আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
অপরাধস্লাইড

মুফতি হান্নানের ফাঁসি

ওমেনআই ডেস্ক : হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান ও তার দুই সহযোগী শরীফ শাহেদুল ওরফে বিপুল এবং দেলোয়ার হোসেন রিপনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। গতকাল রাত ১০টার দিকে মুফতি হান্নান ও বিপুলের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয় গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে। প্রায় একই সময় জঙ্গি রিপনকে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানো হয়। ২০০৪ সালে সিলেটে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার দায়ে তাদের মৃত্যুদ- দিয়েছিলেন আদালত।

কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মিজানুর রহমান কারাফটকে সাংবাদিকদের জানান, মুফতি আবদুল হান্নান ও শরীফ শাহেদুল ওরফে বিপুলের ফাঁসি কার্যকর করা হয় রাত ১০টায়। অন্যদিকে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে সিনিয়র জেল সুপার ছগির মিয়া বলেন, রাত ১০টা ১ মিনিটে দেলোয়ার হোসেন রিপনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
এদিকে কাশিমপুর কারাগারে আগে থেকেই জল্লাদ রাজু এবং তার সহযোগী ইকবাল ও সফিককে প্রস্তুত রাখা হয়। ফাঁসির মঞ্চে নেওয়ার আগে জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান ও তার সহযোগী বিপুলকে করানো হয় গোসল। এরপর তওবা পড়ান কারা মসজিদের পেশ ইমাম হেলাল উদ্দিন। পরে জল্লাদরা দুজনকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যান। অনেকটাই স্বাভাবিক ছিলেন হুজি নেতা মুফতি হান্নান ও তার সহযোগী বিপুল। ঘড়ির কাঁটা যখন ১০টার ঘরে, ঠিক তখনই জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন এবং কারাগারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সামনে ফাঁসির মঞ্চে ঝুলিয়ে তাদের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। আধাঘণ্টা ঝুলে থাকার পর মরদেহ নামানো হয়। এরপর সিভিল সার্জন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। ঠিক একই প্রক্রিয়ায় সিলেট কারাগারে থাকা আরেক জঙ্গি দেলোয়ার হোসেন রিপনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
ফাঁসি কার্যকরের কয়েক ঘণ্টা আগেই কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার এবং সিলেট কারাগারের চারপাশ ঘিরে অবস্থান নেয় পুলিশ, র‌্যাবসহ নিরাপত্তা বাহিনী। এর আগে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্কাবস্থায় রাখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এর আগে প্রাণভিক্ষা চেয়ে মুফতি আব্দুল হান্নানসহ তিন জঙ্গি রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেছিলেন। তবে রাষ্ট্রপতি সে আবেদন নাকচ করে দেন। গত সোমবার নাকচ করা সেই আবেদনসহ সরকারি নির্বাহী আদেশ কারা কর্তৃপক্ষের হাতে আসে। এর পরই শুরু হয় মৃত্যুদ- কার্যকরের প্রক্রিয়া। এরই অংশ হিসেবে তিন জঙ্গির সঙ্গে শেষবারের মতো সাক্ষাৎ করার জন্য সোমবারই কর্তৃপক্ষ স্বজনদের কাছে বার্তা পাঠায়। মঙ্গলবার রিপনের সঙ্গে তার স্বজনরা সাক্ষাৎ করেন। গতকাল সন্ধ্যায় তাদের আরেক দফা দেখা করার সুযোগ দেওয়া হয়। অন্যদিকে গতকাল সকালে মুফতি হান্নানের স্ত্রী জাকিয়া পারভীন রুমা বেগম, বড় ভাই আলী উজ্জামান মুন্সী, মেয়ে নাজনীন ও নিশি খানম কারাগারে প্রবেশ করে মুফতি হান্নানের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর দেখা করেন তার কারাবন্দি দুই ভাই মহিবুল্লাহ ও আনিসুর রহমান। তারা প্রায় আধাঘণ্টা কথা বলেন।
মুফতি হান্নানের নির্দেশে ২০০৪ সালের ২১ মে সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ) মাজার প্রাঙ্গণে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই পুলিশের এএসআই কামাল উদ্দিন নিহত হন। এ ছাড়া পুলিশ কনস্টেবল রুবেল আহমেদ ও হাবিল মিয়া নামের আরেক ব্যক্তি মারা যান হাসপাতালে। আনোয়ার চৌধুরী ও সিলেটের জেলা প্রশাসকসহ অন্তত ৪০ জন ওই ঘটনায় আহত হন। পরে এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার চূড়ান্ত রায়ে আপিল বিভাগ গত বছরের ৭ ডিসেম্বর তিন আসামির ফাঁসির রায় বহাল রাখেন।
এ মামলার দুই আসামি মহিবুল্লাহ ও আবু জান্দালকে হাইকোর্ট যাবজ্জীবন কারাদ- দিয়েছিলেন। আপিল না করায় তাদের ওই সাজাই বহাল থাকে। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর মৃত্যুদ-প্রাপ্ত তিন আসামি রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করেন। তাদের আবেদন গত ১৯ মার্চ সর্বোচ্চ আদালতে খারিজ হয়ে যায়। ফলে চূড়ান্ত বিচারেও ফাঁসির রায় বহাল থাকে।
১৯৯৯ সালে যশোরে উদীচীর সম্মেলনে বোমা হামলার মাধ্যমেই জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের আত্মপ্রকাশ। ওই হামলার পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের নৃশংস ও কালো অধ্যায় শুরু করেন মুফতি আবদুল হান্নান মুন্সি। তবে ওই ঘটনায় তিনি আলোচনায় আসেননি। ২০০০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া কলেজ মাঠের জনসভাস্থলের পাশেই ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখা হয়। এ ঘটনায় প্রথম আলোচনায় আসেন মুফতি হান্নান। এরপর ১৩টি বড় বোমা ও গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনা এবং নেতৃত্ব দেন। তাকে ফাঁসি দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ক্ষেত্রে মুফতি হান্নান অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
কোটালীপাড়ায় খুশির বন্যা
মুফতি হান্নানের ফাঁসি হওয়ায় তার জন্মস্থান গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার মানুষ খুশি। তাকে কোটালীপাড়ায় দাফন করতে না দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন স্থানীয় নেতারা। উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, এক হান্নানের জন্য আমরা কোটালীপাড়াবাসী তথা গোপালগঞ্জের লোকজন কলঙ্কিত হয়েছি। তার মতো কুলাঙ্গারের ফাঁসি হয়েছে মানে আমরা একটু হলেও কলঙ্কমুক্ত হলাম। তার মতো খারাপ লোকের লাশ এখানে দাফন করতে দেব না। তিনি বলেনÑ জঙ্গি কর্মকা- করলে, বোমা মেরে মানুষ হত্যা করলে কী পরিণতি হয় তা মুফতি হান্নানকে দিয়েই দেখা গেল। তাই কোনো লোক আর ওই পথে যাবে না।
মুফতি হান্নান সরকারের কাছে অপরাধী : মা রাবেয়া বেগম
মুফতি হান্নানের মা রাবেয়া বেগম বলেছেন, আমার ছেলে সরকারের কাছে অপরাধী। সরকার তাকে যে শাস্তি দিয়েছে তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু আমাদের পরিবারের অন্য যেসব নিরপরাধ মানুষ রয়েছে তাদের যেন হয়রানি করা না হয়। আমার ছেলে মুফতি হান্নান কোথায়, কী কর্মকা- করেছে না করেছে, তা আমি জানি না। তবে আমার সামনে সে কখনো কোনো খারাপ কাজ করেনি।
স্ত্রী রুমা বেগম জানান, তার চার সন্তান, এর মধ্যে দুটি ছেলে ও দুটি মেয়ে। দুই মেয়ে নিয়ে তিনি গ্রামের বাড়িতেই থাকেন। তারা গ্রামের মহিলা মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে। আর বড় ছেলে যশোর কলেজের ছাত্র। ছোট ছেলে ঢাকায় একটি মাদ্রাসায় পড়ছে।
মুফতি হান্নানের বড় ভাই মো. আলিউজ্জামান মুন্সি বলেন- হান্নানের কর্মকা-ের জন্য তার যে সাজা হয়েছে, তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আল্লাহ যা করেছেন আমরা তাই মেনে নিয়েছি। কী দোষ করেছিল আমরা তা জানি না। মুফতি হান্নানের দুই ছেলের কেউ তার বাবার লাশ দেখতে যাবে না বলে নিশ্চিত করেন তিনি।
আলিউজ্জামান আরও জানান, ফাঁসি কার্যকর হওয়ার আগে আমরা যখন দেখা করেছিলাম তখন হান্নান বলেছিল- সে নির্দোষ, তাকে ষড়যন্ত্র করে এ রায় দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারের কাছে আমার মায়ের পক্ষ থেকে একটাই দাবি, হান্নানের লাশটা যেন আমাদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close