আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
অপরাধস্লাইড

রাজধানীর রাজপথ অবৈধ লেগুনার রাজত্বে

ওমেনআই ডেস্ক : প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর প্রতিষ্ঠান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে শিক্ষার্থীদের গমনাগমনের চাপ কমাতে বছর দশেক আগে ক্যাম্পাসের দক্ষিণ পাশে নির্মাণ করা হয়েছিল দ্বিতীয় ফটক। তাতে শিক্ষার্থীদের উপকার হয়নি, বরং গড়ে উঠেছে অবৈধ লেগুনা (হিউম্যান হলার) স্ট্যান্ড। উপরন্তু এ স্ট্যান্ডের কারণে সংলগ্ন কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এখান থেকে পাঁচটি রুটে নিয়মিত চলাচল করে প্রায় পাঁচশ লেগুনা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময় নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে ফটকটি বন্ধ রাখলেও এর নেপথ্যে রয়েছে মূলত ছাত্রলীগ ও প্রশাসনের রমরমা বাণিজ্য।

রাজধানীর রাজপথ যেন ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি থেকে মুক্ত হয়, এ জন্য পদক্ষেপ নিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র। কিন্তু মেয়রের কার্যালয় ‘নগরভবন’-এর নাকের ডগাতেই রয়েছে লেগুনার স্ট্যান্ড। এসব লেগুনার অধিকাংশই লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা, নেই ফিটনেস। তদুপরি উদ্বেগ বাড়িয়ে দেওয়ার বিষয় হচ্ছে- এগুলোর ড্রাইভার-হেলপার প্রায় সবাই শিশু-কিশোর। তাদের নেই ড্রাইভিং লাইসেন্স, নেই রাজপথে গাড়ি চালানোর মতো মানসিক পরিপক্বতা। ছয়শ থেকে সাতশ লেগুনার নিয়মিত চলাচল রয়েছে গুলিস্তানের এই স্ট্যান্ড থেকে।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) বেঁধে দেওয়া নিয়ম অনুযায়ী, প্রধান সড়কে লেগুনা স্ট্যান্ড করার অনুমতি নেই। তবে বাস্তব চিত্র উল্টো। বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে আড়াই হাজারের মতো লেগুনা চলাচলের অনুমতি আছে। এটি কাগুজে। প্রকৃতপক্ষে রাজধানীতে প্রায় সাত থেকে আট হাজার লেগুনা রয়েছে। এসব অবৈধ লেগুনা বৈধতা দেওয়ার পেছনে রয়েছেন রাজনৈতিক পরিচয়ের স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তাদের নিয়মিত মাসোহারা দিয়েই টিকে আছে এসব লেগুনা-রুট। এসব লেগুনার ড্রাইভারের ৮০ শতাংশই শিশু-কিশোর। আর সহযোগীরা প্রায় প্রত্যেকেই শিশু।

এসব লেগুনা কোনো নিয়মনীতিরই তোয়াক্কা করে না। বেপরোয়া ড্রাইভিং, শিশু হেলপার, লাইসেন্সবিহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, ফিটনেসবিহীন লেগুনা ও অন্যান্য যানবাহনের কারণে রাজধানীতে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা। জানা গেছে, রাজধানীতে চলাচলকারী ৮০ শতাংশ লেগুনার ফিটনেস নেই। কিছু লেগুনার বাইরের অংশ চকচকে হলেও ভেতরের অবস্থা খুবই নাজুক। প্রধান সড়কগুলোতে লেগুনা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও চলছে প্রতিনিয়ত। অন্যদিকে বিকল মাইক্রোবাস কেটে তৈরি করা লেগুনাও চলছে।

গত এক সপ্তাহ রাজধানীর সদরঘাট, মালিবাগ, মোহাম্মদপুর, মহাখালী, ফার্মগেট, নিউমার্কেট, গুলিস্তান, বাসাবো, নীলক্ষেত ও যাত্রাবাড়ী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এসব রুটে লেগুনার সংখ্যা সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজারের মতো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই নীলক্ষেত-পলাশী সড়কের মুখে পুরোটা দখল করে গড়ে উঠেছে লেগুনা স্ট্যান্ড। এ পথে চলাচলকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়তই পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ। স্ট্যান্ড গড়ে ওঠায় রাস্তার দুপাশে শ্রমিকদের আড্ডা এবং বিভিন্ন টং দোকান স্থাপনের কারণে এ সড়কটির এখন বিচ্ছিরি দশা, যা মাস ছয়েক আগেও ছিল দৃষ্টি নন্দনীয়। এই স্ট্যান্ডের কারণে নীলক্ষেত-নিউমার্কেট সড়কে লেগে থাকে ভয়াবহ যানজট। দেশের স্বনামধন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইডেন, গার্হস্থ্য অর্থনীতি ও ঢাকা কলেজের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ভোগান্তি হয়ে দেখা দিয়েছে এই স্ট্যান্ড। নিউমার্কেট স্ট্যান্ডেও দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে লেগুনা স্ট্যান্ড।
রাজধানীর অন্যতম আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ফার্মগেট। এই পয়েন্টে মেশা বিভিন্ন সড়কের মুখে রয়েছে লেগুনা স্ট্যান্ড। ইন্দিরা রোড, আনন্দ সিনেমা হল ও পূর্ব তেজতুরীপাড়া রোডের দিকে গড়ে তোলা হয়েছে আলাদা আলাদা লেগুনা স্ট্যান্ড। বিশেষ করে ইন্দিরা রোডের অনেকটা জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে লেগুনার স্ট্যান্ড। তেজগাঁও কলেজের সামনে থেকে সংসদ ভবনের কর্নার পর্যন্ত পুরোটা রাস্তাই লেগুনার দখলে। এখান থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ লেগুনা মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, শিশুমেলা, ৬০ ফুটসহ বিভিন্ন রুটে চলাচল করে। এই সড়কের রিকশা লেন ও মোটরযান চলাচল করার মূল সড়কেও সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে লেগুনা। ফলে সকাল থেকে গভীর রাত অব্দি যানজট লেগে থাকার পাশাপাশি বিড়ম্বনায় পড়েন পথচারী ও কলেজের শিক্ষার্থীরা।
একই চিত্র রাজধানীর অন্য লেগুনা স্ট্যান্ডগুলোর ক্ষেত্রেও। সব রুটেই দেখা গেছে অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক; বেপরোয়াভাবে চালাচ্ছে গাড়ি। যাত্রী তোলা নিয়ে লেগুনাগুলোর মধ্যে লেগে থাকে রাস্তা দখল করে অসুস্থ প্রতিযোগিতা; হুট করেই ব্রেক কষে যাত্রী তোলা হচ্ছে, যাচ্ছেতাইভাবে দিগি¦দিক ছুটছে গাড়িগুলো। একটি লেগুনায় সাধারণত ৮ জন যাত্রী বসার মতো জায়গা থাকলেও যাত্রী তোলা হচ্ছে ১২ জন। এ ছাড়া ড্রাইভারের পাশে বসানো হয় দুজন। ব্যস্ত সময়ে পেছনের পাদানিতেও একাধিক যাত্রী দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিটি লেগুনার জন্য দৈনিক চারশ থেকে পাঁচশ টাকা দিতে হয় লাইনম্যান ও পুলিশকে। মূলত লাইনম্যান-ই রুট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, বিআরটিএ, রাজনৈতিক নেতা, স্থানীয় প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে চলছে এসব পরিবহন। প্রতিটি রুটেই রয়েছে লাইনম্যান, রয়েছে তাদের একাধিক সহযোগী। তারা মূলত বড় কোনো নেপথ্যচারী প্রভাবশালীর হয়ে কাজ করে মাসিক ও সাপ্তাহিক বেতনের ভিত্তিতে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, রাজধানীতে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা গাড়ির বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। আমরা ফিটনেসবিহীন লেগুনা আটক করে ডাম্পিংয়ে পাঠাচ্ছি।

নগরভবনের সামনেই লেগুনা স্ট্যান্ডের বিষয়ে দৃষ্টিপাত করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। অতিদ্রুত এ জায়গা থেকে লেগুনামুক্ত করা হবে। অনুমোদনহীন ও ফিটনেসবিহীন কোনো গাড়ি চলতে দেওয়া হবে না।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close