আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সারাদেশস্লাইড

চ্যালেঞ্জ টপকে বৈমানিক সাদিয়া

তানিয়া তুষ্টি : ছোটবেলা থেকে ব্যাংকার হওয়ার শখ ছিল। দুই ব্যাংকার চাচাকে দেখতাম সকালে ফরমাল পোশাকে অফিসে যাচ্ছেন। কেমন জানি গোছানো জীবন তাদের। একটু বড় হওয়ার পর পুলিশ দাদা নানাকে দেখে ভাবতাম পুলিশ অফিসার হবো। আসলে ছোট থেকেই কেন জানি ইউনিফর্ম লাইফস্টাইলটা খুব পছন্দের। তখন থেকে মনে হতো যে চাকরিই করবো তাতে যেন ইউনিফর্ম থাকে। আমি সব সময় চাইতাম একটি রুটিন লাইফ। ছোটবেলার সে ইচ্ছা অপূরণ থাকেনি আজকের বৈমানিক সাদিয়া আহমেদের। তার উচ্ছ¡াস মাখা হাসিতে যেন ভুবন ভোলে। নিজের অবস্থানে রুটিন জীবন যে খুবই ভালোবেসে ফেলেছেন তিনি।
শত ব্যস্ততার মাঝে অনেক কষ্টে বের করা সময়ে কথা হচ্ছিল ইউএস বাংলার বৈমানিক সাদিয়া আহমেদের সঙ্গে। তার মুখে শোনা গেল, বৈমানিক মানেই শুধু বিমান চালিয়ে গন্তব্যে পৌঁছনো নয়। প্রতিটি ফ্লাইটের আগে থাকে একগাদা পড়াশুনা। যে দেশগুলো পাড়ি দিতে হবে, তার রুট সম্পর্কে জানতে হয়। প্রত্যেকটি দেশের আবহাওয়া সম্পর্কে আলাদা করে খোঁজ নেয়া, সেসব দেশের ‘এয়ার ল’ জানা- সবই সেরে নিতে হয় ফ্লাইটের আগে। নিজের শরীরের প্রয়োজনীয় বিশ্রাম ও ফিটনেস ধরে রাখাও ফ্লাই করার অন্যতম শর্ত। প্রতিটি মুহূর্তকে যেন চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে যাচ্ছি। একটি সেকেন্ডের জন্যও মনোযোগ হারানো চলবে না। কারণ আমার হাতের উপর নির্ভর করছে বিমানের সব যাত্রীর জীবন। আমরা যারা বৈমানিক তারাও এই ঝুঁকির বাইরে নই। তাই প্রতিটি মুহূর্ত যেন টানটান উত্তেজনার। তার ব্যাখ্যায় উঠে আসে বৈমানিকদের অ্যাডভেঞ্চারধর্মী জীবনের প্রতিচ্ছবি।
তার কথায় জানা গেল, প্রতিটি বৈমানিককে ফ্লাইটের আগে কমপ্লিট গ্র“মিং অর্থাৎ গোজগাজটা নিখুঁতভাবে করে তবেই বের হতে হয়। তাই সময়ের দিকে একটু বেশিই নজর দিতে হয়। সাদিয়ার মুখে শোনা গেল, উড্ডয়নের আগে বিমানে থাকা দুজন বৈমানিক বিমানের কন্ডিশন দেখে রিপোর্ট মিলিয়ে দেখেন, কোনো ত্র“টি ধরা পড়লো কিনা। ত্র“টি থাকলে দ্রুত সংশোধন করে তবেই ফ্লাই। এটা প্রতিটি ফ্লাইটের আগের কাজ। সাদিয়া বললেন, একটু অসচেতন হলে বড় ধরনের বিপদের ঝুঁকি। তাই প্রত্যেকের নিরাপত্তার জন্য বিমানের অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ জরুরি হয়।
সাদিয়া আহমেদের গ্রামের বাড়ি সিলেটে। বাবা বনবিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। মা গৃহিণী। যৌথ পরিবারে দুই ভাইবোনের মাঝে বেড়ে ওঠা সাদিয়া আহমেদের। তিনি ছোট থেকেই খুব দ্রুত প্রতিষ্ঠিতও হতে চাইতেন। বাবা আমাকে সব সময় বলতেন, তুমি মেয়ে বা ছেলে হও, ধনী অথবা গরিব যে পরিবার থেকেই আসো একটা সময়ে তোমাকে দিয়েই তোমার বিচার করা হবে। তখন দেখা হবে না তুমি কতোটা সুন্দর, তুমি কতোটা লেখাপড়া জানো, কেমন পরিবার থেকে আসছো, জীবন তোমাকেই মোকাবেলা করতে হবে। আর তাই যত দ্রুত সম্ভব নিজেকে গুছিয়ে নিতে হবে। বাবা সব সময় একটি করে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতেন। সেটা শেষ করে বাবাকে বলতাম তুমি তো বলেছিলে পারবো না, এই যে পেরেছি। তখন বলতেন এটা না বললে তোমার মাঝে চেষ্টার অভাব থাকতো। তিনি বললেন এমন বন্ধুপ্রতিম বাবাকে পাওয়া আসলে ভাগ্যের ব্যাপার।
শহীদ আনোয়ার স্কুল এন্ড কলেজ থেকে ১৯৯৯ সালে এসএসসি ও ২০০১ সালে এইচএসসি পাশ করেন সাদিয়া। এরপর তিনি জিএমজি এয়ারলাইন্সে যোগ দেন এক্সিকিউটিভ হিসেবে। তখন তার মনে হয়, আমি তো ছোট থেকে অন্যকিছু ধারণ করে এসেছি। অফিস টু বাসা ছকবাঁধা জীবন আমার জন্য না। তখন বাবাকে রাজি করিয়ে কানাডার একটি স্কুল থেকে বিমানে প্রশিক্ষণ নিই। এরপর দেশে ফিরে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন। তারপর ২০০৭ সালে জিএমজি এয়ারে বৈমানিক হিসেবে যোগ দিলাম।
বৈমানিক সাদিয়া বিমান চালানোয় যেমন তুখোড়, স্বামী ও এক সন্তানকে নিয়ে সংসার সামাল দিতেও তেমনি পটু। খুব সাজগোজ পছন্দ, আবার রান্নাবান্নাও পছন্দ। যতক্ষণ বাসায় থাকি বাচ্চাকে পুরো সময়টি দিই। এক কথায় খুব করে গুছিয়ে থাকাটা তার খুব পছন্দের। এমন একটি দায়িত্বশীল পেশায় থেকে সাদিয়া সময় সংকটে ভোগেন না। অথচ তাকে প্রায়-ই একদিন দুদিন পরে বাসায় ফিরতে হয়। কখনো এর থেকেও চাপ থাকে। বললেন, আমার স্বামীও বৈমানিক। তিনি আমার টাইম শিডিউল খুব ভালো মতো বোঝেন।
নারীদের এগিয়ে যেতে প্রথমেই আত্মবিশ্বাসী হতে হবে বলে মনে করেন সাদিয়া আহমেদ। তিনি বলেন, আমাদের দেশে একজন গর্ভবতী নারীকে বোঝানো হয় সে অসুস্থ। অথচ এটি জীবনের একটি অংশ। আমাকে বাচ্চা প্রসবের মাত্র তিনদিন পরেই হাসপাতাল থেকে আমাকে রিলিজ দেয়। বারো দিনের মাথায় আমেরিকা থেকে ফ্লাই করে দেশে ফিরে আসি। আমি চাই, অন্য নারীও এমন আত্মবিশ্বাসী হলে কাজের ক্ষেত্রে গর্ভকালীন সময় তার জন্য অসুস্থতার হবে না। তাছাড়া আমরা যখন পুরুষদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে চাচ্ছি তখন কেন সামান্যতে ভেঙে পড়া? ২০০৭ সাল থেকে তিন বছর জিএমজি এয়ার লাইন্স, এরপর পাঁচ বছর রিজেন্ট এয়ার ওয়েজে কাজ করেছেন। বর্তমানে সাদিয়া আছেন ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সে। প্রতি ছয় মাসে তাদের ট্রেনিং থাকে। যাতে হঠাৎ বিপদে পড়লে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারি। আমাদের পুরো কাজটিই রুটিন ওয়ার্ক। এমনকি আমরা যখন বাসায় থাকছি, খাচ্ছি, বিশ্রাম নিচ্ছি পুরোটায় রুটিন মেনে। বেশি খেয়ে বা বিশ্রাম নিয়ে মুটিয়ে যাওয়া ও অসুস্থ হওয়াটা এই পেশায় একদম অনুচিত।
যেসব মেয়ে এই পেশায় আসতে আগ্রহী প্রথমেই তাদের দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে হবে। সাদিয়ার অভিজ্ঞতা বলে, এই পেশায় যোগদানের সময় একটি মেয়েকে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। প্রথমে ধরে নেয়া হয় সে চ্যালেঞ্জ নিতে পারবে না। অথচ নিয়োগ পাওয়ার পর সেই মেয়েটিকে নিজের যোগ্যতা প্রদর্শনে অধিক প্রমাণ দিতে হয়।
কিছু ক্ষেত্রে বেশি যোগ্যতা দেখাতে হয়। বৈমানিক হতে সৌন্দর্যের খুব বেশি দরকার নেই। তবে শারীরিক সুস্থতা, মানসিক দৃঢ়তা ও সাহস দরকার।
ইউনিফর্মের সঙ্গে পুরো গ্র“মিং শেষ করতে একটি মেয়েকে কমপক্ষে ১ ঘণ্টা সময় বেশি হাতে রাখতে হয়। এদিকে আবার তাকে বাসার কাজ করা, বাচ্চা থাকলে তাকেও নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা করে তবে বের হতে হয়। ফ্লাই শেষে বাসায় গিয়ে আগে তাকেই সংসার, বাচ্চা, পরিবারের অন্যান্য সদস্যের প্রতি খেয়াল রাখতে হয়। অপরদিকে পুরুষ বৈমনিকটি বাসায় ফিরেই বিশ্রাম নিতে পারে। পুরুষের তুলনায় একজন নারীর এতোকিছু করার ক্ষমতা থাকে। এজন্য নারী হিসেবে তিনি যথেষ্ট গর্ব অনুভব করেন। তবে এটিও স্বীকার করেন, সুখের সংসার গড়তে স্বামী স্ত্রীর উভয়ের সমান অংশীদারিত্ব থাকা দরকার। নইলে তা সম্ভব না। বৈমানিকদের এমনিতেই একটি সন্তোষজনক বেতন কাঠামো থাকে। তারওপর আবার পদোন্নতি আছে। বছরজুড়ে ফ্লাই করার উপর বার্ষিক ইনক্লিমেন্ট থাকে। তাছাড়া সুশৃক্সক্ষল ও উন্নত জীবন ব্যবস্থা পাওয়ার সুযোগ থাকায় বৈমানিকের চাকরিটি সবার কাছে লোভনীয়। নিজের অবস্থান নিয়ে তিনি খুব গর্বিত। আমি সেই জায়গাতে এসেছি যেখানে খুব সহজেই যে কেউ আসতে পারে না। দশটা ছেলের মাঝে আজ কোনো মেয়েকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। আমি একটি মেয়ে হলেও আমাকে দায়িত্ব দিন। আমি তা ঠিকঠিক পালন করবো। এই বিশ্বাস রেখে সমান করে দেখা শুরু করুন। আমাদের যেন নারী দিবসে অধিকার নিয়ে বারবার কথা বলতে না হয়। তাই মেয়েদের উচিত চ্যালেঞ্জ নিতে শেখা।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close