আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সাক্ষাৎকার / ব্যক্তিত্ব

নারী নির্যাতন রোধে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করছি: সেলিনা হোসেন

ফরিদা ইয়াসমিন:
সেলিনা হোসেন। প্রতিথযশা লেখক হিসেবে ইতিমধ্যেই যিনি বাংলা ভাষাভাষীদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। তিনি শুধু সাহিত্যচর্চাই করেন না। সমকালের রাজনৈতিক-সামাজিক সংকটে নির্ভয়ে কলম ধরেন। মানুষ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, সমকালীন দ্বন্দ্ব সংঘাত যেমন তাঁর কথাসাহিত্যে উঠে এসেছে তেমনি তাঁর প্রবন্ধে কলামে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা গভীরভাবে হৃদয়ে লালন করেন সেলিনা হোসেন। সেলিনা হোসেনের জন্ম ১৯৪৭ সালের ১৪ জুই রাজশাহীতে। পৈত্রিক নিবাস লক্ষ্মীপুর জেলার হাজীরপাড়া গ্রামে। পিতা এ কে মোশাররফ হোসেন। মা মরিয়মন্নেসা বকুল।
ষাটের দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে লেখালেখির সূচনা। পশ্চিমবঙ্গের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ‘যাপিত জীবন’ এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘নিরন্তর ঘন্টাধ্বনি’ উপন্যাস পাঠ্যসূচিভুক্ত। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের মুখোমুখি হলে তাঁর সাহিত্যচর্চা থেকে শুরু করে তাঁর সমকালীন চিন্তা চেতনা পাঠকদের উদ্দেশ্যে খোলামেলাভাবেই বলেছেন।

সেলিনা হোসেনকে শৈশব প্রচন্ডভাবে প্রভাবিত করেছে। তাঁর লেখক হওয়ার পেছনে শৈশবের প্রকৃতি ও পরিবেশ একটা বিরাট ভূমিকা রেখেছে। শৈশব এবং লেখক হওয়া প্রসঙ্গে সেলিনা হোসেন নিজে যা বললেন, আমার জন্মের পর থেকে আমি ছিলাম করতোয়া নদীর পাড়ে একটি গ্রামে। গ্রামটির নাম গন্ড-গ্রাম। সেখানে আমার বাবা চাকুরি করতেন। সেরিকালচার নার্সারি অফিসার। সেরিকালচার নার্সারি অফিসার মানে যেখানে রেশম এবং খড়ের চালের ঠান্ডা ঘর ছিল। যেখানে পলি পোকা পালন করা হতো। ঘরেও পলি পোকা পালতাম শখ করে। এইসব পরিবেশ ছিল বলে অবাধ স্বাধীনতা ছিল প্রকৃতির ভেতরে প্রবেশ করার। ছেলেবেলায় পথঘাট, প্রান্তর নদী, নদীর পাড়, মিষ্টি আলুর ক্ষেতে, শামুকের খোল কুঁড়ানো, গাছে চড়া। ধান ক্ষেতের আইল দিয়ে অনেক দূরে যাওয়া এমনি সব বৈচিত্র ছিল।

অভিজ্ঞতার সঞ্চয় এমন ব্যাপক এবং বিপুল, এইগুলোকে কাজে লাগানোর জন্য নিজেকে লেখার টেবিলে নিয়ে গেলাম এবং ভাবলাম কবিতা লিখব, কবিতা দিয়ে শুরু করলাম, পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর মনে হল কবিতা হবে না, আমার যা অভিজ্ঞতা তাকে আমি বড় ক্যানভাসে কাজে লাগাতে চাই। সেই ক্যানভাসটি হবে গল্প। তার চেয়ে যদি বড় হয় তাহলে হবে উপন্যাস। এভাবে শিল্পের জগতে আসা, প্রকৃতি এবং মানুষ দেখে।

প্রশ্ন: লেখার ব্যাপারে আপনার কমিটমেন্ট কি?
সেলিনা হোসেন: প্রথমত কমিটমেন্ট শিল্পের কাছে। যে শিল্প শুধু শিল্পীর জন্যই নয়, যে শিল্প মানুষ এবং মানবিকতার জন্য। যে শিল্পের ভেতর দিয়ে মানুষের কথা গভীরভাবে পরিপূর্ণভাবে বলা যায়।
প্রশ্ন: একজন লেখক কার কাছে বেশি দায়বদ্ধ? পাঠক না নিজের কাছে?
সেলিনা হোসেন: মূলত নিজের কাছে। কারণ নিজের দায়বদ্ধতা থেকেই পাঠকের কাছে অঙ্গীকার করা যায়। নিজের অপূর্ণতা নিয়ে পাঠককে ভরানো যায় না।

প্রশ্ন: লেখালেখির সময়টি কখন?
সেলিনা হোসেন: লেখার জন্য আমাকে সময়টা বের করে নিতে হয়। আমি মনে করি লেখাটাও অন্য আর সব কাজের মতই জরুরি কাজ। সে কাজটি আমাকে করতেই হবে। সেজন্য সবকিছুর ভেতরে লেখার সময় নির্দিষ্ট থাকে। বেশিরভাগ সময় সন্ধ্যায় লিখি। আর সন্ধ্যার সময়টা মিস করলে গভীর রাতে।

প্রশ্ন: আপনার বিবেচনায় আপনার শ্রেষ্ট কাজ কোনটি?
সেলিনা হোসেন: এটা বলা খুব কঠিন, সম্ভবতঃ ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’ উপন্যাস।

প্রশ্ন: উপন্যাসের টেকনিক সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
সেলিনা হোসেন: উপন্যাস জটিল এবং বহুমুখী শিল্প। এর বিস্তার নানা মাত্রিকতায় পরিপূর্ণ। উপন্যাসের কোন গৎবাধা আঙ্গিক নেই। একজন স্রষ্টা তার শিল্পকর্মকে কিভাবে রূপায়িত করবেন সেটা তার নিজস্ব জীবন দর্শন এবং প্রকাশভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল। একজন লেখকের প্রতিটা উপন্যাসই ভিন্নমাত্রার এবং ভিন্ন আঙ্গিকের হতে পারে। সেটা তার সৃষ্টির ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। সেজন্য উপন্যাসের নির্দিষ্ট আঙ্গিকে আমার আস্থা নেই। আমি মনে করি উপন্যাস প্রথমে রচিত হবে এবং তারপরে তার ভেতর থেকে সমালোচক আঙ্গিকের আবিষ্কার করবে। যদি কোন লেখক তার শিল্প কর্মকে গতানুগতিকতায় আবদ্ধ না রেখে নতুন করে একটি দিক-নির্দেশনা দিতে পারে। তাই উপন্যাসের টেকনিক কবিতার ছন্দ নয়, নির্দিষ্ট নাম নেই, উপন্যাস নিজস্ব নিয়ম তৈরি করে এবং খোলস বদল করে।
প্রশ্ন: বর্তমানে যে মেয়েরা সাহিত্য চর্চা করছেন তাদের লেখা আপনি পড়েন?

সেলিনা হোসেন: তাদের লেখা আমি অবশ্যই পড়ি। এই সময়ের নবীন লেখকরা নানাভাবে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের সাহিত্যের একটি অবস্থান নির্মাণে সচেষ্ট। তাদের লেখার আঙ্গিক, বৈচিত্র্য, দেশীয় ঐতিহ্যের পুনঃনির্মাণ এবং রূপকের ব্যবহার বেশি বৈচিত্র্যপূর্ণ। তাদের অনেকেই এদেশের সাহিত্যকে একটি নতুন মাত্রা দিতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।
প্রশ্ন: একজন লেখকের লেখায় তার পরিবেশের প্রভাব কতখানি?

সেলিনা হোসেন: পরিবেশ তাকে অবশ্যই প্রভাবিত করে। তবে লেখালেখির জন্য লেখককে পরিবেশমুক্ত হতে হয়। নইলে তিনি গন্ডিবদ্ধ হয়ে যেতে পারেন।

প্রশ্ন: এদেশে এসিড নিক্ষেপ, হত্যা, ধর্ষণসহ বিভিন্ন নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। এ বিষয়টি নিয়ে ভাবেন কি? সামাজিক এই সমস্যায় আপনি কিভাবে আপনার দায়িত্ব পালন করেন?

সেলিনা হোসেন: বিষয়টি আমাকে গভীরভাবে আতঙ্কগ্রস্ত করে। নির্যাতন কোন অর্থেই সুস্থ স্বাভাবিক সামাজিক পরিবেশের চিত্র নয়। একজন লেখক হিসাবে আমি মূল দায়িত্ব পালন করি মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে।
প্রশ্ন: আমাদের এখানে দীর্ঘসময় প্রধানমন্ত্রী নারী, বিরোধী দলীয় নেত্রী নারী। বর্তামানে স্পিকার একজন নারী। তার মানে কি আমাদের নারী সমাজ এগিয়েছে? তারা আমাদের নারী সমাজের জন্য কতখানি কাজ করেছেন বলে মনে করেন?

সেলিনা হোসেন: নারীদের সামগ্রিক এগিয়ে যাওয়াটা কোন ব্যক্তি বিশেষের ক্ষমতায় থাকা বা বিরোধীদলের প্রধান হিসাবে থাকা তার ওপর নির্ভর করে না। যদি না সেই দল নারীর প্রতি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ইতিবাচক রাখতে পারে। বর্তমান সরকার নারীদের আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। এমন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভবিষ্যতে যারা ক্ষমতায় আসবেন তারা যদি কাজ করেন তাহলে নারীদের অবস্থান পরিবর্তনের অনেকখানি সুযোগ সৃষ্টি হবে।

প্রশ্ন: তরুণীদের উদ্দেশ্যে কিছু বলবেন কি?
সেলিনা হোসেন: একটি কথাই, নিজেকে নারী হিসাবে নিজের ব্যক্তিত্ব নিজের কর্মকান্ড- নিজের স্বাধীনতাকে মূল্যায়ন করে নিজের সামাজিক অবস্থানকে তৈরি করতে যেন সব মেয়েরা পারে।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close