আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সারাদেশস্লাইড

মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে সড়ক!

হাসান সাইদুল : ফ্লাইওভারের কাজ শুরু করতেই অনেকেই মনে করেছেন যানজট একেবারই কমে যাবে। আর যানজট কমলে দুর্ঘটনা কমবে। আর দুর্ঘটনা কমলে জনজীবনে আসবে স্বস্তি। অকালে হারাবে না প্রাণ। কান্না নিয়ে কাটবে না কোনো পরিবারের দিন। নগরীর অনেক ফ্লাইওভারের কাজ সম্পন্ন হলেও কমছে না যানজট। মহাসড়কের পাশাপাশি সরু পথেও চলছে গাড়ি। নগরীতে উন্নত জীবনের প্রত্যয় নিয়ে আসছে মানুষ। বাড়ছে জনগণ। দিন দিন গণপরিবহনের সংখ্যাও বাড়ছে। বাড়তে বাড়তে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে সড়ক দুর্ঘটনাও। প্রতিদিনই ঝরছে তাজা প্রাণ। অনেকেই হচ্ছেন পঙ্গু। গত শুক্রবার শরীয়তপুরে ট্রাকের চাপায় কলেজের একজন সাবেক অধ্যক্ষ নিহত হন। গত ৪৬ দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৪৪৬ জনের। এর মধ্যে গত রোববার চুয়াডাঙ্গায় ট্রাক-নছিমন সংঘর্ষে এক গ্রামের ১২ জনসহ ১৩ জনের প্রাণ গেছে।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও যাত্রী নিরাপত্তা নিয়ে সোচ্চার সংগঠনগুলো সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তি, অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করার দাবি তুলেছিল। আবার কেউ কেউ খুন নয় এমন নরহত্যার দায়ে, অর্থাৎ ৩০৪ ধারায় বিচারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির অপরাধের বিষয়টি অজামিনযোগ্য ধারায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি ছিল ভুক্তভোগীদের।
গত ১১ মার্চ (শনিবার) ঢাকাসহ সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৮ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে খুলনায় প্রাণ গেছে ১১ জনের। এ নিয়ে গত ২৩ দিনে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ২৩০ জন। বেসরকারি হিসাবে, গত ১০ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে প্রায় ৪৭ হাজার। বাংলাদেশের সড়কগুলো এখন হয়ে উঠেছে দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম মৃত্যুফাঁদ। জাতিসংঘ ২০১১ থেকে ২০২০ সালকে ‘সড়ক নিরাপত্তা দশক’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই ১০ বছরে বাংলাদেশসহ সদস্য দেশগুলো সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু পাঁচ বছরের বেশি পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা কমেনি।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব মতে, ২০১৪ সালের সারাদেশে ৫ হাজার ৯২৮টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৮ হাজার ৫৮৯ জন। অথচ বিআরটিএর হিসাবে ওই বছর সারাদেশে দুর্ঘটনার সংখ্যা ২ হাজার ২৭টি। এতে নিহতের সংখ্যা ২ হাজার ৬৭ এবং আহত ১ হাজার ৫৩৫ জন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ সালে সারাদেশে ৬ হাজার ৫৮১ দুর্ঘটনায় নিহত ৮ হাজার ৬৪২ এবং আহত ২১ হাজার ৮৫৫ জন। গত বছর ৪ হাজার ৩১২টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৬ হাজার ৫৫ জন। আহত হয়েছে ১৫ হাজার ৯১৪ জন। অথচ বিআরটিএর হিসাবে ২০১৫ সালে ৩ হাজার ৩৯৪টি দুর্ঘটনায় নিহত ২ হাজার ৩৭৬ এবং আহত ১ হাজার ৯৫৮ জন। সরকারি হিসাবে গত বছর জুলাই মাস পর্যন্ত ১ হাজার ৪৮৯টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ১ হাজার ৪২২ জন, আহত ১ হাজার ২৮৯ জন।
১৯৯৬ সালের ব্র্যাকের সুপারিশ করা ১৪৪টি সড়কের বাঁক সোজা করার প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় ২০১৫-১৬ সালে। এর মধ্যে বুয়েট আবার নতুন করে আরো ২শ’টি দুর্ঘটনাপ্রবণ স্পটের তালিকা করেছে। যেগুলোতে প্রায়ই প্রাণ ঝরছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৫ সালের প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর ২১ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। তবে বাংলাদেশের যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে একই বছরে এই সংখ্যা সাড়ে আট হাজার। তারা মূলত সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করে। আর সরকারি হিসাবে প্রাণহানির সংখ্যা মাত্র ২ হাজার ৩৭৬। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রকাশিত গত বছরের মেডিকেল বুলেটিনে ৪০৮টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৬২টি জেলা হাসপাতাল, ১৪টি মেডিকেল কলেজ, ১০টি বিশেষায়িত হাসপাতালে ২০১৪ সালে ভর্তি হওয়া রোগীদের ধরন বিশ্লেষণ করা হয়। এতে বলা হয়, সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে সর্বাধিক ৬৬ হাজার ৭৮৮ জন সড়ক দুর্ঘটনার শিকার। জেলা হাসপাতালের দুর্ঘটনায় ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৫৮ হাজার ২৩৫, যা শীর্ষ দশ কারণের মধ্যে তৃতীয়। আর উপজেলা পর্যায়ে দুর্ঘটনার রোগী ভর্তি হয় প্রায় ৫১ হাজার, যা শীর্ষ দশের মধ্যে পঞ্চম।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গত বছরের গবেষণা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দিক থেকে এশিয়ায় বাংলাদেশ সপ্তম অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের ওপরে আছে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম। কিন্তু এই দেশগুলোর প্রতিটিতে যানবাহনের সংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। আর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম। ২০১৪ সালের তথ্য ধরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গবেষণা করেছে। সে হিসাবে, বাংলাদেশে প্রতি ১ লাখ মানুষের জন্য ১ হাজার ১৩৩টি যানবাহন রয়েছে। চীনে প্রতি ১ লাখ মানুষের জন্য রয়েছে ১৮ হাজার যানবাহন। ভারতে প্রায় ১৩ হাজার। আর পাকিস্তানে পাঁচ হাজার। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় প্রতি দুজনে একটি করে যানবাহন রয়েছে। এই দেশগুলোতে জনসংখ্যাও প্রচুর। যানবাহনের হিসাব দেওয়া হয়েছে মোটরসাইকেলসহ।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি সূত্রে জানা গেছে, চালকদের তিন ধরনের লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে। এজন্য সারাদেশে বিআরটিএ অনুমোদিত ড্রাইভিং প্রশিক্ষক রয়েছেন মাত্র ১৪২! দেশে রেজিস্ট্রেশনকৃত ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ স্কুলের সংখ্যা মাত্র ৯৮। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অনুমোদিত ড্রাইভিং প্রশিক্ষকদের একটা বড় অংশ কোন কাজ করেন না। ট্রেনিং সেন্টারগুলোতেও প্রতিষ্ঠানের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। সরকারের পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ বলছে, গত বছরের নবেম্বর পর্যন্ত দেশে তালিকাভুক্ত যানবাহনের সংখ্যা সাড়ে ২৮ লাখের বেশি। লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালক আছে প্রায় ১৬ লাখ! এই হিসেবে সাড়ে ১২ লাখের বেশি চালক অবৈধ! যাত্রী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে দেশ ৬০ লাখের বেশি চালক রয়েছে। অবৈধ চালকের সংখ্যা ৪৪ লাখ। লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালক আছে মাত্র ১২ ভাগ। ২২ লাখ অনুমোদনহীন যানবাহন দাবড়ে বেড়াচ্ছে সড়ক-মহাসড়কে। বিআরটিএ সূত্র বলছে, পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের সুপারিশে কোন রকম পরীক্ষা ছাড়াই এক লাখ ৯০ হাজার চালক পেয়েছেন ভারি যানবাহন চালানোর সনদ! বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিনে সারাদেশে গাড়ি নামছে চার শতাধিক। এর মধ্যে ঢাকাতেই নামছে ৩১৭। গাড়ির বিপরীতে গড়ে দিনে ১০ চালকও তৈরি হচ্ছে না। এমন বাস্তবতায় নতুন চালক তৈরিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
একটি গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষার জন্য ৪১টি আইটেম পরীক্ষা করতে হয়। অথচ মালিক আর গাড়ি দেখেই বিআরটিএ’র পরিদর্শক ফিটনেস সার্টিফিকেট দিয়ে দিচ্ছেন। এটা করলে নিরাপদ সড়ক কখনোই পাওয়া যাবে না। ফিটনেস দেয়ার বর্তমান প্রক্রিয়াটা বিজ্ঞানভিত্তিক নয় মন্তব্য করে তা সংস্কারের দাবি জানান অনেকেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে বলা যায়, গাড়ির ফিটনেস দেবে সরকার, কিন্তু টেস্টগুলো করবে বেসরকারি কোম্পানি। সরকার ও বিআরটিএ নজরদারির ভ‚মিকায় থাকবে। সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে সেফটি অডিট চালু হয়নি। দুই স্তরের সড়ক নির্মাণ করলে কম গতি ও বেশি গতির গাড়ি আলাদাভাবে চলতে পারবে। এতে দুর্ঘটনা কমে আসবে। এ ছাড়া মহাসড়কের পাশের ভ‚মির নিরাপদ ব্যবহার নিয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করার খুবই জরুরি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চালক তৈরির ক্ষেত্রে মূল উদ্যোক্তা বেসরকারি খাত। তবে মান নিশ্চিত করতে পরিবহন নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে কঠোর ভ‚মিকা পালনের বিকল্প নেই বলেও মনে করেন তারা। তাছাড়া বিপুলসংখ্যক অবৈধ চালক এখন রাস্তায়। এমন বাস্তবতায় সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। তাদের পরামর্শ দ্রুত সময়ের মধ্যে বিআরটিএকে রেগুলেটরি অথরিটি ঘোষণা করা হোক। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ চালক তৈরিসহ পরিবহনের ফিটনেস পরীক্ষার দায়িত্বে থাকবে। এতে সেবার মান বাড়বে। কমবে সড়ক দুর্ঘটনা। উন্নত দেশগুলোতে এভাবেই পরিবহন নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে।
উন্নত দেশগুলোতে সঠিক সেবা ও মান নিশ্চিত করার জন্য সরকারী সংস্থা ‘রেগুলেটরি বডি’ হিসেবে কাজ করছে, যা আমাদের দেশে নেই। বর্তমানে ব্যাঙ্ককের যানবাহনের সংখ্যা ৭৫ লাখ। থাইল্যান্ডে সাড়ে তিন কোটি। বিশাল এ পরিবহন রাজ্যের দেখভাল কিন্তু দেশটির সরকারি পরিবহন নিয়ন্ত্রণ সংস্থার হাতে নেই। এতে সেবার মান বাড়ছে। দক্ষ চালক তৈরি হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনার মাত্রা কমছে। সেই সঙ্গে আনফিট কোন পরিবহন রাস্তায় চলতে পারছে না। চোখে দেখে ফিটনেস সনদ দেয়ার প্রবণতাও নেই সেখানে। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, উন্নত দেশগুলোতে নাগরিকের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। তেমনি নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের জবাবদিহিতাও রয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিডেন্ট রিসার্স ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক শামসুল হক বলেন, অনেক আগেই দক্ষ চালক তৈরি ও যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষায় পরিবর্তন আনার প্রয়োজন ছিল। ২০০৭ সালে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানোর কথা উলে­খ করে তিনি বলেন, প্রস্তাবটি মন্ত্রিপরিষদ পর্যন্ত গিয়েছিল। কিন্তু কিছু স্বার্থান্বেষী মহল তাদের ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে কাজ করেছে। এতে প্রস্তাবটি আর আলোর মুখ দেখেনি। ফলে প্রতিবছর গাড়ি বেড়েছে। এখনও বাড়ছে কিন্তু চালক বাড়েনি। দক্ষ চালক তৈরি হচ্ছে না। বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। মরছে মানুষ। অনেকে দুর্ঘটনায় সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করছেন।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত পরিবহনের সংখ্যা ১০ লাখ ৫০ হাজার ১২৪। একই সময়ে সারাদেশে তালিকাভুক্ত যানবাহনের সংখ্যা ২৮ লাখ ৪২ হাজার ৩১৯। জানতে চাইলে বিআরটিএ সচিব শওকত আলী বলেন, সারাদেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকের সংখ্যা ১৬ লাখের কাছাকাছি। তবে অবৈধ চালক আছে কিনা আমাদের জানা নেই। অবৈধভাবে বা লাইসেন্স ছাড়া কেউ গাড়ি চালালে যারা মাঠে দায়িত্ব পালন করছেন তাদের ধরার কথা। সরকারি এই কর্মকর্তা বলছেন, দেশে অবৈধ চালক থাকার কথা নয়। যদি থেকে থাকে তাহলে হাইওয়ে পুলিশ, মহানগর পুলিশ, ট্রাফিক বিভাগ, ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা পুলিশের দেখা বা ধরার কথা। তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি দুর্ঘটনা রোধ বা চালক সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার। দক্ষ চালক তৈরির কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
যাত্রী অধিকার সংরক্ষণে কাজ করা যাত্রী কল্যাণ সমিতির ২০১৫ সালের পরিসংখ্যান বলছে, তখন সারাদেশে চালকের সংখ্যা ছিল ৬০ লাখ। এখন আরও বেশি। এর মধ্যে ১৬ লাখেরও কম বৈধ চালক রয়েছে। অথচ বিআরটিএ’র রেজিস্ট্রেশনভুক্ত পরিবহনের সংখ্যা ২৮ লাখ। অর্থাৎ এর বাইরে সব চালকই অবৈধ। সংগঠনের মহাসচিব মোজাম্মেলক হক বলেন, ৬০ লাখ চালকের মধ্যে বৈধ মাত্র ১২ ভাগ। দেশজুড়ে প্রায় ২২ লাখ নসিমন, করিমন, ভটিভটিসহ অনুমোদনহীন যানবাহন ও চালক থাকার দাবি করে তিনি বলেন, এসব চালকদের নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ জরুরি। অথচ সবার চোখের সামনে এসব পরিবহন চলছে। চালকরাও দাবড়ে বেড়াচ্ছেন। কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। সরকারি উদ্যোগে দক্ষ চালক প্রশিক্ষণের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারিভাবে চালক তৈরির প্রক্রিয়ায় গলদ আছে। তাই পরিবহনে নতুন চালক তৈরিসহ চলমান নানা সংকট সমাধানে গবেষণা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
২০০৭ সালে করা ব্র্যাকের করা এক গবেষণা অনুসারে ভারী যানবাহনের ৯৬ দশমিক ৪ শতাংশ চালকই ‘ওস্তাদে’র (মূল চালকের) সহকারী থেকে চালক হয়েছেন। বিআরটিএর তথ্য অনুসারে, দেশে ভারী যানবাহনের প্রায় আড়াই লাখ চালক রয়েছেন। তাঁদের ১ লাখ ৯০ হাজার লাইসেন্স পেয়েছেন পরীক্ষায় অংশ না নিয়ে। তাঁরা লাইসেন্স পান নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের দেওয়া তালিকা ধরে। বাংলাদেশে নিবন্ধিত যানবাহন আছে প্রায় ২৭ লাখ। এর মধ্যে অন্তত ৪ লাখের ফিটনেস সনদ নেই। আর যেসব যানের সনদ আছে, সেগুলোর বেশির ভাগকে দেওয়া হয়েছে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে। কারণ, মোটরযান আইনে যানবাহনের ৫০টির বেশি কারিগরি পরীক্ষা নিশ্চিত করেই চলাচলের সনদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এসব যাচাই করা হয় যন্ত্রের সাহায্যে।
সড়কের অবস্থা দিন দিন কিছুটা উন্নতি হচ্ছে। দুটি মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করে এর মাঝখানে সড়ক বিভাজক দেওয়া হয়েছে। এতে মুখোমুখি সংঘর্ষের আশঙ্কা কমে এসেছে। সরকার দুর্ঘটনা কমাতে ১৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪২টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক সোজা করার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তবে এখনো অনেক সড়ক ভাঙাচোরা, সংকেতও ঠিকভাবে নেই।
পারিপার্শ্বিক অবস্থা বলতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কের পাশের লোকালয়ের অবস্থান ও মানুষের সচেতনতার বিষয়টি। দ্রুত গতির যানের সঙ্গে নছিমন, করিমন, অটোরিকশাসহ অন্তত ১৫ ধরনের ধীরগতির যান চলে মহাসড়কে। গ্রামীণ সড়ক হঠাৎ করে মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হলে সবার আগে দরকার সঠিক তথ্য। কিন্তু সরকারের কাছে সঠিক তথ্যই নেই। নেই উদ্যোগও।
সরকারি তথ্যের উৎস পুলিশ। সড়ক দুর্ঘটনার পর মামলা হলেই পুলিশ তথ্য সংরক্ষণ করে থাকে। ভুক্তভোগী কেউ মামলা না করলে কিংবা নিজেদের মধ্যে মীমাংসা করে ফেললে পুলিশের খাতায় কোনো তথ্য থাকে না। এ ছাড়া দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে কেউ মারা গেলে সেই হিসাবও পুলিশের কাছে থাকে না।
পুলিশ সদস্য ও ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্ঘটনায় মামলা হলে দুর্ঘটনার কারণসহ ৬৪টি বিষয়সংবলিত একটি ফরম পূরণ করতে হয় পুলিশকে। তথ্য সংরক্ষণ ও মামলা তদন্তে পুলিশের আলাদা কোনো সদস্য নেই। ফলে পুলিশ মামলা করার এবং তথ্য সংরক্ষণের ব্যাপারে আগ্রহ দেখায় না। এ জন্যই পুলিশের তৈরি করা হিসাবে দিন দিন দুর্ঘটনার সংখ্যা ও হতাহতের পরিমাণ কমছে। বঙ্গবন্ধু সেতুর দুই পারের প্রায় ৩৯ কিলোমিটার মহাসড়কের দুর্ঘটনার হিসাব পুলিশ ও সেতু কর্তৃপক্ষ আলাদাভাবে সংরক্ষণ করে। দুই সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু সেতু কর্তৃপক্ষের হিসাবে ২০১৩ সালে এই এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটে ১৭২টি। কিন্তু পুলিশের নথিতে দুর্ঘটনার সংখ্যা মাত্র আট। সেতু বিভাগের হিসাবে এসব দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা ৩৯৫। আর পুলিশের হিসাবে ১৪।
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ভারি যানবাহনের চালক প্রায় আড়াই লাখ। তাদের ১ লাখ ৯০ হাজার লাইসেন্স পেয়েছেন পরীক্ষায় অংশ না নিয়ে। তারা লাইসেন্স পান বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের দেয়া তালিকা ধরে। সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, তিন ধরনের লাইসেন্স দেয় বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)। এর কোনটিরই সঠিক মান যাচাই করা হয় না। নিবন্ধিত যানবাহন অন্তত ৪ লাখের ফিটনেস সনদ নেই। আর যেসব যানের সনদ আছে, সেগুলোর বেশির ভাগকে দেয়া হয়েছে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে। কারণ মোটরযান আইনে যানবাহনের ৫০টির বেশি কারিগরি পরীক্ষা নিশ্চিত করেই চলাচলের সনদ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এসব যাচাই করা হয় যন্ত্রের সাহায্যে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, দক্ষ চালক তৈরিতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। সকল মান যাচাই নিশ্চিত করা ছাড়া লাইসেন্স দেয়া হলে সড়ক নিরাপদ করা সম্ভব হবে না। নিরাপদ সড়ক যোগাযোগের জন্য এডুকেশন-ইঞ্জিনিয়ারিং ও এনফোর্সমেন্ট খুবই জরুরি। এর মধ্যে আমাদের দেশে সড়ক নিরাপত্তার দিক বিবেচনায় ইঞ্জিনিয়ারিং দিকটি ভাল। অন্য দুটির অবস্থা বেহাল।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি দুর্ঘটনার জন্য প্রধান কয়েকটি কারণ ছাড়াও অতিরিক্ত ১৩টি কারণ চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে- হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো, রাস্তা-ঘাটের নির্মাণ ত্রæটি, যাত্রীদের অসতর্কতা, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেড ফোন ব্যবহার, মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো, মহাসড়ক ও রেল ক্রসিংয়ে ফিডার রোডে যানবাহন উঠে পড়া, বাসের ছাদে ও পণ্যবাহী ট্রাকের উপর যাত্রী বহন ও রাস্তায় ফুটপাথ না থাকা বা ফুটপাথ বেদখলে থাকায় রাস্তার মাঝপথে পথচারীদের যাতায়াত। সংগঠনটি সড়ক দুর্ঘটনারোধে কিছু সুপারিশমালা পেশ করে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও পরিবহন মালিক সংগঠনগুলোর কাছে। এর মধ্যে রয়েছে ট্রাফিক আইন ও মোটরযান আইন সম্পর্কে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের, মসজিদ, মন্দির, গির্জায় জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করা।
প্রাণ হারানো বা পঙ্গুত্ববরণের মধ্যেই সড়ক দুর্ঘটনার ট্র্যাজেডি সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের ৫২ শতাংশই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবার নেমে গেছে ছিন্নমূল বা দারিদ্র্যের কাতারে। বেঁচে থাকার জন্য পরিবারের সদস্যদের আর কোনো অবলম্বন নেই।
সড়ক আইন অনুমোদন : পরিবহন শ্রমিক ও মালিক নেতাদের চাপ এবং নানা জটিলতায় ছয় বছর ঝুলিয়ে রাখার পর শেষ পর্যন্ত সরকার সড়ক পরিবহন আইন চূড়ান্ত করেছে। নতুন আইনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৭’। তাতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির জন্য অপরাধীর শাস্তি আগের মতোই দণ্ডবিধি অনুযায়ী দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির অপরাধের জন্য নতুন কোনো বিধান রাখা হয়নি তাতে। তবে চালকের লাইসেন্স নিতে হলে কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি পাস হতে হবে, চালকের সহকারীকেও লাইসেন্স নিতে হবে। বাসে নারীর আসনে পুরুষ যাত্রী বসলে জেল-জরিমানার বিধানসহ বিভিন্ন বিষয় যোগ করে নতুন আইনটি চ‚ড়ান্ত করা হয়েছে। গত সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে আইনটির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।
সড়ক খাত নিয়ে আন্দোলনকারী, যাত্রী প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কে দুর্ঘটনার শাস্তি বাড়িয়ে ও এ ধরনের মামলায় অপরাধীকে জামিন অযোগ্য করা সমীচীন। না হলে দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না। তবে অনেকে বলছেন, প্রচলিত আইনের শতভাগ ও বাধাহীনভাবে প্রয়োগ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
প্রস্তাবিত আইন অনুসারে ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালালে এক বছর কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হবে। আর সড়কে দুটি গাড়ি পাল্লা দিয়ে চালানোর সময় সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা ২৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তবে দুর্ঘটনার জন্য মৃত্যু বা অন্যান্য ক্ষেত্রে আগের মতোই দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। গাড়ি চালিয়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে কেউ নরহত্যা করলে ৩০২ ধারা অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হবে। মৃত্যু নয়, এমন ঘটনায় ৩০৪ ধারা অনুযায়ী সাজা দেওয়া হবে। শুধু দুর্ঘটনা হলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
নতুন আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রাখার দাবি জানিয়ে আসছে বিভিন্ন সংগঠন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘নতুন আইনে আমাদের দাবির প্রতিফলন ঘটেনি। এ ক্ষেত্রে পরিবহন নেতাদের সঙ্গে সরকারের কোনো গোপন বোঝাপড়া হয়ে থাকতে পারে।’
নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় অপরাধীরা জামিন পেয়ে থাকে। এটাকে জামিন অযোগ্য করার দাবি জানিয়ে আসছি আমরা। এর কোনো প্রতিফলন ঘটেনি।’ প্রস্তাবিত আইনে গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যাবে না। কেউ তা করলে এক মাসের কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হবে। প্রস্তাবিত আইনে গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে ২৫টি নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমলযোগ্য অপরাধ হলেও পরোয়ানা ছাড়াই পুলিশ এ ক্ষেত্রে অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে পারবে। প্রস্তাবিত আইন অনুসারে, গাড়ি চালানোর লাইসেন্স ছাড়া কোনো চালক গাড়ি চালাতে পারবে না। কেউ লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। চালকের সহকারীর লাইসেন্স থাকতে হবে। আর তা না থাকলে তাকে এক মাসের কারাদণ্ড অথবা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে।
প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী, বাসে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের সংরক্ষিত আসনে কেউ বসলে বা তাদের না বসতে দিলে এক মাসের কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গত সোমবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ আইনের নীতিগত অনুমোদন ছাড়াও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট আইন-২০১৭ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট (সংশোধন) আইন-২০১৭-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশে ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশকে নতুন আইনে পরিণত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইনে মোটরযান চলাচলে সাধারণ নির্দেশাবলি নামে একটি নতুন ধারায় ২৫টি নির্দেশনা যুক্ত করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close