আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
আন্দোলন সংগ্রামে নারী

বিস্ময়কন্যা রেশমার অবিশ্বাস্য ১ হাজার ৪৬০ দিন

ওমেনআই ডেস্ক : এ ছিল এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। হাজারো প্রাণের নির্মম মৃত্যু যখন কোটি হৃদয়ে বইয়ে দিচ্ছিল বেদনার অথৈ ধারাপাত, তখন এমন এক বিস্ময়কর সংবাদ ভেসে আসে ইথারে, টিভির পর্দায়- যে সংবাদ সবার ভেতর বইয়ে দিয়েছে আনন্দাশ্রুর ফল্গুধারা। রানাপ্লাজার মৃত্যুস্তূপে দুর্ঘটনার ১৭ দিন পর একটি প্রাণের বেঁচে থাকার সংবাদ অবাক করে দিয়েছিল বিশ্বকে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অসংখ্য মানুষের হৃদয়কে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেওয়া সেই দুর্ঘটনায় একমাত্র আনন্দের উপলক্ষ হয়ে রেশমা জানান দিয়েছিলেন, তিনি বেঁচে আছেন। মৃত্যুস্তূপে তার জীবনের জয়গানে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল মুগ্ধতার আবেশ। এ ঘটনায় রেশমা হয়ে ওঠেন বিস্ময়কন্যা।

ভয়াবহ সেই ট্র্যাজেডির চার বছর পূর্ণ হওয়ার প্রাক্কালে মুখোমুখি হয়েছিল সেই বিস্ময়বালিকার। বুকে সেই ভয়াবহ স্মৃতি নিয়েও বেশ সুখেই দিন কাটছে তার। গত চার বছরের প্রতিটি দিনই তার কাছে এখনো অবিশ্বাস্য বলেই মনে হয়। তিনি বেঁচে আসার পর সসম্মানে তার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয় রাজধানীর গুলশানের পাঁচতারকা হোটেল দ্য ওয়েস্টিন ঢাকায়। এরপর বিয়ে। ঘর আলো করে এসেছে সন্তানও। স্বামী-সন্তান নিয়ে বেশ সুখেই আছেন তিনি।
রেশমা বলেন, ঢাকার অভিজাত হোটেল ওয়েস্টিনে চাকরি করছি। পোশাকশ্রমিক থেকে এ রকম একটি জীবন তো অবিশ্বাস্যই বলতে হবে। প্রতিটি মুহূর্তে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি ভুলিয়ে রেখেছে ওয়েস্টিন। স্বপ্নের মতো মনে হয় সবকিছু। এই চার বছরে তার জীবনের বড় অর্জন স্বামী আর সন্তান নিয়ে গড়া সুখের সংসার।
গতকাল দুপুরে গুলশানের হোটেলে বসে যখন রেশমার সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তখন বাইরে বৈশাখী আকাশের ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। রেশমার চোখেও বৃষ্টির ধারা। চোখের জলের কোনো রঙ হয় না, তবু কত রঙ যে আঁকা থাকে। রেশমার চোখে যে বৃষ্টি, তা আনন্দের, সুখের সাগরে অবগাহনের।
বিস্ময়বালিকা স্মৃতি হাতড়ে বলেন, রানা প্লাজা থেকে বেঁচে ফিরব তা কল্পনায় ছিল না আমার। কতদিন সেখানে আটকে ছিলাম তাও জানি না। কি খেয়েছি তাও সঠিক বলতে পারব না। যখন বের হলাম, তখন আলোর চমক দেখে মনে হলো- আমার পুনর্জন্ম হয়েছে।
তিনি যোগ করেন, বাবা নেই। তাই মা ও ভাইকে দেখে মনে হলো না, নতুন পৃথিবী না আগের পৃথিবীতেই আবার এসেছি। তখন থেকে প্রতিটি দিন আমার কাছে পুনর্জন্ম বলে মনে হয়। রেশমা জানান, রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধারের পর অনেকবার অনেক চিকিৎসককে দেখানো হয়েছে। তারা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করেছেন আমাকে মানসিকভাবে সুস্থ করে তোলার। তাই রানা প্লাজার সেই দুঃসহ স্মৃতি এখন খুব একটা মনে নেই।
ছোট থেকেই শান্ত রেশমা। বরাবরই চুপচাপ থাকতে পছন্দ করতেন। এখনো তাই। কাজের বাইরে তেমন কোনো আড্ডা ভালো লাগত না, এখনো লাগে না। সময় পেলে টিভি দেখেন। তবে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর চুপচাপ থাকাটা অনেকটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে বলে জানান। রেশমা বলেন, কাছের বা দূরের কারো সঙ্গে দেখা হলে সব সময় রানা প্লাজার কথা জানতে চায়। বারবার দুঃসহ সেই স্মৃতি মনে করলে নিজের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। তাই চুপচাপ থাকি। এসব কথা বলতে এখন আর ভালো লাগে না।
দিনগুলো কীভাবে কাটে- জানতে চাইলে রেশমা বলেন, নর্দার কালাচাঁদপুরে ছোট্ট একটি ঘরে এক বছরের মেয়ে ও স্বামীকে নিয়ে থাকি। সকালের শুরুতেই সন্তানের যাবতীয় দেখভাল শেষে অফিসে আসি। প্রায় ৯ ঘণ্টা ওয়েস্টিন হোটেলে আউটপুটের কাজ করি। কাজ শেষে বাসায় ফিরি। মেয়ে রেদোয়ানার এখনো কিছু বোঝার বয়স হয়নি। অফিস থেকে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দেখে মনে হয় মেয়ে আমার জন্যই অপেক্ষা করছিল।
সাভারে ভবনধসের ১৭তম দিনে টানা ৪০৮ ঘণ্টা ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকার পর অনেকটা অক্ষত অবস্থায় কীভাবে উদ্ধার করা হলো তা নিয়ে অনেকের অনেক প্রশ্ন আছে। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে চান রেশমা।
তিনি বলেন, আমি কীভাবে বেঁচে ফিরলাম তা আমি নিজেও জানি না। সবার মতো আমিও হয়তো মারা যেতাম। কিন্তু আমি আজ বেঁচে আছি। আমার সেসব দিনের কথা, আমার বর্তমান জীবন- এসব বিষয়ে সবাইকে জানাতে চাই। সবাই যখন বলে এসব সাজানো, তখন খুব কষ্ট হয়। আমি সাজানো ঘটনা কেন ঘটাতে চাইব?
দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে রেশমা বলেন, রানা প্লাজাধসের ঘটনার পর সবাই অনেক ক্ষতিপূরণ পেয়েছে। আমি বেতনের ৫০ হাজার টাকা ও প্রধানমন্ত্রীর ৫০ হাজার টাকা ছাড়া তেমন কিছুই পাইনি। কিন্তু সবাই বলে আমাকে অনেক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। আমি এসবের উত্তর দিতে চাই।

পাঁচ বছরে তার জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখের দিন কাটছে। তার পরও মনে হয় অনেক কিছু করার আছে রেশমার।

জীবনের প্রত্যাশা সম্পর্কে বলতে গিয়ে রেশমা বলেন, আমি বেঁচে আছি- এটিই স্বপ্ন। তাই এই স্বপ্নের মতো অনেক কিছু বাস্তবায়ন করতে চাই আমি। আমার মতো যারা দরিদ্র, তাদের সাহায্য করতে চাই। সন্তানকে পড়াশোনা করিয়ে অনেক বড় করতে চাই। একই সঙ্গে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য আমার মতো মেয়েদের কত কষ্ট করতে হয়, সে বার্তা সবার কাছে পৌঁছে দিতে চাই। এ-ই আমার প্রত্যাশা।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close