আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সারাদেশস্লাইড

নবপ্রাণের উচ্ছ্বাসে শুরু হোক নতুন পথচলা

রেজাউল করিম খোকন : কালের আবর্তে হারিয়ে গেল আরো একটি বছর। ১৪২৩ বিদায় নিচ্ছে আমাদের কাছ থেকে। নতুন বাংলা বছর ১৪২৪ কে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত সবাই। নতুন বছরকে বরণ করে নিতে চারদিকে চলছে ব্যাপক তোড়জোড়। ব্যাপক আয়োজনে বাঙালী নববর্ষের বর্ণাঢ্য উচ্ছ¡াসময় উৎসবের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। মেয়েদের পরনে লাল-সাদা শাড়ি, খোঁপায় বেলিফুলের মালা। রং বেরঙের পুতুল, মাটির খেলনা, মুখোশ, বাঁশি আর সাস বাতাসার ছড়াছড়ি। কোথাও নাগরদোলা, তারই পাশে হয়তো সার্কাস, লাঠি খেলা। চিরচেনা এ দৃশ্য আমাদের বৈশাখী উৎসবের। প্রতিবারের মতো এবারও মঙ্গল শোভাযাত্রায় নতুন বছরকে বরণ করতে প্রস্তুত বাঙ্গালীর উচাটন মন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে যেমন চলছে শোভাযাত্রার প্রস্তুতি তেমনি বিভিন্ন এলাকা প্রস্তুত হচ্ছে বৈশাখী মেলার জন্য। এখন রাজধানী ঢাকা এবং অন্যান্য বড় বড় শহরগুলোতে বৈশাখী মেলার ধুম পড়ে যায় নতুন বছরের প্রথম দিনটিতে। বরাবরের মতোই এবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাজুড়ে চলবে নববর্ষের উৎসব। চারুকলা থেকেই সকাল সকাল বের হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা নতুন বছর প্রত্যেক বাঙালির মনে অনাবিল আনন্দ আর সুখের বার্তা বয়ে আনুক, এমন প্রত্যাশা আর দেশের মঙ্গল কামনায় এ শোভাযাত্রার আয়োজন। রমনার সবুজ বৃক্ষের ছায়াতলে চলবে পান্তা-ইলিশ উৎসব। মাটির শানকিতে মাছে ভাতে বাঙালীর চিরচেনা খাবার ইলিশ ভাজা দিয়ে পান্তাভাত। খুব ভোর থেকে রমনার বটমূলে চলবে ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।

প্রকৃতির নিয়মে দেখতে দেখতে শেষ হয়ে এলো বাংলা সন ১৪২৩। বসন্তের শেষে গ্রীষ্মের ছোঁয়া লেগেছে প্রকৃতিতে। রোদের তাপদাহ বাড়ছে দিন দিন। আকাশে মেঘ জমছে। হঠাৎ বৃষ্টি ঝড় শুরু হয়ে গেছে। প্রকৃতি তার আপন বৈশাখীরূপে সেজে উঠছে। সেই ছোঁয়া লেগেছে শহর, গ্রাম আর শহরতলীতে। সবাই নিজ নিজ ভাবনায় প্রস্তুতি নিচ্ছে কিভাবে বরণ করবে পয়লা বৈশাখকে। কৃষি কাজের সুবিধার্থে বাংলা সন প্রবর্তনের হাত ধরে পয়লা বৈশাখের যাত্রা শুরু। দিন কয়েক পরেই বাংলা নববর্ষের আগমন। চৈত্রের বিদায়ে বৈশাখের নবযাত্রা। আর পয়লা বৈশাখ মানে ঐহিহ্যের আবাহন। বাঙালিয়ানা ধরে রেখে চিরচেনা আনন্দে নববর্ষ বরণ। প্রাণের সুরে আরও একবার মেতে ওঠা বাঙালি উৎসবে।
বাতাসে কান পাতলেই যেন শোনা যাচ্ছে নতুন বছর পহেলা বৈশাখের আগমনী ধ্বনি। বাংলা বছরের প্রথম এই মাস বৈশাখের সারাটা সময় থাকে দেশজুড়ে আনন্দঘন পরিবেশ। সারাদেশে চলতে থাকে বৈশাখ বরণ উৎসব। বৈশাখ শুধু একটি মাসের নাম নয়, বৈশাখ আগমন মানে তীব্র এক মাতন সারাবেলা। নবোদ্যমে, নবোল্লাসে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে দীপ্ত অঙ্গীকার সবাইকে উজ্জীবিত করে এই দিনে।
পহেলা বৈশাখে জরাজীর্ণ, পুরাতনকে ছেড়ে নতুনের আহŸানে ভেসে যাবে সবাই। ব্যর্থতা, না পাওয়ার গøানি, দুঃখ শোক, বঞ্চনার ক্ষোভ দুঃখ সবই ভুলে আবার নতুন করে জীবনের পথ চলার প্রত্যয় নিয়ে শক্তভাবে দাঁড়াবে নারী পুরুষ শিশু কিশোর তরুণ বয়স্ক সবাই। বৈশাখের রঙে নতুন চেতনায় সাজবে সবাই। বাঙালী যেন আকুল হয়ে প্রতীক্ষা করে বৈশাখী উৎসবের। কেননা আবহমানকাল থেকে বাঙালীর চিরন্তন সর্বজনীন পার্বণ বাংলা নববর্ষ। বাঙালী আর বাংলা নববর্ষ এক বিকল্পহীন অভিযাত্রা। এই সময়ে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই আনন্দে উদ্বেল হয় নববর্ষের আহŸানে। মঙ্গল শোভাযাত্রা, হালখাতা, কারুশিল্প লোক সংস্কৃতির বর্ণচ্ছটা, নতুন রঙিন পোশাক, হলুদ ফুলের সাজসজ্জা এবং ভোরের আলোয় নববর্ষের সূর্যোদয় সবই উদযাপন করার আকাংক্ষায় থাকে প্রতিটি মানুষ। এই সময়ে আমাদের ফ্যাশনভুবন আন্দোলিত হয় নতুন আনন্দে। পোশাকের আয়োজনে আসে নতুন সংযোজন। ডিজাইনে আসে নতুনত্ব। বৈশাখ মানেই লাল-সাদার চিরায়ত রূপ। আগেও নববর্ষের দিন নতুন শাড়ি পরার চল ছিল। উৎসবের নতুন পোশাক হিসেবে সবাই সবাই সাধারণত লাল পাড়ের সাদা শাড়ি বেছে নিত। এর পেছনেও কারণ ছিল। পহেলা বৈশাখ ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সর্বজনীন একটি উৎসব। এই দিনে সবাই নতুন প্রাণের উচ্ছাসে ভেসে যেতে যেতে অনুভব করে বাঙালীত্বের অনাবিল বিচিত্র স্বাদ। বৈশাখ মানেই ষোলো আনা বাঙালিয়ানা। তাই বৈশাখকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজে এখন সাজসাজ রব। ঐতিহ্য আর রঙের সংমিশ্রণে এসেছে নতুন নতুন ডিজাইন।
পয়লা বৈশাখের ছোঁয়া লাগছে মানুষের পোশাকে, অন্দরে, খাবার থেকে সবখানে। তারুণ্য এই বৈশাখে সেজে উঠবে রঙে রঙে। কিভাবে? পোশাকে ও ফ্যাশনে। গত কয়েক দিনে বাজার ঘুরে অনুমান করা গেছে এবার তরুনদের বৈশাখী পোশাকে দেখা যাবে নানা ডিজাইনের খেলা। বিশেজ্ঞরাও এমনটাই আভাস দিলেন। সাদা লাল রঙের পাশাপাশি অন্যান্য রঙের পোশাকও এবার পরবে তরুণ তরুণীরা। পোশাকের কাটছাঁটেও থাকবে বৈচিত্র্য। সূতি শাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির ঐতিহ্য। পয়লা বৈশাখের এত রঙিন পোশাকের আয়োজনের মধ্যে এতটুকু কমেনি সূতি শাড়ির আবেদন। বরং কপালে টিপ, চুলের বাঁধনে ফুলের বাহার আর হাত ভর্তি রঙিন চুড়ি-চিরায়ত বাঙালির চমৎকার এই সাজ পোশাক এদিন ছড়িয়ে দেয় ষোলো আনা বৈশাখীবার্তা।
সবাই যেন নিজের মানের মাধুরীতে তুলে ধরেছে বৈশাখী আমেজ। এখন দোকানগুলোতে আনাগোনা বাড়ছে ক্রেতাদের। বিভিন্ন ধরনের পোশাক কিনছে মানুষ। বিশেষ দিনে সাজটা হওয়া চাই মনের মতো। শুধু পোশাক কিনেই বৈশাখী আয়োজন শেষ হচ্ছে না। ফ্যাশন সচেতন নারীরা ছুটছেন পারলারে। নারীর সৌন্দর্যকে নববর্ষের উৎসবে নতুন রঙে রাঙাতে চলছে কতো অফার কতো আয়োজন। বাঙালীর শ্রেষ্ঠ, বৃহৎ এবং সর্বোচ্চ অসা¤প্রদায়িক অনুষ্ঠান হলো বৈশাখের প্রথম দিনে বাংলা নববর্ষকে বরণ করা। এ অনুষ্ঠানের আনন্দ এবং উচ্ছাস এখন আর গ্রামে গঞ্জে সীমাবদ্ধ নেই।
বাঙালী হয়ে জন্ম নিয়ে বাংলায় কথা বলা, বাংলায় বেড়ে ওঠার কি যে আনন্দ কি যে মজা তা সবাই আমরা অনুভব করি। দেশের মাটি, দেশের সংস্কৃতি যেন আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। সংস্কৃতি মানেই সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে আর মহৎভাবে বাঁচা। আর প্রতিনিয়ত মরতে মরতে বেঁচে থাকাটার নামই অপসংস্কৃতি। অপসংস্কৃতিতে বাংলা ও বাঙালীর প্রতিটি বৈশাখেরই মৃত্যু হচ্ছে। এ মৃত্যু দৈহিক নয়। আত্মিক ও মানসিক। অসুন্দরের উপসনা করে, অকল্যাণের হাত ধরে বেঁচে থাকাটাই অপসংস্কৃতি। এখন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে চলছে অপসংস্কৃতির প্রচণ্ড দাপট লোভ লালসা, ষড়যন্ত্র, হিংসা, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, অপরাজনীতি, জঙ্গীবাদের চর্চা আমাদের চিরন্তন বাঙালীয়ানাকে ¤øান করে দিচ্ছে। আমাদের জীবনাচরণ, খাদ্যাভ্যাস, বিনোদন, আবেগ উচ্ছাস সব কিছুতেই এখন বিদেশী সংস্কৃতির ছাপ সুস্পষ্ট। বৈশাখ এলেই আমরা সবাই একদিনের জন্য যথার্থ বাঙালী হতে নানা কসরত করি। যা অনেক সময় হাস্যকর প্রহসন মনে হয়। শুধুমাত্র লোক দেখানো পান্তা ইলিশ উৎসবের আয়োজন রমনার বটমূলে ঘুরে বেড়ানোর কোন তাৎপর্য থাকে না তখন।
শুধুমাত্র একটি দিনের জন্য বাঙালী সাজার প্রহসন না করে সারা বছরের জন্য বাঙালী হওয়ার শপথ নিতে হবে সবাইকে। আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংস্কৃতি, বাঙালিয়ানা ধরে রাখতে হবে আমরণ। সারা বছর জুড়েই আমরা বাঙালী থাকতে চাই। পোশাক আশাকে, চিন্তা চেতনায় মননশীলতায় বাঙালী সংস্কৃতি ও জীবনবোধকে গুরুত্ব দিতে সবাইকে বিশেষভাবে যতœবান হতে হবে। আসুন, এবারের পহেলা বৈশাখে নববর্ষের আনন্দ উৎসবে ূদয়ের গভীর থেকে আত্মোপলদ্ধির চেষ্টা করি যে আমরা সবাই প্রত্যেকে খাঁটি বাঙালী। আমাদের বৈশাখী উৎসবে বিনোদনে আর উদযাপনে স্বদেশীয় বিশ্বাস, প্রথা ও চেতনাকে যুক্ত করতে যতœবান হই। যারা অপসংস্কৃতির জোয়ারে গা ভাসিয়ে স্বদেশীয় আর স্বজাতীয়, সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে তৎপর তাদের প্রতিরোধ করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এখনই।
পেছনে ফেলে আসা বছরটিতে যেমন আমাদের অনেক গৌরবময় অর্জন রয়েছে তেমনি রয়েছে গøানি দু:খ বেদনাময় অনেক অভিজ্ঞতা স্মৃতি। আমাদের সমৃদ্ধি অর্জনের ধারাবাহিক সাফল্যের বিপরীতে জঙ্গিবাদীদের অপতৎপরতা সবাইকে হতবাক এবং হতাশ করেছে। দেশজুড়ে বিভিন্ন জায়গায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। নারী ধর্ষণ, হত্যা আর নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে। মূল্যবোধের অবক্ষয়, নৈতিকতার অধঃপতনের ঘটনা সমাজে অস্থিরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। মানবতা ভ‚লুণ্ঠিত হচ্ছে বিভিন্ন হিংসাত্মক ঘটনায় এরকম অনেক গøানিময় বোঝা নিয়ে বিদায় নিচ্ছে বাংলা ১৪২৩ সন।
আর মাত্র কয়েকটি দিন। তারপরেই বাঙালীর প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ। আমরা সবাই নবপ্রাণের উচ্ছাসে নতুন পথে এগিয়ে যেতে চাই। দুর্ভাবনা, দুশ্চিন্তার কালো মেঘ সরিয়ে উজ্জ্বল রোদেলা আলোর ভুবনে পথ চলতে চাই। ফেলে আসা অতীত সময়ের গøানি, দুঃখ, শোক হতাশা, বেদনা ভুলে নতুন দিনের স্বপ্নে বিভোর হতে চাই আমরা। নবপ্রাণের আনন্দে ভেসে যেতে চাই সবাই। বাংলা নববর্ষের আগমনী মুহ‚র্তে আমরা ফেলে আসার বছরের পাওয়া না পাওয়ার হিসাব মেলানো নিয়ে অযথা সময় নষ্ট করতে চাই না। এবারের পয়লা বৈশাখের আনন্দ উৎসবে আমাদের প্রত্যাশা সুন্দর সমৃদ্ধ সুখী বাংলাদেশের। যেখানে বঞ্চনা, সংঘাত হানাহানি, লোভ লালসা, সা¤প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ, ক্রসফায়ার, ঘুষ, দুর্নীতি, নারী ধর্ষণ নির্যাতন, লঞ্চডুবি, সড়ক দুর্ঘটনার আতঙ্ক, আর্তনাত আর বেদনা ভরা শোকের মাতন থাকবে না। সবাই একসাথে শান্তি সৌহাদ্য স¤প্রতির মেলবূনে আবদ্ধ থাকবে। শুভ নববর্ষ।

লেখক : ব্যাংকার

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close