আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সারাদেশস্লাইড

নগরজুড়ে জনদুর্ভোগ : গ্যাসের দাম বাড়লেও সরবরাহের মান বাড়েনি

হাসান সাইদুল : জ্বালানি নিজে জ্বলে। অন্যকেও জ্বালায়। প্রাকৃতিক জ্বালানি নিজে জ্বলে অন্যকে চালায়। প্রাকৃতিক জ্বালানি গ্যাস মানবসভ্যতার একটি উপাদান যা মানবজীবনকে করেছে সহজ এবং কাজের গতিকে করেছে আরও দ্রæততর। এটা সত্য প্রাকৃতিক গ্যাস সহজ ও নিরাপদ জ্বালানি। গ্যাস ছাড়া মানবজীবন সহজ কল্পনাও করা যায় না। অথচ সহজ ও নিরাপদ জ্বালানির বর্তমান দাম, সরবরাহ ও মান নিয়ে বর্তমান জীবন ব্যবস্থায় খুবই ভোগান্তিময়। একদিকে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি অন্যদিকে সরবরাহ নিয়ে বেকাদায় পড়েছে নগরবাসী।
ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পাইপলাইনে গ্যাস থাকছে না। এ কারণে দিনে বাসাবাড়িতে চুলা জ্বলছে না।
গভীর রাত জেগে গৃহিণীদের রান্না করতে হচ্ছে। এতে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। যারা রাত জেগে রান্না করতে পারছেন না তাদের বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। আবার হোটেলগুলোতেও খাবার পাওয়া যাচ্ছে না। বাসী খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। এতে অনেকেই পেটের পীড়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। স্কুলগামী ছেলে মেয়েদের বাসি খাবার খেয়ে স্কুলে যেতে হচ্ছে। গ্যাস সমস্যার কারণে কেউ কেউ কেরোসিনের চুলা কিনছেন। এ চিত্র খোদ রাজধানীর বেশিরভাগ এলাকায় বিরাজ করছে। শুধু বাসাবাড়িতেই সমস্যা হচ্ছে না, সিএনজি পাম্পগুলোতেও গ্যাসের চাপ কমে গেছে। এতে একবার গ্যাস নিতে ৩/৪ ঘন্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে সিএনজি চালিত গাড়িগুলোর। এ কারণে সিএনজি পাম্পগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ লাইন পড়ে যাচ্ছে।
রাজধানীবাসীর এ দুর্ভোগ যেন স্থায়ী রূপ নিয়েছে। এ দুর্ভোগের কারণ নিয়ে বরাবরই গ্যাস খাতের সংস্থাগুলোর পরস্পরকে দোষারোপ করতে দেখা যায়। যেমন, গ্যাস বিতরণের সাথে জড়িত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তিতাস থেকে বলা হয় চাহিদা অনুযায়ী তাদেরকে গ্যাস সরবরাহ করছে না পট্রোবাংলা। আবার পেট্রোবাংলা থেকে বলা হয়, তিতাসের পাইপলাইনের দোষারোপ করা হয়। বলা হয় গ্যাস সরবরাহের জন্য পাইপলাইনগুলো অনেক পুরনো এবং ব্যাসে কম থাকায় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা যায় না।
নতুবাজারের নুরেরচালা এলাকার গ্যাস সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরে গৃহবধূ রিক্তা জানিয়েছেন, প্রতিদিন ভোর ৬টায় পাইপ লাইনে গ্যাস চলে যায়, সারাদিন আর গ্যাস আসে না। সন্ধ্যায় গ্যাস আসলেও অনেকদিন তা রাত ৯টায় চলে যায়। গ্যাসের এ দুর্ভোগে এ এলাকার গৃহিণীরা রাত জেগে রান্না করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
যে সব বাসায় যৌথভাবে একই চুলায় রান্না করতে হয় সে সব বাসায় ভোগান্তির অন্ত থাকে না। চাইলেও যখন তখন রান্না করা যায় না। অন্যথায় উপোস থাকতে হয়। গ্যাসের এ সংকটের কারণে সামর্থ্যবানরা বিকল্প হিসেবে এলপি গ্যাস ব্যবহার করছেন। কেউবা কেরোসিনের চুলা কিনে কোনো রকম রান্নার কাজ সারছেন। তবে সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে স্কুলগামী ছোট শিশুদের নিয়ে। তাদের বাসি খাবার খেয়ে স্কুলে যেতে হচ্ছে। কিন্তু টিফিন দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
ধানমণ্ডির বাসিন্দা সামিনা ইসলাম বলেন, ঢাকার শহরে গ্যাস সংকট নতুন কি প্রতিদিন সকাল ৯টার পর গ্যাস চলে যাচ্ছে। আর আসছে বিকেল ২-৩টায়। আমার স্বামীর অফিস সময় সাড়ে ৮টায় প্রতিদিনই নাস্তা না করে তাকে অফিসে যেতে হয় এটা নিতান্তই কষ্টদায়ক। আমার বাচ্চাকে এ বছর স্কুলে দিয়েছি। সকালে ওভেনে গরম করে গত কালের খাবার দিতে হয়। টিফিন তো দিতেই পারি না। খাবার নিয়ে প্রায়ই পড়তে হয় বিপাকে। রান্না বাড়ায় বেজাই কষ্ট।
উত্তরা ৪নং সেক্টরের বাসিন্দা নাহিদ জানান আগে কখনো এ এলাকায় গ্যাস সংকট ছিল না। গত দেড় কি দু মাস যাবৎ গ্যাস সমস্যা এ এলাকার নতুন সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। বেলা ১১টার পর থেকে দুপুর পর্যন্ত এবং কখনো কখনো রাতেও এ এলাকায় গ্যাস থাকে না। গ্যাসের চাপ কম থাকায় সামান্য খাবার গরম করা যায় না।
উত্তরার বাসিন্দা সুলতানা বৃষ্টি জানান, আগে ৭ নম্বর সেক্টরে ছিলাম। অতিরিক্ত পানি ও গ্যাস সংকটের কারণে রান্না করা মুশকিল হয়ে পড়তো। কর্তার অফিসে যাওয়ার সময় নাস্তা দেওয়াটা ছিলো খুবই কষ্টকর অনেক সময় না খেয়ে অফিসে যেতো হতো। বাচ্চাদের টিফিন দেয়া যেতো না। বাধ্য হয়ে বাসা ছেড়ে দিয়ে এখন ৯ নম্বর সেক্টরে বাসা নিলাম। রান্না বাড়া ঠিক মত করা যায় তবে মাঝে মাঝে বিপাকে পড়তে হয়।
দক্ষিণ বনশ্রীর বাসিন্দা গুলশান আরা বলেন, এলাকায় গ্যাসের করুণ আবস্থা। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩-৪টা পর্যন্ত একটানা পাইপ লাইনে গ্যাস থাকে না। গ্যাস না থাকায় ভয়াবহ সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাদের।
রামপুরার ওয়াপদা ওমর আলী লেনের বাসিন্দা জোসনা বেগম জানান, সকাল ৯টা থেকে দুপুর তিনটা পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। তিনি বলেন, গোসল করার জন্য এক পাতিল পানি গরম করতে ৪-৫ ঘণ্টা লেগে যায়। এভাবেই চলছে তাদের নিত্য দিন।
শুধু রান্নার কাজেই রাজধানীবাসীর দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন না, এসব এলাকার সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস নেয়ার জন্য গাড়ীর দীর্ঘ লাইন পড়ে যাচ্ছে। পাইপ লাইনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় কোনো কোনো এলাকার সিএনজি পাম্প থেকে একবার গ্যাস নিতে ৩-৪ ঘণ্টা লেগে যায়। এতে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। বেড়ে যাচ্ছে পরিবহন ভাড়া। সিএনজি চালক, হারুন রশিদ বলেন, গ্যাস নিতেই অনেকটা সময় চলে যা। যে সময়টা যাত্রী বেশি পাওয়া যায়। দুপুর বেলায় তেমন যাত্রী পাওয়া যায় না। ঠিকমতো গ্যাস নিতে পারলে আমাদের তেমন কষ্ট হতো না। যাত্রীদেরও ভোগান্তি কমতো।
গ্যাসের দাম নির্ধারণ নিয়ে উভয় সংকটে সরকার। বর্তমানে গ্যাস আমদানির কোনো বিকল্প নেই। আগামী বছরের জুলাই থেকে আমদানি করা গ্যাস ভোক্তারা ব্যবহার করতে পারবেন বলে আশা করছে সরকার। কিন্তু দেশীয় গ্যাসের চেয়ে আমদানি করা গ্যাসের দাম পাঁচগুণ বেশি। এত বেশি দামে আমদানি করা গ্যাস বর্তমানে নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে সরকারকে বছরে কমবেশি ৩০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি গুনতে হবে, যা বহন করা সরকারের পক্ষে অনেকটাই দুরূহ। এদিকে দাম যদি দ্বিগুণও বাড়ানো হয়, তাহলেও সরকারকে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি গুনতে হবে। ওদিকে দাম বাড়ালে শিল্প উৎপাদনসহ সার্বিক অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে। গ্যাসের দাম নির্ধারণ নিয়ে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে শিগগিরই আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।
বর্তমানে সারা দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ৩৫০ কোটি ঘনফুট। সরবরাহ করা হচ্ছে ২৭০ কোটি ঘনফুট। ৮০ কোটি ঘনফুট ঘাটতি। প্রাথমিক পর্যায়ে আমদানি করা হবে ৫০ কোটি ঘনফুট। আগামী বছরের মাঝামাঝি জাতীয় গ্রিডে এই আমদানি করা গ্যাস যুক্ত হবে। পরবর্তী বছরেই আরও ৫০ কোটি ঘনফুট জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে। জাতীয় গ্রিডে আমদানি করা গ্যাস যত বেশি যুক্ত হবে, গ্যাসের দামও তত বাড়তে থাকবে। প্রশ্ন উঠেছে, এত বেশি দামে গ্যাস ব্যবহারের মতা শিল্প মালিক ও সাধারণ গ্রাহকদের আছে কি-না। একজন শিল্প মালিক নাম ও ছবি না প্রকাশের শর্তে বলেন, এভাবে গ্যাসের দাম বাড়তে থাকলে পোশাক রফতানিতে ধস নামবে। কারণ প্রতিযোগিতায় তারা টিকতে পারবেন না। রাজধানীর একজন নুডল্স কোম্পানির মালিক নাম না প্রকাশের শর্তে অনুরোধে বলেন, যে হারে গ্যাসর দাম বাড়ছে সে হারে সরবরাহের মান বাড়েনি। আমাদের সব সময় গ্যাস দরকার হয়। একদিন গ্যাস না থাকলে কারখানার কাজ বন্ধ থাকে। এমন প্রায়ই হয়। এমন অবস্থা চলতে থাকলে কারখানাই বন্ধ হয়ে যাবে।
বিইআরসির কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাসের দাম নির্ধারণের বিষয় নিয়ে নানা রকম চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। বিপুল পরিমাণ ভর্তুকির ভার সরকার বহন করতে পারবে না। একই সঙ্গে শিল্প মালিক ও সাধারণ গ্রাহকরাও অসহনীয় কোনো দাম বৃদ্ধি মেনে নেবেন না। ফলে আমদানি করা গ্যাস ব্যবহার শুরু হলে দাম সমন্বয় কীভাবে করা যায়, সেটা নিয়ে ব্যাপক চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।
আমদানি করা গ্যাসের ব্যবহার শুরু হলে দামের ক্ষেত্রে কী রকম প্রভাব পড়তে পারে সেটি বিশ্লেষণ করে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বর্তমানে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট (এক হাজার ঘনফুট) গ্যাসের দাম ১৭৩ টাকা (২.১৭ ডলার)। দিনে ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি যোগ হলে গ্যাসের দাম হবে প্রতি ইউনিট ৯২১ টাকা। আর ৫০ কোটি ফুট এলএনজি যোগ হলে গ্যাসের দাম হবে প্রতি ইউনিট ৩৪৮ টাকা। আমদানি মূল্য ও স্থানীয় পর্যায়ের শুল্ক ধরে এ দাম হিসাব করা হয়েছে। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এলএনজির ওপর ধার্য শুল্ক ও কর না নিলে এ দাম কমবে। এলএনজি আসার পরও সরকার যদি বর্তমান দরেই (প্রতি হাজার ঘনফুট ১৭৬ টাকা) ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রি করে তাহলে বছরে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হবে। দিনে ৫০ কোটি ঘনফুট এলএনজি ব্যবহার হলে বছরে ভর্তুকি গুনতে হবে ৩০ হাজার কোটি টাকা। আর দিনে ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি যোগ হলে ভর্তুকি গুনতে হবে ৬০ হাজার কোটি টাকা।
বর্তমান মূল্যের চেয়ে গ্যাসের দাম ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ আরো বাড়তে পারে। এই মূল্য বৃদ্ধির বিরোধিতা করছেন ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তরা। তারা বলছেন, প্রস্তাবিত হারে গ্যাসের দাম বাড়ালে শিল্প কারখানার উৎপাদন ব্যয় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে, যা পণ্য রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে। বাড়বে মূল্যস্ফীতি। অর্থনীতি বড় ধরনের চাপে পড়বে।
দেশে প্রতিদিন গড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হয়। এর ৬২ শতাংশ আসে বিদেশি কোম্পানির (আইওসি) মালিকানাধীন গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে। চুক্তি অনুসারে বর্তমানে এই ৬২ শতাংশের ৬০ থেকে ৬৫ ভাগ বাংলাদেশের অংশ। বাকি অংশ আইওসির। আইওসির অংশ প্রতি হাজার ঘনফুট গড়ে ২৪০ টাকায় কিনে নেয় পেট্রোবাংলা। আইওসিগুলোর কর ও শুল্কও পরিশোধ করে পেট্রোবাংলা। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উত্তোলিত গ্যাসের উৎপাদন ব্যয় অনেক কম। প্রতি ইউনিটে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। সব মিলিয়ে গড়ে গ্যাসের উৎপাদন ব্যয় ইউনিটপ্রতি ১২১ টাকার মতো। কিন্থ বিক্রয় পর্যায়ে প্রায় ৫৫ শতাংশ কর ও শুল্ক ধার্য থাকায় গ্যাসের দাম বেড়ে হয় ২৭০ টাকা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের শিক্ষক অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বর্তমানে ঘাটতি মেটাতে এলএনজি আমদানির বিকল্প নেই। এর ফলে গ্যাসের দাম কয়েক গুণ বাড়বে। কিন্তু ভোক্তা পর্যায়ে এক দফায় দাম বৃদ্ধি করা যৌক্তিক হবে না। পর্যায়ক্রমে দাম বাড়াতে হবে। যেন উদ্যোক্তারা আগেই জানতে পারেন সামনে গ্যাসের দাম কত হবে। তারা সেভাবেই প্রস্তুতি নেবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ‚তত্ত¡ বিভাগের অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, জ্বালানি ঘাটতির সাময়িক সমাধানে ৫০ কোটি ঘনফুট এলএনজি আমদানি করা যেতে পারে। তবে দীর্ঘ মেয়াদের জন্য এলএনজির ওপর বেশি নির্ভরশীলতা হিতেবিপরীত হতে পারে। কারণ এতে গ্যাসের দাম সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে। অর্থনীতির জন্য তা শুভফল বয়ে আনবে না। বিকল্প হিসেবে সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর জোর দিতে বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাপক।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close