আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
অপরাধস্লাইড

৭ খুনের ৩ বছর : খুনিদের ফাঁসি দ্রুত কার্যকরের দাবি পরিবারের

ওমেনআই ডেস্ক : সাত খুন নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসতো বটেই দেশের ইতিহাসে ন্যাক্কারজনক ঘটনার একটি। এ ঘটনায় প্রমাণসহ মারাত্মক প্রশ্নবিদ্ধ হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এলিট ফোর্স র‌্যাব।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল অপহরণের সেই ঘটনা এখনো ভুলতে পারেনি রাজধানী লগোয়া শীতলক্ষ্যার তীরের মানুষ। ঘটনার পর র‌্যাবের তিন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার, প্রধান আসামী নূর হোসেনকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা-সহ টান টান উত্তেজনায় পার হয়ে গেছে পৌনে তিন বছর। গত ১৬ জানুয়ারি ঘোষিত ওই রায়ের পর এখন নিহতের স্বজনদের প্রত্যাশা দ্রুত সে রায় কার্যকর হউক।

নিহত পরিবারগুলো যা বললো
নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, ‘যাদের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে তাদের ফাঁসির আদেশ উচ্চ আদালতেও বহাল থাকবে সেটাই এখন প্রত্যাশা। তাহলেই নিহত পরিবারগুলো স্বস্তি পাবে।’

তাজুল ইসলাম
তাজুলের বাবা আবুল খায়ের বলেন, ‘আমাদেরতো কিছু পাওয়া নেই। যা হারিয়েছি তা তো আর ফিরে পাব না। এখন নারায়ণগঞ্জের আদালত থেকে যে ফাঁসির রায় দিয়েছে সেটা যেন কার্যকর হয়। এখন উচ্চ আদালতে এ রায় বহাল থাকবে এটাই আমার চাওয়া ও প্রত্যাশা। এটা শুধু আমাদের পরিবারের না দেশের মানুষের আশা পূর্ণ হয়েছে।’

নুপুর
সাত খুনে নিহত গাড়ি চালক জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী নুপুর বেগম নুপুর বলেন, ‘আমার মেয়ের বয়স এখন ২ বছর ১০ মাস। সে তার বাবাকে খুঁজে। তার বাবার খুনিদের যেন অন্তত ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে পারে তাহলে আমরা খুশি। অন্তত মেয়ে রওজাকে বলতে যেন পারি তোমার বাবাকে যারা খুন করেছিল তাদের ফাঁসি হয়েছে। যখন ফাঁসি কার্যকর হবে তখন খুশি হব। মনে একটা সান্তনা পাব যে আমার স্বামীর হত্যার বিচার আমি পেয়েছি। এর আগে মনটাও শান্ত হবে না।’

রফিক
লিটনের ভাই রফিক বলেন, ‘ফাঁসির রায় হয়েছে তা এখন সারা দেশের মানুষ জানে। আমরাও চাই এ রায় উচ্চ আদালতে বহাল থাকবে। এবং সকল আসামিদের দ্রুত রায় কার্যকর করা হবে। তাহলে মন থেকে একটু শান্তি পাব যে আমার ভাইয়ের হত্যার বিচার আমরা পেয়েছি।

রিপন
নিহত মনিরুজ্জামান স্বপনের ভাই রিপন জানান, নিম্ন আদালত যে রায় দিয়েছে সেটা কার্যকর হবে সে প্রত্যাশাই করি। যারা মারা গেছে তাদের তো আর ফিরে পাব না। কিন্তু রায় কার্যকর হলে সকলের আত্মার যেমন শান্তি পাবে তেমনি আমরাও কিছুটা স্বস্তি প্রকাশ করতে পারবো।

পিপির বক্তব্য
নারায়ণগঞ্জ জেলা আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষের তথ্য উপস্থাপনের কারণে মামলাটি নিম্ন আদালতে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আমি আশা ও প্রত্যাশা করবো উচ্চ আদালতও নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখবে।’

বাদি পক্ষের আইনজীবীর বক্তব্য
বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ‘নিম্ন আদালতে যে রায় হয়েছে উচ্চ আদালতের ডেথ রেফারেন্সেও সেই রায় বহাল থাকবে সে প্রত্যাশা করছি। তাহলেই নারায়ণগঞ্জবাসী খুশি হবে।’

নিহত ৭ জনের পরিচয় ও রায়
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল বেলা দেড়টার দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে অপহৃত হন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজন। তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীতে একে একে ভেসে ওঠে ছয়টি লাশ, পরদিন মেলে আরেকটি। নিহত বাকিরা হলেন নজরুলের বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম ও চন্দন সরকারের গাড়িচালক মো. ইব্রাহীম। ওই ঘটনায় গত ১৬ জানুয়ামি প্রধান আসামি নূর হোসেন, র‌্যাবের তিন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এম এম রানা ও মেজর আরিফ হোসেনসহ ২৬ জনের ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। বাকি ৯ জনকে সাত থেকে ১০ বছরের কারাদ- দেওয়া হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক সৈয়দ এনায়েত হোসেন ওই রায় ঘোষণা করেন। আসামিদের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় এ রায় দিয়েছেন আদালত।

যাদের ফাঁসি ও কারাদণ্ড
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলো গ্রেফতার থাকা প্রধান আসামি নূর হোসেন, র‌্যাবের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক মোহাম্মদ সাঈদ, মেজর আরিফ হোসেন, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাসুদ রানা (এমএম রানা), হাবিলদার এমদাদুল হক, আরওজি-১ আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক হীরা মিয়া, ল্যান্সনায়েক বেলাল হোসেন, সিপাহী আবু তৈয়্যব, কনস্টেবল মো: শিহাব উদ্দিন, এসআই পুর্নেন্দ বালা, র‌্যাবের সদস্য আসাদুজ্জামান নূর, আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান দিপু, রহম আলী, আবুল বাশার, নূর হোসেনের সহযোগী মোর্তুজা জামান চার্চিল। পলাতক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলো নূর হোসেনের সহযোগী সেলিম, সানাউল্লাহ সানা, শাহজাহান, জামালউদ্দিন, সৈনিক আবদুল আলীম, সৈনিক মহিউদ্দিন মুন্সী, আলামিন শরিফ, তাজুল ইসলাম, এনামুল কবীর। এসব আসামিদের বিরুদ্ধে অপহরণ ও হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ৯ জন
অপহরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গ্রেফতার আসামিদের মধ্যে করপোরাল রুহুল আমিনের ১০ বছর, এএসআই বজলুর রহমানের ৭ বছর, হাবিলদার নাসির উদ্দিনের ৭ বছর, এএসআই আবুল কালাম আজাদের ১০ বছর, সৈনিক নুরুজ্জামানের ১০ বছর, কনস্টেবল বাবুল হাসানের ১০ বছর কারাদণ্ড হয়েছে। পলাতক আসামিদের মধ্যে হাবিবুর রহমানের ১৭ বছর, কামাল হোসেনের ১০ বছর ও মোখলেসুর রহমানের ১০ বছর কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।

৭ খুনের ৩ বছর : ভালো নেই পরিবারগুলো
যারা জীবিত ছিল তারা ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাদের মৃত্যুর পর পরিবারগুলোতে নেমে এনেছে অমানিশার অন্ধকার। কোনো মতে চলছে পরিবারের দিনযাপন। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে পরিবারগুলো।

নূপুর
‘মেয়ের বয়স ৩ বছর হতে চলেছে। আগামীতে ৪ বছর হবে। তখন ওকে স্কুলে ভর্তি করতে হবে। যা বেতন পাই তা দিয়ে কোন রকমে সংসার চলে। মেয়ের দিকে তাকিয়ে কষ্ট করেই সংসার চালিয়ে যাচ্ছি। আমার জীবনটা তো এভাবে চালিয়ে গেলাম কিন্তু আমার মেয়ের জীবনটা কেমনে চলবে।’
আবেগে আপ্লুত হয়ে ২৬ এপ্রিল বুধবার সকালে মোবাইল ফোনে কথাগুলো বলেন আলোচিত সাত হত্যাকাণ্ডে নিহত জাহাঙ্গীরের স্ত্রী নূপুর। সাত হত্যাকাণ্ডের দুই মাস পর জন্ম নেয় শিশুটি। যার বয়স ২ বছর ১০ মাস। নূপুর আরও বলেন, ‘প্রতিদিন কষ্ট করেই চলতে হয়। দিন দিন মেয়েটা বড় হচ্ছে ওর একটা ভবিষ্যৎ আছে। আমার দিনটা এভাবে চলে গেলো কিন্তু মেয়েটার একটা ভবিষ্যৎ আছে। তার জন্য একটা কিছু করা প্রয়োজন। আইভী ম্যাডাম (নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী) আমাকে এখানে (নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সিদ্ধিরগঞ্জ শাখা অফিস) চাকরি দিয়েছেন বলে চলতে পারছি। না হলে কপালে আরও অনেক দুঃখ ছিলো। তবে আমার একটা সরকারি বা স্থায়ী চাকরি হলে খুব ভালো হতো। দিন দিন সংসারের খরচ বাড়ছে। মেয়েটাকে আগামীতে স্কুলে ভর্তি করতে হবে। তখনও খরচ বাড়বে। এখানের চাকরিটা স্থায়ী না। একটা স্থায়ী চাকরি পেলে আর বেতনটা বাড়লে অনেক উপকার হতো।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতি রোজার ঈদে আইভী ম্যাডাম ৫ হাজার করে টাকা দেন। এর পর আর আপার সঙ্গে দেখা হয় না। এখানে চাকরি করি বাসায় যাই। তাই আপার সঙ্গে দেখা করতেও যাওয়া হয় না। এছাড়াও কয়েক বছর আমার আত্মীয় স্বজনরাও কিছু টাকা দিয়ে সাহযোগিতা করেছিল। কিন্তু এখন তাদের অবস্থাও ভালো না। আর তাই তাদের কাছে যেতেও ভালো লাগে না।
সিদ্ধিরগঞ্জের কদমতলী মধ্যপাড়া এলাকার শ্বশুর শুক্কুর আলীর বাড়ির নিচ তলায় রওজাকে নিয়ে বসবাস করেন নূপুর বেগম। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সিদ্ধিরগঞ্জের শাখা অফিসে মাস্টার রোলে চাকরি করেন তিনি। মাসিক বেতন পান ৬ হাজার টাকা।

আবুল খায়ের
তাজুলের বাবা আবুল খায়ের বলেন, ‘খুব কষ্টের মধ্যে জীবনযাপন করছি। যা আল্লাহ ছাড়া কেউ বুঝতে পারবে না। আমার বড় ছেলে তাজুল ছিল আমার একটা ফান্ড। ওর রোজগার ও আমার রোজগারে ভালোভাবে সংসার চলতো। কিন্তু এখন খুব কষ্টে আছি। সবাই হাত পাততে পারে কিন্তু মান সম্মানের ভয়ে আমি তাও করতে পারি না। সিদ্ধিরগঞ্জের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ১০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করি। এর মধ্যে আবার বাসা বাড়ায় চলে যায় ৫ হাজার টাকা। এদিকে ছোট ছেলে বিল্লাল হোসেন রাহাত ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ালেখা করে। আর মেঝো ছেলে সাইফুল ইসলাম রাজু উন্মুক্ত থেকে এইচএসসি পাস করে এখন বেকার।

আবুল খায়ের সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি চৌধুরী পাড়া এলাকার মাহজারুল ইসলামের বাড়িতে ৮ বছর ধরে বসবাসকরে আসছেন। আবুল খায়েরের নিজ বাড়ি চাঁদপুর হানাছর ইউনিয়নে। মেঘনার ভাঙনে ঘরবাড়ি ভেঙে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে সিদ্ধিরগঞ্জে বসবাস করছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘তাজুলের ঘটনার পর থেকে ওর মা তাসলিমা খাতুন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সংসারের খরচ জোগার করে সব সময় ওর মার ওষুধ কিনে দিতে পারি না।’

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close