আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সাক্ষাৎকার / ব্যক্তিত্বস্লাইড

ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা ছিল লেখক ও সাংবাদিক হওয়ার : শাহনাজ মুন্নী

শাহনাজ মুন্নী একজন সফল সংবাদকর্মী। পাশাপাশি তার আরেকটি পরিচয় তিনি একজন নিষ্ঠাবান কবি ও লেখক। তিনি চুল বাঁধেন আবার রাঁধেন’ও, সময় পেলে কলম-খাতা নিয়ে বসেন সমাজ রাষ্ট্র এমনকি মানুষকে নিয়ে লিখতে। দুই সন্তানের জননী শাহনাজ মুন্নী সফলতার সাথে দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করে আসছেন। বর্তমান দেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন। সাংবাদিকতা ও তার সফলতা নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। যার চুম্বক অংশ তুলে ধরেছেন- হাসান সাইদুল ও খাদিজা খানম তাহমিনা

কেমন আছেন?
খুব ভালো আছি। গতকালই সুইডেন থেকে এলাম। আজ অফিস। কাজ ছাড়া ভালো লাগে না।

ঢাকার ইট-পাথরে মধ্যেই আপনার বেড়ে ওঠা। কখনও কি মনে হয়েছে যে কেন গ্রামে জন্মালেন না?
আসলে আমি যেই ঢাকাতে জন্মেছিলাম। তখনকার ঢাকা আর এখনকার ঢাকার মধ্যে অনেক পার্থক্য। আমাদের সময় ঢাকা শহরে অনেক খোলা প্রান্তর ছিলো। গাছপালা ছিলো। এতো মানুষ এতো হইচই কোলাহল ছিলো না। আরেকটা বিষয় হলো গ্রামের সাথেও আমাদের যোগাযোগ ছিলো। আমার মায়ের বাড়ী নেত্রকোনা বাবার পৈতৃক নিবাস ছিলো কিশোরগঞ্জ। আমরা দাদা বাড়ী, নানা বাড়ী বেড়াতে যেতাম। সব মিলিয়ে শহরে জন্ম নিয়ে আমার কোনো খেদ নেই। বরং শহর ও গ্রাম দুই রকমের জীবন সম্বন্ধেই আমার ধারণা রয়েছে।

সাংবাদিকতায় আসার শুরুর কথা বলুন?
ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির হাত ছিল আমার। আমাদের বাসায় অনেক বই ছিলো। বই পড়ার চর্চা ছিলো। আমার মনে হয়েছিল, সমাজের জন্য কিছু করতে হলে সাংবাদিকতা একটা ভালো পেশা। তখন থেকেই আমার একটা প্রবল ইচ্ছা ছিলো, সাংবাদিক হওয়ার। পাশাপাশি ছোটদের জন্য গল্প কবিতা লিখতাম তাই লেখক হবো এমন একটা প্রত্যয়ও ছিল আমার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনার ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু আমার বাবার সম্মতি না থাকায় সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করি। বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও আমি লেখালেখি ছাড়িনি। কবিতা ও গল্প লিখতাম। যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলাম তখন নাইমুল ইসলাম খান ‘খবরের কাগজ’ নামে একটি পত্রিকা বের করার জন্য একটা বিজ্ঞাপন দিলেন যে, তরুণ প্রজন্মের যাদের লেখালেখি ও সাংবাদিকতায় আগ্রহ আছে তারা যোগাযোগ করুন। আমি সেখানে গেলাম। সম্পাদক আমাকে কিছু কাজ দিলেন। আমি তিন/চারটা প্রতিবেদন জমা দিই এবং সেগুলো ছাপাও হয়। ‘প্রিয়জন’ নামে একটা সাপ্তাহিক বের হতো তখনকার সময়। সে পত্রিকায়’ও কিছুদিন কাজ করি। ‘অনন্যা’তেও কাজ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পর কয়েকটি এনজিওতে এবং বাংলা একাডেমি ও নজরুল ইনস্টিটিউটে কাজ করেছিলাম কিছুদিন পরে দৈনিক মানব জমিনে চাকরি নিলাম। প্রফেশলান ও দাম্পত্য নামে দুটা পাতার বিভাগীয় সম্পাদক ছিলাম। মানব জমিনে ছয় মাস কাজ করার পর চাকরি নিলাম একুশে টেলিভিশনে। তার পর ১২ বছর কাজ করি এটিএন বাংলায় এখন কাজ করছি নিউজ২৪।

সাংবাদিকতায় কেন এলেন?
সাংবাদিকতা একটি মহৎ পেশা। এই পেশায় সৎভাবে সমাজের ভালোর জন্য কাজ করা সম্ভব। তাই নিজের আগ্রহ তো ছিলই, পাশাপাশি একুশে টেলিভিশনের মত ভাল একট প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগও পেয়ে গেলাম… তাই।
তখনকার সময় তো মেয়েদের চাকরি করা খুব কঠিন ছিলো…
আসলে আমাদের ছাত্রজীবনেই অর্থাৎ আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই মেয়েরা প্রচলিত পেশার বাইরে বের হতে শুরু করলো। আমি যখন একুশে টেলিভিশনের চাকরি নিলাম, তখন রিপোর্টিং-এ আমরা দুজন মেয়ে ছিলাম। আমি ও মুন্নী সাহা। তার পর আরো অনেকেই আসা শুরু করলো। আমাকে এখনও অনেক অভিবাবক বলেন যে, মুন্নী সাহা ও আপনাকে দেখে আমরা মেয়েকে সাংবাদিক হতে উৎসাহ দিয়েছি। এখন তো প্রতিটা গণমাধ্যমে মেয়েরা কাজ করছে এবং ভাল করছে।

আপনার সংসার সম্বন্ধে বলুন?
আমার দুই কন্যা ও স্বামী নিয়ে আমার ছোট সংসার। আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তখন থেকেই আমার স্বামীর সাথে পরিচয় হয়। তিনি কবিতা লিখেন। বিশ^বিদ্যালয়েই তার সাথে আমার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। ১৯৯৪ সালে আমরা বিয়ে করি। ১৯৯৫ সালে উনি বাংলা একাডেমিতে যোগ দেন। এখনও সেখানে উপ-পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। আমার মেয়েদের নাম যৌথ মনীষা ও যুক্ত মনন।

আপনার প্রথম উপার্জনের পরিমাণ কত ছিলো সে টাকা দিয়ে কি করেছিলেন?
আমি স্কুলে পড়ার সময় প্রথম উপার্জন করি, টিউশনি করে। আমার প্রথম উপার্জনের টাকার পরিমাণ ছিলো দু’শ। পাশের বাসায় পলাশ শিমুল ও চঞ্চল নামে তিনজন ছাত্রকে পড়াতাম। সে টাকা দিয়ে তখন গল্পের বই কিনেছিলাম।

এমন কিছু স্মৃতি যা মনে পড়লে আজও রোমাঞ্চিত হন?
দেখো সাংবাদিকতা সারাক্ষণই রোমাঞ্চিত করার মতো পেশা। প্রতিদিন কত রোমাঞ্চকর ঘটনা ঘটে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে, কত কিছু জানতে পারি, দেখতে পাই। আলাদা করে তাই কোন স্মৃতি মনে করা কঠিন। তবে খবর সংগ্রহের প্রয়োজনে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় গেছি, অনেক মহান মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি, সেগুলো ভাবতে ভাল লাগে।
বর্তমানে টেলিভিশন রেডিও এমনকি অনলাইন পোর্টালগুলো উপস্থাপনার সময় অনেক সময় বাংলা ভাষাকে বিকৃতি করে ফেলে কথায় কথায় ইংরেজি বলে থাকে… এটা অনেক দিন ধরেই হচ্ছে। বিশেষ করে এফএম রেডিওগুলোতে বাংলা ভাষাকে বিকৃত করে উচ্চারণ করার একটা রীতি ছিল। তবে এটা এখন অনেক কমে এসেছে। এখানে শুধু গণমাধ্যমের দোষ দিবো না। আমরা নিজেরাও তো প্রাত্যহিক জীবনে ভালোভাবে বাংলা বলি না। যখন বাংলা লিখি সঠিক বাংলা লিখি না। আমরা বাংলা ভাষার চর্চা করি না। সাহিত্য পড়ি না। এটা ঠিক নয়। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

‘রুদ্বশ্বাস বৈঠকের পর’ আপনার প্রথম কবিতার বই। প্রথম বই প্রকাশ সম্বন্ধে বলুন?
এই বইটি ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয়। আমি তো তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, নতুন লেখক। নতুন লেখকদের বই প্রকাশকরা সহজে প্রকাশ করতে চান না। আমার বেলায়ও তেমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমি ও সরকার আমিন যৌথভাবে নিজেদের টাকায় প্রথম এই বইটা প্রকাশ করি। বইয়ের সংখ্যাও ছিলো কম। বইমেলায় নিজেদের বই নিজেরাই বিক্রি করেছি।

বাংলাদেশে কর্মসংস্থানে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে নারীদের এই অগ্রযাত্রা সম্বন্ধে কি বলবেন?
নারীদের বিভিন্ন সেক্টরে এখন কাজ করার সুযোগ বেড়েছে। মেয়েরা নিজেরা যেমন, তেমনি তাদের পরিবারের মানুষজনও এখন উৎসাহ দিচ্ছেন মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে। আত্মনির্ভরশীল হতে। আমি নারীদের এই অগ্রযাত্রাকে স্বাগত জানাই।

গণমাধ্যমে মাত্র ৬ শতাংশ নারী কাজ করছে অথচ অন্যান্য সংস্থা নারীদের অংশগ্রহণ বেশি এ বিষয়ে কিছু বলুন?
প্রথম কথা হচ্ছে, আমাদের সমাজ তো এখনও পুরোপুরি বদলে যায়নি। এটা স্বীকার করতেই হবে, অনেক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বাধা রয়ে গেছে। একটি মেয়ে রাতে একা নিরাপদে বাসায় ফিরবে এর নিশ্চয়তা আমাদের সমাজ দিতে পারছে না। একটা মেয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে রিপোর্টিং করতে যাবে, সে সেখানে নিরাপদে থাকবে এ নিশ্চয়তা রাষ্ট্র কি দিতে পারছে? আর সাংবাদিকতা পেশা অন্য আট দশটা পেশার মত না। এখানে বাধা ধরা কোনো নিয়ম নাই কোনো নির্দিষ্ট সময় নাই। তার পর অনেক রকম জায়গা আছে যেখানে কেউ যেতে চায় না। দুর্ঘটনা হোক দুর্যোগ হোক, সেখানে সবার আগে সাংবাদিকরাই ছুটে যায়। ঝুঁকি নেয়। এই ঝুকিপূর্ণ কাজ করতে হয়তো অনেকে রাজি থাকেন না। আমি যদি অন্য জায়গায় নিরাপদ চাকরি করতে পারি তবে ঝুঁকি নিয়ে কেনোই বা সাংবাদিকতা করবো এই চিন্তাও অনেক মেয়েরা করেন।

পেয়েছেন বেশি নাকি চাওয়া ছিলো বেশি?
কি পাইনি তার হিসাব মেলাতে মন মোর নহে রাজি। বরং যা পেয়েছি সেইটুকুতেই খুশি আমার মন।
সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ ভালো থাকবেন

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close