আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
আপন ভুবন

১৮ বছর ধরে মানবসেবায় দিলরুবা ফেরদৌস

আয়শা সিদ্দিকা আকাশী : জেলা সদর মাদারীপুরে গরিব-অসহায়দের বন্ধুখ্যাত ডা. দিলরুবা ফেরদৌস দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে নারীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও গরিব-অসহায়দের আর্থিক সহযোগিতা করে আত্মতৃপ্তি পান প্রচারবিমুখ মাদারীপুরের নারীদের প্রিয় চিকিৎসক দিলরুবা ফেরদৌস।
মাদারীপুর শহরসহ প্রত্যন্ত গ্রামগুলো থেকে চিকিৎসা নিতে আসা নারীরা চিকিৎসক দিলরুবা ফেরদৌসের ব্যবহার ও আন্তরিকতার জন্যও বারবার ছুটে আসেন শহরের শকুনী লেকপাড়ে অবস্থিত একটি বেসরকারি ক্লিনিকে (চৌধুরী ক্লিনিক)।
অত্যন্ত সাদাসিধেভাবে হাসিমুখে রোগীদের সাথে দীর্ঘ সময় নিয়ে শোনেন তাদের সমস্যার কথা। গরিব রোগীদের বিনামূল্যে দেন চিকিৎসাপত্র। গরিব রোগীদের ওষুধ কেনার জন্য আর্থিক সহযোগিতা দেয়া তার নিয়মে পরিণত হয়েছে। শুধু ওষুধ নয় বিভিন্ন সময় দুস্থ মানুষদের নানা ধরনের সহযোগিতা করে থাকেন এই নারী চিকিৎসক। তবে চেয়ে কখনও ফি নিতে দেখা যায়নি। সামর্থ্য অনুযায়ী যে যা দিয়েছে, তাতেই খুশি। এছাড়াও দীর্ঘ ১০ বছর বিনামূল্যের পাশাপাশি সমর্থবানদের কাছ থেকে মাত্র ৫০ টাকা করে ফি নিয়ে চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন।
কথা হয় সেই চিকিৎসক দিলরুবা ফেরদৗসের সাথে। তিনি বলেন, আমার স্বামী মরহুম ডা. এসএম আলীমুর রেজার কাছ থেকেই মানুষকে ভালোবাসতে শিখেছি। তিনি বলতেন একজন চিকিৎসকের উচিত গরিব-দুঃখী মানুষের পাশে থাকা। বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দেয়া। তার সেই কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আজও গরিব-দুঃখীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়া, ওষুধ দেয়ার পাশাপাশি নানাভাবে আর্থিক সহযোগিতা করে আসছি এবং সারা জীবন এই কাজগুলো করে যাবো। তাই দীর্ঘমেয়াদি আর ধারাবাহিকভাবে এই কাজগুলো করার জন্য আমার স্বামীর নামে একটি সংস্থা খুলতে চাই। সেই সংস্থা হবে গরিব-দুঃখীর আশ্রয়স্থল।
ক্লিনিক, নার্স, রোগী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দিনাজপুর পার্বতীপুরের ইংরেজি শিক্ষক মৃত কফিল উদ্দিন আহম্মেদের মেয়ে ডা. দিলরুবা। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। শ্বশুরবাড়ি যশোর শহরে। স্বামীও ছিলেন একজন চিকিৎসক। ২০১৪ সালে স্বামী ডা. এসএম আলীমুর রেজা ব্রেনস্টোক করে মারা যান। এক মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে সপ্তাহের দুদিনই থাকে মাদারীপুর শহরের শকুনী এলাকায় ও ৫ দিন থাকেন ঢাকার গ্রীন রোড এলাকায়।
এমবিবিএস, এমসিপিএস, ডিজিও পাসসহ বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এমএস কোর্সের (অবস্ এন্ড গাইনি) থিসিস পার্ট-এ আছেন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডা. দিলরুবা ফেরদৌস।
১৯৯৯ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত মাদারীপুরের মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে স্বামী-স্ত্রী দুজনের এক সাথে কাজ করেছেন। তাদের দুজনের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে ঐ সময় মাদারীপুর জেলা ছাড়াও আশেপাশের জেলাগুলো থেকে রোগী আসতেন। ২০০৫ সালে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র ঢাকার আয়োজনে সারা বাংলাদেশের মধ্য থেকে জাতীয় পর্যায় শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক হিসেবে পুরস্কার পান মাদারীপুরের এই চিকিৎসক দিলরুবা ফেরদৌস।
এছাড়াও ২০০৬ সালে ওজিএসবি-এর গাইনি অব সোসাইটিতে শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক হিসেবে সম্মাননা পান।
ডা. দিলরুবা ফেরদৌস বলেন, আমার বাড়ি মাদারীপুর না হলেও এই জেলার মানুষদের প্রতি আমার অনেক মায়া, অনেক ভালোবাসা। সেই ৯৯ সাল থেকে ৭ বছর আমি ও আমার স্বামী মিলে একসাথে কাজ করার সুবাদে ভালোবাসা জন্ম হয়। সেই ভালোবাসার টানে ১৮ বছর ধরে মাদারীপুরে চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছি। বর্তমানে নিজের কাজ ও পড়াশুনাসহ ছেলে মেয়েদের জন্য ঢাকা থাকলেও প্রতি বৃহস্পতি ও শুক্রবার মাদারীপুরে আসি। এই দুদিন রোগীদের সেবা দিয়ে থাকি। অনেক সময় ভাবি মাদারীপুরে আর যাবো না। কিন্তু অসহায় গরিব রোগীদের দীর্ঘ লাইনের মুখগুলো আমাকে বারবার এখানে টেনে আনে।
এ ব্যাপারে মাদারীপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমীর নাট্য বিভাগের শিক্ষক আ.জ.ম কামাল বলেন, ১৮ বছর ধরেই ডা দিলরুবাকে দেখে আসছি। খুবই সাদাসিধে হাসি খুশি একজন মানুষ। অনেক ডাক্তার দেখেছি টাকা জন্য বেপরোয়া হয়ে উঠে। রোগীদের সাথে বাজে ব্যবহার করে। কিন্তু ডা. দিলরুবাকে কখনও রাগ করতে দেখেনি। কোন রোগীর কাছ থেকে টাকা চেয়ে নিতে দেখেনি। বরং গরিব অসহায়দের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, ওষুধ দেয়া এমনকি বিনা খরচে মেয়েলী সমস্যায় অপারেশন করতে দেখেছি।
এ ব্যাপারে প্রেসক্লাবের আহŸায়ক শাহজাহান খান বলেন, আমি নিজেও তার কাছে অনেক গরিব রোগী নিয়ে গেছি। কিন্তু তিনি কোনো ফি নেননি।
ডাক্তার দিলরুবা ফেরদৌসের সহযোগী হেমন্ত সোমা বলেন, সপ্তাহে দুদিন তিনি মাদারীপুরে থাকেন। এই দুদিন একটানা অনেকটাই না ঘুমিয়ে, খাওয়ারও কোন ঠিক নেই শুধু রোগী দেখা, অপারেশনসহ নানা ধরনের চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। গরিবদের কাছ থেকে টাকা নেন না। গরিবরা ছাড়া অন্য রোগীরা যা ফি দেন, তাতেই তিনি হাসি মুখে নিয়ে থাকেন। অনেক সময় দেখা যায় গ্রাম থেকে অনেক রোগী কিংবা রোগীর কোন আত্মীয়-স্বজনের কষ্টের কথা শুনে তাদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেন। অনেকেই আছে মিথ্যা কথা বলেও নানাভাবে আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে থাকেন। কেউ এসে কাঁদলেই কিংবা কেঁদে কেঁদে সহযোগিতা চাইলেই তার প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন তিনি। আসলে ডাক্তার আপা অনেক ভালো, তাই সবাইকে সহজে বিশ্বাস করেন। আর তিনি এইসব সহযোগিতার কথা কাউকে বলতেও চান না।
ক্লিনিকে আসা সদর উপজেলার খোয়াজপুর গ্রামের ফজিলাতুন নেছা, ল²ীপুর গ্রামের আয়শা বেগম, বকুলতলা গ্রামের আনোয়ারা বেগম, ঘটকচর গ্রামের শিউলি বেগমসহ একাধিক রোগী বলেন, আমরা আমাদের নানা সমস্যা নিয়ে, বিশেষ করে মেয়েলি সমস্যা, বাচ্চা হওয়া ইত্যাদি সমস্যা কিংবা অপারেশনসহ নানা বিষয় নিয়ে এই ডাক্তার দিলরুবা আপার কাছেই আসি। সে কোন দিন চেয়ে টাকা নেয়নি। বলেছি আজ টাকা নেই, তাও সে আমাদের চিকিৎসা দিয়েছে। অনেক সময় রোগীদের যাতায়াতের ভাড়ার টাকাও দিতে দেখেছি।
মাদারীপুর সদর উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের পশ্চিম বাহাদুরপুর গ্রামের হেলেনা বেগম বলেন, আমার ১৮ বছর বয়সের ছেলে মাসুদ বেপারী শারীরিক প্রতিবন্ধী। সে হাঁটতে পারে না। তাকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় আনা নেয়া খুব কষ্টকর ছিলো। অনেকের কাছে গিয়েছি। কেউ একটা হুইল চেয়ার দেয়নি। কিন্তু ডাক্তার দিলরুবা আপা আমার এই অসহায়ত্বের কথা শোনামাত্রই আমার ছেলেকে একটি হুইল চেয়ার ও নগদ টাকা দিয়েছিলেন। এখনও তিনি আমাদের খোঁজ খবর নেন। বর্তমান সমাজে এমন ডাক্তার খুঁজে পাওয়া যায় না। তিনি গরিবের বন্ধু। গরিবের ডাক্তার আপা।
শুধু মাসুদ নন, এমন উদাহরণ আছে অনেক। সবার আড়ালে, কোন বাহবা আশা না করে তিনি শুধু অসহায় মানুষের পাশে থাকতে চান। এমন কথা বললেন উন্নয়ন সংস্থা নকশি কাথার সভাপতি নুরুন্নাহার জুই।
মাদারীপুর জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মাহমুদা আক্তার বলেন, আমার দেখা তিনি একজন সৎ, ভালো ও গরিবের ডাক্তার দিলরুবা ফেরদৌস। তিনি প্রায় সময় গরিবদের বিনামূল্যে দেখেন। আমি অনেক গরিব রোগী পাঠিয়েছি। তিনি ফি ছাড়াই দেখেছেন। তাকে দেখে অন্য চিকিৎসকদের উদ্বুদ্ধ হয়ে এভাবে চিকিৎসা সেবা ও মানবসেবা করা উচিত।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close