আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সারাদেশস্লাইড

আটকে আছে জামায়াত নিষিদ্ধের প্রক্রিয়া

ওমেনআই ডেস্ক : বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন হাইকোর্টের রায়ে বাতিল হয়েছে আগেই। তবে সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধের প্রক্রিয়াটি আটকে আছে অজ্ঞাত কারণে। এ কারণে এখনো টিকে আছে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াত। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে যাদের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবেও ঘোষণা করা হয়েছে।
সংগঠন হিসেবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন (আইসিটি অ্যাক্ট) সংশোধনের খসড়া বছরখানেক আগেই চূড়ান্ত করেছে আইন মন্ত্রণালয়। তবে অজ্ঞাত কারণে তা এখনো মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে তোলা হয়নি। কবে নাগাদ তোলা হতে পারে তাও বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কেউ। আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক সাংবাদিকদের কাছে একের পর এক তারিখ জানালেও এ বিলটি মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে এখনো তোলা হয়নি।
আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সব কিছু চূড়ান্ত হওয়ার পরও বিলটি আটকে আছে। তা ছাড়া আদালতেরও অবজারভেশন (পর্যবেক্ষণ) রয়েছে জামায়াত নিষিদ্ধের ব্যাপারে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ ব্যাপারে কথা বলেছেন। তার পরও কেন আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন সংশোধনের বিলটি মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে তোলা হচ্ছে না তা বলা মুশকিল। অপর একটি সূত্র জানায়, অনেক পরিশ্রম করে দ্রুততার সঙ্গে জামায়াত নিষিদ্ধের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন সংশোধনের খসড়া তৈরি করা হয়েছিল। অথচ তা মাসের পর মাস ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এ ব্যাপারে বলেন, জামায়াত নিষিদ্ধের বিল উত্থাপনের বিষয়ে আমি কয়েকটি সময়ের কথা বলেছিলাম ঠিকই, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট তারিখ কখনো উল্লেখ করিনি। তিনি বলেন, যুক্তিসঙ্গত কারণেই বিলটি এতদিন তোলা হয়নি। সময় হলেই বিলটি মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে তোলা হবে এবং অনুমোদন হলে চূড়ান্ত করতে পাঠানো হবে জাতীয় সংসদে।
তিনি আরও বলেন, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবি পুরো জাতির। তাই এ নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টির অবকাশ নেই।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বেশ কয়েকটি রায়ে জামায়াতকে ইতোমধ্যে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটির অপরাধের জন্য তাদের দোষী সাব্যস্ত করে এর সঙ্গে সম্পৃক্তদের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি না দেওয়ার জন্যও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে জামায়াতকে একটি ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে উল্লেখ করে এটি নিষিদ্ধ করার ব্যাপারেও পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমসহ দলটির বেশ কয়েক শীর্ষ নেতার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ে সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন আর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া গণজাগরণ মঞ্চ ও দেশের বিশিষ্টজন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকেও দাবি রয়েছে দ্রুত জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার।
এদিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর আগে বর্ধমানের কাগড়াগড় বোমা বিস্ফোরণের পর ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতারা দাবি করেছিলেন- মমতার আশ্রয়ে থেকে বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী ভারতে সন্ত্রাসী কর্মকা- চালাচ্ছে। এহেন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার দাবি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও স্থান করে নিয়েছে।
সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন সংশোধনের খসড়ায় বিদ্যমান আইনের ১০টি ধারায় সংশোধন আনা হচ্ছে। এর মধ্যে সাতটি ধারায় কেবল ব্যক্তি শব্দের পাশাপাশি সংগঠন শব্দটি বসেছে। খসড়ার ২০ ধারার ২ উপধারায় বলা হয়েছে- ট্রাইব্যুনাল দোষী সাব্যস্ত সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করবেন এবং এর নিজ নামে বা অন্য কোনো নামে ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবেন। পাশাপাশি মামলার বিষয়বস্তু সাপেক্ষে সংগঠনটির সদস্যদেরও ট্রাইব্যুনাল সাজা দিতে পারবেন। বিদ্যমান আইনের ২০ ধারায় কেবল ব্যক্তির সাজার বিধান রয়েছে। খসড়ায় ৪ ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করে বলা হয়েছে, কোনো সংগঠনের কার্যনির্বাহী কমিটি অথবা কেন্দ্রীয়, আঞ্চলিক বা স্থানীয় কমিটির সদস্য যদি অপরাধ করেন, তবে ওই অপরাধের জন্য সদস্যের পাশাপাশি সংগঠনও দায়ী হবে। ১০ ধারায়ও একটি পরিবর্তন আনা হচ্ছে। খসড়া অনুসারে, সংগঠনের বিরুদ্ধে মামলার বিচারের ক্ষেত্রে অন্যান্য মামলার মতোই ট্রাইব্যুনাল তার কার্যপ্রণালি বিধিমালা অনুসারে অভিযোগ গঠন, দোষী সাব্যস্তকরণ ও রায় ঘোষণা করবেন।
২০১৪ সালের ২৭ মার্চ দল হিসেবে দলবদ্ধভাবে মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র বিরোধিতাকারী জামায়াতের বিরুদ্ধে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে জমা দেয় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জামায়াত এবং তাদের অঙ্গ সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির (তৎকালীন সময়কার ইসলামী ছাত্রসংঘ) ও ইসলামী ছাত্রী সংস্থা, শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনী, আলবদর, আলশামসের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন ১৯৭৩-এর আলোকে তৈরি এ তদন্ত প্রতিবেদনে জামায়াত এবং তার সব অঙ্গ সংগঠন নিষিদ্ধ ও অবলুপ্ত করার আরজি জানানো হয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, জামায়াতের বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান-সংগঠনের বিরুদ্ধেও।
ভবিষ্যতেও যেন কেউ এ ধরনের রাজনীতির আলোকে রাজনৈতিক দল গঠন বা রাজনীতি করতে না পারেন সে রায়ও চাওয়া হয়েছে। একাত্তরে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জেনেভা কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা ও ষড়যন্ত্র এবং এসব অপরাধ ঠেকাতে ব্যর্থতাসহ সাত ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে জামায়াত ও তার অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। জামায়াতের নীতিনির্ধারক, সংগঠক, পরিচালক ও কেন্দ্র থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের এসব অপরাধের জন্য দায়ী করা হয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত জামায়াত, তার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ, শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনী, আলবদর বাহিনী ও আলশামস বাহিনীর নানা নৃশংস অপরাধ এবং জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামের যাবতীয় অপরাধের অভিযোগ তুলে আনা হয়েছে এ তদন্ত প্রতিবেদনে।
স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে যুদ্ধাপরাধের কারণে স্বাধীনতার পর জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হয়। তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুব রহমান নিহত হওয়ার পর দেশে রাজনৈতির পটপরিবর্তন হলে ক্ষমতায় আসেন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান। আর তিনি ক্ষমতায় আসার কিছু দিনের মধ্যেই জামায়াতকে রাজনীতিতে পুনর্বাসন করেন। এর পর থেকে কখনো একক আবার কখনো জোটগতভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে দলটি। প্রতিটি নির্বাচনেই দলটি বেশ কিছু আসনে নির্বাচিতও হয়। তবে সর্বশেষ ২০০৯-এর নির্বাচনে দলের মোটামুটি ভরাডুবি হয় বিএনপির সঙ্গে জোটগত নির্বাচন করার পরও। মাত্র ৩ আসন পায় তারা। আর এই নির্বাচনে হেরে যান দলের আমির, সেক্রেটারি, নায়েবে আমিরসহ প্রায় সব বড় নেতা। তখন থেকেই মূলত দলের বিপর্যয় শুরু।
এর পর একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ২০১০ সালে গঠিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সেখানে একে একে মৃত্যুদ-ের রায় আসতে থাকে দলটির নেতাদের বিরুদ্ধে। শুরুর দিকে রাজপথে কিছুটা প্রতিবাদ ও উচ্ছৃঙ্খলাতা প্রকাশ করা হলেও ধীরে ধীরে তা কমতে থাকে। দলের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর দেশব্যাপী ব্যাপক তাণ্ডব চালায় দলটির নেতাকমীরা। তবে সেটিই ছিল তাদের শেষ ‘শোডাউন’। এর পর আর কোনো রায়ের পর তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া রাজপথে দেখা যায়নি দলটির। এমনকি দলের আমিরের ফাঁসি কার্যকরের পরও না।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close