আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সারাদেশস্লাইড

হাওরে কৃষকের কান্না

* পাউবো, জনপ্রতিনিধি ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ *নেত্রকোনা হাওর পরিদর্শনে কৃষি সচিব * কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার চিন্তাভাবনা * বেড়িবাঁধ রক্ষায় ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হতে পারে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি

ওমেনআই ডেস্ক : বৈশাখ মাস এখনও আসেনি। এরই মধ্যে বেড়িবাঁধ ভেঙে পানিতে তলিয়ে গেছে ভাটি অঞ্চলের লাখো কৃষকের আয়ের সব ফসল। বছরের এই একটিমাত্র ফসল হারিয়ে কৃষকরা এখন পাগলপ্রায়। বাড়ি বাড়ি নারী-পুরুষের মধ্যে চলছে কান্নার রোল। গত বছরের ফসল হারিয়ে এবার যখন তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিলেন কৃষকরা, ঠিক তখনই এক মুঠো ধানও কাটার সুযোগ হয়নি তাদের। আর এ অবস্থায় এখন হাহাকার শুরু হয়েছে নেত্রকোনো, সুনামগঞ্জ ও সিলেটের কৃষকদের মধ্যে। এজন্য দায়ী করা হচ্ছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের। অবশ্য গত মঙ্গলবার কৃষি সচিব মোহাম্মদ মইনউদ্দীন আবদুল্লাহ যখন নেত্রকোনার প্লাবিত বিভিন্ন হাওর পরিদর্শন করছেন তার আগেই তলিয়ে গেছে ১৬ হাজার ৮ শত ২০ হেক্টর জমির ফসল। অন্যদিকে সুনামগঞ্জ ও সিলেটে পানিতে ডুবে এক লাখ ৮০ হাজার হেক্টও জমির ধান তলিয়েছে। এরমধ্যে শুধু সুনামগঞ্জেই ৭৯ হাজার ৭৯০ হেক্টর জমির ধান। কৃষকদের অভিযোগ, বরাবরই বাঁধ ভাঙলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। কিন্তু এরপর তাদের কার্যকর কোন ভূমিকা দেখা যায় না। তাদের প্রশ্ন সরকার কৃষির উন্নয়নে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও তা কোথায় যায় এবং দুর্নীতি হয়ে থাকলে কোন উপযুক্ত শাস্তি হয় না কেন? এদিকে, পরিদর্শন শেষে কৃষকদের জন্য আশার বাণী শুনিয়েছেন কৃষি সচিব ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার। তারা বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে ক্ষতিপূরণ ও আগামীতে নেত্রকোনার বেড়িবাঁধের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের চিন্তাভাবনা চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে দুর্গত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন।
নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুরী, মোহনগঞ্জ, মদন, কলমাকান্দা উপজেলার বেশক’টি হাওর চলে গেছে পানির নিচে। নতুন নতুন জায়গা দিয়ে ঢুকছে পানি। সাপমরা খালসহ বিভিন্ন সস্নুইস গেটে বালির বস্তা এবং বাঁশ দিয়েও রক্ষা যাচ্ছে না পানি। বিভিন্ন এলাকায় কাঁচা ধান ডুবে যাওয়ায় অনেকে গরু নামিয়ে দিয়েছেন জমিতে। কেউ কেউ গোখাদ্যের জন্য কেটেও নিচ্ছেন।
প্রায় ৪৭টি হাওরের মধ্যে মোহনগঞ্জেই রয়েছে বেশিরভাগ হাওর। আর এসব হাওর রক্ষার্থে আশির দশকে উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের আজমপুর ছেছড়াখালি পর্যন্ত ৩১ কিলোমিটার চরহাইজদা বেরিবাঁধ নির্মাণ করা হয়। এ বাঁধের জালাল পয়েন্টে ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে পিআইসি প্রকল্প অর্থাৎ মেরামতের কাজ শেষ হয় গত ৩১ মার্চ। এর একদিন পরই বাঁধ ভেঙে বিপাকে পড়েন হাজার হাজার কৃষক। পাশাপাশি এ বাঁধের পানি সাপমরা নদীসহ বিভিন্ন সস্নুইস গেট দিয়ে প্রবেশ করছে জেলার ৮ থেকে ১০টি হাওরে। নতুন করে রেগুলেটর লাগানোর কথা থাকলেও গেটে তা না লাগানোর ফলে সাপমরা সস্নুইস গেট ভেঙে গিয়ে ডিঙ্গাপোতাসহ মলি্লকপুরের অনেক গ্রামের ধান তলিয়ে গেছে বলে জানান মলি্লকপুর গ্রামের সালাম ও মজিবুর রহমানসহ আরও অনেকে।
চরহাইজদা বেড়িবাঁধ সংলগ্ন মান্দারোয়া গ্রামের কৃষক হারুন মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এবার আমি প্রায় ২ লাখ টাকা খরচ করে ২২ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলাম। আর ৫-৬ দিন পরই জমির ধানকাটা শুরু করতাম। কিন্তু নেত্রকোনার পানি উন্নয়ন বোর্ড ও তাদের অধীনে গঠিত পিআইসি কমিটির লোকজন সময়মতো সঠিকভাবে বাঁধ মেরামত না করায় পানিতে আমার জমির সব বোরো ফসল তলিয়ে গেছে।
বরান্তর গ্রামের ইদ্রিছ মিয়া, নুর মিয়া, টিটন মিয়া, মতি মিয়াসহ একাধিক কৃষক অভিযোগ করেন, চরহাইজদা বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় কোনার বাঁধও ভেঙে যায়। এতে করে ওই হাওরগুলোতে তাদের ফসলও পানিতে তলিয়ে যায়।
বরান্তর গ্রামের মরহুম ইউনুস আলী চৌধুরীর পুত্র মুজিবুর রহমান চৌধুরী চরহাইজদা থেকে গোটা রাস্তা আগুরা করার দাবি জানিয়েছেন। রাস্তা আগুরা হলে ওই এলাকায় সহজে ফসলের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা দুর্গত এলাকা ঘোষণা করার দাবি জানিয়ে কৃষকদের মধ্যে ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মফিজুল ইসলাম নাফিস বলেন, চলতি বোরো মৌসুমে উপজেলায় ১৬ হাজার ৮২০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু এই অসময়ে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের আধাপাকা বোরো ধান প্রায় সবই পানিতে তলিয়ে গেছে। তলিয়ে যাওয়ার ফসলের আনুমানিক মূল্য প্রায় আড়াইশ’ কোটি টাকা।
মোহনগঞ্জ নাগরিক আন্দোলনের নেতা সৈয়দ মঈন উদ্দিন হোসেন বলেন, বাঁধের জন্য যে টাকা বরাদ্দ ছিল তা বিছিয়ে রাখলেও আজ এ ঘটনা ঘটত না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুর্নীতির ফলে আজ কৃষকরা সর্বহারা।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু তাহের বলেন, হঠাৎ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে ধনু নদীর পানি এসে ঢুকে গেছে। প্রায় ৭০ মিটার বাঁধের অংশ নষ্ট হয়েছে। ৩১ মার্চে ভালোভাবেই কাজ শেষ হয়েছিল।
সুনামগঞ্জেও পানিতে তলিয়ে গেছে জেলার ৭৯ হাজার ৭৯০ হেক্টর জমির ধান। বিগত কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টি ও দুর্বল বাঁধ নির্মাণের কারণে এ অবস্থা হয়েছে বলে কৃষকদের অভিযোগ। এছাড়া জেলার দোয়ারাবাজার, বিশ্বম্ভরপুর ও সদর উপজেলার জাহাঙ্গীর নগর ইউপির ৩২০ হেক্টর জমির বর্ষাকালীন সবজির খেত নষ্ট হয়ে গেছে।
গদর উপজেলার আবদুল্লাহপুর গ্রামের কৃষক জমির আলী বলেন, ‘এ বছর ঋণ করে জমি চাষ করেছি। সব ফসলতো পানিতে তলিয়ে গেছে, এ বছর একটি ধানও পাব না। কীভাবে সংসার চালাব, আর কীভাবেই বা ঋণের টাকা সুদ করব?’
একই গ্রামের আরেক কৃষক মইনুল মিয়া বলেন, শীতের সময় যদি হাওরের বাঁধ ঠিকমতো নির্মাণ বা মেরামত করা হতো তাহলে আর এ দুর্যোগের মধ্যে পড়তে হতো না। কিন্তু কাজ শুরু করতে দেরি হওয়ায় বৃষ্টির পানিতে বাঁধের মাটি গলে পানির সঙ্গে মিশে গেছে। ফলে সহজে বৃষ্টির পানি হাওরের ফসলি জমিতে ঢুকে পড়েছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক জাহিদুল হক গত মঙ্গলবার বলেন, এখন পর্যন্ত ৭৯ হাজার ৭৯০ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। শাল্লা উপজেলার দিকে কিছু জমি রয়েছে সেখানে এখনও পানি ওঠেনি। তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে এ জমিগুলোও রক্ষা পাবে কিনা সন্দেহ রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আফসার উদ্দীন জানান, হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ একটু দেরিতে শুরু হয়েছে। সুনামগঞ্জে অতিমাত্রায় বৃষ্টি হওয়ার ফলে বাঁধের ওপর দিয়ে পানি ঢুকে গেছে।
বুধবার দুপুরের দিকে সিলেট কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মামুনুর রশিদ জানিয়েছেন সিলেট বিভাগজুড়ে ১ লাখ হেক্টর বোরোধান তলিয়ে গেছে। এরমধ্যে কেবল সুনামগঞ্জেই তলিয়েছে ৮০ হাজার হেক্টরের বেশি।
এদিকে ভারতের আসাম, মেঘালয়সহ সুরমা কুশিয়ারার প্রবেশমুখের উজানে টানা ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে বলে জানা গেছে। তা আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকবে।
এদিকে, গত মঙ্গলবার নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার প্লাবিত বিভিন্ন হাওর পরিদর্শন করে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন কৃষি সচিব মোহাম্মদ মইনউদ্দীন আবদুল্লাহ ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার জিএম সালেহ। পরিদর্শন শেষে সন্ধ্যায় নেত্রকোনা সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সচিব জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। একই সময় বিভাগীয় কমিশনার আগামী বছর নেত্রকোনা বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে জানান।
কৃষি সচিব ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিলেও বেড়িবাঁধ নির্মাণে যে দুর্নীতি ও গাফিলতি হয়েছে এর বিরুদ্ধ ব্যবস্থা নেয়ার কোন কথাই বলেননি। হাওর অঞ্চলের কৃষকরা আশঙ্কা করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতিতে আগামী বছরও তাদের সর্বস্বান্ত হতে হবে আর প্রশাসন থেকে পাওয়া যাবে শুধু আশ্বাস।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close