আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
অপরাধস্লাইড

ফের জঙ্গি তৎপরতা

প্রধান দুই দলের পারস্পরিক দোষারোপ
মূল হোতারা আড়ালে

 

শফিউল আলম দোলন : ‘বছর দেড়েক শান্ত থাকার পর আবার তুঙ্গে উঠেছে জঙ্গি তৎপরতা। কয়েক দিন ধরে সকালে ঘুম থেকে উঠেই শোনা যায় অমুক এলাকার অমুক বাড়ি ঘিরে ফেলেছে পুলিশ। পুলিশের সোয়াত বাহিনীর অভিযান। অতঃপর গুলিতে এতজন হতাহতসহ বাকিরা আটক।’ রাজধানীর হলি আর্টিজান হোটেল ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর থেকে তৎপর পুলিশ বাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর ভ‚মিকা ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এরপর বছরখানেকেরও বেশি সময় দেশে জঙ্গি তৎপরতা প্রায় বন্ধই ছিল। অতি সম্প্রতি হঠাৎ করেই তা বেড়ে গেছে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড আর ঢাকার আশকোনাসহ কয়েকটি জায়গায়ই কয়েক দিনের মধ্যে বেশ কিছু হতাহতের ঘটনা ঘটে গেছে। তবে রাজধানীর কল্যাণপুরের জাহাজবাড়ির অভিযানে হতাহতের ঘটনার পর থেকে জঙ্গি নিধন অভিযানের ঘটনার কাহিনীগুলো প্রায় একই রকমের হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন দেশের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহল।
তবে সরকারি ও বিরোধী দল তথা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের প্রতিপক্ষ বিএনপি জঙ্গিবাদ নিয়ে পরস্পরকে দোষারোপ অব্যাহত রেখেছে। ফলে মূল হোতারা সব সময় আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ঘটনার পর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের পরিষ্কার ভাষায় এই জঙ্গিবাদের জন্য বিএনপি ও জামায়াতকে দোষারোপ করেছেন। একই কথা বলে যাচ্ছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও আওয়ামী লীগ নেতা ড. হাছান মাহমুদ। অতঃপর দেশের অন্যতম বৃহৎ বিরোধী দল বিএনপির নেতারা সরকারের এই জঙ্গি অভিযানকে রহস্যজনক বলে আখ্যায়িত করছেন প্রায় প্রতিদিন। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত বৃহস্পতিবারও জঙ্গিবাদের জন্য সরকারকেই দায়ী করে বলেছেন, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের স্বার্থে সরকারই এতে মদদ দিচ্ছে। যেসব জঙ্গি ধরা পড়ছে তার একটারও এ পর্যন্ত কোনো বিচার করা হয়নি। বরং ধরে ধরে অভিযানের নামে গুলি করে মেরে ফেলা হচ্ছে। এর ফলে জঙ্গি রহস্য রহস্যাবৃতই থেকে যাচ্ছে। দেশের সচেতন মহলের মতে, রাজনৈতিক উভয়পক্ষের এই দোষারোপের রাজনীতিতে আসল অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। ফলে এই জঙ্গিবাদ আর নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না।
আসলে সরকার জঙ্গিবাদ নির্মূল না করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায় বলেই দেশে মাঝে-মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ জঙ্গি তৎপরতা বেড়ে যাচ্ছে। এর জন্য গণতন্ত্রহীনতাই দায়ী। আজকে জঙ্গিবাদের যে ভয়াবহ একটি দানব দেশকে গ্রাস করতে চলেছে, এই জঙ্গিবাদকে সুষ্ঠুভাবে মোকাবিলা না করে শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এটাকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। যার ফলে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। তবে এটা এখন পরিষ্কার যে, এ সরকার জঙ্গিবাদকে নির্মূল করতে চায় না। এটাকে (জঙ্গিবাদ) তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চায়। এ জন্য তারা ক্ষমতায় আসার পর থেকে জঙ্গিবাদ ক্রমশই বেড়ে চলেছে। জঙ্গিবাদ সম্পর্কে পুলিশ ও র‌্যাবের বক্তব্যও একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অন্যদিকে পুলিশের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা বলছেন, সা¤প্রতিক সময়ে দেশে জঙ্গি তৎপরতা বেড়ে গেলেও বাংলাদেশে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) কোনো অস্তিত্ব নেই। রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্যই ইতিপূর্বে দুই বিদেশি নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ সরকারের মন্ত্রী-এমপিসহ রাজনৈতিক নেতাদের সুরে সুর মিলিয়ে সরকারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তারাও এখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ী করে একই কথা বলে যাচ্ছেন। তারা আরো বলছেন, যেসব অপশক্তি দেশের বিরুদ্ধে কাজ করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সংগ্রাম পরিচালনা করছেন পুলিশ বাহিনীর সর্বস্তরের সদস্যরা। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে যে, দেশের কিছু প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গোপনে জঙ্গি তৎপরতা চলছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষার্থীই ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ রাজনীতির স্বপ্ন নিয়ে নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। এই তৎপরতা শুধু অভিযানই নয়, শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে বন্ধ করতে হবে। রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানের হলি আর্টিজান ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ার ঈদগাহ মাঠে হামলার ঘটনায়ও দেশের অন্যতম দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী জড়িত বলে প্রমাণও পাওয়া গেছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত দেশের ৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৩ জনকে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে নর্থ-সাউথের ১১ জন, বুয়েটের ৬ জন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬ জন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ জন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ জন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ বিভাগের ২ জনসহ একজন শিক্ষকও রয়েছেন। তবে বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে চিহ্নিতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছে আইন-শৃংখলা বাহিনীগুলোর পক্ষ থেকে।
জঙ্গি ইস্যুতে এ পর্যন্ত নর্থ-সাউথের পাশাপাশি যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নাম বারবার সামনে এসেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- দারুল ইহসান, ব্র্যাক, বুয়েট এবং ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। তবে নর্থ-সাউথের পর সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের নাম।
সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর শিক্ষক মহিউদ্দিন আহমেদ হিযবুত তাহরীরের প্রধান বলে যখন চিহ্নিত হন। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরে তাকে বহিষ্কার করা হয়।
জঙ্গিবাদ নিয়ে কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, জঙ্গি সংগঠন বেড়ে উঠার অন্যতম কারণ তাদেও প্রশাসনের সহযোগিতা। গ্রন্থাগারে জঙ্গিবাদী বই পাওয়া গেলেও প্রশাসন থেকে কখনই কোনও ব্যবস্থা না নেওয়ায় তা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
এ ব্যাপারে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশিদের ভাষ্য হলো- যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য থেকে এই জঙ্গিদের বিষাক্ত সাপ বেরিয়ে আসছে, ধরে নিতে হবে এদের সুরক্ষা দেওয়ার মতো একটা গর্ত সেখানে আছে। সেই গর্তটিই আগে খুঁজে বের করে বন্ধ করতে হবে।
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের ভিতরের পাশাপাশি সীমান্তু এলাকাগুলোতেও জঙ্গি তৎপরতা বেড়ে চলেছে। এ জন্যে সরকারের পক্ষ থেকে কঠিন ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসমূহকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারি তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের কারাগারগুলোতে ৭৯২ জন বিদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন। বন্দিদের মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, তানজানিয়া, নাইজেরিয়া, মিয়ানমার, হাঙ্গেরি, ক্যামেরুন, মালি ও দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিকও রয়েছে। বন্দীদের মধ্যে বিচারাধীন ৬০৫ জন, দণ্ডপ্রাপ্ত ৭৭ জন ও মুক্তিপ্রাপ্ত ১১ জন রয়েছেন। পার্শ¦বর্তী দেশ থেকে যাতে অবৈধ অস্ত্র বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে এবং দেশি জঙ্গিদের পাশাপাশি বিদেশি কোনো জঙ্গিও যাতে বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে জঙ্গি তৎপরতা না চালাতে পারে সে জন্যে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এজন্য সীমান্ত এলাকায় তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে এবং এ ব্যাপারে সীমান্তের ২৩টি বিওপিকে সংবেদনশীল বিওপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সীমান্তে তৈরি করা হয়েছে ১২৪টি বর্ডার সেন্ট্রি পোস্ট।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close