আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
নারী নির্যাতনস্লাইড

সাম্প্রতিক ধর্ষণের ঘটনায় উদ্বিগ্ন মানুষ

খাদিজা খানম তাহমিনা : মিসেস সাবিহা মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় অস্থির। পারেন তো বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়াও বন্ধ করে দেন। চারদিকে ধর্ষণের নানা ঘটনায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। মেয়ের মোবাইল পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত করতে তার রুচিতে বাধেনি। তিনি বলেন, ‘কি করবো বলো, মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে সত্যি আমি আতঙ্কিত, সমসাময়িক ধর্ষণ চিত্র আমাকে অস্থির করে তুলেছে। মেয়ে ঘর থেকে বের হলেই ভয় পাই, এই বুঝি কোনো ছেলের পাল্লায় পড়ে দুর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে।’
রাজধানীর বনানীতে জন্মদিনের অনুষ্ঠানের কথা বলে ডেকে নিয়ে তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। মামলার এজহারভুক্ত আসামি বাহার উদ্দিন ইভান। পুলিশ জানায়, গত ৪ জুলাই মঙ্গলবার রাতে জন্মদিনের দাওয়াতের কথা বলে পূর্বপরিচিত এক তরুণীকে বনানীর ২ নম্বর রোডে ন্যাম ভিলেজে নিজ বাসায় ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ ওঠে। ধর্ষণ শেষে রাত সাড়ে তিনটায় বাহার উদ্দিন ইভান তরুণীকে বাসা থেকে বের করে দেন বলে জানা যায়। ওই ঘটনায় তরুণী পরদিন ধর্ষণের অভিযোগে ইভানের বিরুদ্ধে বনানী থানায় মামলা করেন। গ্রেফতারকৃত আসামি ইভান তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে।
রেইনট্রিতে ধর্ষণের মামলা- জন্মদিনের পার্টিতে ডেকে নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ এনে গত ৬ মে বনানী থানায় মামলা করেন এক ছাত্রী। মামলার এজহারে থেকে জানা যায়, গত ২৮ মার্চ রাত ৯টা থেকে পরের দিন সকাল ১০টা পর্যন্ত আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত আহমেদসহ পাঁচজন মামলার বাদী এবং তার বান্ধবী ও বন্ধু শাহরিয়ারকে আটকে রাখেন। অস্ত্র দেখিয়ে ভয়-ভীতি প্রদর্শন ও অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে বাদী ও তার বান্ধবীকে জোর করে ঘরে নিয়ে যায় আসামিরা। বাদীকে সাফাত আহমেদ এবং তার বান্ধবীকে নঈম আশরাফ ধর্ষণ করেন। দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের কথা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে সাফাত এবং সাদমান। উল্লেখ্য, সাদমান সাফিফের মাধ্যমেই ঘটনার অল্প কিছুদিন আগে পরিচয় হয় সাফাত এবং নঈম এর সাথে ওই দুই ছাত্রীর সাফাতসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের (ভিকটিম সাপোট সেন্টার) পরিদর্শক ইসমত আরা এ্যানি। মিউজিক ভিডিওতে অভিনয়ের কথা বলে ডেকে এনে সাভারে দুই তরুণীকে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তরুণীদের অভিযোগ অনুযায়ী। অভিযোগ অনুযায়ী ৬ জুলাই রাতে সাভারে পৌর এলাকার সিটি সেন্টারের পশ্চিম দিকে লিজেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভবনের দ্বিতীয় তলার অফিস কক্ষে আটকে তাদের ধর্ষণ করে লিটন আলী মণ্ডল ও তার সহযোগীরা। ভবনটির অবস্থান ঢাকা জেলা (উত্তর) গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ের সামনে। তরুণীদের ভাষ্যমতে, মিউজিক ভিডিওতে মডেল হিসেবে অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়ে ৬ জুলাই বিকেলে মোবাইলে ফোন করে তাদের সাভার আসতে বলে লিটন। তারা গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকা থেকে সাভারের যায়। রাত ১০টায় দিকে তারা সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে লিটনকে ফোন করলে সে তাদের ওই কলেজ ভবনে নিয়ে যায়। পরে লিটন ও তার সহযোগীরা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে পৃথক কক্ষে নিয়ে তাদের ধর্ষণ করে। ভোরের দিকে তাদের চিৎকারে এলাকাবাসী এগিয়ে এসে পুলিশের সহযোগিতায় তাদের উদ্ধার করে। এরই মধ্যে কৌশলে লিটন পালিয়ে যায়।
কাজ দেওয়ার কথা বলে রাজধানীতে নিয়ে এসে বন্ধুর এতিম শিশু সন্তানকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে খোকন নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ইতোমধ্যে তাকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে কদতমলী থানা পুলিশ। ১০ বছরের শিশুটি ৬ জুলাই বৃহস্পতিবার রাত থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে ভর্তি আছে।
পর পর ধর্ষণের একই রকম ঘটনায় আতঙ্কিত দেশের মানুষ, বিশেষ করে কন্যার সন্তানদের অভিভাবকগণ। সারাদেশে নারীর যৌন হয়রানি অর্থাৎ ধর্ষণ চিত্র এতটাই বেড়ে গেছে যে তা সাধারণ ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ধর্ষণ একটি জঘন্য অপরাধ। ধর্ষণের মতো অপরাধের কঠোর শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য প্রকাশ করেছেন এক অভিভাবক। সুফিয়া নামের অভিভাবকরা জানান- আমাদের দেশে আইন আছে কিন্তু আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়ার ধর্ষণকারী কিছুদিন পরই আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে।
আমাদের দেশের কিছু ধনাঢ্য পরিবারের তরুণ নিজেদের ভোগ বিলাসিতার প্রয়োজনে নারীদের ব্যবহার করে থাকে। এ ধরনের তরুণদের দ্বারা নারীর যৌন হয়রানির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্টজনরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক চিন্ময় সিকদার বলেন, ধর্ষণ ও নির্যাতন আমাদের সমাজকে কলুষিত করেছে। কিন্তু আমাদের জানতে হবে কেন এ ধরনের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। যারাই এ ধরনের ঘটনার সাথে জড়িত, তাদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে। এবং শাস্তির বিষয়টি গণমাধ্যমে ধর্ষণের চেয়েও বেশি করে তুলে ধরতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফাওজিয়া হোসেন বলেন, এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে সে জন্য সরকারকে আরো কঠোর হাতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিচারের বিষয়টিও জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। এসব অপরাধের শাস্তির সংবাদ বিস্তারিতভাবে গণমাধ্যমে আসে না বলেই অপরাধীরা সাহস পাচ্ছে।
সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, যৌন নির্যাতনের ঘটনা একটি অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ। এ ধরনের যৌন হয়রানির ঘটনা কখনোই কাম্য নয়। যারা এই ঘৃণ্য অপরাধ করছে তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং দ্রæত সম্ভব বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। অপরাধীরা যত প্রভাবশালীই হোক, যত ক্ষমতাবানই হোক, কোনোভাবেই তাদের ছাড় দেওয়া যাবে না। এ ধরণের অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও সাজা হলে নারী নির্যাতন বন্ধের ক্ষেত্রে তা ইতিবাচক ভ‚মিকা রাখবে বলে আমি মনে করি।
মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল বলেন, আমরা দেখতে পাই, মামলার ক্ষেত্রে বিত্ত ও ক্ষমতার প্রভাব কাজ করছে। কাজেই পুরো বিষয়টিকে নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে। সচরাচর এ ধরনের বিষয়গুলোর বিচার হয় না। এর ফলে অপরাধীরা আরও সাহসী এবং বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আমি তাদের শাস্তির জোর দাবি করছি। এরই সঙ্গে এ ঘটনাগুলোতে আইনগত বিভিন্ন পর্যায়ে যারা গাফিলতি করছে, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি। সা¤প্রতিক সময়ের ধর্ষণসহ নারী নির্যাতনের ঘটনায় দ্রæত বিচার না পাওয়ার কারণে এসব যৌন হয়রানির ঘটনাগুলো বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির দেওয়া তথ্যানুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে নারী খুন, ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, নারী পাচারসহ নানাভাবে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে মোট ২৭৪টি। যার মধ্যে মামলা হয়েছে মাত্র ৮৫টি ঘটনার। ফেব্রæয়ারি মাসে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে ২০৮টি। যার মধ্যে মামলা হয়েছে মাত্র ৭০টি ঘটনায়। এভাবে প্রতিদিনই নারীর যৌন হয়রানি বেড়েই চলেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ডা. নাসরীন ওয়াদুদ মনে করেন, নারীর প্রতি সংঘটিত অপরাধকে খাটো করে দেয়া, আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়া, বিচারকার্যে দীর্ঘ সময়, সাক্ষীকে ভয় দেখানো, সাক্ষীর অভাব ও নির্যাতিত পরিবারের ঘটনা চেপে যাওয়ার চেষ্টার কারণেই নারী নির্যাতন অর্থাৎ যৌন নির্যাতন রোধ সম্ভব হচ্ছে না। অপরাধ বিজ্ঞানী ও সমাজ গবেষক মো. তৌহিদুল হক মনে করেন, আমাদের দেশের তরুণ যুবক, উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা ভিনদেশি সংস্কৃতি দ্বারা খুব বেশি পরিমাণে প্রভাবিত হয়ে পড়েছে। অতি আধুনিকতার নাম করে যুব সমাজ অনেকটা বিকৃত রুচিশীলতার পরিচয় দিচ্ছে। আর তাদের বিকৃত মানসিকতার শিকার হচ্ছে নারী ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. শেখ তৌহিদুল ইসলাম এক বিবৃতিতে বলেন, পূর্বের তুলনায় নারীর ক্ষমতায়ন অনেক বেড়েছে। নারীর মর্যাদা ও ক্ষমতা যেমন বেড়েছে পাশাপাশি নারীর প্রতি নিষ্ঠুরতা এবং নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণের ঘটনাও বেড়েছে। ইন্টারনেট সুবিধার জন্য এখন সবাই ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়েছে। অবাধ ইন্টারনেট সুবিধার কারণে অপ্রাপ্ত বয়সের ছেলেমেয়েরা নিষিদ্ধ জিনিস দেখছে। পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে অনেক বিকৃত তরুণ এসব অসৎ কাজেও লিপ্ত হচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলেছেন, দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের অবক্ষণের কারণেই ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। এসব অপরাধের বিরুদ্ধে সমাজকে জেগে উঠতে হবে, সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
অনেকে মনে করেন, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বলতা, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও অবাধ পর্নোগ্রাফির প্রসারের কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। মনিরুল ইসলাম নামের একজন ব্যবসায়ী বলেনÑ ক্রমাগতভাবেই এ ধরনের ঘটনা সারাদেশে ঘটছে। কিন্তু আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী যথাযথ ভ‚মিকা পালন করছে না। ‘ঘটনা ঘটে কিন্তু অপরাধীর বিচারকার্য স্থগিত থেকে যায় এটাই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে দিন দিন ধর্ষণের ঘটনা আরো বাড়তে থাকবে বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ। ধর্ষণের ঘটনাগুলো নিয়ে কথা বলছিলাম ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে ঢাকার উপ-পুলিশ কমিশনার ফরিদা ইয়াসমিনের সঙ্গে। তিনি বলেন ‘এখন আসলে মেয়েরাই মেয়েদের নিজেদের সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। অভিভাবকদেরও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে সন্তানদের প্রতি। কারণ সা¤প্রতিক সময়ের ধর্ষণের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাতে মেয়েরা বন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। কাদের ডাকে যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, সবকিছু ভালোভাবে জেনে শুনে মেয়েদের ঘর থেকে বের হওার অনুমতি দিতে হবে। ফ্যামিলি থেকে সন্তানদের সতর্ক করতে হবে। হুট করে বন্ধু ফোন করলো, আর তাতেই সে রাজি হয়ে গেলÑ এই বিষয়গুলো ভেবেচিন্তে ঘর থেকে বের হওয়া উচিত। নিজেকে নিজেদের সেইভ করতে হবে। পাশাপাশি সন্তানদের প্রতি বাবা মায়ের আরো সুদৃষ্টি দিতে হবে।’

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close