিচ্ছে, না পিছিয়ে দিচ্ছে? আর হলের মারামারিতে শিক্ষকও লাঞ্ছিত হন বলেও প্রতিবেদনে প্রকাশ। একজন শিক্ষক হিসেবে খবরটা দারুণ গায়ে লাগে। একে কোন শিক্ষা বলব আমরা? এরাও তো ডিগ্রি নিয়ে বের হবে এবং একদিন সমাজের উঁচু পর্যায়ে বাস করবে। নেতৃত্ব দেবে। সমাজ কী পাবে তাদের কাছ থেকে? এই শঙ্কা আমাদের থাকতেই পারে। উন্নয়নের গায়ে এই বিষফোঁড়াটাই কি কম বেদনাদায়ক? এর তো নিরাময় তথা বিনাশ অবশ্যই দরকার, নয় কি?
অন্যদিকে শিক্ষিত এবং ধনী লোকদের (ব্যতিক্রম ছাড়া) সাধারণ প্রবণতা হলো নিয়মকে পাশ কাটিয়ে চলা। এই গাড়ি পার্কিংয়ের কথাই বলা যায়। যেখানে সেখানে গাড়ি পার্ক করেন তারা। যা যানজটের প্রধানতম কারণ। রাস্তার দুই ধারে গাড়ি পার্ক করার ফলে সচল গাড়িগুলোর ভয়ানক সমস্যা। পার্কিং প্লেস থাকার পরেও রাস্তার ধারে পার্ক করেন অনেকে। দিলকুশার পার্কিং ভবন খালি পড়ে থাকে। আর যে ভবনগুলোতে মাটির নিচে পার্কিং প্লেস থাকার কথা, সেখানে তা নেই। এই বিষয়টা নিয়ে রাজউক আর ব্যক্তির মধ্যে মতান্তর আছে। কিন্তু মানুষের কষ্ট তাতে দূর হয় না। এই বিষফোঁড়া থেকে দুর্গন্ধময় পুঁজ পড়তেই থাকে। পরিবেশ নষ্ট করার কারণে উন্নয়নের চাকা এখানে এসে হোঁচট খায়।
গৃহ নির্মাণের সময় রাস্তা জুড়ে নির্মাণ সামগ্রী রাখার দৃশ্য এতই পরিচিত যে মানুষ আর কথা বলে না। বলবে কার কাছে? বলেই বা কী হবে? সেদিন আমার চোখের সামনে ছড়ানো পাথরের ওপর দিয়ে হাঁটার সময় দুজন পড়ে গেলেন। তাদের একজন বয়সী মহিলা। স্তূপ করে রাখা পাথর গাড়ির চাকার তলে পড়ে ক্রমে ক্রমে রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে। সেগুলো কেউ সরায় না। বাধ্য হয়ে মানুষকে ঐ পাথরের ওপর দিয়েই সাবধানে জায়গাটা পার হতে হয়। তাতে কত মানুষ পড়ে ব্যথা পান। ব্যথাকাতর মানুষদের কিছু করার থাকে না। বিষফোঁড়ার পুঁজ লেপ্টে যায় সারা গায়ে। উন্নয়নের অগ্রসরমান প্রক্রিয়াকে কুৎসিত করে দেয়া হয় এইভাবে। এ কি সহ্য হয়?
উন্নয়নের প্রথম কথা হলো গতি। সেই গতি টেনে রাখছে বহু ধনী লোকের স্বেচ্ছাচারিতা। ধানমণ্ডি থেকে মতিঝিল যেতে দুই ঘণ্টা লাগে। আসতে দুই ঘণ্টা। চলাচলে চাকা না ঘোরার জন্য হাজার হাজার শ্রমঘণ্টা বয়ে যায় বৃথাই। এটা কি জাতিয় ক্ষতি নয়? নিয়ম ভেঙে ভেঙে এমনি স্বভাব হয়েছে যে, ফুটপাথের অবৈধ বাণিজ্য উচ্ছেদের বরাতে খালি ফুটপাথে শুরু করে তারা গাড়ি পার্ক করা। এতই দৃষ্টিকটু সেই দৃশ্য, যা বলাই যায় না ভাষায়।
এর সুরাহা করতেই হবে। এক, গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা করতে হবে; দুই, অবৈধভাবে গাড়ি পার্ক করলে মোটা জরিমানা করতে হবে। নগরপাল এই ব্যবস্থা করতে পারবেন অবশ্যই। মানে, এই খাতের বিষফোঁড়ার অপারেশন করা তারই কাজ বলেই করতে হবে। কেন এত কথা বলি? আমাদের তো পথেঘাটে চলাফেরা করতে হয়। অযাচিত কষ্ট করতে ভালো লাগে না। কম খেয়ে কম পরে তবু থাকা যায়। কিন্তু শরীর ভর্তি বিষফোঁড়া নিয়ে বাঁচাই দায় হয়ে ওঠে। তখন উন্নয়নের কথা কানে যেতে চায় না। বার বার ভাবি, দেশনেত্রী হাসিনার অপরিমিত উন্নয়ন প্রয়াসে যারা অপকর্ম যোগ করছে, তাদের শাসন বারণের জন্য শক্ত কিছু করা অতি অবশ্যই প্রয়োজন। এতে সবার সমর্থন পাবেন তিনি।
লেখক : সাবেক অধ্যাপক, গবেষক
ভাষা বিজ্ঞানী, কলাম লেখক

সূত্র : মানবকণ্ঠ

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close