আমাদের নুতন ওয়েবসাইট www.womeneye24.com চালু হয়েছে। নুতন সাইট যাবার জন্য এখানে ক্লিক করুন
আন্দোলন সংগ্রামে নারীস্লাইড

ভাষা আন্দোলনের সূচনা

ওমেনআই ডেস্ক : ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম যতই দানা বাঁধছিল, ততই স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, এই প্রশ্নও উত্থাপিত হচ্ছিল। ১৯৪৭ সালে যখন ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম সুনিশ্চিত হয়ে যায়, তখন থেকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, এ নিয়ে প-িতজ্ঞ ও রাজনীতিকদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চলতে থাকে।
১৯৪৭ সালের জুলাইয়ে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বিষয়ে একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, হিন্দি যেমন ভারতের রাষ্ট্রভাষা হবে, উর্দুকেও তেমনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করতে হবে।
এর দাঁতভাঙা জবাব দেন বাঙালি ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি বলেন, এটি বৈজ্ঞানিক শিক্ষা ও নীতিবিরোধী এবং স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার-নীতিরও পরিপন্থী। ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ পাকিস্তানের প্রদেশসমূহের বিদ্যালয়ের শিক্ষার বাহনরূপে প্রাদেশিক ভাষার পরিবর্তে উর্দুভাষার সপক্ষে যে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন, আমি একজন শিক্ষাবিদরূপে উহার তীব্র প্রতিবাদ জানাইতেছি। ইহা কেবলমাত্র বৈজ্ঞানিক শিক্ষা ও নীতির বিরোধীই নয়, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের নীতি বিগর্হিতও বটে।
১৯৪৭ সালের ৩ আগস্ট মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কমরেড পত্রিকায় ল্যাঙ্গুয়েজ প্রবলেম শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ভাষাবিদ ও শিক্ষাবিদ হিসেবে অনেক যুক্তি উপস্থাপন করেন। তার প্রবন্ধটি ছাত্রজনতার মধ্যে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টিতে সহায়ক হয়। সে সময়ই দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দু ভাষা গ্রহণ করা হইলে ইহা রাজনৈতিক পরাধীনতারই নামান্তর হইবে।
আরেকটি প্রবন্ধে তিনি বাংলা ভাষার পক্ষে বলেন, ইহা জ্যামিতির স্বীকৃত বিষয়ের ন্যয় স্বতঃসিদ্ধ। উন্মাদ ব্যতীত কেহই ইহার বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করিতে পারে না।
১৯৪৭ সালের ১৪-১৫ আগস্ট ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে নতুন দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এর পর পরই রাষ্ট্রভাষার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্বের সঙ্গে সামনে চলে এসে। ১৯৪৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপক ও ছাত্রের উদ্যোগে তমুদ্দুন মজলিস নামে একটি সাহিত্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়। এর আহ্বায়ক ছিলেন নূরুল হক ভূঁইয়া এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাশেম। ১৫ সেপ্টেম্বর তমুদ্দুন মজলিসের পক্ষ থেকে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়। এর শিরোনাম ছিল ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?’ এই পুস্তিকাটিতে শিক্ষার বাহন, অফিস, আদালত ও সরকারি কাজকর্মে বাংলা ভাষা ব্যবহার করার দাবি তুলে ধরা হয়। তমুদ্দুন মজলিসের এই ছোট্ট বইটি ছাত্রদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। বাংলা ভাষার পক্ষে জনমত গড়ে উঠতে থাকে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী মোতাহার হোসেন, অধ্যাপক আবুল কাশেমসহ শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা বাংলার সপক্ষে যুক্তি দিতে থাকেন। তমুদ্দুন মজলিসের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির অনেক কর্মী সম্পৃক্ত ছিলেন। বামপন্থি এই ছাত্রনেতারা তাদের রাজনৈতিক পরিচয় গোপন রেখে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সাধারণ ছাত্রদের সংগঠিত করতে থাকেন। ভাষা আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের মধ্যে ছিলেন শহীদুল্লাহ কায়সার, নাদেরা বেগম, মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ, আবদুল মতিন, মমতাজ বেগম, গাজীউল হক প্রমুখ।
এদিকে উর্দু ভাষাকে বাংলার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পক্ষেও কর্মকা- চলতে থাকে। ১৯৪৭ সালের ২৭ নভেম্বর করাচিতে পাকিস্তানের প্রথম শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তানের সে সময়কার কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাবিদদের নিয়ে এ সম্মেলন আহ্বান করেন। এর আসল উদ্দেশ্য ছিল উর্দুকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে পাকিস্তানের প্রাদেশিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাপিয়ে দেওয়া। বাংলার বিপক্ষে এই শিক্ষা সম্মেলন ছিল বেশ জটিল একটি ষড়যন্ত্রের অংশ। শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের প্রতিটি প্রদেশে (পূর্ব পাকিস্তানসহ) শিক্ষার মাধ্যম ঘোষণা করা হয়। তার মানে বাংলাদেশেরও স্কুলে কলেজে সর্বত্র উর্দু ভাষার মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই অযৌক্তিক ও স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ফেটে পড়ে পূর্ববাংলার ছাত্রসমাজ এবং সাধারণ জনগণ।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close