আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সারাদেশস্লাইড

পহেলা বৈশাখ : বাঙালির প্রাণের উৎসব

খাদিজা খানম তাহমিনা : বাংলা নববর্ষ পয়লা বৈশাখ বা পহেলা বৈশাখ, বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস বৈশাখের ১ তারিখ। বাংলা সনের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। দিনটি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ উৎসব হিসেবে পালিত হয়। এটি সারা বিশ্বে সকল বাংলা ভাষার মানুষের একটি সার্বজনীন উৎসব। সকল বাঙালি এ দিনে নতুন বছরকে বরণ করে নেয় এবং অতীতের সকল দুঃখ গ্লানি ভুলে যাবার চেষ্টা করে। গ্রেগরীর বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৪ই এপ্রিল অথবা ১৫ই এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালিত হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ই এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। বাংলা একাডেমি কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক পঞ্জিকা অনুসারে এই দিন নির্দিষ্ট করা হয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে সূর্যোদয় থেকে বাংলা দিন গণনার রীতি থাকলেও ১৪০২ সালের ১ বৈশাখ থেকে বাংলা একাডেমি এই নিয়ম বাতিল করে আন্তর্জাতিক রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে রাত ১২.০০টায় দিন গণনা শুরুর নিয়ম চালু হয়।

এখন যেমন বাংলা নববর্ষ নতুন বছরকে বরণ করার নিমিত্তে পালিত একটি সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। তা এক সময় এমনটি ছিল না। তখন বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হয়। এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। তখন কৃষকদের ঋতুর উপরই নির্ভর করতে হতো। ভারতবর্ষে মুগল সম্রাটরা হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করতো। কিন্তু হিজরী সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল না হওয়ার কৃষি ফলনের সাথে মিলতো না। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের জন্য মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। ডিতনি মূূূূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত পায়। সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উৎযাপন শুরু হয়। পহেলা বৈশাখে ভ‚মির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে মিষ্টি বিলাতেন। এই দিনটি উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবেরও আয়োজন করা হতো। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। তখনকার সময়ে এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল ‘হালখাতা’ তৈরি করা।
‘হালখাতা’ হল একটি নতুন হিসাব বই। প্রকৃত পক্ষে ‘হালখাতা’ হল বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকান পাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। সম্রাট আকবরের আমল থেকেই ‘হালখাতা’ বা ‘পুণ্যাহ’ এর প্রচলন ছিল। হালখাতা পহেলা বৈশাখের আচার অলংকার হিসেবে বিবেচিত হয়। কোথাও কোথাও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে হালখাতা খোলা হয় পহেলা বৈশাখে। এখনও অনেক জায়গায় বিশেষ করে হাটবাজার, শপিংমলগুলোতে ফুলে ফুলে সঞ্জিত করা হয় পহেলা বৈশাখে। পুরান ঢাকার এলাকাগুলোতে হালখাতা উপলক্ষে চলে নানা আয়োজন। আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর পাওয়া যায় ১৯১৭ সাথে। এরপর ১৯৩৮ সাথে ও নববর্ষ পালনের কথা শুনা যায়। তবে ১৯৬৭ সনের আগে ঘটা করে নববর্ষ পালনের রীতি তেমন একটি জনপ্রিয় ছিল না। বাংলাদেশে নতুন বর্ষকে বরণ এখন ঈদ, পূজা, পার্বণের মতোই উৎসবে রূপ নিয়েছে।
নববর্ষ উদযাপন গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গ্রামে বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে নানা রকম প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। সকালে সকলে নতুন কাপড় চোপড় করে মেলায় যায়, মেলায় থাকে নানা আয়োজন। বড় কোন খোলা মাঠে বৈশাখী মেলার আয়োজন করে গ্রামবাসী। সারাদিন শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলের মধ্যেই থাকে খুশির আমেজ। বিভিন্ন প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকে নৌকা বাইচ, লাঠি খেলা কিংবা তবে এখন অনেক বদলে গেছে গ্রামের বৈশাখী মেলার খেলার আয়োজন। এখন বিভিন্ন টুর্নামেন্টের আয়োজন করে কিশোর-যুবারা। ফুটবল এবং ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বেড়ে গেছে গ্রামে। তবুও বৈশাখী আয়োজনে নৌকাবাইচ ঐতিহ্যবাহী একটি প্রতিযোগিতা। কুস্তি খেলারও একটি বেশ কদর আছে গ্রামের বৈশাখী আয়োজনে। বেশ ধুমধামের সাথে প্রস্তুতি চলে এসব খেলার জন্য নবর্বষের কয়েক দিন ধরে। গ্রামে নববর্ষ এক নব আনন্দ উৎসবের জন্য দেয় বাংলার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে।
রাজধানী ঢাকায় নববর্ষের চিত্র আমোদপূর্ণ ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিনোদন কেন্দ্রগুলো বৈশাখী কাজে সজ্জিত হয়। পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট। বৈশাখী গান গেয়ে নতুন বছরকে বরণ করার আয়োজন চলে ছায়ানটে।
১লা বৈশাখের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রমনার বটমূলে ছায়ানটের গিয়ে উঠেন।
এসো হে বৈশাখ
এসো এসো
তাপস নিশ্বাস বায়ে
মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে
বৎসরের আবর্জনা
দূর হয়ে যাক যাক যাক…
১৯৬৫ সালে প্রথম রমনার বটমূলে বর্ষ বরণের সূচনা হয়েছিল। এখন তা বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সারাদেশের মানুষ এই প্রাণের উৎসবে মেতে উঠে। বাঙালির এই প্রাণের মেলা শুধু বাংলাদেশেই নয়, নববর্ষ উপলক্ষে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশেও এই উৎসবের নানা আয়োজন হয়। ঢাকায় নববর্ষের বিশেষ আকর্ষণ হল মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে এই শোভাযাত্রা বের করে। শোভাযাত্রায় বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করে। জানা যায় ১৯৮৯ সাল থেকে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখে বের করা হয়।
পহেলা বৈশাখ সুখময়তা বয়ে আনবে সবার মাঝে এই প্রত্যাশা থাকলেও এউ উৎসবটি কখনো তা বেদনাদায়ক ও হয়। ২০০১ সালের পহেলা বৈখাখে বোমা হামলা আমাদের ূদয়ে এখনো আতংক তৈরি করে। গত কয়েক বছরে নানা অপ্রীতিকর ঘটনায় বাঙালীর এই প্রাণের উৎসবে যেন ভাটা পড়েছে। কালবৈশাখী ঝড়ের মতো উড়িয়ে নিয়ে গেছে মানুষের আনন্দগুলো। এক শ্রেণির মানুষরূপী প্রাণী নারীদের লাঞ্ছনা করে এই প্রাণের উৎসবকে কলঙ্কিত করেছেন। এই ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। সেই মানুষ্যরূপী প্রাণীগুলো কলুষিত করেছে আমাদের এই প্রাণের উৎসবকে। কিন্তু এসব করে কি বাঙালীর চিন্তাও মননে যে চেতনা সঞ্চারিত হচ্ছে তা দমিয়ে রাখা যাবে? এখন বর্ষবরণ প্রতিটি পাড়া মহল্লায় আয়োজিত হয়। ১লা বৈশাখকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করে জাতীয় মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে ১লা বৈশাখ ছুটির দিন। ১লা বৈশাখ শুভ নববর্ষের এই দিনে নানা রকম মেলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মেলাগুলো হলো বউমেলা, বৈসাবি, ঘোড়ামেলা ইত্যাদি। নতুন বছর মানুষের নতুন কল্যাণ বয়ে আনে, দূরীভ‚ত হয় পুরনো কষ্ট ও ব্যর্থতার গøানি। তবে নববর্ষের নামে অশ্লীলতা, অবাধ মেলামেশা, নৈশ পার্টি ইত্যাদি সমাজকে কুলুষিত করে। আমাদের প্রাণের উৎসবকে আরো প্রাণবন্ত করতে আমাদের সকলের সমান সহযেগিতা প্রয়োজন। পহেলা বৈশাখ এমন একটি উৎসব যেখানে ধর্মীয় আবহ নেই। সকল স¤প্রদায়ের মধ্যে সামাজিক সপ্রীতির মাধ্যমে ঐক্যের সেতুবূন রচনা করে। পহেলা বৈশাখ সকলের মাঝে শান্তির বার্তা বয়ে আনুক এই প্রত্যাশা।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close