আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সাক্ষাৎকার / ব্যক্তিত্ব

একাত্তরে চরম মূল্য দিয়ে বাঁচতে হয়েছে —ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী

ফরিদা ইয়াসমিন: ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী পরিত্যক্ত গাছের শেকড়-বাঁকড় দিয়ে তৈরি করছেন অদ্ভুত সব শিল্পকর্ম। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস খুলনার ক্রিসেন্ট জুট মিলে কর্মরত অবস্থায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হাতে কার্যত তিনি বন্দী ছিলেন। ফেরদৌসী দেখেছেন হানাদার বাহিনীর বর্বর নির্যাতন, গণহত্যা এবং ধ্বংসযজ্ঞ। নিষ্ঠুর পাশবিক নির্যাতনের ঐতিহাসিক সাক্ষী ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। হানাদাররা অনেক কিছু কেড়ে নিলেও নিতে পারেনি তাঁর শিল্পসত্তাকে। জীবন ছুটে চলে বহতা নদীর মত। যাপিত জীবনে কত ঝড়ই না আসে। কখনো সবকিছু উলট-পালট করে দেয়। ঝড়ের পর মানুষ আবার ওঠে দাঁড়ায়। আবার স্বপ্ন বুনে। এভাবেই নিরন্তর বেঁচে থাকা। বড় প্রিয় এ জীবন। ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী প্রিয় জীবনের কথা বলতে বলতে বলছিলেন একাত্তরে দেখেছি বাঁচার ইচ্ছা মানুষের কত প্রবল। মানুষ বাঁচার প্রশ্নে কত সংগ্রামী হয়ে উঠে। শুধু বাঁচতে গিয়েই নিজে দুঃখজনক ঘটনার শিকার হয়েছি। আমাকে চরম মূল্য দিয়ে বাঁচতে হয়েছে। বেঁচে থাকতে পেরেছি বলে স্বাধীন দেশের জন্ম দেখতে পেরেছি। বাঁচার প্রশ্নে আড়াই লাখ নারীকে নির্যাতিত হতে হয়েছে। একাত্তরের নির্মম ঘটনার স্বাক্ষী বর্বর পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় এক দুঃসহ ঝড় বয়ে যায় তার ওপর। কিন্তু বেঁচে আছেন প্রিয়ভাষিণী। শুধু বেচে নয়। জীবনকে সাজিয়েছেন শিল্পের থরে থরে। প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হয়েছে নিজের সঙ্গে সমাজের সঙ্গে। আর এই যুদ্ধের  মধ্য দিয়েই তিনি তাঁর শিল্প সত্তার বিকাশ ঘটিয়েছেন। সমাজের হায়েনার ক্ষত-বিক্ষত ছোবলেও নষ্ট হয়নি শিল্পী মন। পরিত্যক্ত গাছের গোড়া, শেকড়বাঁকড় দিয়ে অদ্ভুত সব শিল্পকর্ম তৈরি করছেন শিল্পী ফেরদৌসী।
ফেরদৌসীর জন্ম খুলনা শহরের ফেয়ারি কুইন নামের একটি বাড়িতে। ঢাকার নারী শিক্ষা মন্দিরে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু। যশোর এম এম কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। শিল্পী এস এম সুলতানের উদ্যোগে ১৯৯১ সালে যশোরে চারুপীঠ-এ প্রিয়ভাষিণীর প্রথম একক প্রদর্শনী শত তুচ্ছের আড়ালে অনুষ্ঠিত হয়। এ প্রদর্শনীতে শিল্পী এস এম সুলতান চারুপীঠের সহযোগিতায় একটি সংবর্ধনার মাধ্যমে প্রিয়ভাষিণীকে ভাস্কর হিসাবে স্বীকৃতি দেন। পরবর্তীতে তাঁর অনেক একক ও যৌথ প্রদর্শনী হয়।
শিল্পী ফেরদৌসী ছোটবেলা থেকে এই শিল্পের প্রতি ঝুঁকেন। মূল উদ্দেশ্য ছিল ঘর সাজানো। তিনি একদিন ভাস্কর হিসাবে স্বীকৃতি পাবেন এটি হয়ত ভাবেননি। তিনি বললেন, আমার মূল চিন্তা ছিল ইন্টিরিয়র ডেকোরেশন। ঘর সাজানোর জন্য বিভিন্ন ফার্ন কালেকশন করতাম। গাছের ডালপালা দিয়ে শুরু করলাম। ঘরে এগুলোতে  সাজিয়ে রাখলে অনেকে দেখে খুব উৎসাহ দিত। এভাবেই শুরু। তবে মূল ধারার কাজ শুরু করেন ১৯৮৪ সালে। ওমেন আই টুয়েনটি ফোর এর মুখোমুখি হন ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী ।

ওমেন আই: পরিত্যক্ত জিনিস দিয়ে শিল্পকর্মের চিন্তা মাথায় এলো কিভাবে?
প্রিয়ভাষিণী : আসলে ছোট বেলা থেকে প্রকৃতি বিলাসী ছিলাম। প্রকৃতি বিলাসিতা থেকে এ ধরনের কাজ করার কথা মনে আসে। এই শিল্পের পিছনে আরেকটা কারণ আছে, তা হচ্ছে এখানে আর্থিক সম্পৃক্তটা কম। এই মাধ্যমে কাজ করতে খুব বেশি অর্থের প্রয়োজন পড়ে না।
ওমেন আই: আপনার শিল্পকর্মের মূল অনুপ্রেরণা কী?
প্রিয়ভাষিণী: আমার পারিপার্শ্বিকতাই আমার শিল্পের মূর অনুপ্রেরণা। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের কবিতা, জীবনানন্দ দাশের কবিতা আমাকে অনুপ্রেরণা যোগায়। আমার শৈশবের স্থানটি ছিল খুবই প্রাকৃতিক পরিবেশের। এই শৈশব আমার জীবনে প্রভাব ফেলে।
ওমেন আই: মুক্তিযুদ্ধ আপনার জীবনে কতটা প্রভাব ফেলেছে?
প্রিয়ভাষিণী: মুক্তিযুদ্ধের সবটুকু সময় জুড়ে আমার জীবনে বয়ে গেছে দুঃসহ ঘটনা। নয় মাসকে তিরিশ দিয়ে গুণ করলে যা হবে তাঁর চেয়ে বেশি নৃশংস ঘটনার সাক্ষী আমি। শান্তি কমিটির নেতা প্রফেসর ভূঁইয়াকে হত্যার অভিযোগ এনে আমার ওপর চলে নির্যাতন। একাত্তরে পাকিস্তানি সৈন্যদের যে নৃশংসতা প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করেছি বর্বরতার সকল ইতিহাসকে তা ম্লান করে দেয়। আমি দেখেছি খুলনার ক্রিসেন্ট জুট মিলে গিলোটিনের মত পাট কাটার মেশিনের নীচে বাঙালিদের মাথা ঢুকিয়ে দ্বিখ-িত করে মু-ুটা নদীতে ফেলে দেয়া হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে নির্যাতিত হয়েছি। যুদ্ধের পর আমাকেই পাকিস্তানিদের সহযোগি হিসাবে চিহিৃত করার অপচেষ্টা হয়েছিল। আমি কখনো ভেঙে পড়েনি। প্রচ- আত্মবিশ্বাস নিয়ে প্রতিবারই তা প্রতিরোধ করেছি। ট্রাগল দিয়ে বোধ হয় নিজেকে তৈরি করা যায়। যুদ্ধ শেষ হলেও আমাকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়েছে প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে। শুধু বাঁচার ইচ্ছাটা আমাকে এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। আজ আমি শিল্পী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি। দেশেবিদেশে আমার শিল্পকর্ম প্রশংসিত হচ্ছে।’
পরিত্যক্ত গাছের শেকড়-বাঁকড় দিয়ে শিল্পকর্মের কাজ এদেশে বর্তমানে একমাত্র ফেরদৌসী করছেন। কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই গত ১৮ বছর ধরে তিনি এ কাজ করছেন। বীরঙ্গনা হিসাবে মহিলারা মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের যে ইতিহাস রচনা করেছিলেন। ফেরদৌসী তাদেরই একজন। তাঁর মা গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ফার্স্ট এইড হাসপাতাল খুলেছিলেন। ছোট ভাই সৈয়দ হাসান শিবলী যশোর সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন। ‘মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের মেয়ে হয়েও যুদ্ধের পরবর্তী সময়েও সহ্য করতে হয়েছে অনেক লাঞ্চনা-গঞ্জনা। কিন্তু সমস্ত কিছুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে তিনি এগিয়েছেন। তিনি আজ শুধু সামান্য একজন নারী নন, একজন শিল্পী হিসাবে সাড়া জাগিয়েছেন। শিল্পী হিসাবে তিনি অনন্যা শীর্ষদশ -‘৯৯ পুরস্কার পেয়েছেন।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে হলে আমাকে আরও পিছনে ফিরে যেতে হয়। বাষট্টি সালে আমার বিয়ে হয়েছিল। আমার স্বামী তখন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র। তার পড়াশুনার ব্যয়ভারও আমাকে বহন করতে হত। ক্রিসেন্ট জুট মিলে তখন কেরানীর চাকরি করি। পাশাপাশি পড়াশুনাও করতাম। তবে বিএ পাস করার পর আর আমার পড়াশুনা সম্ভব হয়নি। এদিকে আষট্টি সালে আমার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। আমি তখন তিন পুত্র সন্তানের জননী। আমার ছেলেরা তার দাদীর কাছে থাকলেও তাদের যাবতীয় খরচ আমাকেই দেখতে হতো। এই সময়টা আমার একজন ঊর্ধ্বতন সহকর্মী আহসান উল্লাহ আহমেদ (বিয়ার) আমাদের পরিবারটির প্রতি সহানুভূতির হাত বাড়িয়েছিলেন। মা আর ছোট ভাই বোনদের সঙ্গে খালিশপুরে থাকি। একাত্তরের মার্চে অন্যসব এলাকার মত খুলনার খালিশপুরও ছিল উত্তপ্ত। ২৪ তারিখে অফিসে গেলাম। তাড়াতাড়ি ফিরে এলাম। শহরে বাঙালি-বিহারী দাঙ্গা বেঁধেছে। কয়েকটি বাঙ্গালি বাড়িতে আগুনও দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভয় ছিল যদি কোন কারণে অফিস বন্ধ হয়ে যায় তাহলে তো বেতন পাবনা। আমার তিন সন্তান এবং ছোট ভাই বোনদের ভরনপোষণের কথা আমারই চিন্তা করতে হতো। সবকিছু বাদ দিয়ে আমার মনে হতে লাগল অফিস বন্ধহয়ে গেলে নিজের সন্তান আর ভাইবোনরা না খেয়ে থাকবে। যাই হোক পরদিন অফিসে গেলাম না। এদিকে ইপি আর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) রাস্তায় নামলো ২৬ তারিখ প্রচন্ড দাঙ্গা শুরু হল। চারিদিকে আগুন আর আগুন। ২৯ তারিখ শহরে আর্মি এলো। সবাই শহর ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। আমরাও  পালিয়ে গিয়েছিলাম। পড়ে কোথাও আশ্রয় না পেয়ে আবার ক্রিসেন্ট জুট মিলে ফিরে এসেছিলাম।
ক্রিসেন্ট জুট মিলের ঠিক পিছন দিকে বয়ে গেছে ভৈরব নদী। নদীর তীর ঘেঁষে মিলের পাট গুদাম। আমার কোয়ার্টার থেকে ওটার দূরত্ব বড়জোর দুশ ফুট। আমার সঙ্গে আমার এক ভোচ বোন থাকত। একদিন ও আমাকে বললো, আপা ঘুমের মধ্যে আমি কাদের যেন বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করতে শুনি। ওর কথা শুনে একদিন রাতে জেগে থাকি। রাত পায় তিনটার দিকে নদীর দিক থেকে অস্পষ্ট শব্দ ভেসে এল। বাঁচাও, বাঁচাও।
জানালা একটু ফাঁক করে দেখি গুদামের কাছে একটি ট্রাক দাঁড়ানো। মুখে কাল কাপড় বাঁধা কয়েকজন মানুষ হাঁটাহাঁটি করছে। চোখ কালা কাপড়ে বাঁধা একজনকে নামালো ট্রাক থেকে। গিলোটিনের মত দেখতে পাই কাটার মেশিনের তলায় ফেলে দেহ থেকে মাথা আলাদা করা হচ্ছে। এভাবে এক দুই তিন চারটা দেখার পর আর দেখতে পারলামনা। ভয়ে আতঙ্কে শিউরে উঠলাম চোখ বন্ধ করলেই সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য ভেসে উঠতো।’
কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে আমি ছিলাম অভিভাবকহীন। বয়স খুব বেশি ছিলনা। অনেক কিছু বুঝে উঠার আগেই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছি। বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করে পাকিস্তানের দোসররা আমাকে হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছিল। আমার অসহায়ত্বের সুযোগে তারা আমাকে ছিড়ে খুড়ে খেয়েছে। তারা বিভিন্নভাবে আমাকে হাতবদল করেছে। ওদের নির্যাতনের কারণে একবার আমি একটানা আটাশ ঘণ্টা সংজ্ঞাহীন ছিলাম।’
একাত্তরের স্মৃতিচারণ করতে করতে ফেরদৌসী বলেছেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আহসান উল্লাহর সাথে আমার বিয়ে হয়। আহসান উল্লাহ আমাকে বলেছিলেন তুমি তো আমাদের চেয়ে অনেক বড় মুক্তিযোদ্ধা। পাকিস্তানিরা কি করেছে তা ভুলে যাও। আমার কাছে তুমি আগের মতই আছ। আহসান উল্লাহ আমার স্বামী  তার কাছে হয়ত আমি আগের মতই আছি। কিন্তু একাত্তরের সেই নৃশংস ঘটনার কথা মনে পড়লে এখনও আমি আতংকে শিউরে উঠি। কী দুঃসহ ঝড় আমার ওপর দিয়ে বইয়ে গেছে। তা কি কোনদিন ভুলে যাবার!’

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close