আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
অর্থনীতিস্লাইড

অপার সম্ভাবনার আধার বঙ্গোপসাগর

রেজাউল করিম খোকন : বঙ্গোপসাগর আমাদের অর্থনীতির জন্য অনেক সম্ভাবনার আধার হয়ে উঠেছে দিনে দিনে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে নীল সমুদ্র। অতি সম্প্রতি মূল্যবান খনিজ সম্পদ ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে বাংলাদেশের অগভীর ও গভীর সমুদ্রের তলদেশে। জানা যায় ১৩ টি জায়গায় আছে সোনার চেয়ে দামি বালি। যাতে মিশে আছে ইলমেনাইট, গার্নেট, সিলিমানাইট, জিরকন, রুটাইল, ম্যাগনেটাইট। অগভীর সমুদ্রে বিপুল পরিমাণ সিমেন্ট তৈরির অন্যতম কাঁচামাল ‘ক্লে’র সন্ধান পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বঙ্গোপসাগরের ১৩টি স্থানে ইলমেনাইট, গার্নেট সিলিমানাইট, জিরকন, রুটাইল ও ম্যাগনেটাইট সমৃদ্ধ ভারী খনিজ বালু পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশের সমুদ্র ভাগেও বড় ধরনের গ্যাসের মজুদ রয়েছে। বøু ইকোনমি ও নীল সমুদ্রের অর্থনীতির সম্ভাবনা সংক্রান্ত অনুসন্ধানী রিপোর্ট থেকে এ সব তথ্য জানা গেছে। এ সংক্রান্ত জরিপ ও অনুসন্ধান চালিয়েছে বাংলাদেশের জ¦ালানী ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এই রিপোর্ট অনুযায়ী অগভীর সমুদ্রের তলদেশে কোবাল্ট, ভানাডিয়াম, মলিবডেনাম ও প্ল্যাটি নামে গঠিত ম্যাঙ্গানিজ ক্রাস্ট এবং তামা, সিসা, জিংক, কিছু পরিমান সোনা ও রূপা দিয়ে গঠিত সালফাইডের অস্তিত্ব রয়েছে। এ সব অতি মূল্যবান সম্পদ সমুদ্রের ১৪০০ থেকে ৩৭০০ মিটার গভীর তলদেশে রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের তলদেশ শুধু অপার খনিজ সম্পদেই পূর্ণ নয় ৩০ থেকে ৮০ মিটার গভীরতায় এক ধরনের ক্লের সন্ধান পাওয়া গেছে। অগভীর সমুদ্রের এই ক্লে উত্তোলন করা গেলে বাংলাদেশের সিমেন্ট শিল্পে বিপ্লব ঘটে যাবে। কারণ ক্লে সিমেন্ট উৎপাদনের অন্যতম কাঁচামাল। সাগরে মূলত দুই ধরনের সম্পদ রয়েছে। এগুলো হলো প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদ। প্রানিজ সম্পদের মধ্যে মৎস্য ও সামুদ্রিক নানা প্রাণী, লতাগুল্ম প্রভৃতির কথা বলা যায়। বঙ্গোপসাগরে মৎস্য আহরণে বাংলাদেশ এখনও যথেষ্টভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি নানা সীমাবদ্ধতার কারণে। যদি পরিপূর্ণভাবে বঙ্গোপসাগরে মৎস্য সম্পদসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী মূল্যবান লতাগুল্ম আহরণের মাধ্যমে এগুলো যথাযথ প্রক্রিয়াকরণের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে রপ্তানি পণ্য তালিকায় এগুলো গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করতে পারে। এমনিতেই রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনায়ন এবং রপ্তানি বাণিজ্যের বহুমুখী করনে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগরের প্রাণিজ সম্পদ বিরাট উৎস হয়ে উঠতে পারে।

বঙ্গোপসাগরে অপ্রাণিজ সম্পদের শেষ নেই। অপ্রাণিজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে তেল, গ্যাস, চুনাপাথর প্রভৃতি। খনিজের মধ্যে আরো রয়েছে ১৭ ধরনের খনিজ বালু। এর মধ্যে ইলমেনাইট, জিরকন, রুটাইল, ম্যাগনেটাইট, গ্যানেট মোনাজাইট, কায়ানাইট, লিকোক্সিন উল্লেখযোগ্য। বঙ্গোপসাগরে এই আটটি খনিজ বালু বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়। এগুলোর দামও অনেক বেশি। বঙ্গোপসাগরে অর্জিত সমুদ্রসীমা থেকে প্রায় ১০ লাখ টন এসব খনিজ বালু আহরণ সম্ভব। এছাড়াও সাগরের তলদেশে ক্লেসার ডেপোজিট, ফসফরাস ডেপোজিট, এডাপোরাইট, পলিমেটালিক সালফাইড, মাঙ্গানিজ নডিউল নামক খনিজ পদার্থ আকরিক অবস্থায় পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। এদের পরিশোধনের মাধ্যমে লেড, জিংক, কপার, কোবাল্ট, মলিব ডেনামের মতো দুর্লভ ধাতুগুলো আহরন করা সম্ভব হবে। এ সব দুর্লভ ধাতু উড়োজাহাজ নির্মাণে, রাসায়নিক কারখানায় এবং বিভিন্ন কলকারখানায় উৎপাদন কাজে ব্যবহার করা যাবে। বঙ্গোপসাগর জড়িয়ে আছে বাংলাদেশে ও মিয়ানমারের সঙ্গে। বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানা নিয়ে বিরোধ ছিল তিন দেশের মধ্যে। ২০১২ তে মিয়ানমার ২০১৪ তে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর ভাগাভাগি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিদ্যমান বিরোধ নি®পত্তি হয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রে বিরোধপূর্ণ ১৭ টি বøকের ১২টি পেয়েছিল বাংলাদেশ। আর এবার ভারতের দাবিকৃত ১০ বøকের সবগুলোই পাওয়া গেছে। এর সঙ্গে বিরোধপূর্ণ ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটার অঞ্চলের ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটার পেয়েছে বাংলাদেশ আর বাকি ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার দেওয়া হয়েছে ভারতের অধিকারে। বাংলাদেশের ভাগে যা পড়েছে তা বিশাল বলা যায়। ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার। পাশাপাশি ২০০ নটিক্যাল মাইলের একচ্ছত্র অধিকার। চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩০৪ নটিক্যাল মাইল মহীসোপনের তলদেশে সব ধরনের প্রাণিজ, অপ্রাণিজ সম্পদের সার্বভৌম কর্তৃত্ব এখন বাংলাদেশের। ভারত এবং মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ কিলোমিটারের বেশি সমুদ্র এলাকা, ২০০ নটিক্যাল মাইলের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকুল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার পেয়েছে। এ বিশাল অঞ্চলে কী পরিমাণ মৎস্য ও খনিজ সম্পদ রয়েছে যা যথাযথ জরিপ ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে আহরণের জন্য প্রধানমন্ত্রী ১৯টি মন্ত্রণালয়কে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। বাংলাদেশের মূল ভ‚খণ্ডে প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদ দিনে দিনে কমে আসছে। অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদেরও আধিক্য কোনো সময়েই ছিল না। সীমাবদ্ধ প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি জোরালো হতে পারেনি। বারবার হোঁচট খেয়েছে। কৃষি ক্ষেত্রেও উৎপাদনশীলতা বেড়েছে বটে তবে এ অবস্থা একটানা দীর্ঘদিন বজায় থাকবে না। কৃষি জমির পুনঃ ব্যবহারের ফলে উৎপাদনশীলতা দিনে কমে আসছে। জনসংখ্যার চাপ এবং শিল্পায়ন-নগরায়নের কারণে কৃষি জমির পরিমাণ কমে আসছে। তেমনি প্রেক্ষাপটে বঙ্গোপসাগর আমাদের অর্থনীতির সমৃদ্ধির জন্য বিরাট ভরসার কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠতে পারে। বঙ্গোপসাগরকে অবহেলা না করে এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে। সাগরে বিরাজমান প্রাণিজ সম্পদ, মৎস্য, সামদ্রিক প্রাণী লতাগুল্ম প্রভৃতি আহরনের বিষয়ে অতীতের গা ছাড়া মনোভাব ত্যাগ করে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব গড়ে তুলতে হবে এ কাজে সংশ্লিষ্টদের। সমুদ্রের তলদেশে লুকিয়ে থাকা খনিজ সম্পদ উত্তোলনের উদ্যোগ হতে হবে অনেক শক্তিশালী। বঙ্গোপসাগরের তলদেশে থাকা মূল্যবান খনিজ সম্পদ যথাযথভাবে আহরণ করে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতির চেহারা পাল্টে যেতে বেশি সময় লাগবে না। এমনিতেই বাংলাদেশের অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে মোটামুটিভাবে সমৃদ্ধির পথ ধরে এগিয়ে চলেছে। আমাদের আগামী দিনের জ¦ালানী নিরাপত্তা নিয়ে অনেক আশংকার কথা শোনা যাচ্ছে। সেই আশংকাগুলো দূর করতে হলে বঙ্গোপসাগরের বিরাজমান খনিজ সম্পদকে পরিপূর্ণ ব্যবহারের নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়ে সরকার আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন হয়েছে। সম্প্রতি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে সমুদ্র অর্থনীতির সম্ভাবনা বাস্তবায়নে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে বøুইকোনমি সেল গঠন করা হয়েছে। এই সেল থেকে সমুদ্র অর্থনীতির সম্ভাবনা বাস্তবায়নে বিভিন্নভাবে কাজ করবে। সমুদ্র সম্পদ আহরণে জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ এবং এ ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। সমুদ্র অর্থনীতির সম্ভাবনা বাস্তবায়নে যে ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে তা আমাদের সবাইকে আশাবাদী করে তুলেছে। এ সব উদ্যোগ যদি বাস্তবায়িত হয় তাহলে বিপুল সম্ভাবনাময় বঙ্গোপসাগরের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার ঘটবে। দেশের বিরাজমান খাদ্য চাহিদা পূরণের পর সামুদ্রিক খাবার বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করা সম্ভব হবে। এ সব সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ ও প্রক্রিয়াকরণ কাজে নিয়োজিত হবে দেশের বিরাট জনসম্পদ। এতে কর্মসংস্থানের দারুণ সুযোগ ও সৃষ্টি হবে সন্দেহ নেই। আর সব কিছু মিলিয়ে বাংলাদেশেল অর্থনীতি আরো নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যাবে। অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে বঙ্গোপসাগরের অব্যবহৃত খনিজ ও প্রাণিজ সম্পদ আহরণ অবশ্যই প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ কিংবা অবহেলার কোনো উপায় নেই।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close