আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
অর্থনীতিস্লাইড

ওষুধ রপ্তানিতে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ

রেজাউল করিম খোকন : ওষুধ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান দিন দিন আরও উজ্জ্বল হচ্ছে। স্বাধীনতার পর যেখানে দেশের চাহিদার ৭০ শতাংশ ওষুধ বিদেশ থেকে আমদানি হতো এখন সেখান দেশের চাহিদার ৯৮ শতাংশ মিটিয়ে বিশে^র ১২৭ টি দেশে বাংলাদেশে প্রস্তুত ওধুষ রপ্তানি হচ্ছে। শুধুমাত্র দেশের অভ্যন্তরেই বর্তমানে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার বাজার রয়েছে এদেশের ওষুধের। আর দেশের বাইরে রপ্তানি করে বছরে আয় হচ্ছে ৬৫০ কোটি টাকারও বেশি। রপ্তানি প্রবৃদ্ধির হারও ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ওষুধ রপ্তানি খাতটিকে ইতিমধ্যে দারুণ সম্ভাবনাময় একটি খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছেও। এক সময়ে এদেশের মানুষ বিদেশি আমদানিকৃত ওষুধের ওপর প্রচণ্ডভাবে নির্ভরশীল ছিল। এ দেশে তখন তেমন ভালো ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। তখনও ভাবা যায়নি আমদানিমুখী ওষুধ খাত রপ্তানি বাজারে শক্ত অবস্থান দখল করে নিতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশ থেকে এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। প্রতিবছরই বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানির পরিমাণ বাড়ছে আশাব্যঞ্জকভাবে। প্রতিবছর ওষুধ রপ্তানির পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন নতুন দেশ যোগ হচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধ আমদানিকারক দেশের তালিকায়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু জাপানসহ উন্নত বিশে^র শতাধিক দেশে যাচ্ছে বাংলাদেশে প্রস্তুত বিভিন্ন ধরনের ওষুধ। গত বছরে বাংলাদেশের ওষুধের রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির তথ্য অনুযায়ী দেশের দেড় শতাধিক প্রতিষ্ঠান ওষুধ উৎপাদন করছে। এসব কোম্পানি সম্মিলিতভাবে প্রায় ৫ হাজার ব্র্যান্ডের ৮ হাজারের বেশি ওষুধ উৎপাদন করছে। যার মধ্যে বড় ১০ টি কোম্পানি দেশের চাহিদা ৮০ শতাংশ মিটিয়ে থাকে। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান, ফ্রান্স, সুইডেন, ইতালি, কানাডা, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, তুরস্ক, সৌদি আরব, ইরান মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার, মরক্কো, আলজেরিয়াসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য থেকে জানা যায়, চলতি-২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রথম তিন প্রান্তিকে (জুলাই-মার্চ) দেশের ৬ কোটি ৯৬ লাখ ডলারের ওষুধ রপ্তানি হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। দেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে এ আয় সাড়ে ৯ শতাংশ বেশি। ওই সময়ে ( ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের জুলাই-মার্চ মাসে) আয় ছিল ৬ কোটি ১৬ লাখ ডলার। গত বছর পুরো সময়ে আয় হয়েছে ৮ কোটি ২১ লাখ ডলার বা ৬৫০ কোটি টাকা। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সম্প্রতি জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন গত অর্থবছরে (২০১৫-১৬) বাংলাদেশ থেকে ৫৪ টি কোম্পানির ওষুধ বিদেশে রপ্তানি হয়েছে। দেশের উন্নতমানের ৫৪ টির বেশি কোম্পানি ৩০৩ টি গ্রæপের ওষুধ রপ্তানি করে।
পৃথিবীর অনেক দেশের ওষুধের চেয়ে বাংলাদেশের ওষুধের মান অনেক ভালো। পাকিস্তান, শ্রীলংকা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ এমনটি ইউরোপের অনেক দেশের চেয়ে আমাদের ওষুধের মান ভালো। মালয়েশিয়া কিংবা সিঙ্গাপুর আমাদের চেয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নত দেশ হিসেবে বিবেচিত হলেও তাদের বিদেশ থেকে ওষুধ আমদানি করতে হয়। এতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয় তাদের। আমাদের অর্থনীতি দিনে দিনে উর্ধ্বমুখী হচ্ছে। এখন আমাদের প্রায় শতকরা সাতানব্বই ভাগ ওষুধই দেশে তৈরি হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের এখন আর ওষুধ আমদানি করতে হয়না বললেই চলে। সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান আইএমসি ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টর নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতা বিশ^ব্যাপী। আই এমসির গত বছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টরে অর্থাৎ ওষুধ শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে শতকরা বত্রিশ ভাগ। পৃথিবীর খুব কম দেশেই এটি সম্ভব হয়েছে।
২০১৫-১৬ অর্থ বছরে বিদেশে রপ্তানিকৃত ওষুধের মূল্যে ৮৩৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা। বর্তমানে দেশে উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের ওষুধের কাঁচামাল পৃথিবীর ১২৭ টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। ওষুধ রপ্তানির পরিমান ও দেশের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে ওষুধ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে বিশ^ব্যাপী খ্যাতি লাভ করেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকো, স্কয়ার, ইনসেপ্টা, একমি, এসিআই, রেনেটা প্রভৃতি। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাবে আরো দেখা যায়, গত ৫ বছরে ওষুধের রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণে পৌঁছেছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে ওষুধ রপ্তানি আয়ের পরিমান ছিল ৪ কোটি ৮২ লাখ ডলার। ২০১২-১৩ অর্থবছরে তা ছয় কোটি ডলারে গিয়ে পৌঁছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রায় সাত কোটি ডলারের, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৭ কোটি ২৬ লাখ ডলারের, ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে ৮ কোটি ২১ লাখ ডলারের ওষুধ বিদেশে রপ্তানি করা হয়েছে।
বাংলাদেশে প্রস্তুত ওষুধের প্রতি বিভিন্ন দেশের আগ্রহ বাড়ছে ক্রমেই। সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্ক, কুয়েত, শ্রীলংকা, রেলারুশ, দক্ষিন আফ্রিকা বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ আমদানির জন্য চুক্তি করেছে। লাইসেন্সিং চুক্তি করে বাংলাদেশের কারখানায় উৎপাদন করে ওষুধ নিতে চান জাপানি উদ্যোক্তরা।
২০১৬-১৭ অর্থবছরে সাড়ে ৯ কোটি ডলারের ওষুধ রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। জানা গেছে, ইতিমধ্যে তার ৮০ শতাংশ রপ্তানি হয়েছে।
বিশে^র ওষুধের রপ্তানি বাজার প্রায় ১৭০ বিলিয়ন ডলারের। এর মধ্যে ৪ থেকে ৫ শতাংশ ধরা সম্ভব হলে রপ্তানি আয় ৭-৮ বিলিয়ন ডলার হবে। এ দেশীয় মুদ্রায় যার রপ্তানির মূল্য প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। নীতি সহায়তাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা পাওয়া গেলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক এ বাজার ধরা সম্ভব হবে আশা করা যায়।
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের অগ্রযাত্রার মূল কারণ আমাদের ওষুধ নীতির যথার্থ বাস্তবায়ন। ১৯৮২ সালে এদেশে যে ওষুধ নীতি করা হয় তার সুফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। যার কারণে এখানকার ওষুধশিল্প সামনেই অগ্রসর হয়নি বরং এ দেশের মানুষকে কম দামে ওষুধ কিনে খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। তা না হলে এদেশের অনেক গরীব মানুষকে ওষুধের অভাবে মৃত্যুবরণ করতে হতো অকালে। আমাদের ওষুধনীতি দিনে দিনে অনেক সংশোধিত এবং পরিমার্জিত হচ্ছে। যে কারণে আমাদের ওষুধ শিল্প আগামীতে আরো ভালো অবস্থানে পৌছে যাবে সন্দেহ নেই। এখন যেভাবে ওষুধ বিক্রি হয় তার ধরনও বদলে যাবে সময়ের পালাবদলে। বাংলাদেশে যত পণ্য তৈরি হয় তার মধ্যে ওষুধের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বাধিক সতর্কতা অবলম্বন করে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপে শতভাগ মান নিশ্চিত করা হয়। নতুন ওষুধ নীতিমালায় অনেক কিছুই সংযোজন হচ্ছে। যে কারনে আরো বেগবান হবে আমাদের ওষুধ শিল্প, আরো বেশ এগিয়ে যাবে সামনের দিকে। এখন আমাদের এখানে ভালো ভালো উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী, গ্রæপ ওষুধ শিল্পে আসছেন। অনেক নতুন উদ্যোক্তরা আসছেন ওষুধ শিল্পে। আমাদের ওষুধ শিল্পে অনেক দক্ষ অভিজ্ঞ মেধাবী লোকজন প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছেন। আগামীতে তাদের দক্ষতা ও নিরলস পরিশ্রমের কারন আমাদের ওষুধশিল্প আরো উন্নত হবে।
সম্ভাবনাময় ওষুধ শিল্পে একটি বড় বাধা হলো কাঁচামাল আমাদানি। উৎপাদনের বড় একটা অংশ ব্যয় হয় উচ্চমূল্যের কাঁচামালের পেছনে। দেশে ওষুধ প্রস্তুতের কাঁচামাল উৎপাদন বাড়াতে পারলে উৎপাদন ব্যয়ও কমবে, ওষুধের দামও মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা সম্ভব হবে। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য থেকে জানা যায় বর্তমানে দেশের অধিকাংশ ওষুধের কাঁচামালের বাজার ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার মত। আজকাল দেশের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদন করছে। মুন্সিগঞ্জের এ পি আই ওষুধ শিল্প পার্ক পুরোদমে চালু হলে কাঁচামাল উৎপাদন বাড়বে। ফলে আমাদানি খরচ শতকরা ৭০ ভাগ কমে আসবে। বাংলাদেশ সহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ওষুধের মেধাস্বত্বে বিশ^বাণিজ্য সংস্থার ছাড়ের সুযোগ বাংলাদেশের জন্য বড় আর্শিবাদ বয়ে এনেছে। দেশের অনেক কোম্পানিই এখন আন্তর্জাতিকমানের ওষুধ তৈরি করছে। নতুন নতুন কোম্পানির ওষুধ প্রস্তুতকারী হিসেবে আসার পথও তৈরি হয়েছে। উন্নত বিশে^র দেশগুলোর সার্টিফিকেশন সনদও পেয়েছে প্রায় ১২টি কোম্পানি। এ কারণে ওইসব দেশসহ আরো অন্যান্য দেশে ওষুধ রপ্তানি পর্যায়ক্রমে বাড়ছে।
লেখক : ব্যাংকার

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close