আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
খেলাধুলাস্লাইড

অদম্য রাঙ্গাটুঙ্গির ফুটবলাররা

ওমেনআই ডেস্ক : ‘মেয়ে মানুষ মাঠে ফুটবল খেলতে যায় কখনো? তোমাদের বিয়ে হবে না। ভালো মেয়েরা কখনো বাড়ি থেকে বের হয় না, মাঠে গিয়ে দৌড়ঝাঁপ করে না। মেয়ে হয়ে হাফ-প্যান্ট পরে ফুটবল খেলো, যেন লজ্জা-শরম কিছুই নাই।’

প্রতিবেশীদের মুখে এমনই নানা কটু কথা শুনতে হয়েছে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার রাঙ্গাটুঙ্গি ইউনাইটেড ফুটবল একাডেমির মেয়ে ফুটবলারদের। তারপরও দমানো যায়নি তাদের ইচ্ছাশক্তিকে। এখন উপজেলা, জেলা ও বিভাগ পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ফুটবল খেলছে তারা। একদিন জাতীয় দলে স্থান হবে তাদের- এমন প্রত্যাশা নিয়ে ফুটবল চর্চা চালিয়ে যাচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই মেয়েরা। ওদের কারও বয়স ১২, কারও ১৪, আবার কারও কারও ১৫ বছর। পরিবারে আর্থিক অবস্থাও ভালো না। একাডেমির ২৪ জন মেয়ে ফুটবলারের মধ্যে সাতজন ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর মেয়ে রয়েছে।
সকল বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যেতে হবে- এই প্রতিপাদ্য বুকে ধারণ করে ২০১৪ সালের জুন মাসে রাণীশংকৈল ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ তাজুল ইসলামের পৃষ্ঠপোষকতায় যাত্রা শুরু করে রাঙ্গাটুঙ্গি ইউনাইটেড ফুটবল একাডেমির এই মেয়ে ফুটবল দলটি। বর্তমানে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ফুটবল খেলে সুনাম অর্জন করেছে। সম্প্রতি রাঙ্গাটুঙ্গি মাঠে তাদের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। ১২ বছর বয়সী বিথিকা কিসকু বলল, প্রথম প্রথম যখন মাঠে খেলতে আসতাম তখন পাড়ার মানুষরা খুব খারাপ কথা বলত। মেয়ে মানুষ হাফ-প্যান্ট পরে মাঠে খেলি, এরকম অনেক কথা শুনতে হয়েছে। আমার বিয়ে হবে না বলেও কটূক্তি করেছে অনেকে। আমি বলেছি বিয়ে না হোক, তবুও ফুটবল খেলব।
১৪ বছর বয়সী সোহাগী কিসকু বলল, প্রথম প্রথম পরিবার থেকে বাধা দিত। পরে তাজুল স্যার বাবা-মাকে বোঝানোর পর এখন বাবা-মাই প্রতিদিন মাঠে আমাকে খেলতে পাঠান। সোহাগী আরও বলল, এখন আমরা ঢাকাসহ নানা জায়গায় গিয়ে ফুটবল খেলছি। আমাদের সবাই চেনে এখন। আগে যারা খারাপ কথা বলত, তারা আর ওইসব কথা বলার সাহস পায় না। জাতীয় দলের হয়ে একদিন ফুটবল খেলবে এমনই স্বপ্ন রাঙ্গাটুঙ্গির নারী ফুটবলারদের। হান্না হেমরম নামের একজন বলল, স্কুল ছুটির পরই বিকাল ৪টায় এসে মাঠে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা ফুটবল খেলি। এরপর বাড়ি গিয়ে পড়তে বসি। পড়ায় আগের থেকে এখন মনও বেশি বসে।
শুধু দেশে নয়, বিদেশের মাঠেও খেলার স্বপ্ন দেখছে মিনি হেমরম, আদুরী ও মুন্নী আকতারসহ অন্য নারী ফুটবলাররা। মুন্নী আকতার বলল, ফুটবল খেলে অর্থ উপার্জন করে আমি পরিবারের সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে চাই। পরিবারের সবাইকে ভালো রাখতে চাই।
এই ফুটবল খেলার মধ্য দিয়েই শ্রেণি-বৈষম্য কেটে যাচ্ছে জানিয়ে মিনি হেমরম বলে, আদিবাসী মেয়ে বলে অনেকেই আগে মিশত না আমার সাথে। কিন্তু এখন আমরা হিন্দু, মুসলমান সব ধর্মের মেয়েরাই একসাথে খেলি। ফুটবল খেলতে অন্য এলাকায়ও যাচ্ছি। ধর্মের আর কোনো ভেদাভেদ নাই। সব ধর্মের মেয়েরাই মিলেমিশে ফুটবল খেলছি।
রাঙ্গাটুঙ্গির মেয়েদের ফুটবল প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জয়নুল ইসলাম ও সুগা মরমু। সুগা মরমু জানালেন, এসব মেয়েরা কয়েক বছরেই অনেক ভালো ফুটবল খেলছে। বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ফুটবল খেলে জয়ীও হয়ে আসছে। মেয়েরা আগে শুধু ঘরমুখী ছিল, এখন তারা বাইরে আসছে। তাদের দেখে নতুন মেয়েরাও উৎসাহিত হচ্ছে। তিনি বলেন, আগামীতে এই মেয়েদের অনেকেই আরও ভালো করবে এবং জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ অবদান রাখবে।
অধ্যক্ষ তাজুল ইসলাম জানালেন, রাঙ্গাটুঙ্গি মাঠে এক ফুটবল টুর্নামেন্টে মেয়েদের খেলতে দেখে তখনই তাদের নিয়ে একটা দল গড়ার চিন্তা করেন তিনি। বললেন, প্রথমে মেয়েদের অভিভাবকদের সাথে কথা বলি। মেয়েরা মাঠে খেলবে এই নিয়ে লোকজন কী বলবে এই ভয়ে অনেক অভিভাবকই মেয়েদের মাঠে পাঠাতে রাজি হননি। এরপর দু-একজন রাজি হলে তাদের দেখে অন্যরাও রাজি হন। তিনি আরও বলেন, মেয়েরা অনেক ভালো খেলছে। ঢাকায় এফএ অনূর্ধ্ব-১৪ তে গ্রুপ পর্বে চ্যাম্পিয়নও হয়েছে। ফেয়ার প্লে ট্রফি জিতেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে খেলছে।
তার দলের মেয়েদের পারিবারিক অবস্থা ভালো না জানিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, মেয়েদের পুষ্টির অভাব রয়েছে। টাকার অভাবে পুষ্টিকর খাবারও খেতে পারে না। স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে এই মেয়েদের স্যানিটারি ন্যাপকিন সরবরাহসহ প্রাথমিক চিকিৎসাগুলো করিয়ে থাকি। সরকার যদি এই মেয়ে ফুটবলারদের পাশে এগিয়ে আসত, তাহলে তারা আরও এগিয়ে যেত।
এ বিষয়ে রাণীশংকৈল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার মো. নাহিদ হাসান বলেন, মেয়েরা ফুটবল খেলছে এটাই আমাদের জন্য ইতিবাচক দিক। দেশের বিভিন্ন জায়গায় তারা খেলতে যাচ্ছে এবং সফল হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের আর্থিক ভাবে সহায়তা করা হয়। তারপরেও সমস্যা হলে তারা যদি আবেদন করে বিষয়টি অবশ্যই দেখব।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close