আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
উন্নয়নে নারীস্লাইড

সাফল্যগাথা : তরুণ বিশ্বনেতা মালিহা কাদির

ইয়াং লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড

নারীরাও তৈরি করছেন নতুন কর্মসংস্থান। সে স্বীকৃতি মিলছে বিশ্বদরবারে। তেমন একজন সহজ ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক মালিহা মালেক কাদির। সম্প্রতি তিনি পেয়েছেন জাতিসংঘের ইয়াং লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড।

অন্দর মহল থেকে বেরিয়ে আজ নারীরা উদ্ভাসিত হচ্ছেন আপন পরিচয়ে। আবিষ্কার করছেন সার্বিক জীবন প্রণালির সহজতম উপায়। ধৈর্য আর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ইতিবাচক পরিকল্পনা বাস্তবায়নও করছেন। সৃষ্টি করছেন নতুন কর্মসংস্থান। অন্যের অধীনে কাজ নয়, কাজ দেওয়ার যোগ্যতা অর্জনে দেখাচ্ছেন দক্ষতা। তাদের এ অর্জন শুধু নিজ দেশের পরিমণ্ডলে নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। এমনই এক নারী সহজ ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক মালিহা মালেক কাদির। একান্ত ইচ্ছা আর দৃঢ়তা তাকে এনে দিয়েছে এই সাফল্য। জাতিসংঘের বিচারে নির্বাচিত হয়েছেন ইয়াং লিডার। বিস্তারিত জানাচ্ছেন—তানিয়া তুষ্টি

সাফল্যের ডানায় আরেকটি পালকের সংযোগদাতা বাংলাদেশের নারী ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা মালিহা মালেক কাদির। সম্প্রতি তিনি বিশ্বের তরুণদের প্ল্যাটফরম ‘ইয়াং গ্লোবাল লিডার্স ক্লাস অব-২০১৭’ পুরস্কার পেয়েছেন। ফোরামের দক্ষিণ এশিয়া ক্যাটাগরিতে তিনি পুরস্কারপ্রাপ্ত একমাত্র বাংলাদেশি। মালিহা কাদির বাস ট্রেনের অনলাইনে টিকিট ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠান সহজ ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম নিজ নিজ ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্ভাবনী, উদ্যোগী ও সামাজিক সংস্কারে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতি বছর এ পুরস্কার দিয়ে থাকে। অনূর্ধ্ব ৪০ বছরের উদ্ভাবনী ও উদ্যমী নারী-পুরুষের মধ্যে যারা নিজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বাইরের দুনিয়া নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেন ও পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন পন্থায় কাজ করেন তাদের এ পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়।

মালিহা মালেক কাদিরের বেড়ে ওঠা ঢাকায়। দেশে ’ও লেভেল শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে যান উচ্চ ডিগ্রি লাভের উদ্দেশে। বাবা ছিলেন রিয়্যাল এস্টেট ও কনস্ট্রাকশন ব্যবসায়ী। মা জীবনবীমা করপোরেশনে চাকরি করতেন।

মালিহা জানান, নিজের ইচ্ছা থেকে বর্তমানে এমন পেশায় আসা। ছোট থেকেই মনে হতো প্রযুক্তিনির্ভর কোনো কাজে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলব। তা ছাড়া কাজের সুবাদে আমার মায়ের অনেক সাক্ষাৎকার পত্রিকায় দেখে খুবই অনুপ্রাণিত হতাম। তখন থেকেই ভাবতাম এমন কিছু করব যার মাধ্যমে আমাকেও সবাই চেনে। আমার কাজের জন্য সবাই প্রশংসা করে। তা ছাড়া আমার পরিবারের অন্য সদস্যরা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে ভালো পদে চাকরি করতেন। এ বিষয়টিও আমাকে ক্যারিয়ার সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।

জাতিসংঘের এই সম্মাননা পাওয়া বৈশ্বিক তরুণরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে জিন-এডিটিং, আবেগ বুঝতে পারা কম্পিউটার এবং জীবনযাত্রা সহজ করার প্রযুক্তি উদ্ভাবন, টেকসই পদ্ধতিতে বিপুল মূলধন বিশিষ্ট কোম্পানি পরিচালনা করা, প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে একটি যুদ্ধবিদ্ধস্ত জাতিকে পুনরায় গড়ে তোলাসহ নানা দিকে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে কাজ করে। এক কথায়, মানুষের জীবনকে আধুনিক ও সহজতর করে তোলার জন্য যারা ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেন তাদের মূলত ইয়াং লিডার হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

এই বছরের ইয়াং গ্লোবাল লিডার্স হিসেবে তারাই নির্বাচিত হয়েছেন, যারা আশার আলো দেখিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, জটিল এবং কঠিন সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য তারা প্রস্তুত। বর্তমান ও সাবেক ইয়াং গ্লোবাল লিডার্সের মধ্যে রয়েছে ফরচুন ৫০০ কোম্পানির পরিচালকরা, অলিম্পিকে মেডেল জয়ী, একাডেমিক পুরস্কারপ্রাপ্ত এবং যারা মানুষের প্রাত্যহিক দিন-বদলের চেষ্টায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

মালিহা বাংলাদেশের পরিবহন শিল্প খাত ডিজিটালকরণে যুগান্তকারী কাজ করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে ইয়াং গ্লোবাল লিডার্স ফোরামের ওয়েবসাইটে। সহজ ডটকম অনলাইন ও মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে বাস, লঞ্চ, সিনেমা, ইভেন্ট এবং ক্রিকেট খেলার টিকিট বিক্রয় করে থাকে। ২০১৪ সালের শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠিত হয় সহজ ডটকম। অনলাইনে টিকিট বিক্রয়ের পাশাপাশি, সহজ ডটকম বাস ও লঞ্চ অপারেটরদের কার্যক্রম পরিদর্শন করার জন্য টিকিটিং সমাধান প্রদান করে থাকে। এরই মধ্যে সহজ ডটকম স্বল্প পরিসরে ৪০টিরও বেশি প্রথম সারির বাস অপারেটর এবং ২০টিরও বেশি নামকরা লঞ্চ অপারেটরকে সার্বক্ষণিক কাজ পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে সহজ ডটকমের সঙ্গে নিজ নিজ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ৮০ জনেরও বেশি দক্ষ তরুণ কাজ করছেন। সহজ ডটকমের সেবাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে রয়েছে সক্রিয় মার্কেটিং বিভাগ। তা ছাড়া সহজ ডটকমের সেবা গ্রহণ সহজতর করতে অনলাইনে নানা নির্দেশনামূলক ভিডিও আপলোড করা থাকে, যেগুলো দেখে গ্রাহকরা সহজেই বুঝে যান কিভাবে ঝামেলা ছাড়াই সেবা নিতে হবে।

মালিহা মালেক কাদির যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথ কলেজ থেকে অর্থনীতি ও কম্পিউটার সায়েন্সে সম্মান ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর তিনি কর্মজীবন শুরু করেন মর্গান স্ট্যানলের নিউইয়র্ক ও সানফ্রান্সিসকো এলাকার ইউটিলিটিজ মার্জারস অ্যান্ড অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল স্পন্সরস কাভারেজ বিভাগের একজন এনালিস্ট হিসেবে। এরপর বাংলাদেশে এসে দুবছর একটি কোম্পানিতে কাজ করেন। পরে তিনি হার্ভার্ড থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে নোকিয়াতে ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো উঠতি বাজারে সিনিয়র বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার হিসেবে নকিয়া লাইফ টুলসের সেবা প্রদানের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ২০০৮ সাল থেকে তিনি সিঙ্গাপুরের দুই বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি ভিস্তা প্রিন্টে ডিজিটাল পণ্যের পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। এ ছাড়া মালিহা খণ্ডকালীন সিঙ্গাপুরের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের জন্য কাজ করেছেন।

মালিহা দাবি করেন সহজ ডটকমের মাধ্যমে টিকিট কাটা সাধারণ গ্রাহকের জন্য খুবই সহজ একটি বিষয়। যেকোনো উৎসবের আগে বাস ও লঞ্চের টিকিটে অত্যন্ত চাপ থাকে। অনেকক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও টিকিট মেলে না। কখনো কখনো ভুয়া টিকিটের ফাঁদে পড়তে হয়। শেষে দেখা যায় টাকা খরচ করেও গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। কিন্তু অনলাইনের মাধ্যমে এখান থেকে টিকিট কাটার সুবিধা থাকায় আপনাকে কোনো রকম ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে না। এ ছাড়াও সিনেমা, খেলা ও বিভিন্ন ইভেন্টের টিকিটও মিলে যাচ্ছে খুব সহজে। তা ছাড়া ফেসবুকের মাধ্যমে আমরা অনেক ধরনের ইনস্ট্রাকশন দিয়ে থাকি। আজকের ব্যস্ত জীবনকে সহজ ডটকম আরও সহজ করে তুলেছে।

তিনি আরও জানান, মাঝে মাঝে আমাদের এখানে টিকিটের ওপর বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা থাকে। তা ছাড়া কোনো ধরনের ঝুঁকি ছাড়াই গ্রাহকের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে কাঙ্ক্ষিত টিকিট। সবার উদ্দেশে তিনি বলেন, অনলাইন টিকিট কাটার আগে বুকিং দিয়ে তারপর টাকা পাঠাতে হবে। তাহলে আর টিকিট পেতে সমস্যা হবে না।

মালিহা বলেন, যেকোনো কাজ করতে অনেক ধৈর্য ধরতে হয়। সেখানে সফলতা আনতেও বুদ্ধি ধৈর্য দুটোই দেখাতে হয়। কারণ আমাদের অনলাইনে টিকিটিংয়ের সুবিধা সম্পর্কে যেমন গ্রাহকদের বোঝাতে হয়, তেমনি বাস মালিক, লঞ্চ মালিককে বোঝাতে হয় কেন তারা আমাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন। ফলে অনেক প্রচার-প্রচারণার ব্যাপার আছে, মোটিভেশনের ব্যাপার আছে। সময়ের ব্যাপারও আছে। সেখানেও মার্কেটিংয়ের জন্য অনেক ব্যয় করতে হয়। তাই কোনো ব্যবসা শুরুর আগে অবশ্যই এসব বিষয় মাথায় নিয়েই কাজ শুরু করতে হবে।

মালিহা ছোটবেলায় আর্কিটেক্ট হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সায়েন্স পড়াটা ভালো না লাগায় সে চিন্তা থেকে সরে আসেন। অথচ সায়েন্স বাদেও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায় আজ তিনি অন্যের অনুপ্রেরণীয়।

তরুণ উদ্যোক্তাদের অনলাইনে ব্যবসার আগে অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরির পরামর্শ দেন মালিহা কাদির। তিনি বলেন, ‘অন্যের প্রতিষ্ঠানে অন্তত পাঁচ বছর কাজ করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করার পর নিজে কিছু করার চিন্তা করুন। নইলে কাজে সফলতা পাওয়া অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। কোনো কাজের পর সন্তুষ্ট হয়ে বসে থাকা আমার পছন্দ নয়। একটা কিছু অর্জন করলে আরেকটি নতুন অর্জনে অগ্রসর হই। কাজের এই পর্যায়ে ইয়াং লিডার নির্বাচিত হওয়ার পর খুবই অবাক হয়েছি। তবে এই সম্মাননা আমার দায়িত্ব-কর্তব্য আগের চেয়ে বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন নতুন করে ভাবতে হচ্ছে কিভাবে নিজেকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close