আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
আন্দোলন সংগ্রামে নারী

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নারী অবহেলিত

আফরোজা নাজনীন:
মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানের উজ্জ¦ল স্বীকৃতি নেই। নারীরা সরাসরি যুদ্ধ করেছেন, আহতদের সেবা করেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন, তথ্য সরবরাহ করেছেন, অর্থ সংগ্রহ করেছেন, অস্ত্র আনা- নেওয়া করেছেন। এতকিছু করেও নারীরা তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু পাননি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও নারীর সঠিক অবস্থানকে তুলে ধরা হয়নি।  নারী নেত্রীদের মতে এর প্রধান কারণ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখার ভার ছিল পুরুষের ওপর।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস রচনার জন্য বাংলাদেশ সরকার ‘৭৮সালে একটি প্রকল্প প্রতিষ্ঠা করেন। তার নাম ছিল‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস লিখন ও মুদ্রুন প্রকল্প’। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস রচিত হয়নি। ‘৮২ সালে ১৬টি খন্ডে বের হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র। বিশেষজ্ঞদের মতে দলিল সমূহে হয়তো নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চেষ্টা হয়েছে কিন্তু চিন্তার সীমাবদ্ধতা ছিল। এ দলিলে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কবিতায় মেয়েদের নাম পাওয়া যায়। পুরো দলিল ঘেটে দেখা গেছে, এখানে উল্লেক করা হয়, ৩০ মার্চ কালুর ঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র আধ ঘন্টার মতো অনুষ্ঠান প্রচারের শুরুতে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোসনা করে যে টেলিগ্রাম দিয়েছিলেন তার বাংলা ও ইংরেজি তর্জমা প্রচার করে। যে ইংরেজি তর্জমা করেছিলেন ডা.মমজুলা আনোয়ার। ঘোষণায় কন্ঠ দিয়েছিলেন কাজী হোসনে আরা। এ দলিলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরে যারা যুদ্ধ করেছেন তাদের নাম খুঁজে পাওয়া মুশকিল্ তবে দু’একজন নারীর বীরত্বের কথা রয়েছে।

রয়েছে রোশেনারা বেগমের কথা। বীর রোশেনারা বেগম বুকে মাইন বেঁধে জল্লাদ বাহিনীর ট্যাংকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এতে কিশোরী রোশেনারার দেহের সঙ্গে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় একটি ট্যাংক। এ সম্পর্কে মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিল বলেন, বীর রোমেনারাকেও শহীদ বলা হয়নি। এতে নারীদের ভূমিকার স্বীকৃতির ক্ষেত্রে যে বৈষম্য তা নগ্নভাবে ধরা পড়ে। এ দলিলে অনেক নারীর পুরোনাম ব্যবহার করা হয়নি। বলা হয়েচে বেগম ওসমান, বেগম হোসেন আলি, বেগম সারোয়ার মোর্শেদ। অথচ বেগম মোর্শেদের নাম  ড.নূরজাহান মোর্শেদ। তিনি পাকিস্তান আমলেই ছিলেন সংসদ সদস্য।

প্রামান্য রুপ কমিটির গবেষক সাংবাদিক আফসান চৌধুরী এ সম্পর্কে বলেন, ‘৭৮ সালে আমরা যখন দলিল নিয়ে কাজ করি তখন নারী পুরুষের বিষয়টি আমাদের পরিকল্পনায় ছিল না। নারীর দিক থেকে যুদ্ধ দেখার কথা আমরা ভাবিনি। তখন আমরা যেন বেশি গুরুত্ব দিয়েঝি রাষ্ট্র গঠনের দিকে। একটা রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখাই ছিল মূখ্য। সেদিক থেকে নারীদের অবদানের কথা সুনির্দ্দিষ্টভাবে আমাদের চিন্তায় আসেনি। এটা অবশ্যই আমাদের চিন্তার সংকীর্ণতার কারণেই ঘটেছে। তিনি আরও বলেন, ইতিহাস বলে যুদ্ধের সময় একজন নারী যতগুলো ভূমিকায় আসতে পারে, একজন পুরুষ তা পারে না। নারীর অবস্থানকে চারভাবে দেখা যায়।

১.    সরাসরি যুদ্ধ করা,
২.     ২.যুদ্ধে বিভিন্নভাবে সহায়তা করা
৩.    সংসার টিকিয়ে রাখা
৪.    বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হওয়া।

এসব বিষয় অনেকেই অজানা বলেই ইতিহাসে নারীদের অবদানের মত এতবড় একটা ক্ষেত্রও থেকে যায় উপেক্ষিত।
এ সম্পর্কে নারীগ্রন্থ প্রর্বতনার নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার বলেন,মুক্তিযুদ্ধ কথাটি ভাবলেই অস্ত্রহাতে পুরুষের কথাটিই ভাবা হয়। কিন্তু নারীরা যে বিভিন্নভা মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেচে তা বলা হয় না। নারীদের অবদানের কথা প্রমান করে দেখাতে হয়। তিনি আরও বলেন, আমরা ১৫ খন্ড দলিল পরীক্ষা করে দেখেছি, নারীদের খবর কিছু জানা যায় কিনা। আমাদের আশা পুরোপুরি সফল হয়নি। যারা সীমান্তের ওপারে সাহায্যে করেছে তাদের নাম আছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী নারীদের নাম খুঁজে পাওয়া কষ্টকর।

মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নারীর নাম নেই

দেশে মোট পাঁচবার মুক্তিযোদ্ধা তালিকা তৈরি হয়। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়,অনুমোদিত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখ ৬ হাজার ৮৭ জন। মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী পরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন জাতীয় কমিটি এ তালিকা অনুমোদন করে। এদের মধ্যে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৫ম জন মুক্তিযোদ্ধার নাম গেজেট আকারে প্রকাশ পায়। ১ লাখ ২৬ হাজারকে সনদপত্র দেয়া হয়েছে। আলাদা করে নারীর কোনও তালিকা করা হয়নি। ২০০১ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ একটি তালিকা করে। এতে ১ লাখ ৪৯ হাজার মুক্তিযোদ্ধার নাম স্থান পায়।  এতে নারীর সংখ্যা অত্যন্ত কম। মাত্র ১’শ  ‘৭৮ জনের নাম রয়েচে। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক সাধারন সম্পাদক কালী নারায়ন বলেন, আসলে নারীরা জানতেই পারেন নি কখন কোথায় নাম নেওয়া হচ্ছে। হয়তো বাড়ির পুরুষেরা অনীহা দেখিয়েছে। এছাড়া নারী মুক্তিযোদ্ধা তত বেশি দারিদ্রের মধ্যে থাকে যে এসব প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। বাংলাদেশে বাকী মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা সম্পর্কে গবেষক আফসান চৌধুরী বলে, নারী মুক্তিযোদ্ধ কতদুর সেটা নির্ভর করে কার সংখ্যা বা বিবরন ব্যবহার করা হচ্ছে। কে মুক্তিযোদ্ধা  কে নয়, এ বিষয়টিকে রাষ্ট্র, সমাজ, গ্রামীন জনপদ, সেনাবাহিনী, মন্ত্রণালয় এসব প্রতিষ্ঠানগুলো আলাদাভাবে দেখে। অতএব তালিকার ভিত্তিতে কতজন মুক্তিযোদ্ধা ছিল বা এছাড়াও প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক তালিকা প্রনয়ণ সম্ভব। কিন্তু কোনটা প্রকৃত সংখ্যা বলা কঠিন। সরকারির মুক্তিযোদ্ধা যেমন রয়েছে তার পাশাপাশি রয়েছে সামাজিক যোদ্ধারা যারা সমাজকে টিকিয়ে রাখার যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। এসব নারীর ভূমিকা গোলাগুলি করার যুদ্ধের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাদের সংখ্যা কেউ লিপিবদ্ধ করেন্ িযেহেতু তাদের ভূমিকার স্বীকৃতির জন্য রাষ্ট্রে অথবা আমাদের মানসিকতায় কোনও পরিসর নেই তাই আমরা তাদের উপেক্ষা করেছ্ িতিনি আরো বলেন, এখনও তালিকা করা সম্ভব। কিন্তু তার আগে মুক্তিযুদ্ধ বলতে কি বোঝায়, মুক্তিযোদ্ধা কে, সে ব্যাপারে এক মত হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশে নারী মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা সম্পর্কে ওয়ার্ল্ড ক্রাইমস ফ্যাক্টরস এ্যান্ড ফাইন্ডিং কমিটির আহ্বায়ক ডা. এম এ হাসান বলেন,সার্বিক অর্থে এ দেমে নারী মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি। পুরুষ তো শুধু যুদ্ধ করেছে, নারী যুদ্ধ তো করেছেই, তার সঙ্গে যুদ্ধের আনুষাঙ্গিক অনেক কাজ করেছে। যে কাজগুলো নারী না করলে মুক্তিযুদ্ধ সফল হতো না। তাই সার্টিফিকেটের নাম দেখে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নারীকে মূল্যায়ণ করা হলে তা হবে মস্ত বড় ভুল।

মুক্তিযোদ্ধা হয়েও সার্টিফিকেট পায়নি
সালেহা বেগম। এখন বয়স ৫৩। মুক্তিযোদ্ধা চলাকালে যশোরের বেনাপোলে ছিলেন। ভাইদের সঙ্গে চলে যান ভারত। সেখানেই প্রশিক্ষণ নেন। তারপর যুদ্ধক্ষেত্র। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সালেহা বেগমের কোনও সার্টিফিকেট নেই। তিনি জানান, সার্টিফিকেট কখন কোথায় দিয়েছে আমি জানতে পারিনি, জানার চেষ্টাও করিনি। সালেহা সুলতানা ’৭১ এ দিনের  বাগেরহাটের কান্দাপাড়া গ্রামে। সেখান থেকেই যুদ্ধে যান। এখন থাকেন মীরপুরে। তিনি জানান, তিনি কোনও ভাতা পান না। তার মুক্তিযোদ্ধ নম্বর-০৪০৩০৯০২৫০।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে নারী

এ জাদুঘরে নারীর যেসব ছবি রয়েছে তার মধ্যে আছে, ’৯৯ সালের ২০ নভেম্বর মিরপুর জল্লাদ খানা ও মিরপুরের ১২ নম্বর সেকশনের ডি-ব্লকে নূরী মসজিদের কুয়া থেকে মানুষের হাড় ও নারী শিশুর পরিধেয় জিনিসের ছবি। রয়েছে শহীদ জননী জয়নাতুন্নেছা ও শহীদ জায়া রাহেলা বেগমের ক্রনুনরত ছবি। রয়েছে বীর প্রতীক তারামমবিবি ও সিতারা বেগমের ছবি। শহীদ ডা. রাব্বীর গাড়িতেও রয়েছে তার স্ত্রী জাহানারা রাব্বীর ছবি। তারও রয়েছে ’৪৮ সালে তেভসির জাবিতে কৃষক আন্দোলনের হাজার নারীর মিছিলের ছবি। ‘৬৯ এর গণঅভ্যূথানে শহীদ আনোয়ারা বেগমের ছবি, তিনি পাক বাহিনীর হাতে নিহত হন। এছাড়া রয়েছে গণঅভ্যুথানের সাধারণ নারী ও ছাত্রীদের ১৪টি ছবি। এতে রয়েছে অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী।

বীরাঙ্গনা নারীর কথা
সরকারি হিসেবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে আড়াই লাখ নারী ধর্ষিত হয়েছে। গবেষকের মতে, এ সংখ্যা চার লাখ। ওয়ার এসন্ড ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইনডিংস কমিটির পুরোধা এম এ হাসান জানান, ধর্ষিতা নারীর সংখ্যা ৮৮ হাজার ২শ বীরা হন। অর্থ বীর নারী। সে অর্থকে ভিত্তি করে স্বাধীনতার পর পাকবাহিনী ও তার দোসরদের হাতে লাঞ্চিত নারীদের বঙ্গবন্ধু উপাধি দিয়েছিলেন বীরঙ্গনা। কিন্তু এ সমাজ তা মেনে নেয়নি। মেনে নেয়নি বলেই দু’লাখ ধর্ষিতা নারী। বীরাঙ্গনা নামেই সমাজের কাছে হয়েছে নিগৃহীত, —-এক ঘরে। এতদিন পরও তাকে শুনহে হয়, তোকে পাকবাহিনী ধরে নিয়ে গিয়েছিল, তুই তো বেশ্যা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার হাশিমপুর গ্রামের মাসুদা খাতুন, এলজাম নেছা ও দুলজাম নেছা তিন জনই একাত্তুরে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতে গিয়ে হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হন। পাকসেনারা ক্যাম্পে আটকে রেখে তাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালায়। তারা এ প্রতিবেদককে জানান, এখনও স্বাধীনতার এত বছর পরও ‘নষ্টা’ নাম দিয়ে তাদের এক ঘরে করে রাখা হয়েছে। ‘৯২ সালে অনুষ্ঠিত গণ আন্দোলনে যোগদেয়ায় তাদের সমাজচ্যুত করা হয়। তাদের সাধারণ টিউবওয়েল থেকে পানি নিতেও বাধা দেওয়া হয়। তিন বীরাঙ্গনাকেই তাদের ছেলে মেয়ের বিয়ে দিতে বেগ পেতে হয়। বারবার বিয়ে ভেঙ্গে যায়। শেষ মেষ মুক্তিযুদ্ধের ৩৫ বছর পর ২০০৬ সালে তাদের পাশে এসে দাঁড়ায় কুষ্টিয়া মহিরা ক্লাব। সংগঠনটি তাদের মানসিক সহযোগিতা ছাড়াও হাতে তুলে দেয় সেলাই মেশিন। চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ তিনজনের কেউই মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট পাননি।

তাকেই কবর খুঁড়তে হতো অন্য মেয়েদের

মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাসের মধ্যে ছয় মাসই তাকে রক্তমাখা শাড়ি ও ব্লাউজ পড়ে কাটাতে হয়। ‘৭১ সালের এপ্রিলে যশোর জেলার ইদ্রা গ্রামে  হালিমা পারভীনদের বাড়িতে  হামলা চালায় রাজাকারও হানাদার বাহিনী। বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। এরপরই হালিমা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। যুদ্ধরত অবস্থায় তিনি জুনে ধরা পড়েন পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে। শুরু হয় অকল্পনীয় যন্ত্রনার জীবন। প্রথমে তাকে রাখা হয় রাজাকারদের ক্যাম্পে প্রতিদিন তাকে বেয়োনেট দিয়ে খোঁচানো হতো। কিছু দিনপর তাকে চোখ বেধে নিয়ে যাওয়া হয় যশোর ক্যান্টনমেন্টে। সেখানে একদিন পর একদিন তাকে খেতে দেওয়া হতো। তাকেই কবর খুড়তে হতো, সেসব মেয়েদের যারা হানাদার বাহিনীর হাতে নির্যাতিত হয়ে মরে যেত। অথবা গণ ধর্ষনের পর হত্যা করা হতো। তিনি এসবও জানান, ‘৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা হালিমাকে উদ্ধার করে তার বাবার বাড়ি পৌছে দেয়। কিন্তু তারপর হালিমার জীভনে নেমে আসে অন্য রকমের বিড়ম্বনা। জীবিত ও সাধারণ ক্ষমা পাওয়া রাজাকাররা তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা চারায়। একদিন রাতে হালিমা পালিয়ে আসেন তার চাচার কাছে। চাচা উদ্যোগ নেন তাকে বিয়ে দেওয়ার। কিন্তু হানাদার বাহিনীর হাতে বন্ধি থাকার কথা জানাজানি হলে বিয়ে ভেঙ্গে যায়। ‘৮৩ সালে তিনি আয়ার চাকরি পান মহেশপুর হাসপাতালে। ‘৮৪ সালে তার বিয়ে হয় মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে। শশুর তাদের ত্যাজ করেন। সংসার জীবনেও তার হালিমার  কাটেনি। দুছেলে মেয়ের মধ্যে এক ছেলে অন্ধ। আমিও বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের গেজেটে (নং-২০৮৩) হালিমার নাম রয়েছে তবু টাকার অভাবে তার চিকিৎসা হচ্ছে না।
মুক্তিযোদ্ধা নারীর অবদানকে যথাযথ মর্যাদা না দেওয়ার প্রসঙ্গে কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেন, নারীর সাহস পুরুষের আড়ালে হারিয়ে যায়। নারী কোন সাহসের কাজ করলে বলা হয় পুরুষোচিত সাহস। তাই মুক্তিযোদ্ধা নারীর অবস্থা এখনও উপেক্ষিত।

একাত্তুরে নারী ছিল সর্বত্ত সাহসী সৈনিক হিসেবে
মুক্তিযুদ্ধের দলিলে ও বিভিন্ন পুরুষ গ্রন্থাকারের রচনায় নারী স্বীকৃতি না পেলেও এটা ঐতিহাসিক সত্য নারী মুক্তিযুদ্ধের সময় অসম সাহসের পরিচয় দিয়েছে গ্রামর একজন সামান্য নারী দেশের জন্য নিজের জীবনকে বাজি রেখেই যুদ্ধে নেমেছে। শুধু সামনা সামনি যুদ্ধ করা নয়, নারী মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে, তাদের জন্য ক্যাম্পে ক্যাম্পে, গিয়ে রান্না করেছে, মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার পৌছে দিয়েছে। করেছে গুপ্তচর বৃত্তির কাজ। সেই সঙ্গে নিজের ঘর সামলেছে।
সিরাজগঞ্জের মনিকা মতিন সরাসরি যুদ্ধ করেছেন। তিনি নারী যোদ্ধাদের স্মরণ করে বলেন, আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় শতকরা ৯৮ ভাগ নারীই ছিল মুক্তিযোদ্ধা। এদেশে কোন নারী রাজাকার নেই। আমি মুক্তিযুদ্ধের সময় যমুনার এপার ওপার যুদ্ধ করেছি। এ দুঅংশে পাক বাহিনীর যাওয়া আসা খুব কষ্টকর ছিল। রাজাকাররাও যাওয়া আসা করতে ভয় পেত। নারী এ সুযোগটি নিয়ে দিব্য আসা যাওয়া করে খবর আনা নেওয়া করতো। মনিকা এ প্রতিবেদককে আরও বলেন, আমি যদিও বন্ধুক চালাতে পারতাম না, তবু রাতে পাহাড়া দেবার জন্য দাঁড়াতাম। শত্রুর আনাগোনার খবর পেলে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতাম।
সাংবাদিক বেবী মওদুদ জানান, তারা মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের লোকদের খাবার সরবরাহ করতেন। এ কাজে সাহায্য  করতেন কবি সুফিয়া কামাল। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ধানম-ির অনেকেই ঢাকা ছাড়ার আগে তাদের রেশম কার্ড সুফিয়া কামালকে দিয়ে যেতেন। তিনি সে কার্ড দিয়ে তেল, আটা, চাল তুলে রাখতেন। পরে তা বিতরণ করা হতো। অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমেদ রিকশাওয়ালা সেজে তা বাড়ি বাড়ি পৌছে দিতেন।
মুক্তিযুদ্ধে ফরিদপুর হেমায়েত বাহিনীতে ছিলেন ২৪ জন মহিলা। এরা অস্ত্র চালানো জানতেন। এর ফলে ছিলেন কবি আজমেরী ওয়ারেস। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, তিনি একবার সন্ত্রাস সম্ভবা সজে পেটে অস্ত্র নিয়ে সাভার থেকে ঢাকা আসেন।
’৭১ এ ফাতেমার বয়স ছিল ১৩ বছর। চুল ছোট থাকায় ছেলের মতো মনে হতো। ফাতেমা কাদের মিয়া বাহিনীর প্রধান ক্যাম্প উপজেলার বাহড়াতৈলে মুক্তিযোদ্ধাদের রান্না করতেন, গোলাবারুদ পাহাড়া দিতেন, খবর আনা নেওয়া ও অস্ত্র সরবরাহ করতেন। ফাতেমা মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পেতেন। সাড়ে ৫ বছর যাবত তা বন্ধ রয়েছে। ফাতেমা বর্তমানে অনিয়মিতভাবে সখীপুর পৌরসভায় ঝাড়–দার পতে কাজ করছেন। স্বামী মোবারক আলী সুইপার। চার ছেলে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে।
নারী নেত্রী মালেকা বেগম নারী মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ন সম্পর্কে বলেন, নারীকে কেউ সহজে সংগ্রামের পথে নেয়নি। প্রীতিলতা ওয়েদার যখন শীহদ হন, তখন তার একটি চিঠিতে জানা যায়, তিনি লিখেছেন, নারীকে কেউ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করতে দেয়নি। বহু বাঁধা ছিল এমনি নারীর যে যন্ত্রণা তা মুক্তিযোদ্ধাদের কষ্ট ও যন্ত্রণার চেয়ে কম নয়। তবু নারী থেমে নেই।

প্রসঙ্গ তিন বোন
একি পরিবারের তিনবোন আসমা, রেশমা ও সায়মা খান। ঢাকায় তাদের বাড়িতে জমা রাখতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ। পরে তা মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিতরণ করতেন। ’৭১ এ আসমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসএসসি পড়তেন। সায়মা ও রেশমা কলেজে পড়তো। নারী গ্রন্থ প্রবর্তসর এক সংবর্ধনা সভায় সায়মা জানান, মুক্তিযোদ্ধারা ঠিক করলেন ’৭১ এর ১৪ আগস্ট ঢাকার কয়েকটি এলাকায় বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করবেন। আমাদের পতাকা তৈরির দায়িত্ব দিলেন। আমরা ২৮ দিনে ২০০টি পতাকা সেলাই করি। যদি কেউ সন্দেহ করে, তাই কাপড় কেনার সময় আমরা প্রথম সবুজ লুঙ্গি কিনি। তারপর কিনি লাল ও হলুদ কাপড়। পতাকা টানানো হল। ঘরে জমে ওঠনো সবুজ কাপড়ের টুকরো। আমার মা শঙ্কিত হলেন, যদি পাকবাহিনী বাড়ি সার্চ করে তবে তারা বুঝে যাবে। মা ক্রুসকাঁচা দিয়ে সবুজ কাপড়ে লেস করে তৈরি করেছেন টেবিল ম্যাট। তারপর উপহার দিলেন আত্মীয় স্বজনকে। ১৪ আগস্ট গাড়ি নিয়ে আমরা তিনবোন গ্যাস বেলুনের সাহায্যে আজিমপুর তোপখান ও স্টেডিয়ামে পতাকা ওড়াই। পতাকা দেখে পাকবাহিনী বেলুন লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করে।

মাত্র দুজন বীর প্রতীক পেয়েছেন
১৯৭৩ সালে ৬শ ৭৪ জন মুক্তিযোদ্ধাকে বিভিন্ন উপাদিতে ভূষিত করা হয়। তার মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র দুজন। তারা হলেন, তারামন বিবি ও মেডিকেল কোরের চিকিৎসক সেতারা বেগম। দীর্ঘদিন তারামন বিবি বীর প্রতীক ছিলেন শুধুই সরকারী গেজেটে। স্বাধীনতার চব্বিশ বছর পরে তারামন বিবি জানতে পারেন তিনি বীর প্রতীক পদক পেয়েছেন। ততদিনে দারিদ্র তাকে কাবু করে ফেলেছে, যক্ষ্মা এসেছে বাঁসা বেধেছে বীর হৃদয়ে।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close